ইতিহাস ও ঐতিহ্য

সুনামগঞ্জের সাচনা: ইতিহাসের আলোকে

পরিতোষ ঘোষ চৌধুরী প্রকাশিত হয়েছে: ০৪-১২-২০১৯ ইং ০০:৩৭:৩৫ | সংবাদটি ৭২৮ বার পঠিত

সুনামগঞ্জ জেলার সাচনাবাজার ভাটি অঞ্চলের একটি ঐতিহ্যবাহী বাজার। এটি একটি নদীবন্দরও বটে। এক সময় বাংলাদেশের মানচিত্রে ‘সাচনা’ নামটি ছিল। অবাক হলেও সত্য যে ১৯৮৫ সালে জামালগঞ্জ উপজেলা হবার পর থেকে বাংলাদেশের মানচিত্রে সাচনার জায়গায় জামালগঞ্জ লেখা হয়। ১৯৪০ সালে থানা গঠিত হবার পরও ব্যবসা-বাণিজ্য রাজনৈতিক কর্মকান্ড সংস্কৃতি খেলাধূলা ও সামাজিকতার প্রধান কেন্দ্রবিন্দু ছিল সাচনাবাজার।
প্রায় দুইশত বছরের পুরানো বাজারটি সুরমা নদীর পূর্ব তীরে পিয়াইন নদীর মোহনায় অবস্থিত। পশ্চিম তীরে জামালগঞ্জ উপজেলা। দক্ষিণে মফিজনগর উত্তরে পলক ও কামলাবাজ গ্রাম। কামলাবাজের উত্তরে সাচনাগ্রাম। কথিত আছে যে বাজার হবার আগে এখানে বড় বড় গাছ ছিল, গাছের নীচে বৈকালিক আড্ডা হতো। ব্যবসায়ীরা বড়বড় নৌকা করে হাওর পাড়ের গ্রামে বাণিজ্য করে এখানে এসে বিশ্রাম নিতেন।
সাচনার জমিদারগণ পলক মৌজা ও কামলাবাজ মৌজার জমি ক্রয় করে নয় একর ভূমির উপর বাজারটি প্রতিষ্ঠা করেন। যদিও বাজারের মালিকানা নিয়ে চরণারচর জমিদার ও রামপুরের ভটবাড়ির সাথে বিরোধ দেখা দিলে কলকাতা হাইকোর্ট সাচনা জমিদারদের পক্ষেই রায় দেন। যেহেতু সাচনা জমিদারদের বাজারটি ছিল সেহেতু লোকে প্রথমে সাচনার বাজার বলে চিনত। পরে আস্তে আস্তে বাজারটির নাম হয় সাচনাবাজার। তবে কাগজপত্রে বাজারটির নাম কালিগঞ্জ বাজার ছিল। অনেকে বলে এ এলাকায় অনেক সজনা ফলত। আর সজনা থেকেই সাচনা নামের উৎপত্তি। স্বাধীনতার পর বাজারটির নাম কেহ কেহ সিরাজনগর রাখলেও সেটার কোন সরকারি স্বীকৃতি ছিল না। ১৯৭৫ সালে বাজারটির মালিকানা চলে যায় সরকারের হাতে।
ব্রিটিশ আমলে স্টিমার আসতো সাচনাবাজারে ঢাকা, ভৈরব, ছাতক, আজমিরিগঞ্জ, তাহিরপুর, সুনামগঞ্জ সহ বিভিন্ন স্থানে নৌপথে যাতায়াত করা যেত। ব্রিটিশ আমলে ডাকঘর স্থাপিত হয়। যা আজো সাচনা ডাকঘর নামে পরিচিত। ইহাই জামালগঞ্জ উপজেলার প্রধান ডাকঘর। পাকিস্তান আমলে সরকারি টেলিফোন লাইন ছিল সাচনা ডাকঘরটির সাথে। থানার একমাত্র হাসপাতালটি ছিল সাচনা বাজারে। হাসপাতালের কাছেই ছিল দৃষ্টিনন্দন রেস্ট হাউস। যা সুরমা নদী থেকে দেখা যেত। ছিল ব্যাংক। স্বাধীনতার পর যা সোনালী ব্যাংক সাচনাবাজার শাখা নামে এখন জামালগঞ্জে আছে। তাছাড়া কৃষি ব্যাংক, সাবরেজিস্ট্রারী অফিস, সাচনা তহশিল অফিস, সাচনা খাদ্য গোদাম বর্তমানে জামালগঞ্জে আছে।
ভৈরব মোকাম থেকে কার্গোযোগে সাচনাবাজারে পণ্য আসার কারণে বাজারে পণ্যের দাম তুলনামূলক সস্তা। তাহিরপুর, বিশ্বম্ভরপুর, বাদাঘাট, আনোয়ারপুর, টেকেরঘাট সহ ভাটি অঞ্চলের অনেক ছোট ছোট বাজারের পণ্য সাচনাবাজার থেকে আমদানী করা হত। বর্ষায় বানিয়াচং থেকে নৌকা বোঝাই করে সবজি আসত। বেলাপুর থেকে আসত বড় বড় নৌকায় কাঁঠাল। বর্ষায় বাঁশ ও নৌকার বাজারে প্রচুর বিকিকিনি হত। হেমন্তে বসত গরুর বাজারসহ দেশীয় কৃষি কাজের যন্ত্রপাতি ও সবজি। শীতকালে কমলায় বাজার সয়লাব হয়ে যেত। বাজারে মাছ এবং দুধ প্রচুর পরিমাণে পাওয়া যেত। হাঁটের দিন সোমবারে এতই লোক সমাগম হতো যে, বাজারের একপ্রান্ত থেকে অন্য প্রান্তে যেতে হিমসিম খেতে হতো।
এখন আর সেদিন নেই। কালক্রমে বাজারটি ঐতিহ্য হারাতে বসেছে। বাজারে কেনাবেচা অনেক কমে গেছে। হাটের দিনেও নেই কোন ক্রেতা। বাজারের দক্ষিণদিকে একটি লঞ্চ কোম্পানী সহ বহু দোকানঘর নদী গর্ভে বিলীন হয়ে গেছে। উত্তর দিকে মাছ বাজারের অর্ধেকসহ করম আলী চেয়ারম্যানের বসতভিটা নদী গর্ভে বিলীন হয়ে গেছে। খেলার মাটটিও অর্ধেক নদীতে। ফলে এখন আর জমজমাট খেলার আসরও বসে না। নেই কোন সাংস্কৃতিক কর্মকান্ড।

 

শেয়ার করুন
ইতিহাস ও ঐতিহ্য এর আরো সংবাদ
  • একাত্তরের শরণার্থীর স্মৃতি
  • আরব বিশ্বের অনন্য শাসক
  • জননেতা আব্দুস সামাদ আজাদ
  • বালাগঞ্জের আজিজপুর উচ্চবিদ্যালয়
  • হারিয়ে যাচ্ছে ডাকপিয়ন ও ডাকবাক্স
  • সুনামগঞ্জের লোকসংস্কৃতি
  • সিলেটে বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার আন্দোলন ও শাবি
  • মরমী কবি শেখ ভানু
  • মুক্তিযুদ্ধে কানাইঘাট
  • বিপ্লবী এম.এন.রায়
  • শতাব্দীর বন্দরে জামেয়া রেঙ্গা
  • রেফারেণ্ডাম ও সিলেটে বঙ্গবন্ধু
  • বিজয়োল্লাসের মধ্যে বিষাদের ভয়াল স্মৃতি
  • জগন্নাথপুর উপজেলা সমিতি
  • ঢাকার আকাশে প্রথম নারী
  • বঙ্গভঙ্গের সূচনার ইতিহাস
  • স্বতন্ত্র আবাসভূমির আন্দোলন
  • সুনামগঞ্জের সাচনা: ইতিহাসের আলোকে
  • বদলে গেছে বিয়েশাদীর রীতি
  • স্বতন্ত্র আবাসভূমির আন্দোলন
  • Developed by: Sparkle IT