উপ সম্পাদকীয়

লক্ষ্য হোক সুষম সামাজিক উন্নয়ন

চৌধুরী শাহেদ আকবর প্রকাশিত হয়েছে: ০৩-১২-২০১৯ ইং ০১:৩২:১৬ | সংবাদটি ২০৯ বার পঠিত

বিখ্যাত ব্রিটিশ উপন্যাসিক জর্জ অরওয়েল ১৯৪৫ সালে ‘দি এনিমেল ফার্ম’ নামে একটি উপন্যাস লিখেছিলেন। উপন্যাসটির কাহিনি অনেকটা এই রকম। ‘দি ম্যানর ফার্ম’ নামে একটি ফার্মে একদল পশু মনুষ্যশ্রেণি দ্বারা নিযার্তিত হয়ে মনুষ্যশ্রেণির বিরুদ্ধে বিপ্লবের সিদ্ধান্ত গ্রহণ করে। পরবর্তীতে বিপ্লবে জয়ী হয়ে পশুরা ফার্ম-এর উপর কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠা করে। তারা ফার্মটির নাম বদলে ‘দি এনিমেল ফার্ম’ রাখে। সবাই মিলে পশুবাদ প্রতিষ্ঠার জন্য ৭টি নীতিমালা রচনা করে। যার মাধ্যমে তারা ঘোষণা করে সব পশু সমান। কিন্তু কিছুদিন পর নেতৃত্বদানকারী পশুদের মধ্যে দ্বন্দ্ব শুরু হয়। ফলশ্রুতিতে ক্ষমতার পালাবদলে নেতৃত্ব বদলের পর ক্ষমতা এক সময় এককেন্দ্রিক হয়ে পড়ে। ফার্মের অন্য পশুদের এক সময় বোঝানো হয় যে, নেতৃত্বদানকারী পশুরা অন্যান্য সাধারণ পশুদের তুলনায় অধিকতর উন্নত শ্রেণির। একসময় তারা সব পশু সমান, এই নীতিমালা বদলেও ফেলে। তাদের নতুন নীতি হয়- ‘সব পশু সমান কিন্তু তাদের মধ্যে ও উন্নত শ্রেণি আছে যারা আলাদাভাবে সমান’। ১৯৪৫ সালে লেখা এই উপন্যাসটির নীতিমালাকে বর্তমান সময়ের প্রেক্ষাপটে আমরা প্রয়োগ করতে পারি এইভাবেÑ‘একটি দেশের সব নাগরিকই সমান, কিন্তু ধনীরা আলাদাভাবে আরো সমান’।
বিষয়টি একটু খোলাসা করেই বলি। আমরা দেশ নিয়ে ইদানীংকালে অনেক আশাবাদী কথা শুনি। যেমনÑ২০১৫ সালে প্রকাশিত সুইজারল্যান্ডের ক্রেডিট সুইস-এর রিপোর্ট অনুযায়ী ২০১০ সাল থেকে ২০১৫ সালের মধ্যে বাংলাদেশের মানুষের সম্পদ বেড়েছে ৩ গুণ। ওই সময়কালে মোট সম্পদের পরিমাণ ৭৮ বিলিয়ন মার্কিন ডলার থেকে বেড়েছে ২৩৭ বিলিয়ন মার্কিন ডলার। এই সময়ে বার্ষিক মাথাপিছু আয় বেড়েছে ১০৬৯ মার্কিন ডলার থেকে ২২০১ মার্কিন ডলার। ক্রেডিট সুইস-এর চেয়ে আরো চমৎকার খবর দিয়েছে যুক্তরাজ্যের ওয়েলথ এক্স ইন্সটিটিউট নামের এক গবেষণা প্রতিষ্ঠান। তাদের ধনী তৈরির ক্ষেত্রে সবচেয়ে এগিয়ে থাকা ১০টি দেশের মধ্যে তালিকায় বাংলাদেশের নাম সবার উপরে রেখেছে। বাংলাদেশ টপকে গেছে চীন, ভারত, পাকিস্তান, যুক্তরাষ্ট্রসহ আরো কয়েকটি দেশকে। তাদের মতে, ২০১২ সাল থেকে ২০১৭ সাল পর্যন্ত বাংলাদেশে অতি ধনী বেড়েছে বার্ষিক ১৭ দশমিক ৩ শতাংশ হারে। অথচ ওই সময় যুক্তরাষ্ট্রের অতি ধনী বৃদ্ধির হার ছিলো মাত্র ৮ শতাংশ। এখানে বলে রাখা ভালো যে, তারা অতি ধনী বলতে তাদেরকে বুঝিয়েছে যাদের মোট সম্পদের পরিমাণ কমপক্ষে ৩০ মিলিয়ন মার্কিন ডলার বা ২৫০ কোটি টাকা। খুবই আশার কথা এটি। কিন্তু নিরাশার কথাও আছে সেই সাথে। এই জনবহুল দেশটিতে এই অতি ধনীর লিস্টে আছেন মাত্র ২৫৫ জন বাংলাদেশি। রিপোর্টটি আরো বলছে, বাংলাদেশ গত কয়েক বছরে আশ্চর্য রকম উন্নতি করেছে। প্রবৃদ্ধির হিসেবে অনেক দেশকে ছাড়িয়ে গেছে। কিন্তু এই প্রবৃদ্ধির ফলে সব মানুষ লাভবান হননি, গুটিকয়েক মানুষ ছাড়া। অর্থাৎ সম্পদের পরিমাণ বাড়লেও আসল ফায়দা পাচ্ছে এইরকম মানুষর সংখ্যা খুবই নগন্য।
বিষয়টিকে আরো স্পষ্ট করেছে বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর তথ্য। বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর মতে, বাংলাদেশের সবচেয়ে গরিব ৫ শতাংশ জনগোষ্ঠীর মোট আয়ের পরিমাণ মোট জাতীয় আয়ের মাত্র ০.২৩ শতাংশ। ২০১০ সালে এই হার ছিল ০.৭৮ শতাংশ। অপরদিকে সবচেয়ে ধনী ৫ শতাংশ মানুষের মোট আয় দেশের মোট জাতীয় আয়ের প্রায় ২৮ শতাংশ বা এক-তৃতীয়াংশ। ২০১০ সালে এই হার ছিল ২৪.৫০ শতাংশ। বিগত কয়েক বছরে তাদের আয় বেড়েছে সাড়ে ৩ শতাংশ। অন্যদিকে সবচেয়ে গরিব ৫ শতাংশ মানুষের আয় তো বাড়েইনি, উল্টো বরং কমেছে শূন্য দশমিক ৫৬ শতাংশ। অর্থাৎ ধনী আরও ধনী হচ্ছে, গরিব হচ্ছে আরও গরিব।
১৯১২ সালে ইতালিয়ান সমাজবিজ্ঞানী এবং পরিসংখ্যানবিদ করারাডো গিনি সমাজে সম্পদ বন্টন পরিমাপের একটি উপায় তৈরি করেছিলেন যা গিনি সূচক বা গিনি সহগ হিসেবে পরিচিত। এর মান ০ থেকে ১ পর্যন্ত। শূন্য বা এর কাছাকাছি মান হলে তাকে সাম্য বা নিম্ন আয় বৈষম্যের দেশ ধরা হয়। আর গিনি সহগ শূন্য দশমিক ৫ পেরিয়ে গেলে তাকে উচ্চ আয়বৈষম্যের দেশ বলা হয়। অর্থনীতি শাস্ত্রে আয়ের বৈষম্য পরিমাপ করা হয় এই গিনি সূচক বা সহগের মাধ্যমে। আমাদের দেশে সর্বশেষ গিনি সহগ পরিমাপ করা হয় ২০১৬ সালে। সর্বশেষ হিসাবে বাংলাদেশের গিনি সহগের মান শূন্য দশমিক ৪৮৩। অর্থাৎ দশমিক ৫-এর খুবই কাছে। তার মানে বাংলাদেশ ও একটি উচ্চ আয় বৈষম্যের দেশ।
২.
অর্থনীতিতে ‘নব্য উদারতাবাদ’ নামে একটি ধারণা রয়েছে। এটি এখন খুবই পরিচিত ধারণা। দুনিয়ার অর্থনীতি এখন এই ধারণার উপর ভিত্তি করেই চলছে। মার্কিন অর্থনীতিবিদ মিল্টন ফ্রিডম্যান (১৯৫০) এই ধারণার অন্যতম প্রচারক ছিলেন। তিনি শিকাগো স্কুল অব ইকনমিক্স এর অধ্যাপক ছিলেন। এই প্রতিষ্ঠানের অন্যান্য অর্থনীতিবিদ ও এই ধারণার সমর্থক এবং প্রচারক। তাদেরকে ‘শিকাগো বয়েজ’ নামে ডাকা হয়। এই নব্য উদারতাবাদের দুটি দিক রয়েছেÑঅর্থনৈতিক এবং রাজনৈতিক। এর অর্থনৈতিক দিকটি মূলত মুক্তবাজার অর্থনীতির কথা বলে। আর রাজনৈতিক বিবেচনায় সেই মুক্তবাজার অর্থনীতিতে রাষ্ট্রের হস্তক্ষেপ হবে খুবই সীমিত। রাষ্ট্রের প্রধান কাজ হবে, নিরাপত্তা রক্ষা, আইন শৃঙ্খলা বজায় রাখা, রাজস্ব ও মুদ্রা ব্যবস্থা নিয়ন্ত্রণ করা। বাজারে রাষ্ট্রের হস্তক্ষেপের উপস্থিতি বুঝতে দেয়া যাবে না। বাজার চলবে তার নিয়মে। রাষ্ট্র সবকিছুর উপর নিয়ন্ত্রণ কমাবে, যা কিছু পাবলিক আছে তার বেসরকারিকরণ করতে হবে। আরো কমাতে হবে জনগণের জন্য সরকারের কল্যাণমূলক ও সামাজিক সব কর্মসূচি।
এই নব্য উদারতাবাদ প্রয়োগের প্রথম পরীক্ষা হয় শুরু হয় চিলি-তে। ১৯৭৩ সালে আমেরিকান গোয়েন্দা সংস্থা সিআইএ-এর সহযোগিতায় চিলির প্রেসিডেন্ট সালভেদর আয়েন্দকে হত্যা করে জেনারেল অগাস্টো পিনোশেট-কে ক্ষমতায় বসানো হয়। এরপর পটপরিবর্তন করে নানা ধরনের অর্থনৈতিক সংস্কার করা হয়। পরবর্তীতে বিশ্বের অনেক দেশেই এই রকম হঠাৎ পটপরিবর্তন করে নব্যউদারতাবাদ চাপিয়ে দিয়ে অনেকটাই জোর করেই অর্থনৈতিক সংস্কার সাধন করা হয়। বিভিন্ন দেশে এইভাবে সংস্কার কর্মসূচি চাপিয়ে দেয়ার প্রক্রিয়াকে কানাডিয়ান লেখক নাওমি ক্লেইন (২০০৭) নাম দিয়েছেন ‘শক ডকট্রিন’।
আমেরিকাতে নব্য উদারতাবাদ-এর প্রয়োগ শুরু হয় ৭০ দশকের শেষের দিকে নানা অর্থনৈতিক সংস্কার কর্মসূচির মাধ্যমে। পরবর্তীতে প্রেসিডেন্ট রোনালড রিগ্যান এটি আরো এগিয়ে নেন। এই নব্য উদারতাবাদ নীতিতে ধনীর হাতে আরো টাকা আসার সুযোগ করে দেয়া হয়। করের হার কমানো হয়। আর্থিক খাতের নিয়ন্ত্রণ শিথিল করা হয়। এই সময় বাজার, আর্থিকখাত সবকিছুর নিয়ন্ত্রণ কর্পোরেটদের হাতে চলে যায়। একই ধারাবাহিকতায় ৯০-এর দশকে কর্পোরেশন ব্যবস্থাপক এবং সিইওদের বেতন আকাশচুম্বী হতে থাকে, আর শ্রমিকদের বেতন বাড়ে নগন্য হারে।
রিগ্যানের আমেরিকার মতো মার্গারেট থ্যাচার ও ব্রিটেনে বিভিন্ন ধরনের সংস্কার কর্মসূচি শুরু করেন। পরবর্তীতে সাবেক উপনিবেশ দেশগুলোকে ঋণের ফাঁদে ফেলে ‘কাঠামোগত সমন্বয় কর্মসূচি’-এর নামে এই মডেল অনুসরণ করার জন্য বলা হয়। এক সময় এটি অনিবার্য ও অপ্রতিরোধ্য হয়ে উঠে এবং ৯০ দশকের দিকে পৃথিবীর বেশিরভাগ দেশ এই নীতি গ্রহণ করতে বাধ্য হয়। একই ধারাবাহিকতায় বাংলাদেশ নব্য উদারতাবাদ নীতি গ্রহণ করতে শুরু করে ৮০র দশকের দিকে, ‘কাঠামোগত সমন্বয় কর্মসূচি’র মাধ্যমে। এই নব্য উদারতাবাদের মধ্যেই তীব্র আয় বৈষম্যের বীজ নিহিত রয়েছে।
টমাস পিকেটির ‘ক্যাপিটাল ইন দ্য টোয়েন্টি ফার্স্ট সেঞ্চুরি’ একটি অনবদ্য গ্রন্থ। বইখানাতে ১৮ শতকের শুরু থেকে বর্তমানকাল পর্যন্ত ইউরোপ এবং আমেরিকার সম্পদ ও আয় বৈষম্য নিয়ে আলোচনা করেছেন। তিনি মনে করেন, আয় বৈষম্য হঠাৎ করে তৈরি হয়নি বরং এটি পুঁজিবাদের কারণেই হয়েছে। তিনি গ্রেট ডিপ্রেশন এবং দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ পরবর্তী অবস্থা নিয়ে আলোচনা করেছেন। ওই সময় মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে করের হার ৯০ শতাংশ পর্যন্ত উঠেছিলো। তখন সম্পদ আজকের মতো এক শ্রেণির হাতে পুঞ্জিভূত হওয়ার সুযোগ ছিলো না। তিনি দেখিয়েছেন যে, যখন দীর্ঘ মেয়াদে পুজি থেকে প্রাপ্ত আয়ের হার অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির হারের চেয়ে বেশি হয়, তখন সম্পদ পুঞ্জিভূত হয়। ফলশ্রুতিতে সম্পদের অসম বন্টন হয়। আর এই অসম বন্টন এক সময় সামাজিক এবং অর্থনৈতিক অস্থিরতার জন্ম দেয়।
পিকেটির এই ধারণা বাস্তবিক এবং বর্তমান সময়ের প্রেক্ষাপটে এতে চিন্তার খোরাক রয়েছে। আমরা এখন দেখছি যে নব্য উদারতাবাদের বিরুদ্ধে বিক্ষোভ চলছে বিশ্বে। হংকং থেকে বার্সেলোনা, বাগদাদ থেকে সান্তিয়াগো, বৈরুত থেকে আদ্দিস আবাবা, পুয়ের্তোরিকো থেকে হাইতি ও ইকুয়েডর সব জায়গায় একই বিষয় নিয়ে বিক্ষোভ হচ্ছে। সর্বশেষ এই তালিকায় যুক্ত হয়েছে পাকিস্তান। আন্দোলনের চাপে চিলির মন্ত্রিসভা ভেঙে দেওয়া হয়েছে, জলবায়ু সম্মেলনও বাতিল করা হয়েছে। লেবাননের প্রধানমন্ত্রী রফিক হারিরি করেছেন পদত্যাগ। গত কয়েক দশকের জীবনযাত্রার মাত্রাতিরিক্ত ব্যয় পরিস্থিতিকে অসহনীয় পর্যায়ে নিয়ে গিয়েছে। নব্য উদারতাবাদ ও পুঁজিবাদ ক্ষুধার্থের হার কমালে ও দারিদ্রতার হার কমাতে পারেনি। বর্তমান এই বিক্ষোভ বিদ্যমান রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক কাঠামোর ব্যর্থতার দিকেই ইশারা করছে। নব্য উদারতাবাদ দেশের ভেতরে যেমন আয় ও সম্পদের বৈষম্য বৃদ্ধি করেছে, তেমনি সারা বিশ্বে এক ধরনের অসম বিশ্বায়ন প্রক্রিয়ার জন্ম দিচ্ছে।
৩.
মানুষের আয় যত বেশি হবে, তার করও তত বেশি দেওয়ার কথা। কিন্তু বিষয়টি সেরকম নয় এখনো। ধনবান মানুষেরা কর ফাঁকি দেন। দেশে কোটি টাকা ব্যাংকে আছে, এইরকম হিসাবধারীর সংখ্যা ৬০ হাজার ছাড়িয়েছে। স্বাধীনতার পরে কয়েক বছর পর্যন্ত কোটি টাকার বেশি এমন হিসাবের সংখ্যা ছিল মাত্র ৪৭টি। কোটিপতির সংখ্যার এই হিসাব ও প্রকৃত হিসাব নয়। কারণ বাংলাদেশ ব্যাংক দেশের প্রকৃত কোটিপতির সঠিক হিসাব প্রকাশ করে না। কিন্তু এটি নিঃসন্দেহে বলা যায় যে, বাংলাদেশের অর্থনীতিতে দ্রুতগতিতে বাড়ছে কোটিপতি। এর সঙ্গে প্রত্যাশিত সুশাসনের অভাবে বাড়ছে কর ফাঁকিও। দেশে এত হাই প্রোফাইল ব্যবসায়ী থাকতে ও চাঁদপুরের জর্দা ব্যবসায়ী মোহাম্মদ কাউছ মিয়া প্রতিবছর সেরা করদাতা হন। আমরা অনায়াসে বলতে পারি দেশে তাঁর চেয়ে অনেক বড় মাপের ব্যবসায়ীর অভাব নেই, কিন্তু তারা প্রতিনিয়ত কর ফাঁকি দিয়ে যাচ্ছেন।
উচ্চবিত্তদের সাথে আমাদের মধ্যবিত্তের ও একটি অংশ কর ফাঁকি দিচ্ছেন। পরিসংখ্যান বলছে, দেশে ১৬ কোটি মানুষের মধ্যে আয়কর দেয়ার মতো সামর্থ্যবান আছেন ৪ কোটি, কিন্তু আয়কর দিচ্ছেন খুবই কমসংখ্যক। দুদকের মতে, দেশে ১ শতাংশের কম মানুষ আয়কর দেন। আর, দেশের মোট দেশজ উৎপাদনের (জিডিপি) তুলনায় কর আদায় হয় মাত্র ১১ দশমিক ৪৭ শতাংশ। কর ফাঁকি ও মওকুফ বন্ধ হলে কর-জিডিপি অনুপাত ৫ শতাংশ বাড়বে, যা টাকার অঙ্কে ১ লাখ ১১ হাজার ৯০০ কোটি টাকা।
আমাদের রাজস্ব আইন এমনভাবে প্রণয়ন করা হয়, যাতে কর ফাঁকি দেওয়া সহজ হয়। অর্থাৎ একদিকে কর্পোরেশনের হাতে বিপুল টাকা জড়ো হওয়ার সুযোগ দেওয়া হচ্ছে, অন্যদিকে তার মালিক ও ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের কর ফাঁকি দেওয়ারও সুযোগ দেওয়া হচ্ছে। এর মাধ্যমে এক অতি ধনবান শ্রেণির সৃষ্টি হয়েছে। তাছাড়া, রাজনৈতিক কারণে ও ধনীদের ওপর কর আরোপ না করার একটি প্রবণতা কাজ করে আমাদের ক্ষমতাসীন দলগুলোর মাঝে। আমরা উপযোগী করারোপ না করে প্রণোদনা দেয়ার নামে কার্যত ধনীদের করের পরিমাণ কমাতে বেশি আগ্রহী।
ধনী বা পেশাজীবি মানুষের কর ফাঁকি দেওয়ার ক্ষমতা আছে। কিন্তু সাধারণ জনগণের কর ফাঁকি দেওয়ার সুযোগ বা ক্ষমতা কোনোটাই নেই। ভ্যাট নামক পরোক্ষ করের মাধ্যমে ঠিকই তাদের কাছ থেকে রাজস্ব আদায় করা হচ্ছে। বাংলাদেশ সরকারের সংগৃহীত মোট রাজস্বের ৭০ শতাংশই আসে পরোক্ষ কর থেকে, অর্থাৎ ভ্যাট থেকে, আর বাকি মাত্র ৩০ শতাংশ আসে প্রত্যক্ষ কর বা আয়কর থেকে। এতে বৈষম্য আরও বাড়ছে। কারণ, এই পরোক্ষ কর আরোপ করা হয় সব মানুষের ওপর, তার আয় কত তা বিবেচনা না করেই। তাই স্বাভাবিকভাবেই যারা গরিব তারা তাদের ক্ষুদ্র আয়ের বৃহত্তর অংশ ব্যয় করে এ ধরনের পরোক্ষ করের পেছনে। অপরদিকে ধনীদের জন্য যেটি কিনা তাদের আয়ের একটি ক্ষুদ্রাংশ মাত্র।
বিদ্যমান পরিস্থিতিতে আয় বৈষম্য পুরোপুরি দূর করা অসম্ভব। এটি চিন্তা করা ও বোকামী হবে। আর প্রকৃতপক্ষে পুঁজিবাদ, সমাজতন্ত্র বা অন্য কোনো মতবাদ আসলেই আয় বৈষম্য দূর করতে পারবে, সেটাও এখনই খুব জোর দিয়ে বলা যাবে না। এই আয় বৈষম্য তাই কিভাবে সহনীয় পর্যায়ে রাখা যায়, সেটি হচ্ছে এখন আসল কথা। পিকেটি তার বইটিতে আয় বৈষম্য কমানোর উপায় হিসাবে প্রগতিশীল করের কথা বলেছেন। প্রগতিশীল কর হলো একটি কর যা করদাতার সামর্থ্যের ওপর ভিত্তি করে যে নিম্ন-আয় উপার্জনকারী তার উপর যে উচ্চ-আয় উপার্জনকারী তার তুলনায় কম হারে কর আরোপ করে। অর্থাৎ এই কর ব্যবস্থা একজন উচ্চ-আয় উপার্জনকারীর কাছ থেকে একজন নিম্ন-আয় উপার্জনকারীর তুলনায় একটি বড় শতাংশ আদায় করে।
আমাদের যে করনীতি আছে তা দেশে বৈষম্য আরো বাড়িয়ে দিচ্ছে। অথচ আমরা জানি যে, করনীতির প্রধান লক্ষ্য হচ্ছে সমাজে বৈষম্য কমিয়ে আনা। অথচ আমাদের ভুল করনীতির কারণে আমরা ব্যর্থ হচ্ছি ধনীদের করের আওতায় আনতে। আর এই কারণে সমাজে বাড়ছে বৈষম্য। তাই, বৈষম্য কমানোর একটি উপায় হচ্ছে ধনীদের আয়ের ওপর আনুক্রমিক হারে করারোপ করা। আর আদায়কৃত টাকা ব্যয় করতে হবে জনগণের শিক্ষা, স্বাস্থ্যসহ অন্যান্য জনকল্যাণমূলক ও সামাজিক খাতে।
৪.
অর্থনীতিবিদ দেবপ্রিয় ভট্টাচার্য্যের এক লেখাতে পড়েছিলাম রবীন্দ্রনাথ লিখেছেন, ‘দেশের যে অতি ক্ষুদ্র অংশে বুদ্ধি-বিদ্যা-ধন-মান, সেই শতকরা পাঁচ পরিমাণ লোকের সঙ্গে পঁচানব্বই পরিমাণ লোকের ব্যবধান মহাসমুদ্রের ব্যবধানের চেয়ে বেশি। আমরা এক দেশে আছি, অথচ আমাদের এক দেশ নয়।’ রবীন্দ্রনাথ আরো লিখেছেনÑ‘ইংরেজিতে যাকে বলে এক্সপ্লয়টেশন, অর্থাৎ শোষণ নীতি, বর্তমান সভ্যতার নীতিই তাই। ন্যূনাংশিক বৃহদাংশিককে শোষণ করে বড় হতে চায়; এতে ক্ষুদ্র-বিশিষ্টের স্টম্ফীতি ঘটে, বৃহৎ-সাধারণের পোষণ ঘটে না।’ বহু আগে লেখা রবীন্দ্রনাথের এই কথাগুলো যেনো বর্তমান সময়ের কথাই বলছে।
যুক্তরাজ্যে অধ্যয়নকালীন সময় এক অধ্যাপকের কাছে শুনেছিলাম, আমেরিকায় নাকি বলা হয় বড়লোক যদি আরও বড়লোক হয়, তাহলে গরিবদেরও লাভ। কারণ, এক মুঠোয় যে পরিমাণ টাকা জায়গা হয়, তার বেশি যদি ধনীরা মুঠোয় ধরেন, তাহলে তাদের আঙুলের ফাঁক ফোঁকর দিয়ে কিছু সিকি-আধুলি মাটিতে পড়বে। আর সে পয়সা পাবে ওই গরিবেরা। কিন্তু এইরকম কিছু কি খুব একটা চোখে পড়ছে?
কবি আল মাহমুদ-এর একটি কবিতার লাইন হচ্ছে ‘আমাদের ধর্ম হোক ফসলের সুষম বণ্টন’। কবির মতো আসুন আমরাও বলি এই আশাহীন পৃথিবীতে আমাদের লক্ষ্য হোক সুষম সামাজিক উন্নয়ন। সম্পদের সুষম বণ্টনে ক্ষমতাধর বিত্তবানরা হবেন আন্তরিক। আর তবেই না স্বাদ পাওয়া যাবে আসল স্বাধীনতার আর মানব মহত্ত্বের বিশালতার।
লেখক : কলামিস্ট।

শেয়ার করুন
উপ সম্পাদকীয় এর আরো সংবাদ
  • সম্ভাবনাকে কাজে লাগাতে হবে
  • মানবাধিকার দিবস ও বাস্তবতা
  • বুয়েটের শিক্ষা
  • পাল্টে গেল শ্রীলঙ্কার ভোটের হিসাব
  • গড়ে তুলতে হবে মানবিক সমাজ
  • পাখি নিধন, অমানবিকতার উদাহরণ
  • দুর্নীতির বিরুদ্ধে শুদ্ধি অভিযান সফল হোক
  • সড়ক দুর্ঘটনা এবং সড়ক আইন-২০১৮
  • বাংলাদেশের প্রবৃদ্ধি ও বিদেশি বিনিয়োগ প্রসঙ্গ
  • বাঙালির ধৈর্য্য
  • সামাজিক অবক্ষয় ও জননিরাপত্তার অবকাঠামো
  • শিক্ষকদের অবদান ও মর্যাদা
  • ১৯৭০ এর নির্বাচন ও মুক্তিযুদ্ধ
  • একাত্তর :আমার গৌরবের ঠিকানা
  • সড়ক দুর্ঘটনা কি থামানো যায় না?
  • চিকিৎসা সেবা বনাম ব্যবসা
  • নীরব ঘাতক প্লাস্টিক
  • সার্থক জীবন মহত্তর অবদান
  • প্রযুক্তির বিশ্বায়ন বনাম তরুণ সমাজ
  • মানবিক মূল্যবোধ ও বাংলাদেশ
  • Developed by: Sparkle IT