উপ সম্পাদকীয়

জননী ও জন্মভূমি

শেখর ভট্টাচার্য প্রকাশিত হয়েছে: ০২-১২-২০১৯ ইং ০০:২০:৫৭ | সংবাদটি ২৫১ বার পঠিত

মাঝে মাঝে মানসিকভাবে যখন কোন কারণে ভেঙ্গে পড়ি, আত্মবিশ্বাসে কিছুটা চিড় ধরে, তখন আমি আশ্রয় নেই একটি অসাধারণ প্রামাণ্য গ্রন্থের। বার বার পড়তে থাকি গ্রন্থটি। মনের ভেতরে জমে থাকা বেদনাবোধ খুব দ্রুত প্রশমিত হতে থাকে, আত্মবিশ্বাস ফিরে পেতে খুব বেশি সময় লাগে না। যে গ্রন্থটি পাঠ করি সেটি হল ২০০৯ সালে প্রথমা প্রকাশনি থেকে প্রকাশিত “একাত্তরের চিঠি”। রণাঙ্গন থেকে মুক্তিযোদ্ধাদের হাতের লেখা চিঠির সংকলন। প্রায় ৮২টি চিঠি, প্রতিটি চিঠি “হৃত কলম” দিয়ে লেখা, এক একটি কবিতা। কি অসাধারণ কথা, যেহেতু মুক্তিযুদ্ধ ছিল, বিশ্ব ইতিহাসের একটি অমর এবং তাৎপর্যপূর্ণ জনযুদ্ধ তাই সকল শ্রেুীর মানুষ এতে অংশগ্রহণ করেছিলেন। অল্পশক্ষিত, অর্ধ শিক্ষিতরা যেমন ছিলেন, অনেক সুশিক্ষিতরা অংশ গ্রহণ করেছিলেন স্বতঃস্ফূর্ত ভাবে। চিঠির ভাষাতে ছিল দুর্দমনীয় আত্মবিশ্বাস, দেশ প্রেম, দেশের মানুষের প্রতি ভালো বাসা একই সাথে ছিল বজ্র কঠিন শপথ, দেশ মাতৃকাকে শৃংখল মোচনের প্রতিজ্ঞা। আবেগ মিশ্রিত এই প্রতিজ্ঞাটি ছিল এতো দৃঢ়, সেই দৃঢ়তা তৈরি করেছিলো পৃথিবীর শ্রেষ্ঠ অস্ত্র যা দিয়ে, সুশিক্ষিত, প্রশিক্ষিত বিপুল সংখ্যক নিয়মিত শত্রুবাহিনীকে মাত্র নয় মাসে পরাভুত করতে সমর্থ হয়েছিলো গাঙ্গেয় বদ্বীপের পলির মতো কোমল মুক্তির জন্য তৃষ্ণার্ত যোদ্ধারা। প্রান্তিক কৃষক, দিনমজুর, কামার, কুমোর, ছাত্র, পেশাদার সৈনিক, সাংবাদিক কোন পেশার লোক ছিলেন না, এ জনযুদ্ধে? দেশের প্রতি তাদের ভালবাসার, মায়ের প্রতি অসীম মমতা, তাঁদেরকে দেশের জন্য জীবনকে বাজী রাখার সিদ্ধান্ত নিতে উদ্বুদ্ধ করেছিলো।
“একাত্তরের চিঠিতে” রণাঙ্গন থেকে মুক্তি যোদ্ধারা যত গুলো চিঠি লিখেছেন তাঁর অধিকাংশই মায়ের কাছে লেখা! জাতি গত ভাবে অনাদিকাল থেকে আমরা মনে করি মায়ের কোল হল, পৃথিবীর সবচেয়ে সুরক্ষিত আশ্রয় আর মায়ের কাছে দুঃখ, বেদনা আনন্দের বার্তা বিনিময় হল হল অপার্থিব এক প্রশান্তি। চিঠি গুলো পড়লে মনে হয় মৃত্যুকে আলিঙ্গন করেও অকুতোভয় বীর যোদ্ধারা মায়ের সাথে অবলীলাক্রমে কবিতার ভাষায় মনের গহীনে থাকা অন্তরের কথাগুলো বলে প্রশান্তিতে মগ্ন হতে পারতেন। জানিনা পৃথীবিতে আর কোন জাতি মা এবং মাতৃভুমিকে একাকার করতে পারেন মায়ের কাছ থেকে প্রাপ্ত মানসিক শক্তি দিয়ে। রণাঙ্গন থেকে নুরুল হক অনানুষ্ঠানিক, মায়াময় ভঙ্গিতে লিখেছিলেন :
“আমার মা,আশা করি ভালোই আছ। কিন্তু আমি ভালো নাই। তোমায় ছাড়া কীভাবে ভালো থাকি। তোমার কথা শুধু মনে হয়। আমরা ১৭ জন। তাঁর মধ্যে ৬জন মারা গেছে। তবু যুদ্ধ চালাচ্ছি। শুধু তোমার কথা মনে হয়, তুমি বলেছিলে, “খোকা মোরে দেশটা স্বাধীন আইনা দে, “তাই আমি পিছুপা হই নাই, হবো না, দেশটাকে স্বাধীন করবই। রাত শেষে সকাল হইব , নতুন সূর্য উঠব, নতুন একটা বাংলাদেশ হইব...। (১৯শে নভেম্বর, ১৯৭১, “যুদ্ধ খানা হইতে তোমার পোলা” নুরুল হক।)”
ছয় জন সহযোদ্ধা ইতিমধ্যে শহীদ হয়ে গেছেন, তাঁর পর ও ভয় হয় না শুধু মায়ের কথা মনে হয়, কি আশ্চর্য ভালোবাসা মা ও মাটিকে। এই দু’হাজার ঊনিশ সালে আমরা যখন নানা কারণে অসহায় বোধ করি, তখন মনে হয় মৃত্যুকে হাতের মুঠে নিয়ে যারা লক্ষ্যে অবিচল ছিলেন, শত্রুকে পরাভুত করার জন্য দেশপ্রেমের হাতিয়ার নিয়ে যুদ্ধ করেছিলেন তারা তো নুতন সূর্যের প্রতীক্ষায় কামানের গোলার সামনে আত্মাহুতি দিতে ভয় পাননি, আমরা কেন, আপাত কালো অন্ধকারের চাদরকে ভেদ করতে ভয় পাবো ।
মাঝে মাঝে বেদনাহত হই আমরা। আমাদের মায়েরা, বোনেরা যখন দেশটিকে ঘুরে দাড়াতে সহায়তা করতে সারা পৃথিবীতে ছড়িয়ে গিয়ে নানা পেশার সাথে যুক্ত হয়ে বৈদেশিক মুদ্রা অর্জনের জন্য চরম ভাবে লাঞ্চিত হচ্ছেন, লাশ হয়ে ফিরে আসছেন বিভিন্ন দেশ থেকে। বিভিন্ন অসহায় অবস্থান থেকে আকুল মিনতি জানাচ্ছেন, তাদের নিরাপদে দেশে ফিরিয়ে নিয়ে আসতে, তখন মনে হয় আমাদের বীর মুক্তিযোদ্ধাদের, যারা মা’কে মুক্ত করতে, মায়ের সম্মান ফিরিয়ে দিতে নিজেদের জীবন উৎসর্গ করেছিলেন, আমরা কি তাদের নিবেদনকে, তাদের জীবনের বিনিময়ে অর্জিত স্বাধীনতাকে সামান্য মর্যাদা দিতে সক্ষম হচ্ছি। সারা পৃথিবী জোড়ে আমাদের ছয় লক্ষ মা, বোন উপার্জনের জন্য হন্যে হয়ে ছুটছেন। চরম অসহায় হয়ে দিনযাপন করছেন প্রায় দু’লক্ষ সত্তর হাজারের মতো নারী যারা মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন দেশে অমানবিক পেশায় যুক্ত হয়ে পড়েছেন, মানব পাচারকারী দালালদের প্ররোচনায়। আমরা তাদেরকে প্রশিক্ষণ দিয়ে জনশক্তিতে রূপান্তরিত করতে পারিনি , মিথ্যা প্রত্যাশায়, মিথ্যা স্বপ্ন দেখিয়ে গ্রামের সহজ সরল গৃহবধুদের প্রায় ১২০০ তালিকাভুক্ত এজেন্সি উপার্জনের নামে আগুনের শিখায় নিক্ষেপ করেছে। বিভিন্ন মাধ্যমে তাঁদের আহাজারি শোনে আমাদের বিবেকবোধে যে খুব বড় সাড়া পড়ছে তা’ও মনে হয় না। ব্রাক ইউনিভার্সিটির গবেষণায় বেরিয়ে আসা আমাদের “রেমিটেন্স মাতাদের” এই অসহায় ছবি জনসন্মুখে না এলে আমরা তো, এ নিয়ে কোন পর্যায়েই আলোচনা করতাম না। কারণ লাঞ্চিত মায়েদেরকে আমরা সংখ্যা হিসাবে বিবেচনা করছি এবং সংখ্যাটি খুবই নগন্য বলে মনে হচ্ছে আমাদের অনেকের। আত্মামর্যাদাশীল জাতি কখনো জাতিগত সম্মানের বিষয়কে সংখ্যা দিয়ে বিবেচনা করে না, লাঞ্চনার প্রকৃতি দিয়ে বিবেচনা করে। ইউরোপ, আমেরিকার কোন দেশের একজন সম্মানিত নাগরিকও যদি অন্য দেশে গিয়ে লাঞ্ছনার শিকার হন, পার্লামেন্টের সকল দলের, সকল সদস্য বিষয়টিকে জাতিগত অপমান হিসাবে মনে করেন এবন তড়িৎ ব্যবস্থা গ্রহণ করেন বিবেকের আহবানে কিংবা জনমতের কথা বিবেচনা করে। আমাদের অর্থনৈতিক উন্নয়নের সাথে সাথে আত্মমর্যাদাবোধকেও জাগিয়ে তুলতে হবে, না হলে বিশ্বসমাজে আমাদের মতামতকে সম্মানের সাথে গ্রহণ করতে অনেকেই দ্বিধা বোধ করবেন।
আমাদের মনে রাখতে হবে, এই যে অর্থনৈতিক উন্নয়নের জন্য আমরা এশিয়াতে ধীরে ধীরে এগিয়ে যাচ্ছি, তা’ কিন্তু আমাদের মায়েদের, বোনেদের অবদানে। আমাদের রপ্তানীর সিংহ ভাগ অর্জন হচ্ছে তৈরি পোশাক খাত। তৈরি পোশাক শিল্প ঘুরে দাঁড়িয়েছে আমাদের নারীদের অক্লান্ত ও আন্তরিক পরিশ্রমের বিনিময়ে। পোশাক শিল্পে নিয়োজিত ৮০ লক্ষ শ্রমিকদের মধ্যে ৩২ লক্ষ হচ্ছেন নারী। রপ্তানি বৃদ্ধি, কর্মসংস্থান সৃষ্টি এবং জিডিপিতে অবদান বৃদ্ধি যে দৃষ্টিকোণ থেকেই দেখা হোক না কেন বাংলাদেশের অর্থনীতিতে পোশাক শিল্পের অবদান অপরিসীম। স্বাধীনতার পর প্রায় শূন্য থেকে শুরু করে ৪৯ বছরের মধ্যেই বিলিয়ন ডলারে পৌঁছা এবং চল্লিশ লাখের অধিক শ্রমিকের কর্মসংস্থান করা এ শিল্পের জন্য অনেকটা কল্পনাতীত ছিল। এই শিল্পের অন্যতম বৈশিষ্ট্য হলো শ্রমিকের সিংহ ভাগ নারী শ্রমিক যার অধিকাংশ এসেছে গ্রাম এলাকার হত দরিদ্র পরিবার থেকে। স্বাধীনতার ঊষালগ্নে বাংলাদেশ ছিল কৃষি নির্ভর প্রান্তিক অর্থনীতির দেশ। কেবলমাত্র পাটজাত দ্রব্য ও কাঁচামাল ছাড়া কোন রপ্তানি পণ্য ছিল না। তেমন অবস্থা থেকে তিলে তিলে গড়ে ওঠা পোশাক শিল্প আজ বাংলাদেশকে বিশ্বে নতুন ভাবে পরিচয় করিয়ে দিচ্ছে। এই যে দেশের নুতন ভাবমূর্তি গড়ে তোলা, তা কিন্তু আমাদের নারীদের অক্লান্ত শ্রম ও দক্ষতার বিনিময়ে অর্জিত সম্মান ।
মুক্তি’র জন্য যারা প্রাণপন লড়াই করেছিলেন, তাদের প্রতিশ্রুতি রক্ষার জন্য আমাদের মা’ বোন যারা চরম অসহায় হয়ে মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন দেশে কালাতিপাত করছেন তাদেরকে সম্মানের সাথে ফিরিয়ে নিয়ে আসতে হবে , যারা ফিরেছেন তাঁদেরকে পুনর্বাসন করতে হবে, আর যারা লাঞ্ছনা, নির্যাতনের মধ্যে অসহনীয় কষ্টে দিন যাপন করছেন তাঁদেরকে অবিলম্বে ফিরিয়ে আনা প্রয়োজন, মনে রাখতে হবে উন্নয়নশীল বা উন্নত দেশ হিসাবে নাগরিকরা কিন্তু সংখ্যায় বিবেচ্য নন, তারা আত্ম-মর্যাদাশালী জাতির মর্যাদাবান নাগরিক হিসাবে গন্য।
“বীরের রক্ত স্রোত, মায়ের অশ্রুধারায়” অর্জিত স্বাধীনতা, দীর্ঘ ৪৯ বছরে অর্জিত উন্নয়নকে আমাদের সংহত করার সময় এসেছে। জাতীয়ভাবে সকলক্ষেত্রে শৃঙ্খলা নিয়ে আসার সময় এসেছে। আমাদের বিশ্বাস জাতি হিসাবে সে যোগ্যতা আমরা রাখি, মৃত্যুকে পরম মমতায় আলিঙ্গন করে, স্বাধীনতার সূর্যকে যে জাতি বরণ করতে পিছু হটেনা না, সে জাতির পক্ষে মায়ের অশ্রুধারা মোছার ক্ষমতা আছে। আমরা অবশ্যই পারবো অরুণোদয় ছিনিয়ে আনতে কারণ ঘনঅমানিশার কোল থেকে, আমরা তো নুতন সূর্যের সোনালি আলয় নিজেদেরকে বারবার আলকিত করেছি, ইতিহাস তাঁর সাক্ষী আছে, আমরাই তো ইতিহাস রচনা করেছি অসংখ্যবার।
লেখক : প্রাবন্ধিক ও সমাজ গবেষক।

 

 

 

শেয়ার করুন
উপ সম্পাদকীয় এর আরো সংবাদ
  • সড়ক দুর্ঘটনা এবং সড়ক আইন-২০১৮
  • বাংলাদেশের প্রবৃদ্ধি ও বিদেশি বিনিয়োগ প্রসঙ্গ
  • বাঙালির ধৈর্য্য
  • সামাজিক অবক্ষয় ও জননিরাপত্তার অবকাঠামো
  • শিক্ষকদের অবদান ও মর্যাদা
  • ১৯৭০ এর নির্বাচন ও মুক্তিযুদ্ধ
  • একাত্তর :আমার গৌরবের ঠিকানা
  • সড়ক দুর্ঘটনা কি থামানো যায় না?
  • চিকিৎসা সেবা বনাম ব্যবসা
  • নীরব ঘাতক প্লাস্টিক
  • সার্থক জীবন মহত্তর অবদান
  • প্রযুক্তির বিশ্বায়ন বনাম তরুণ সমাজ
  • মানবিক মূল্যবোধ ও বাংলাদেশ
  • খাদ্য চাহিদা পূরণে উৎপাদন বৃদ্ধি অপরিহার্য
  • শ্রমজীবী মানুষদের নিয়ে কিছু কথা
  • সাংস্কৃতিক আগ্রাসন
  • বৃটিশ সাধারণ নির্বাচন-২০১৯
  • প্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের অগ্রযাত্রা সফল হোক
  • লক্ষ্য হোক সুষম সামাজিক উন্নয়ন
  • জননী ও জন্মভূমি
  • Developed by: Sparkle IT