সাহিত্য

প্রকৃতি ও তারুণ্যের কবি

সুফিয়া জমির ডেইজী প্রকাশিত হয়েছে: ০১-১২-২০১৯ ইং ০০:২২:৩০ | সংবাদটি ৬৩ বার পঠিত

কবি রেজাউদ্দিন স্টালিন ১৯৬২ খ্রিস্টাব্দের ২২ নভেম্বর যশোর জেলার নলভাঙা গ্রামে জন্ম গ্রহণ করেন। আশির দশকের অন্যতম শক্তিমান কবি তিনি। বাংলাদেশের কবিতাভুবনে কিশোর বয়সে তিনি আবির্ভূত হন। নির্মাণ করতে সক্ষম হন একটি স্বকীয় কাব্যভুবন। আমিত্বই স্টালিনের সাহিত্যকর্মের মুখ্য উপজীব্য নয় বরং এক বৈশ্বিক সর্বমানবের সংগ্রাম ও সাফল্যের ঐতিহাসিক শিল্পিত দলিল তাঁর কবিতা। আত্মপ্রীতি, দুঃখবোধ আর স্বপ্নপীড়িত বেদনা নিয়ে স্টালিন ডুবে থাকতে চেয়েছেন তাঁর হৃদয়ের অন্তঃস্থল; কিন্তু সংবেদনশীল শিল্পসত্তা তাঁকে অন্তর্লোকের অতল থেকে বারবার তুলে এনেছে বহির্লোকের প্রাঙ্গণে। সময়জ্ঞান, ইতিহাসচেতনা, পুরাণস্মরণ এবং মৃত্তিকা সংলগ্নতার শক্তি নিয়ে রেজাউদ্দিন স্টালিন অতিক্রম করে যান তাঁর কালের বৈনাশিকতা আর বিভক্তি, সময়ের নষ্ট আক্রোশ। পৌরাণিক উৎস থেকে স্টালিন পৌনঃপুণিকভাবে চয়ন করেছেন তাঁর বিজ্ঞানমনস্ক ভাবনার বীজ। তাঁর গ্রন্থ সংখ্যা ৬০টি’র মতো।
সাহিত্যে অবদানের স্বীকৃতি স্বরূপ পেয়েছেন বহু পুরস্কার ও সম্মাননা। উল্লেখযোগ্য পুরস্কারের মধ্যে রয়েছে বাংলা একাডেমী পুরস্কার (২০০৫)। মাইকেল মধুসূদন, খুলনা রাইটার্স ক্লাব, ধারাসামাজিক সাংস্কৃতিক পুরস্কার, দার্জিলিং নাট্যচক্র পুরস্কার, পশ্চিমবঙ্গের সব্যসাচী পুরস্কার, রংপুর বজ্রকথা পুরস্কার, ঢাকা সিটি কর্পোরেশন পুরস্কার। ক্যালিফোর্নিয়া স্টেট ইউনিভার্সিটি ও তরঙ্গ অফ ক্যালিফোর্নিয়া সম্মাননা, বাদাম সাংস্কৃতিক সম্মাননা-আমেরিকা। সিটি আনন্দ আলো পুরস্কার, (২০১৫) লাভ করেছেন।
মানুষ প্রকৃতি ও তারুণ্যের দায়বদ্ধতায় এই কবির কবিতার গাঁথুনি নন্দিত বলা যেতে পারে। কবির কবিতায় চিন্তার আবেগ উজ্জীবন ঘটায় পাঠক হৃদয়ের মর্মে মর্মে। কবিতার কাহিনীগুলো কাব্যানুগত্যে এতোই স্মরণীয় যা পাঠকের পাঠ্যক্রমে হৃদয়ের কর্ণকুহরে দাগ কাটে। সচেতন ঢঙে অনন্ত সৌন্দর্যের চলমান প্রেরণায় কবির রয়েছে সৎ আদর্শ আর নন্দিত মহত্ত্বের অবিস্মরণীয়তায় প্রত্যয়ী ভাব। বর্ণিল আঙ্গিকে পাঠক বোধগম্যে নন্দনতাত্ত্বিক সদালাপ এবং মহৎ গুণাবলীর একজন কবি তিনি। সমাজভুক্ত প্রতিভার প্রেক্ষাপটে সৃজিত রেখামালাকে বিচরণের স্পর্শে নির্মিত রাখার সর্বদা সচেষ্ট থাকার চেষ্টায় কবিতার অনুভবগম্যে কবি নিরন্তর মজ্জমান থাকেন। কাব্যচর্চায় কবিসুলভ সুষমতায় বিকশিত কথামালাকে মানানসই করেন নিখুঁত উপমার বিস্তার ঢেলে সাজাতে। সর্বক্ষণ হাস্যজ্জ্বলর স্মৃতিকাতরতায় বিচিত্র কবিগুণে মুক্ত মনের মানুষ এই কবি। শিল্পসুলভ কথাবার্তায় আপনজনের মতো অন্তর জয়ে সক্ষমতার অংশীদার হয়ে থাকেন প্রতিটি সময় তিনি। নন্দনতত্ত্বের সমাহারে আমরা দেখতে পাই কবির কবিতায় নিজস্বতার কৌশলকে তিনি আঁকড়ে ধরে আছেন। নিজের সমস্ত ভালোবাসায় মনের মাধুরীকে উপমায় মিশ্রিত করে রচনা করেন কবিতার দেহ। বুদ্ধিদীপ্ত বিচরণ আর সময়ের চিন্তাশীলতা সুন্দরভাবে কবির কবিতায় স্থান পায়। মানুষের সুন্দরতম জীবনকে নিবেদিত করতে পারেন কবিতার গাঁথুনিতে।
কবি বিশ্বাসী হয়ে নিজস্ব মৌনতাকে সাজাতে পারেন মানুষের শাশ্বত সুন্দরের নিয়মে কল্পনার কথায়। আশা-নিরাশার কথায় কিংবা মধ্যবিত্ত বাঙালিয়ানার কথা উপমার পারঙ্গমে তোলে ধরেন। হৃদয়ের ঝাঁপটায় বাস্তবতার অফুরান ছোটাছুটি কবির মনোভঙ্গিতে রয়েছে। অসুন্দরের বিপক্ষে কখনো কবি মানানসই নয়। জ্বলন্ত দ্রোহে কবিতার চিত্রকল্পকে স্মরণীয় করে রাখা কবির যত্মশীল কাজ। কবিতার আকাশে খুব জনপ্রিয় একটি নাম তবু তিনি সাধারণ চলাফেরায় স্বপ্নের পৃথিবী দেখেন। সহজ-সরল মনোভঙ্গির এই মানুষ জীবনযাপনে বাস্তবতায় সততা আর সভ্যতার চিন্তা সর্বদা হৃদয়ে লালন-পালন করেন। জীবনে কবিতার জগতে নিজেকে নিবেদিত করে রেখেছেন। এই কবি কবিসত্তায় উদারতা, মমত্ববোধ আর আন্তরিকতায় তিনি সুদৃঢ় পদক্ষেপে প্রজন্মের হৃদয়ে স্থান করে নিতে সক্ষম হয়েছেন। সামান্যতম হিংসাত্মক মনোরুচি নেই, নীতিগত আদর্শে কোথাও শাসন-শোষণ পদ্ধতি নেই। মায়াজাগানিয়া কথার দ্বারপ্রান্তে সর্বদা সচল। মানুষের মেহনতি উপলব্ধি কবির বুকে চিরন্তন ঐক্যের সত্যবাদীতার শ্লে¬াগানে বাণী তোলে শান্তির পতাকা অঙ্কিত করেন। ভালোবাসা থেকে ভালোবাসাময় তামাম দুনিয়ায়। মানুষের অন্তরই প্রেম, প্রীতি, ভালেবাসায়পূর্ণ। এই পবিত্র ভালোবাসাকে ধরে রেখেছেন চলার পথে। কবির মনান্তরে সভ্যতার যুগান্তকারী বাতিঘর জয়ের দীপ্ত বাতাসে ঘুরে বেড়ান কবিতার সীমানা জুড়ে। মুক্তিকামী, নির্লোভ, নিঃশ্বার্থ এই কবির কবিতার কাহিনীতে অপ্রতিরোধ্য বিচরণ শক্তি। কবিতার সীমাহীন পথ যাত্রায় তিনি আজও অধ্যাবসায়ের আশাতে আশার আলো জাগিয়ে রাখতে স্বপ্নবিভোর। স্টালিনের মধ্যে অনাবিল এক স্থিরতার দীর্ঘতম অভ্যাস। বন্ধু বৎসল এই মানুষটি সরল, বিনয়ী আর পরোপকারী মননের। জীবন যাপনে অথবা স্বপ্নসহ আকাক্সক্ষার জন্য সুন্দর একটা সামাজিকতা মানুষের দরকার। আমরা জানি সাহিত্যে সুন্দরতার সাথে স্বচ্ছলতা সমাজ নির্মাণে ভূমিকা রাখতে পারে। বৈষম্য আর বিমানবিকতা দেখলে কবি তাঁর কবিতায় প্রতিবাদ করেন। স্টালিনের প্রতিবাদের ভাষাই হলো কবিতা। স্টালিন শোষণহীন একটি সমাজের স্বপ্ন দেখেন তিনি। মানুষ প্রকৃতি ও তারুণ্যের করুণ কান্নার চিত্র-বৈচিত্র চিত্রিত হয় কবিতা পঙ্ক্তির সাহসিক আঙিনা জুড়ে। প্রতিবাদের কবিতায় কবি দাঁড়ান সত্য এবং ন্যায়ের গর্জনে। কবির খ্যাতি শুধু আমাদের দেশেই নহে বিদেশে ও ছড়িয়ে পড়েছে। পৃথিবীর নানা ভাষায় অনুদিত হচ্ছে কবির কবিতা। কবির কবিতা অনুবাদ প্রকাশের পর তিনি আন্তর্জাতিক খ্যাতি অর্জন করতে সক্ষম হয়েছেন। কবি মন দিয়ে মানুষকে নিখুঁত দরদে ভালোবাসেন। তাঁর ভালোবাসার চিত্রগুলো কতর্ব্যরে মধ্যে দায়িত্ব পালনের কঠোর চেষ্টা ফুটে উঠে। স্টালিন সত্যিকার অর্থেই একজন প্রতিবাদী কবি। সমাজের দায়িত্বপূর্ণতা কবিকে করে তোলে মহীয়ান এক কারিগর হিসেবে। বাংলাসাহিত্যের উন্নয়নমূলক সৃষ্টিকর্মে কবির আন্তরিকতার যে সংযোগ তা আমাদের শিক্ষণীয় করে তুলবে। তরুণ প্রজন্মকে তিনি নানাভাবে সাহিত্যে অনুপ্রাণিত করে যাচ্ছেন, কবির লেখনি হোক অনাগত সময়ের অসহিষ্ণু শান্তিপ্রেম এবং সুখপ্রেম নিয়ে। কবির জন্য অনাবিল শুভ কামনাসহ নিরন্তর শুভেচ্ছা ও অভিনন্দন।

 

শেয়ার করুন

Developed by: Sparkle IT