সাহিত্য

চোখের নজরে চোখ

আবদুল হামিদ মানিক প্রকাশিত হয়েছে: ০১-১২-২০১৯ ইং ০০:২১:২১ | সংবাদটি ১০৩ বার পঠিত

চোখ। দু’টি অক্ষরের ছোট্ট একটি শব্দ। শরীরের তুলনায় অঙ্গটি ছোট বটে। কিন্তু ব্যঞ্জনায়, আবেদনে এ এক বিস্ময়কর সৃষ্টি। মনের ভাব প্রকাশে চোখের নীরব ভাষার জুড়ি নেই। অকাক্সিক্ষত অনেক কথাই চোখ মুহূর্তে অপরকে জানিয়ে দিতে পারে। মনের গহীন কোণের সংবাদ বহন করে চোখ। বিচিত্র অনুভূতিতে মানুষ প্রতি নিয়ত তাড়িত হয়, আন্দোলিত হয়। মুখে কথা থাকেনা। কিন্তু চোখ। চোখ যেন মনের দর্পন। মুহূর্তেই এ স্বচ্ছ দর্পনে মনের ছায়া ধরা পড়ে। হৃদয় চোখের ভাষায় কথা বলে। দর্শক চোখের দিকে তাকিয়েই পড়ে নিতে পারে হৃদয়ের অব্যক্ত কথাটি। কাব্য সাহিত্য শিল্পে তাই চোখের ছড়াছড়ি। বাস্তবে জীবনেও চোখের কদর সর্বত্র। চোখের তুলনায় কবি এবং শিল্পীরা নেমেছেন সমুদ্রে, বিচরণ করেছেন আকাশে, খুঁজেছেন হরিণের চাহনি, এমন কি পাখির নীড়ের সাথেও চোখকে তুলনা করা হয়েছে। বাস্তবে চোখ এক আশ্চর্য সংবেদনশীল অঙ্গ। এর সাথে তুলনা হয়না অন্য কোনো কিছুর। চোখ চোখই।
মানুষের চোখ মাত্র দু’টি। সৈয়দ মুজতবা আলীর ভাষায় মাছিকে যে দিক দিয়েই ধরতে যান না কেন, সে ঠিক সময় উড়ে যাবেই। কারণ অনুসন্ধান করে দেখা গিয়েছে, দুটো চোখ নিয়েই মাছির কারবার নয়, তার সমস্ত মাথা জুড়ে নাকি গাদা গাদা চোখ বসানো আছে। আমরা দেখতে পাই শুধু সামনের নিক, কিন্তু মাছির মাথার চতুর্দিকে চক্রাকারে চোখ বসানো আছে বলে সে একই সময়ে সমস্ত পৃথিবীটা দেখতে পায়। তাই নিয়ে গুণী ও জ্ঞানী আনাতোল ফ্রাঁস দুঃখ করে বলেছেন, “হায় আমার মাথার চতুর্দিকে যদি চোখ বসানো থাকতো তাহলে আচক্রবাল বিস্তৃত এই সুন্দরী ধরনীর সম্পূর্ণ সৌন্দর্য এক সঙ্গেই দেখতে পেতুম।'
চামড়ার চোখে এক সাথে মানুষ চারদিক দেখতে পারেনা সত্য। মাছির মত মানুষের সারা মাথায় চোখ নেই। কিন্তু যে দু’টি চোখ আছে তাতে হাজারটা জগতের সন্ধান পাওয়া যায় সহজে। মনের বিচিত্র অনুভূতিতে চোখের গতি প্রকৃতি লক্ষ করলেই বুঝা যায়, কুশলী ¯্রষ্টা যেন সংখ্যাগত সীমাবদ্ধতা চোখের অসীম ক্ষমতার ভেতর দিয়ে পুষিয়ে দিয়েছেন।
মানুষ দৈনন্দিন জীবনে মুখোমুখী হয় বিচিত্র অভিজ্ঞতার। বাস্তবে ঘাত প্রতিঘাত সুখ দুঃখ, মান অভিমান, বিরহ, মিলন, স্বাস্থ্য আতংক, রাগ ক্ষোভ, ভয় ভীতি প্রভৃতি নিয়েই বাঁচতে হয় মানুষকে। বাইরের প্রতিটি দৃশ্য, প্রতিটি ঘটনা মানুষের মনে জাগায় রং বেরঙের অনুভূতি। অনুভূতির জগতে মানুষ মিনিটে মিনিটে এমনকি প্রতি মুহূর্তে বিপরীত দোলায় আন্দোলিত হয়। বিস্ময়কর হলেও এই বিচিত্র অনুভূতির ছাপ পড়ে তার চোখে। অতি সূক্ষ্ম অনুভূতি যা প্রকাশ করা যাবে না, চোখকে তাও ফাঁকি দিতে পারে না। ব্যক্তি মানুষটি না চাইলেও চোখ সেই ক্ষণিক অনুভূতিতে সাড়া দেয়। অজান্তেই চোখের গতি প্রকৃতি বদলে যায়। চোখের এই রং বদল ঘটে স্বতঃফুর্তভাবে। মনের অনুভূতি বিদ্যুতের মত অতি দ্রুত ঝলকে উঠে চোখে।
কারো চোখ বড় রোমান্টিক। তাকালে কেমন যেন মায়াবী হয়। রবীন্দ্রনাথের ভাষায়-অকস্মাৎ বক্ষ মাঝে চিত্ত আত্মহারা, নাচে রক্ত ধারার অবস্থা হয় দর্শকের। কারো বা চোখ ঘুমে ঢুলু ঢুলু। দেখলেই মনে জাগে পরম প্রশান্তিকর অনুভূতি। চঞ্চল চপল চোখ, বুদ্ধি দীপ্ত চোখ, ব্যক্তিত্বের ব্যঞ্জনায় মুখর চোখ আর কোনো কোনো চোখ একেবারেই গো বেচারা ভাবলেশ হীন। কিন্তু সব ধরণের চোখই সময় বিশেষ গতি প্রকৃতি বদলে নেয়। ইচ্ছায় অথবা অনিচ্ছায়।
অকারণে কেউ গাল দিয়েছে। এমন কোনো অন্যায় করেছে যাতে ক্রোধ দপ করে জ্বলে উঠেছে। তখন শান্ত চোখটাই রূপ বদলে নেয়। চোখের আকার বড় হয়ে যায়। শক্ত হয়ে ওঠে চোয়াল। চোখ লাল রং ধারণ করে। যেন অগ্নি ঠিকরে পড়ে চোখ থেকে। রাগান্বিত চোখ দর্শকের মনে ভয়ের উদ্রেক করে।
মুখে শব্দ না করেও চোখের সাহায্যে রাগ প্রকাশ করা যায়। কেউ এমন কাজ করছে অথবা এমন কথা বলছে যা শ্রোতার মনে রাগের জন্ম দিচ্ছে। চোখ তখন টান টান হয়ে উঠে। বক্তা চোখের প্রকৃতি দেখেই নিশ্চুপ হয়ে পড়ে। সন্তান অন্য লোকের সামনে এমন কোনো আচরণ করছে যা মা অথবা বাবার জন্য লজ্জাকর। তখন মা বাবার শাসানো চোখ দেখেই শিশু সন্তানটি মুহূর্তে বিরত হয়ে যায়। এই চোখ রাঙানো অনেক গুলো উত্তেজিত কথার চেয়েও বেশী কাজ করে। চোখের এমনি কেরামতি।
কেউ আনমনে রাস্তা দিয়ে হাঁটছে। হঠাৎ লাঠি হাতে রে রে করে আরেকজন লোক এসে মাথার উপর চড়াও। এই মুহূর্তে উদ্দিষ্ট লোকটির চক্ষুগোলক একেবারে স্থির অনড় বিস্ফুরিত। বড় বড় চোখে তখন রাজ্যের ভয়। যাকে বলে একেবারে চক্ষু স্থির।
স্বামী কথা দিয়েছিলেন ফিরবেন দু’দিনেই। কিন্তু কেটে গেছে এক সপ্তাহ। অথবা তৃতীয় দিনের ওয়াদা মতে কেনা হয়নি প্রার্থিত শাড়ী বা গয়নাটি। অভিমানী বউর চোখটা তখন কেমন যেন শান্ত সজল। মুখে কথা আছে, কিন্তু প্রতিবাদ নয়। অথচ চোখ কেমন ঠান্ডা শীতল। চোখের এই প্রকৃতি দেখেই স্বামীটি বউর মনের গোপন ভাষা সহজে বুঝে নেয়। দৈনন্দিন এমনি মান, অভিমানে ভরা চোখ অনেককেই বারবার দেখতে হয়।
মেয়েটি পছন্দ করে যুবককে। অনেক দিন দেখা নেই। হঠাৎ চোখাচোখি হলেই দুজনের চোখ কেমন পলকহীন হয়ে পড়ে। মুখে কথা নেই। অপলক নেত্রে একে অন্যের দিকে তাকিয়ে আছে। চোখ থেকে তখন ঝরছে হৃদয়ের অনেক আকুতি। প্রেম ভালোবাসার এই অভিব্যক্তিত উজ্জ্বল চোখের দৃশ্য ভাষায় বর্ণনা করা সত্যি দুঃসাধ্য। অনেকের সামনে দু’জনের দেখা হয়েছে। চোরাচোখে তখন একে অন্যের দিকে তাকাচ্ছে। চোখে তখন বিজলী খেলে যায়। অনেক না বলা কথাই তখন চোখে বলে দেয়।
এক দুরন্ত কিশোর। সার্কাস দেখতে গেছে। আগে আর কখনও দেখেনি। সার্কাসে সে দেখলো কাপড়ের চাকনা নাড়িয়ে আস্ত একটা লোক চোখের সামনে থেকে অকস্মাৎ হাওয়া হয়ে গেছে। কিশোর তখন বিস্ময়ে বিমূঢ়। চোখ দুটো স্থির। যাকে বলে ছানা বড়া। বিস্ময়ে বিস্ফুরিত তার চোখ।
কেউ হাঁটছে পথ দিয়ে। হঠাৎ সামনে দেখতে পেল সেই লোকটাকে যাকে সে ঘৃণা করে। দেখলেই মনে কেমন যেন ক্ষোভ অথবা ঈর্ষা জাগে। গা রি রি করে উঠে। তখন লোকটির ভ্রুকুঞ্চিত হয়ে পড়ে। পিট পিট চোখে সে আড় চোখে এক পলক দেখে নেয় লোকটাকে। চোখ থেকে বিচ্ছুরিত হয় ঘৃণার আগুন। ভাষাহীন এই চাহনী তখন উদ্দিষ্ট লোকটাকে দগ্ধ করে। কিন্তু করার কিছুই থাকেনা।
ড্রেসিং টেবিলের সামনে তরুণী দাঁড়িয়ে আনমনে সাজছে। মুখে মুখে গুনগুন গানের কলি। অকস্মাৎ সেখানে এসে তৃতীয় ব্যক্তি উপস্থিত বিশেষ করে কোনো পুরুষ। তরুণীর তখন পালাবার পথ নেই। লজ্জায় ভারানত মুখে হাসির ঝলক। নত চোখ। ছোট হয়ে আসে আয়ত লোচন। তরুণীর চোখে তখন সাত রাজ্যের লজ্জা! এই লজ্জানত চোখের ছবি অংকন কি সম্ভব?
মানুষটি সেই দূর দেশে। খোঁজ খবর নেই। বাইরে বৃষ্টি ঝরছে। একা ঘরে তরুণী। স্মৃতির পর্দায় একে একে ভাসছে অতীতের অনেক মধুময় স্মৃতি। বারবার মনে ভেসে উঠছে একখানা মায়াভরা মুখ। অথচ কাউকে বলা যাচ্ছেনা। বিরহ বিধুর এই মুহূর্তে চোখের প্রকৃতি স্থির। অনেকটা ঘোলাটে। চোখ তখন স্থির শান্ত। ঝরনার মত চঞ্চল না হলেও চোখ দু’টি হৃদয় সমুদ্রের জলবাহী নদী। টপ টপ অশ্রু ঝরছে। কেমন কুঞ্চিত ভুরু, সংকুচিত শংকিত চোখের তারা।
হৃদয়ের এমনি বিচিত্র অনুভূতি ধরা পড়ে চোখের তারায়। চোখের গতি প্রকৃতিতে মূর্ত হয়ে উঠে হৃদয়ের অনুভূতি। ক্ষুধার্ত লোক। দেখছে বিরাট অট্টালিকায় চলছে ভোজ। কিন্তু গেট বন্ধ। ওখানে প্রবেশ নিষেধ। ক্ষুধাতুর এই চাহনির চোখ দুটি করুণ রূপ ধারণ করে। আক্ষেপের ভাষাটি ফুটে ওঠে চোখের তারায়। কাঁদো কাঁদো চোখ অনেক অকথিত আর্তনাদের চিত্র হয়ে উঠে। শক্তিশালী কেউ অন্যায়ভাবে কারো উপর চাপিয়ে দিচ্ছে কিছু। প্রতিবাদের সাহস বা শক্তি নেই। ড্যাব ড্যাব অসহায় চোখে লোকটি তখন নীরব নির্বাক। অপরাধী ধরা পড়েছে। বিচার চলছে। এতদিন আশা করেছে সে মুক্তি পাবে। কিন্তু কাঠগড়ায় দাড়িয়ে সে শুনছে ফাঁসির হুকুম। চোখে তখন হতাশার ছাপ। বিমূঢ় ভাবলেশহীন চোখে সে তখন দেখছে অন্ধকার।
চোখ এমনি এক বিস্ময়কর সংবেদনশীল দৃশ্য এবং ভাব কাতর অঙ্গ। প্রেম, বিরহ, ঘৃণা বিদ্বেষ, রাগ ক্ষোভ, আনন্দ বিষাদ, লজ্জা আক্ষেপ সব ধরণের অনুভূতিই ধরা পড়ে চোখে। চোখের এই গতি প্রকৃতি দেখেই উপলব্ধি করা যায়। ভাষায় বর্ণনা দিয়ে বুঝানো সম্ভব নয়।

শেয়ার করুন

Developed by: Sparkle IT