ইতিহাস ও ঐতিহ্য

বদলে গেছে বিয়েশাদীর রীতি

এ এইচ এম ফিরোজ আলী প্রকাশিত হয়েছে: ০৪-১২-২০১৯ ইং ০০:৩৭:০৪ | সংবাদটি ২৩৪ বার পঠিত

আগেকার দিনে ঘটকের মাধ্যমে প্রথমে কনের বা মেয়ের বাড়িতে বিয়ের প্রস্তাব দেয়া হতো। কেউ ঘটকের ভূমিকা পালন করলে খুব বেশি খুশি হতেন, গর্ব করতেন, তিনি যে, একটি সংসার গড়ে দিয়েছেন। সে সময় কেউ কোন বিনিময় গ্রহণ করতেন না। আজকাল পেশাদার ঘটকরা অফিস খুলে পত্রিকায় বিজ্ঞাপন দিয়ে, কেউ কেউ ইন্টারনেটের মাধ্যমে পাত্র-পাত্রী সংগ্রহ করে থাকেন। বিয়ের অনুষ্ঠান শুরু হয় ‘কনে বা মেয়ে দেখা, অনুষ্ঠানের মাধ্যমে। শেষ হয় বউভাত বা ওয়ালিমা অনুষ্ঠানের মাধ্যমে। অতীতে বর কনে দেখা-সাক্ষাতের কোন সুযোগ ছিলনা। বরের ভাই-বোন, ভাবি, দাদা-দাদি, নানা-নানি সহ আত্মীয় স্বজনরা বউ দেখে পছন্দ হলে বিয়ে ঠিক করতেন। বর্তমান সময়ে অনেক বিয়ে বর-কনে ঠিক করে ফেলেন। বিয়ের আনুষ্ঠানিকতা শুরু হয় পানচিনি বা (ঊহমধমবসবহঃ) অনুষ্ঠানের মাধ্যমে। এ দিন সকলকে মিষ্টি মুখ করা ছিল বিয়ের একটি বড় রীতি। মেয়ে দেখার সময় বিবেচনা করা হতো বাড়ির পুকুর ঘাটে পর্দা আছে কিনা, মেয়ের দৈহিক সৌন্দর্য, কথাবার্তা, আচার-আচরণ আনুগত্য, কোরআন শিক্ষা, যৌথ পরিবারের কাজে পারদর্শি কিনা ইত্যাদি জানতেন বর পক্ষ। মেয়েকে কি কি প্রশ্ন করা হবে তা আগেই ঘটক জানিয়ে দিতেন। বিশেষ করে মেয়ে ভালো রান্না-বান্না জানে কিনা সে বিষয়ে জানা ছিল আবশ্যক । মেয়ে শিক্ষিত বা কোন চাকুরি করেন কিনা তা জানার প্রয়োজন ছিল না। সে সময় মেয়েরা ঘরের-বাইরে কিংবা শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে যাওয়া ছিল ধর্ম বিরোধী কাজ। তখনকার সময়ে একটি চমৎকার প্রবাদ বাক্যেরও প্রচলন ছিল। ‘জাতের মেয়ে কালোও ভালো, নদীর জল গোলাও ভাল,। তবে হিন্দু বা অন্য ধর্মের শিক্ষিত মেয়েদের কদর ছিল খুব বেশি।
ষাটের দশকের দিকে বরের পক্ষে, মেয়ের কাবিনে শুধু জমি দানের রীতি ছিল। এখন তা পরিবর্তন হয়ে নগদ টাকায় পরিণত হয়েছে। তবে শহরাঞ্চলে বাসাবাড়ির জায়গা অনেক মেয়ের কাবিনে দেয়া হয়ে থাকে। গায়ে হলুদ অনুষ্ঠানের সময় উভয়ের বাড়িতে মেয়েরা দলবেধে বিবাহের গীত বা গান গাইতেন। এখন গীতের মেয়ে খোঁজে পাওয়া যায় না।
পানচিনির দিন বর-কনের আত্মীয়-স্বজন মিলে বিবাহের দিন তারিখ ঠিক করতেন। যদি তারিখ ঠিক না হয় তবে বুঝা যেত মেয়ে পছন্দ হয়নি। বর যে দিন কনের বাড়িতে বরযাত্রী নিয়ে যান, সেই দিনকে সাধারণত বিবাহের দিন বলা হয়। এ নীতি এখনও বিদ্যমান। বিবাহে বর-কনে উভয়ের আত্মীয় স্বজন বন্ধু বান্ধব দাওয়াত দিতেন। নারী বরযাত্রী এক সময় নিষেধ ছিল। এখন অবশ্য দল বেঁধে মহিলারা বরের সাথে যাত্রা করেন। বিয়ের পর নারীকে পুরুষের ঘরে যেতে হয়। কিন্তু বর বিয়ের পর বউয়ের সাথে শ্বশুর বাড়িতে বসবাস করলে তাকে ঘর জামাই বলা হয়। এক সময় বরের নিকট কনের স্বর্ণালঙ্কার সহ চাওয়া-পাওয়া ছিল বেশি। বর্তমান সময়ে বর-কনের নিকট বিয়ের আগে পরে যৌতুক দাবি করে থাকেন। যৌতুকের কারণে বাংলাদেশে গরীব পরিবারে বিবাহ বিচ্ছেদ বেড়েছে খুব বেশি। ইউনিয়ন অফিস, থানা এবং আদালতে বিবাহ বিচ্ছেদ বা যৌতুকের মামলা আছে হাজারে হাজার।
বিয়ের দিন কনের বাড়িতে ছেলে-মেয়েরা লাল-সবুজ- হলুদ রঙ্গিন কাগজের পতাকা কেটে বাঁশ বা কলা গাছের গেইট সাজাতো। চিকন দড়ির গায়ে তিন কোনা করে কাগজ কেটে পুরো বাড়ি ঘিরে তারা জানান দিত এ বিয়ে বাড়িতে আনন্দযজ্ঞ চলছে। বরের বাড়িতেও কেউ কেউ গেইট দিয়ে থাকেন। বিয়ের দিন বর আসলে পঞ্চায়েতের অনুমতি ছাড়া গেইট পাস দেয়া হতো না। গেইট পাসের জন্য শিশুদের কিছু টাকাও দিতে হতো। বরের সাথে আনা মিষ্টি, পান-সুপারী গ্রামের ঘরে ঘরে পৌছে দেয়ার রীতি ছিল। বিয়েতে কনের পক্ষে শীতল পাটি ডেগ, বাসন, বালতি, কলস, শাড়ী, আংটি আসবাবপত্রসহ কাপড়-চোপড় উপহার দিতেন। এখন সোনা গয়না নগদ টাকা এবং মাঝে মধ্যে ইলেকট্রনিক দ্রব্যাদি উপহার দেয়া হয়। বেশির ভাগ বিয়েতে বর কনের বাড়িতে এক দিন এক রাত থাকতেন। এসব দৃশ্য এখন নেই। বর আসতেন পালকি চড়ে আর বধু যেতেন সোয়ারি চড়ে। বর কনের পালকি ও সোয়ারি আলাদা আলাদা ভাবে বহন করা হতো। ৮০ দশকের দিকে পাংসি নৌকা ও লঞ্চ যোগে বিয়ে শাদী হয়ে থাকতো। এখন আর গ্রামের বাড়ি ঘরে বিয়ে শাদী হয় না। সব বিয়ে হয় কমিউনিটি সেন্টারে। বরযাত্রার বাহন পালকি, সোয়ারি, নৌকা-লঞ্চ সময়ের আবর্তে বিলিন হয়ে গেছে। বর এখন যাত্রা করেন গাড়ির বহর নিয়ে। মাঝে মধ্যে কিছু হিন্দু পরিবারের বিবাহ হয়ে থাকে বাড়িতে। মুসলানদের বিয়েতে মেয়েদের ‘কবুল ছিল একটি কঠিন মুহূর্ত। মেয়ে একবার কবুল না বললে চার-পাঁচ বার কনেকে জিজ্ঞাসা করে নিজ কানে শুনে সবাই খুশি হতেন। এখন মেয়েরা একবারেই কবুল বলে। অবশ্য এতে বাধা ধরা কোন নিয়ম নেই। বিয়েতে খাওয়া-দাওয়া শেষে বিদায়কালিন সময়ে কনের পাশে বরকে বসিয়ে একে অপরের আত্মীয় স্বজনকে পরিচয় করিয়ে দেয়া, কার সাথে কি সম্পর্ক তা বুঝানো এবং সালাম দোয়া আদান প্রদান ছিল বিবাহের এক অপূর্ব নীতি। বিয়েতে সহজে বর দেখা গেলে কনে দেখা ছিল ভাগ্যের ব্যাপার। কনে রাখা হয় অন্দর মহলে। ১৮/২০ বছরের একটি মেয়ে মা-বাবার পরিবার ছেড়ে হঠাৎ অপরিচিত পরিবারে যাচ্ছে। সেখানে নিজেকে মানিয়ে নিতে পারবে কিনা সে চিন্তায় স্বজনরা থাকতেন অস্থির। কনে বিদায়ের সময় স্বজনদের গলায় ধরে হাউমাউ কিংবা চিৎকার দিয়ে কান্নাকাটি করে বাপের বাড়ি ছেড়ে যেতেন কনে। কিন্তু সময় এখন বদলে গেছে। কোন বিয়েতে কনের কান্না শুনা যায়না। মেয়েরা এখন শিক্ষিত স্মার্ট। হাঁসি মুখে বরের বাড়ি যায়। বলতে গেলে আগের বিয়ের অনুষ্ঠানাদি এখন কল্পনা কাহিনী। কমিউনিটি সেন্টারে গেলে বিয়েতে কে বরের পক্ষে আর কে কনের পক্ষে চেনার কোন উপায় নেই। বর পক্ষ আসার আগেই কনে পক্ষের লোকজন খাওয়া দাওয়া শেষ করেন। আগে বর পক্ষের সবাই খাওয়া দাওয়া শেষে কনে পক্ষের লোকজন খেতেন। বিয়েতে বর কনের সাথে ছবি তোলা যেন একটি ফ্যাশনে পরিণত হয়েছে। সব চেয়ে দুঃখজনক বিষয় হচ্ছে সেন্টারে বিয়ে হলে বর ও কনের অনেক গরীব লোকজন বিবাহ খেতে বা আনন্দ উপভোগ করতে পারেনা। কারণ তাদের শার্ট প্যান্ট স্যুাট কোর্ট পায়জামা পাঞ্জাবি শাড়ী, গয়না নেই। তাই তারা সেন্টারে যেতে পারে না।
বিবাহ বিচ্ছেদ এখন সামাজিক একটি ব্যাধি। কেউ ভালোবেসে কেউ পরিবারের সিদ্ধান্তে ঘর বাঁধেন সুখি সংসারের আশায়। বুক ভরা আশা আর রঙ্গিন স্বপ্ন নিয়ে সংসার বাঁধলেও এখন অধিকাংশ পরিবারে সুখ পাখি ধরা দেয়না। কখনো হাতের মেহেদীর রং মোছার আগেই ভেঙ্গে যায় চির জীবনের সুখি সংসার। পরকিয়া, যৌতুক, মাদক,পুরুষত্বহীনতা, নারীর ক্ষমতায়ন ও নারী স্বাবলম্বি হওয়া আকাশ সংস্কৃতি সংসার ভাঙ্গার উল্লেখযোগ্য কারণ। অতিলোভে পরিবারের বন্ধন ক্রমেই দুর্বল হচ্ছে। বাড়ছে বিবাহ বিচ্ছেদের ঘটনা। গত ১ দশকে বদলে গেছে বিয়ের তালাকের ধরণ। আগের ৭০ শতাংশ তালাকের ঘটনা ঘটত স্বামী কর্তৃক। সংসার সুখের হয় রমনীর গুণে-এ চিরসত্য প্রবাদ বাক্যটি সময়ের ব্যবধানে বদলে গেছে। নারীরা এখন তালাকের ঘটনায় পুরুষের চেয়ে ১০গুন এগিয়ে। বর্তমান সময়ে ৮০ শতাংশ তালাক স্ত্রী কর্তৃক হয়ে থাকে। অতীতে শতকরা ৯০ ভাগ বিবাহ ছিল স্বামী-স্ত্রীর মধ্যে এক কঠিন শিকল বাঁধা বন্ধন। এক সময় দেখা গেছে নারী দুঃখ কষ্ট যন্ত্রনা সহ্য করে এমনকি প্রতি নিয়ত স্বামীর হাতে মারপিট খেয়েও সংসারের হাল ধরেছেন। কেউ বংশের মান সম্মানের জন্য, কেউবা নিজের সন্তানের জন্য সীমাহীন কষ্ট শিকার করেছেন। এখন টুনকো কাচের দেয়ালে পরিণত হয়েছে স্বামী স্ত্রীর বন্ধন। পান থেকে চুন কসলেই স্বাবলম্বি শিক্ষিত নারী স্বামীকে তালাক দিতে চান। এটা সমাজের বড় ধরনের বিপদ সংকেত। কারণ নারী পুরুষ যেই হোক জীবনে একবারই বিবাহ হওয়া কাম্য। সম্প্রতিকালে বিবাহ বিচ্ছেদের পরিমাণ বেড়েছে দ্বিগুণ আর স্বামী স্ত্রী আলাদা হওয়ার প্রবণতা বেড়েছে তিন গুণ। অনেক সময় দেখা গেছে প্রেমজনিত বিয়ের সর্বোচ্চ বিচ্ছেদ ঘটছে। যে কারণে এসব পরিবারে থাকা নিস্পাপ শিশুরা মাতা পিতার ¯েœহ থেকে বঞ্চিত এমনকি এসব পরিবারের শিশুদের জীবনে নেমে আসে গভীর অন্ধকার। সন্তানের দাবি নিয়ে আইন-আদালতে অনেক মামলা হওয়ার নজির আছে আমাদের এই দেশে।
এক সময় পরিবার ছিল শান্তি ও ভালোবাসার সুতোয় গাঁথা। এগুলো এখন সবই রূপকথা। যৌথ পরিবার ভেঙ্গে যাওয়ায় ¯েœহ মায়া মমতা নীতি নৈতিকতা শ্রদ্ধা ভালোবাসা যেন উড়ে গেছে পরিবার থেকে। পারিবারিক অশান্তি, কলহ, বিবাদ প্রতিনিয়ত যেন বাড়ছে। মানুষের মধ্যে অতি লোভের আসায় সংসারে অশান্তি বিরাজ করছে। একান্নবর্তী পরিবারের মধ্যে এখন নারী পরিবারের সংখ্যা বাড়ছে। ২০১৬ সালে ঢাকায় নারী প্রধান পরিবারের সংখ্যা ছিল ২০১৩ সালে ১১.৬, ২০১৪ সালে ১২.২, ২০১৫ সালে ১২.৭ এবং ২০১৬ সালে ছিল ১২.৮ শতাংশ। গত ১০ বছর আগে ছিল মাত্র ১০ শতাংশ। নারী প্রধান পরিবারের মধ্যে ৮৪ শতাংশ হয়, বিধবা নয়তো স্বামীর সাথে বিচ্ছেদের কারণে।
পরিবারে শান্তি ফিরিয়ে আনতে হলে মাতা-পিতাকে ধৈর্য্য ধরে দায়িত্বশীল ভূমিকা পালন করতে হবে। যতই দুঃখ কষ্ট আসুক, সন্তানদের বুঝানো যাবে না। একমাত্র ত্যাগই পারে পরিবারে মনুষ্যত্বের উৎকর্ষ বিকাশ ঘটাতে। পরিশেষে বিদ্রোহী কবি’র অমর বাণী দিয়ে শেষ করছি, ‘বিশ্বে যা কিছু চির কল্যাণ কর, অর্ধেক করিয়াছে নারী, অর্ধেক তার নর’। বাংলাদেশের সকল পরিবার আনন্দময় ও সুখি হয়ে উঠুক এটাই প্রত্যাশা।

 

শেয়ার করুন
ইতিহাস ও ঐতিহ্য এর আরো সংবাদ
  • একাত্তরের শরণার্থীর স্মৃতি
  • আরব বিশ্বের অনন্য শাসক
  • জননেতা আব্দুস সামাদ আজাদ
  • বালাগঞ্জের আজিজপুর উচ্চবিদ্যালয়
  • হারিয়ে যাচ্ছে ডাকপিয়ন ও ডাকবাক্স
  • সুনামগঞ্জের লোকসংস্কৃতি
  • সিলেটে বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার আন্দোলন ও শাবি
  • মরমী কবি শেখ ভানু
  • মুক্তিযুদ্ধে কানাইঘাট
  • বিপ্লবী এম.এন.রায়
  • শতাব্দীর বন্দরে জামেয়া রেঙ্গা
  • রেফারেণ্ডাম ও সিলেটে বঙ্গবন্ধু
  • বিজয়োল্লাসের মধ্যে বিষাদের ভয়াল স্মৃতি
  • জগন্নাথপুর উপজেলা সমিতি
  • ঢাকার আকাশে প্রথম নারী
  • বঙ্গভঙ্গের সূচনার ইতিহাস
  • স্বতন্ত্র আবাসভূমির আন্দোলন
  • সুনামগঞ্জের সাচনা: ইতিহাসের আলোকে
  • বদলে গেছে বিয়েশাদীর রীতি
  • স্বতন্ত্র আবাসভূমির আন্দোলন
  • Developed by: Sparkle IT