উপ সম্পাদকীয়

বাজার নিয়ন্ত্রণে কার্যকর মনিটরিং ব্যবস্থা চাই

গোলাম সারওয়ার প্রকাশিত হয়েছে: ০২-১২-২০১৯ ইং ০০:১৮:২৯ | সংবাদটি ৩০৮ বার পঠিত

লবণ-পেয়াঁজ বলে কথা নয়, সব জিনিষেরই দাম হু হু করে বেড়েই চলেছে। চাউলের দাম হঠাৎ করেই বস্তা প্রতি ১৫০-২০০ টাকা বেড়ে গেল। আটা, ময়দা, সয়াবিন তেলের দামও হঠাৎ বেড়েছে। কি কারণে? সরকার কি নতুন করে ট্যাক্স বসিয়ে দিল? নাকি সেই সিন্ডিকেটি বাজার ব্যবস্থার কারণে? আমরা আম পাবলিক। আমাদের এতকিছু জানার সুযোগ নেই! তবে আমাদের কেন্দ্র করেই ঘটে চলে সবকিছু। জনগণই সকল ক্ষমতার উৎস বলে ভোট চেয়ে ক্ষমতায় যাওয়া হয়। এই জনগণকেই সামনে রেখে জিনিসপত্রের দাম বাড়িয়ে দেয়া হয়। অথচ রহস্যের মূল কারণ জনগণ জানতেই পারে না!
পণ্য মনিটরিং করার কোনো ব্যবস্থা দেশে আছে বলে মনে হয় না। পেঁয়াজ-লবণের কাহিনী বলে কথা নয়। সব পণ্যের বেলায়ই এমনটা মনে হচ্ছে। ঠিক মতন মনিটরিং ব্যবস্থা থাকলে এমন সব উল্টা-পাল্টা কথা আমরা শুনতাম না। দুর্বিসহ জীবনের মুখোমুখিও হতাম না। পেঁয়াজের কথাই যদি ধরি, তাহলে কী সব কথা-বার্তা আমরা শুনেছিলাম? পেঁয়াজের দাম যখন বাড়তে থাকে তখন খোদ বাণিজ্যমন্ত্রীর মুখে শোনা গেল-আগামী কয়েক মাসের মধ্যে পেঁয়াজের কোনো ভালো সংবাদ নেই। এ খবরটা চাউড় হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে পেঁয়াজের ঊর্ধ্বগতিকে আর থামানো গেল না। পরে শুনলাম, সিন্ডিকেটের কারণে পেঁয়াজের দাম বাড়ছে। পেঁয়াজ যখন সেঞ্চুরীর পর সেঞ্চুরী করতে লাগল তখন শুনলাম পেঁয়াজ খাওয়া বন্ধ হয়ে গেলে পেঁয়াজের দাম স্থিতিশীল হয়ে যাবে। এরপর শুনলাম-সামনেই দেশি পেঁয়াজ উঠার মৌসুম, দেশী পেঁয়াজ উঠলেই বাজার পড়ে যাবে! এরপর উড়াল পথে প্রায় ৩০০ টন পেঁয়াজ আনা হলো। একটু কমেছিল কিন্তু এখন আবার সেই গতি! আমদানীকারকেরা বলল-ভারত যতদিন না পেঁয়াজ দেবে ততদিন পর্যন্ত পেঁয়াজের ভোগান্তি থাকবেই। যেখানে ভারত ৫,০০০ টন-সাপ্লাই দেয়, সেখানে দেশীয় উৎপাদন বা উড়াল পথে ৩০০ টনে কি চাহিদা মিটবে? এইবার বুঝা গেল পেঁয়াজের একটা প্রায় সঠিক বিশ্লেষণ এসেছে। সেই সাথে বুঝা গেল-পেঁয়াজ উৎপাদনে আমাদের আরো বেশী যতœশীল হতে হবে। নইলে ভোজন রসিক বাঙালির চাহিদা মিটবে না। মিলবে শুধু ইত্যাকার নানান আজগুবি কথাবার্তা!
লবণ কাহিনী বলার দরকার নেই। পণ্য মনিটরিংয়ের ব্যবস্থা থাকলে লবণ কাহিনী গজাতে পারত না। মনিটরিং কোথায়? জুতা আমাদের নিত্য প্রয়োজনীয় একটা প্রোডাক্ট। দিন দিন জুতার দাম বেড়েই চলেছে। ২০০ টাকার সু এখন ২০০ নয়, ২২০০ ছাড়িয়ে গেছে! চামড়াজাত জুতার দাম দুর্দান্ত গতিতেই বাড়ছে। অথচ আমাদের দেশে বর্তমানে চামড়া সবচেয়ে সস্তা। অব্যাহত দরপতনের কারণে চামড়া-পঁচে গলে নষ্ট হয়। ব্যবসায়ীদের প্রতি বছর মাথায় হাত। সেদিন জিন্দাবাজারের একটি অভিজাত জুতার দোকানে গেলাম জুতা কেনার জন্য। শীত আসছে তো তাই একজোড়া জুতা না কিনলেই নয়। পছন্দের জুতা ৫ থেকে ১০ হাজার! প্রশ্ন হলো চামড়ার জুতা কেন-এত দাম হবে? আশির দশকে চামড়ার দাম ছিল তুঙ্গে, অথচ সে সময় এসব জুতার দাম ছিল ৫০০ থেকে হাজার টাকার মধ্যে। এখন চামড়া হয়ে গেছে ফেলনা! অথচ জুতার দাম কমেনা!
দেড়শ-দু’শো টাকার শার্ট অনায়াসে এখন ৬ থেকে ৭ হাজার টাকায় বিক্রি হচ্ছে। পোষাক রপ্তানী হওয়ার সাথে সাথে অভ্যন্তরীন বাজারেও এর প্রভাব পড়েছে। এক্সক্লুসিভ শো-রুম হওয়ার কারণেও এমনটা হচ্ছে। কিন্তু দাম বৃদ্ধি এসব কারণে হবে কেন? প্রতিদিনই বাড়বে কেন? মনিটরিং সিস্টেম নেই। সেজন্য শার্ট-প্যান্টের বাজারে, লুঙ্গির বাজারে, শাড়ির বাজারে এমন ছক্কা-নক্কা চলছেই। মনিটরিং সিস্টেম না থাকার কারণেই অসাধু ব্যবসায়ীরা আমাদের টাকা-পয়সা এক রকম লুট করেই নিচ্ছে।
এখন বলপেন দিয়েই লিখি। এক সময় উইংসাং কলম, ইয়থ কলমের যুগ ছিল। দোয়াত ভর্তি কালি থেকে কালি রিফিল করে লেখা হতো। বেশ মজাই পেতাম লিখে। গাঢ় রঙের ভেজা ভেজা কালি ভেতরের মনটাকেও ভিজিয়ে দিয়ে যেন শীতল করে দিত। কিন্তু নব্বই দশকের দিকে বলপেন এসে আমাদের প্রিয় দোয়াত-কালিকে বিদায় করে দিল। ৩ টাকার রেডিমেইড বলপেন! দোয়াতের দরকার নেই! নিব পরিবর্তনেরও দরকার নেই। মাঝে মাঝে ওয়াশ করার দরকার হতো, সেটারও দরকার নেই! এতোসব সুযোগ-সুবিধায় বলপেন মানুষের হৃদয় জয় করে নিল। কিন্তু ইদানিং লক্ষ্য করছি এখানেও দুই নম্বরী ঢুকে গেছে। এখন বলপেন আগের মতো কালি ছাড়ে না। প্রথম দিকে লেখা যায়, পরে আর লিখতে ইচ্ছে করে না বিরক্তির কারণে। কারণটা কি? প্রথম দিকে মানে নিব-এর দিকে ভালো মানের কালি থাকে, মনে হয় হাফ ইঞ্চি পরিমাণ জার্মানীর কালি ব্যবহার করে, এরপরে কালি পাতলা থেকে পাতলা হতে হতে আর লিখতেই চায় না। খুব জোর করে লিখতে গিয়ে আঙুলে ব্যথা অনুভব হয়। বিষয়টা যাচাই করার দায়িত্ব কার? অবশ্যই বাজার মনিটরের।
কলম আমাদের নিত্য প্রয়োজনীয় প্রোডাক্ট। কলম ভালো থাকলে লেখাও ভালো থাকে। লিখতেও ইচ্ছা করে। যতই অনলাইন ইন্টারনেট ব্যবহার হোক এর গোড়া কিন্তু কাগজ আর কলম। স্কুল-কলেজ, অফিস-আদালত বা ব্যবসা-বাণিজ্যে কোথায় নেই কলমের ব্যবহার? কলম এখনও শক্তিশালী মাধ্যম। তলোয়ারের চেয়ে কলম তখনও শক্তিশালী ছিল এখনও সমান শক্তি নিয়েই কলম এগিয়ে চলে। কিন্তু সেই কলম এখন ভাইরাসে আক্রান্ত হতে চলেছে। কলমকে থামিয়ে দেয়ার প্রক্রিয়া কি চলছে? কলমকে সুরক্ষা বলয়ে আনা দরকার। সুরক্ষার জন্য অবশ্যই একট শক্তিশালী মনিটরিং সেল গঠন চাই।
আমাদের স্বাস্থ্যসেবার জন্য ডাক্তার গণ এখন সবচেয়ে বেশি ভয়ংকর। উনারা এখন ঔষধ কোম্পানীর কথায় ঔষধ লিখেন। ঔষধ কোম্পানী উনাদের গাড়ি, বাড়ি, ট্যুর-সব ফ্রি করে দিচ্ছে। অতএব, অপ্রয়োজনীয় ঔষধ লিখতে অসুবিধা কোথায়? অপ্রয়োজনীয় ঔষধে রোগীর আরো ভিন্ন ভিন্ন রোগের সৃষ্টি হয়। ততক্ষণে ডাক্তার সফল ব্যবসায়ীতে রূপান্তর হন, কোম্পানীর লক্ষ্য উদ্দেশ্যও সফলতার মুখ দেখে। কিন্তু রোগীর যে বারোটা বাজে তাতে উনাদের কী! এই বারোটা না বাজানোর জন্য আমাদের দেশে কি কোনো মনিটরিং সিস্টেম আছে? ঔষধ নির্ভর হয়ে যাচ্ছে আমাদের জীবন। শুধুমাত্র ডাক্তার এবং ঔষধ কোম্পানীর সিন্ডিকেটের কারণেই আমাদের এই ঔষধ নির্ভরতার জীবন। বিশ্বের কোথাও এতো রোগী, এতো ডাক্তার নেই! এতো প্যাথোলজি, এতো ক্লিনিকও নেই! কেন এসব আমাদের দেশে ব্যাঙের ছাতার মতো গজিয়ে উঠছে? এদের নিয়ন্ত্রণের জন্য কি কোনো শক্তিশালী মনিটরিং সিস্টেম গড়ার প্রয়োজন নেই?
কৃষক ন্যায্যমূল্যে ধান বিক্রি করতে পারে না। কৃষক পরিবারে প্রতিবছরই এ হাহাকার আমাদের সত্যি সত্যি পীড়া দেয়। কিন্তু চাউল ব্যবসায়ীদের পীড়া দেয় না। সিন্ডিকেট চাউল ব্যবসায়ীরা প্রতি বছর চাউলের দাম বাড়িয়ে ফুর্তি করে, আনন্দ-উল্লাস করে। পাজেরো গাড়ি দৌঁড়ায়, বিলাসী জীবন যাপন করে আর কৃষকেরা চোখের পানি মুছতে মুছতে রাত্রি যাপন করে ফের ফসলের মাঠে ঘাম ঝরায়। কৃষকের শ্রমের মূল্য, উৎপাদন খরচ কে দেবে?
খাদ্যে ভেজাল এ আবার নতুন কি? এখন অবশ্য ভেজাল রোধে কিছুটা কাজ হচ্ছে। আমরা ভেজাল নিয়ন্ত্রণকারীদের অভিনন্দন জানাই। সময়ের সূর্য সন্তান বলে লাখো কোটি স্যালুট দেই। যদি ভেজাল অভিযান চলমান প্রক্রিয়া বা কন্টিনিউয়াস প্রসেস হয়, তাহলে এ জাতির জন্য মঙ্গল হবে। হৃষ্টপুষ্ট একটা মহান জাতিতে রূপান্তর হতে পারে। কিন্তু আশংকা করি, ভেজাল অভিযানকারীরা কি সার্বক্ষণিক থাকবেন? স্থায়ী অভিযান কি রাখা যায় না? আমাদের দেশে অবশ্য স্থায়ী চিন্তা করাও আরো একটা ভেজাল। স্থায়ীরাই শেষ-মেষ ভেজালের কারখানা খুলে বসেন। লেন-দেনের একটা সিস্টেম রেখে আবার যেই সেই! উফ, কী যে যন্ত্রণায় আছি, বলে বুঝাতে পারব না।
শীতের সব্জি ফুলকপি, শিম, শালগম, গাজর, টমেটো উঠতে শুরু করেছে। কিন্তু আকাশচুম্বী দাম। চড়া দামের জন্য হাত দেয়া যায় না! তবে খুব খুশি হতাম যদি আসল কৃষক এ দাম পেত। ফলনকারী কৃষক কিন্তু এ দাম পাচ্ছেন না। মাঝখানে ফড়িয়া বা মধ্যস্বত্বভোগী ফলনকারীর চেয়ে বেশী মূল্য লুফে নিচ্ছে! কিন্তু এসব মনিটর করবেন কে? কৃষক এবং কনজ্যুমারদের স্বার্থ কে দেখবে?
ভোক্তা অধিকারের জন্য একটা দপ্তর বা অধিদপ্তর আছে বটে, কিন্তু এরা তো নিষ্প্রাণ, নির্জীব! ভোক্তাদের স্বার্থ সুরক্ষায় এদের কোনো এক্টিভিটিস আছে বলে আমার মনে হয় না। আমরা যারা ভোক্তার মানে খরিদ্দার বা কাস্টমার আছি-আমাদের সাথে ভোক্তা অফিসের কোনো সম্পর্ক নেই। অথচ এদের সাথে আমাদের একটা নিবিড় সম্পর্ক থাকা উচিত ছিল। সম্পর্কোন্নয়নের জন্য এদেরই এগিয়ে আসা উচিত। সাধারণ ক্রেতা বা কাস্টমার ভোক্তা অফিস চিনেনা বা ভোক্তার যে অধিকার আছে বা কতখানি অধিকার আছে তা কিন্তু সাধারণ মানুষ বা ক্রেতাগণ জানেই না! আর এই সুযোগেই ফড়িয়া ব্যবসায়ী, অসাধু কারবারীরা তৎপর! আমার মনে হয়, এ বিষয়ে সরকারি উদ্যোগে পাবলিকের সচেতনতা বাড়ানো দরকার। এতে ক্রেতা সাধারণ তার অধিকার সম্পর্কে অবহিত হবেন, অযথাই ঠকা খাওয়া থেকে বেঁচে যাবেন। অযথা মূল্যবৃদ্ধিও বন্ধ হতে পারে। তাই এখন সময় হয়েছে, ভোক্তা এবং ভোক্তা অফিসের মাঝে সমন্বয় সৃষ্টি করার। তা না হলে দুইশ টাকার সু কিংবা জুতা ২২০০ কিংবা এর চেয়েও বেশি দামে কিনতে হতে পারে। অতীত ইতিহাস তাই বলে আসছে। লাগামহীন মূল্য বৃদ্ধিই এর যথেষ্ট প্রমাণ নয় কি?
লেখক : কলামিস্ট।

 

শেয়ার করুন
উপ সম্পাদকীয় এর আরো সংবাদ
  • সম্ভাবনাকে কাজে লাগাতে হবে
  • মানবাধিকার দিবস ও বাস্তবতা
  • বুয়েটের শিক্ষা
  • পাল্টে গেল শ্রীলঙ্কার ভোটের হিসাব
  • গড়ে তুলতে হবে মানবিক সমাজ
  • পাখি নিধন, অমানবিকতার উদাহরণ
  • দুর্নীতির বিরুদ্ধে শুদ্ধি অভিযান সফল হোক
  • সড়ক দুর্ঘটনা এবং সড়ক আইন-২০১৮
  • বাংলাদেশের প্রবৃদ্ধি ও বিদেশি বিনিয়োগ প্রসঙ্গ
  • বাঙালির ধৈর্য্য
  • সামাজিক অবক্ষয় ও জননিরাপত্তার অবকাঠামো
  • শিক্ষকদের অবদান ও মর্যাদা
  • ১৯৭০ এর নির্বাচন ও মুক্তিযুদ্ধ
  • একাত্তর :আমার গৌরবের ঠিকানা
  • সড়ক দুর্ঘটনা কি থামানো যায় না?
  • চিকিৎসা সেবা বনাম ব্যবসা
  • নীরব ঘাতক প্লাস্টিক
  • সার্থক জীবন মহত্তর অবদান
  • প্রযুক্তির বিশ্বায়ন বনাম তরুণ সমাজ
  • মানবিক মূল্যবোধ ও বাংলাদেশ
  • Developed by: Sparkle IT