ইতিহাস ও ঐতিহ্য

স্বতন্ত্র আবাসভূমির আন্দোলন

আবদুল হামিদ মানিক প্রকাশিত হয়েছে: ০৪-১২-২০১৯ ইং ০০:৩৬:০১ | সংবাদটি ২৮৮ বার পঠিত

(পূর্ব প্রকাশের পর)
গণভোটে সমাজের প্রতিটি স্তরে সাড়া জেগেছিল। অথচ রেফারে-াম বলতে যা বুঝায়-অর্থাৎ সার্বজনীন ভোটাধিকার ঐ গণভোটে ছিল না। এর উপর শিক্ষারও শর্ত ছিল। গ্রমে যাদের চৌকিদারী ট্যাক্স আট আনা এবং পৌর এলাকায় যাদের হোলডিং ট্যাক্স পাঁচআনা কেবল তারাই ছিলেন ভোটার। মুসলমানদের মধ্যে গরীবের সংখ্যা ছিল বেশি। শিক্ষার হারও ছিল কম। এরপরও গণভোটের জোয়ার ছড়িয়ে পড়ে ঘরে ঘরে। উভয়পক্ষে চারণ কবিদের রচিত গান ফিরতে থাকে মুখে মুখেঃ
আয়রে মুসলিম আয়রে তোরা
একবার ফিরে আয়,
বিহার ও কলকাতার দিকে
একবার ফিরে আয়।
আগে মরলো কত মুসলিম বিহার কলকাতায়
শেষে শহীদ হইল আলকাস
সিলেটও জেলায়।
অপরপক্ষে ঃ
না বুঝে ভাই পরের কথায়
ঘরে কুড়াল না মারিও
ভাইরে ভাই ঘরের বাকসে ভোট দিও।
বাংলাদেশে দুর্ভিক্ষ মানুষ মরে লক্ষ লক্ষ
সিলেট জেলায় সেই দুর্ভিক্ষ টানিয়া না আনিও।
উল্লেখ করা যেতে পারে যে, ২ মার্চ, ১৯৪৬ খ্রীষ্টাব্দে মোহাম্মদ আলী জিন্নাহ সিলেট এসেছিলেন। তার সফরের পর সিলেটে মুসলিম লীগের সমর্থক বেড়ে যায়। আসামের কংগ্রেস সরকার মুসলিম লীগ সমর্থকদের অনেককে কারাগারে নিক্ষেপসহ জেল-জুলুম শুরু করে। এ অবস্থায় ১৯৪৭-এর ২৪ এপ্রিল সিলেট শহরস্থ কোতোয়ালি থানা ভবন থেকে বৃটিশ পতাকা নামিয়ে পাকিস্তানী পতাকা উঠাতে গিয়ে আলকাস গুলিতে শহীদ হন। (তাঁর নামানুসারে পৌরসভায় একটি সড়ক আছে।) সব মিলিয়ে সমগ্র সিলেট রাজনৈতিক উত্তাপে টগবগে উত্তপ্ত হয়ে ওঠে। এভাবে সময় ঘনিয়ে এলো। ভোটের দু’টি দিনই ছিল সিলেটে বৃষ্টিমুখর। মুষলধারে বৃষ্টি। রাস্তাঘাট কর্দমাক্ত। তবু কেন্দ্রগুলোতে ছুটে এলেন নারী-পুরুষ দলে দলে। নৌকায়, পায়ে হেঁটে। শান্তিপূর্ণভাবে দু’দিনে ২৩৯টি কেন্দ্রে ভোট পর্ব শেষ হলো। দেখা গেল পাকিস্তানের পক্ষে ২ লাখ ৩৯ হাজার ৬১৯ এবং বিপক্ষে ১ লাখ ৮৪ হাজার ৪১ ভোট পড়েছে। সাব-ডিভিশনওয়ারী ফলাফল ছিল ঃ
সাব-ডিভিশন
পূর্ব বাংলার পক্ষে আসামের পক্ষে
সদর ৬৮,৩৮১ ৩৮,৮৭১
করিমগঞ্জ ৪১,২৬২ ৪০,৫৩৬
হবিগঞ্জ ৫৪,৫৪৩ ৩৬,৯৫২
দক্ষিণ সিলেট ৩১,৭১৮ ৩৩,৪৭১
সুনামগঞ্জ ৪৩,৭১৫ ৩৪,২১১
১৯৪৭-এর ১২ জুলাই এ ফলাফল দিল্লিতে পাঠানো হয়। ১৪ জুলাই সরকারিভাবে ঘোষণা করা হয়। এ ফলাফল নিয়ে সিলেটের সর্বত্র সে কি উল্লাস। করিমগঞ্জ, হাইলাকান্দি, কাছাড়সহ আসামের মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠ এলাকার বিস্তীর্ণ জনপদে খুশির জোয়ার। ৩ জুনের সরকারি ঘোষণায় ছিল, জনমত পাকিস্তানের পক্ষে হলে সিলেট এবং সংলগ্ন মুসলিম প্রধান এলাকাসমূহ পাকিস্তান বা পূর্ববংগের অন্তর্ভুক্ত হবে।
এই আনন্দ-উল্লাসের মধ্যেই চার সপ্তাহের মাথায় সীমানা কমিশনার রেডক্লিফ যে রিপোর্ট দিলেন তাতে সিলেটবাসী হতবাক হয়ে গেল। রোয়েদাদ অনুযায়ী করিমগঞ্জ মহকুমার পাথারকান্দি, রাতাবাড়ি, বদরপুর ও করিমগঞ্জ থানার অধিকাংশ এলাকা হয়ে গেল ভারতের অংশ।
স্যার রেডক্লিফের দায়িত্ব ছিল সীমানা নির্ধারণের। জনমত উপেক্ষা করে সিলেটের অবিচ্ছেদ্য আইনসঙ্গত অংশকে আসামের সাথে যুক্ত করার খোঁড়া যুক্তি দিলেন রেডক্লিফ। কুলাউড়া-শ্রীমঙ্গল হিন্দু সংখ্যাগরিষ্ঠ অঞ্চল (চা বাগানের ভোটাধিকারহীন শ্রমিকদের গণ্য করে) পাকিস্তানের ভাগে দেয়ার বিনিময়ে ঐ সাড়ে তিন থানাকে দিতে হলো ভারতের ভাগে। অথচ রেফারেন্ডামের সামগ্রিক ফলাফল মত উভয় এলাকাই স্পষ্টত পাকিস্তানভুক্ত হওয়ার কথা। জুনের ঘোষণা এবং জনগণের রায়কে রেডক্লিফ কেন অন্যায়ভাবে উপেক্ষা করলেন? এর উত্তর খুঁজেছেন অনেকেই। কেউ বলেছেন, রেডক্লিফ প্রথমে যে রিপোর্ট ও ম্যাপ মাউন্টব্যাটেনের কাছে দাখিল করেছিলেন রহস্যজনক কারণে তা গ্যাজেট অব ইন্ডিয়ায় প্রকাশ করা হয়নি।
মাউন্টব্যাটেন নেহরু দম্পতিকে খুশি করার জন্যে রেডক্লিফকে প্রভাবিত করে পাকিস্তান ও সিলেটকে বঞ্চিত করেন। অনেকের মতে, মাউন্টব্যাটেনকে মিঃ জিন্নাহ পাকিস্তানের প্রথম গভর্ণর জেনারেল হিসেবে মেনে নেননি বলে জিন্নাহর উপর মিঃ মাউন্টব্যাটেন খেপা ছিলেন। অন্যদিকে পশ্চিম পাকিস্তানের সাথে কিছু এলাকা যোগ করার বিনিময়ে জিন্নাহ এদিকে ছাড় দেন বলেও কথা উঠেছিল। এ ব্যাপারে আরেকটি কথা আছে। ত্রিপুরার মহারাজা প্রথমেই পাকিস্তানে যোগদানের ঘোষণা দিয়ে বসেন। মহারাজার স্ত্রী ছিলেন বিহারের ময়ুরভঞ্চ রাজ্যের কট্টর হিন্দু রাজার কন্যা। প্যাটেল ঐ রাজাকে দিয়ে তার কন্যাকে (ত্রিপুরা রাজার রাণী) রেডক্লিফের কাছে পাঠিয়ে দিলেন। রাণী সেখানে এক সপ্তাহ ছিলেন। ফলে সবকিছু উলট-পালট হয়ে গেল। পরে চট্টগ্রামের সার্কিট হাউসে করিমগঞ্জের একদল মেডিক্যাল ছাত্র জিন্নাহর সাথে দেখা করে ঐ প্রসঙ্গে জানতে চেয়েছিলেন। জিন্নাহ বলেছিলেন, রেডক্লিফ অর্থলোলুপ নন সে কথা জেনেই আমরা তাকে বিচারক মেনেছিলাম। কিন্তু তিনি যে নারীলোলুপ সে কথা আমাদের লোক জানতে পারেনি।
এভাবে অভিন্ন সত্তার ইতিহাস ও অখ- ঐতিহ্যের অধিকারী সিলেটের মানুষ দ্বিধাবিভক্ত হয়ে দুটি রাষ্ট্রের বাসিন্দা হয়ে গেল। এপারে-ওপারে সিলেটীরা ক্ষতিগ্রস্থ হলো। এ মনোবেদনার প্রতি কেউ নজর দেয়নি। পাকিস্তানের কর্তা ব্যক্তিরাও কোনো কথা বলেননি। সরকারি প্রশাসনও জনমতের দাম দেয়নি। সাবেক আইজি এবং মন্ত্রী এম এ হক গণভোটের সময় পুলিশের কর্মকর্তা হিসেবে করিমগঞ্জে ছিলেন। তিনি বলেছেন, গণভোটের পর প্রায় দশদিন তিনি করিমগঞ্জে পাকিস্তানের পতাকা তুলে রাখেন এবং সিলেট জেলা প্রশাসকসহ বিভিন্ন স্তরের নেতাদের সাহায্য চান। কিন্তু কেউ তাকে সাহায্য করেনি। মুসলিম লীগ নেতৃবৃন্দের এ নির্লিপ্ততা এবং ভোটের রায়কে বানচাল করে সিলেটকে খ-িত করার ঘটনা তাই ক্ষোভের জন্ম দেয়। ফলে এত সাধের পাকিস্তানে শুরুতেই সিলেটীরা ক্ষুব্ধ হন। গ্রামে গ্রামে ব্যাঙ্গাত্মক ছড়া কাটা হয়ঃ পাকিস্তান ঝিঙার ঝাড় গাইয়ে খা’র বলদে চা’র (গাভী খাচ্ছে বলদ দেখছে)।
রেডক্লিফ রোয়েদাদের বিরুদ্ধে আনুষ্ঠানিক একটি প্রতিবাদের বর্ণনা দিয়েছেন দেওয়ান মোহাম্মদ আজরফ। তিনি লিখেছেন ঃ
যাতে স্বারকলিপি পেশ করে সিলেটের এক অত্যন্ত মূল্যবান অংশকে আবার সিলেটের সঙ্গে যুক্ত করা যায়, এ জন্য আসাম মুসলিম লীগের দ্বারা আয়োজিত সভায় বাউন্ডারী কমিশনে লীগের বক্তব্য পেশ করার জন্য মরহুম আব্দুল মতিন চৌধুরীকে সভাপতি ও আমাকে সম্পাদক নিযুক্ত করা হয়। সে উদ্দেশ্যে সিলেটের ভূগোল সম্পর্কে সম্পূর্ণ ওয়াকেফহাল মরহুম আব্দুল্লা ও আমার সহযোগী হিসাবে মরহুম দেওয়ান অহিদুর রাজাসহ আমি কলকাতায় গিয়ে উপস্থিত হই। আমাদের পক্ষে উকালতি করার জন্য লক্ষেèৗ থেকে পূর্বেই তথাকার এডভোকেট জেনারেল মি. ওয়াসিমকে আনানো হয়েছিল। কলকাতার এডভোকেটদের মধ্যে শের-ই-বাংলা এ কে ফজলুল হক ও জনাব হামিদুল হক চৌধুরী নিযুক্ত হয়েছিলেন। বিচারের ভার পড়েছিল চারজন জজের উপর। তারা হচ্ছেন ড. স্যার বিজন বিহারী মুখোপাধ্যায়, মি. চারু চন্দ্র বিশ্বাস, মি, ফজলুর রহমান আইসিএ ও জনাব মুহাম্মদ আকরম। বলাবাহুল্য ড, স্যার বিজন বিহারী মুখোপাধ্যায় ও মি, চারু চন্দ্র বিশ্বাস একাধারে ছিলেন বিচারপতি ও কংগ্রেসের পক্ষের উকিল। আর মি. ফজলুর রহমান ও মি. আকরম ছিলেন বিচারপতি ও মুসলিম লীগের পক্ষের উকিল।
আমরা আমাদের স্বপক্ষে ১৩ খানা স্মারকলিপি দাখিল করে প্রমাণ করতে চেয়েছিলাম পাথারকান্দি, রাতাবাড়ি, বদরপুর ও করিমগঞ্জের খ-িত অংশ সিলেটের অবিচ্ছেদ্য অংশ। এ তিন থানার জনসংখ্যারও বেশীর ভাগ মুসলিম। গণভোট হয়েছে সমগ্র জেলার রাজনৈতিক সীমানা নির্ধারণের উদ্দেশ্যে। তবে আমাদের আকুল আবেদন অগ্রাহ্য করে বাউন্ডারী কমিশন সে সাড়ে তিন থানাকে কাছাড় জেলার সাথে যুক্ত করে সিলেটবাসী মুসলিম সমাজের লোকদের সম্পূর্ণ নিরাশ করে।
এ প্রসঙ্গে আবুল মাল আব্দুল মুহিতের স্মৃতিচারণায় পাওয়া যায় আরেকটি বিবরণ। তাঁর ভাষায় ঃ
র‌্যাডক্লিফ কমিশনের কাছে তদ্বিরের জন্য আসাম মুসলিম লীগ একটি দল ঠিক করে। কিন্তু গণভোট বোর্ড আব্বাকে কমিশনে হাজিরা দিতে নির্দেশ দেয় । আব্বার তখন কলিকাতা গিয়ে আরো তিন সপ্তাহ কাটাবার সামর্থ নেই। কিন্তু বোর্ডের চাপে এবং বিশেষ করে আবদুল মতিন চৌধুরী এবং আবদুল হাই চৌধুরীর পীড়াপীড়িতে তিনি কলিকাতা যান। সেখানে সিলেটের তরফ থেকে মুসলিম লীগের মনোনীত কৌসুলী মোহাম্মদ ওয়াসিম ও হামিদুল হক চৌধুরী ছাড়া একমাত্র তিনিই কমিশনের সওয়ালজবাবে অংশ নেন। শেরে বাংলা পূর্ব বাংলার পশ্চিম সীমানা ও কলিকাতা নিয়ে দরবার করেন তবে সিলেটের বিষয়ে তিনি কোন যুক্তি দেননি। সীমানা কমিশনের সামনে হাজিরা দিতে তিনি শেষবারের মত কলিকাতা যান। (আমার আব্বাঃ তৎকালীন সমাজ ও রাজনীতিঃ আবু আহমদ আব্দুল হাফিজ জন্মশতবার্ষিকী স্মারক, পৃষ্ঠা ৫৮, জুলাই ২০০০)।
এই পরিপ্রেক্ষিতে চাপা অসন্তোষ নিয়ে হলেও সিলেটীরা পাকিস্তানে শুরু করে নতুন জীবন। গণভোট-পূর্ব সিলেটের আয়তন ছিল ৫,৪৪০ বর্গমাইল। সাড়ে তিন থানা ভারতভুক্ত হওয়াতে ৪,৭৮৫ বর্গমাইল আয়তন নিয়ে সিলেট পাকিস্তানভুক্ত হয়। পাকিস্তান আমলে সব কটি আন্দোলনে সিলেটবাসী সক্রিয়ভাবে অংশগ্রহণ করে। যারা গণভোটে পাকিস্তানের পক্ষে ছিলেন, দেখা যায় তাদের অধিকাংশই ভাষা আন্দোলন এবং মুক্তিযুদ্ধে আছেন সামনের কাতারে। উল্লেখ্য, বঙ্গবন্ধু গণভোটের সময় পাকিস্তানের পক্ষে সিলেটের গ্রামে গ্রামে জনসংযোগ, সভা-সমাবেশ করেছেন। সংগ্রামী এ ঐতিহ্যের হাত ধরেই মুক্তিযুদ্ধেও সিলেটবাসী দেশে-বিদেশে অত্যন্ত উজ্জ্বল অবদান রাখেন। (অসমাপ্ত)

 

শেয়ার করুন

ফেসবুকে সিলেটের ডাক

ইতিহাস ও ঐতিহ্য এর আরো সংবাদ
  • বালাগঞ্জের বাতিঘর বাংলাবাজার উচ্চ বিদ্যালয়
  • বঙ্গবন্ধু ও গান্ধীজী
  • সিলেটের দ্বিতীয় সংবাদপত্রের সম্পাদক ছিলেন ‘মেশিনম্যান’
  • একটি যুদ্ধ : একটি শতাব্দী
  • বালাগঞ্জের প্রাচীন জনপদ শিওরখাল গ্রাম
  • ভাটিপাড়া
  • সময়ের সোচ্চার স্বর সোমেন চন্দ
  • বঙ্গবন্ধুর সিলেট সফর ও কিছু কথা
  • বায়ান্নতেই লিখেছিলেন ‘ঢাকাই কারবালা’
  • জীবনের শেষক্ষণে অর্থ-স্বর্ণ সবই জড়পদার্থ
  • কমরেড বরুণ রায়
  • বঙ্গবন্ধু ও রাষ্ট্রভাষা আন্দোলন
  • নারী ভাষাসৈনিকদের কথা
  • মুক্তিযুদ্ধ ও বঙ্গবীর ওসমানী
  • ভাটির বাতিঘর সুনামগঞ্জ সরকারি কলেজ
  • মাওয়ের লংমার্চের ৪ বছর পর সিলেটিদের লং মার্চ
  • শহীদ মিনারের ইতিকথা
  • সিলেটের লোকসংগীত : ধামাইল
  • পর্যটক ইবনে বতুতার কথা
  • বই এল কোথা থেকে?
  • Developed by: Sparkle IT