উপ সম্পাদকীয়

শ্রমজীবী মানুষদের নিয়ে কিছু কথা

সোহেল আহমদ প্রকাশিত হয়েছে: ০৪-১২-২০১৯ ইং ০০:৩৮:৪৮ | সংবাদটি ৪৭৬ বার পঠিত
Image

‘এমন দেশটি কোথাও খুঁজে পাবে নাকো তুমি, সকল দেশের রানী সে-যে আমার জন্ম ভূমি।’ গানের এ কলির বন্দনা সত্যি আমাকে মুগ্ধ করে। এ দেশে জন্ম নিয়ে নিজে গর্ববোধ করি। সুজলা-সুফলা, শস্য-শ্যামলা এমন দেশ আর কোথাও নেই। এদেশের সোনা ঝরা ফসলের মাঠ,পত্র-পল্লবে সুশোভিত নৈসর্গিক সৌন্দর্য সত্যিই মুগ্ধ হওয়ার মতো। বাঙ্গালি জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান ৯ মাসের রক্তক্ষয়ী এক যুদ্ধের নেতৃত্বের মাধ্যমে এদেশটি এনে দিয়েছিলেন আমাদের। আমরা পেয়েছি স্বাধীন এক ভূখন্ড। দেশ স্বাধীন হওয়ার আজ ৪৮ বছর। আমাদের প্রাপ্তির খাতা দীর্ঘ হলেও আশাব্যঞ্জক নয়। এ দেশটিকে অনন্য এক উচ্চতায় নিয়ে যাওয়া ‘আকাশ কুসুম’ কল্পনা ছিল না। মাটির উর্বরতাশক্তি আমাদের বাড়তি পাওয়া। সাথে আছে আঠারো কোটি মানুষের ছত্রিশ কোটি হাত। সে হিসেবে আমাদের আরো বহুদূর এগিয়ে যাবার কথা। কিন্তু দুর্নীতি ও সঠিক নেতৃত্বের অভাবে আমাদের পিছনে টেনেছে বার বার। বর্তমানে দেশের চেহারা চাকচিক্যময় বৈকি। ব্যক্তি ও সমাজের দৃশ্যমান অগ্রগতি হয়েছে ঠিক,তবে মানবিকতার অগ্রগতি মোটেও ঘটেনি। মানুষের সামাজিক বন্ধনের অবনতি ঘটেছে। এমন অবনতির কারণ, রাজনৈতিক পার্থক্য। গণতান্ত্রিক দেশে নানান মতের মানুষ থাকা স্বাভাবিক হলেও এদেশের প্রধান দু’টি রাজনৈতিক শক্তি এমন ঐতিহ্য বজায় রাখতে অক্ষম। যারাই ক্ষমতায় এসেছেন, বিরোধীদের পিঠের চামড়া তুলতে তৎপর ছিলেন সর্বক্ষণ। এদেশ গড়তে সকল শ্রেণি পেশার মানুষের অবদান অনস্বীকার্য। তবে সকল শ্রেণির লোকজন নানাভাবে তাদের অবদানের স্বীকৃতি পেলেও শ্রমজীবী শ্রেণির লোকজন বরাবরই ছিলেন অবহেলিত। দেশকে ফল-ফসলে ভরে দিয়েছেন যারা, তারা আমাদের শ্রমজীবী মানুষজন। তাদের ত্যাগের কথা আমাদের ভুলে যাওয়া মানে নিজ অস্তিত্বকে ভুলে যাওয়ারই নামান্তর। কিন্তু সত্যি কথা, চিরায়ত নিয়ম অনুযায়ী দেশের অবহেলিত শ্রমজীবী মানুষের কথা ও তাদের সুখের ঠিকানা বাস্তবায়নে যথাযথ কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণে সরকার বা ধনিক কোন শ্রেণিই আন্তরিকতার পরিচয় দেননি। নানা দিবসে সভা-সমাবেশে আর বিবৃতিতে কিছু কথা শুনতে পেলেও ভাগ্য পরিবর্তনের জন্য কোন স্বীকৃতি লক্ষ করা যায়নি।
এদেশে ৪০ লাখেরও বেশি গার্মেন্ট শ্রমিকের জীবন মানের নিরাপত্তার প্রশ্নে আমরা পিছিয়ে, কিন্তু পোশাক আমাদের প্রধান রপ্তানী পণ্য। রাজা-মহাজনরা ওইসব শ্রমিকের দ্বারাই মুনাফা লাভ করছেন, কিন্তু তাদের নূন্যতম সুবিধাটুকু দিতে যতো অনীহা। অথচ, মহা মানবের জীবনীতে শ্রমিক-মালিক একই কাতারে থাকার নজির। ধনির দুলালী কোন এক কিশোরী ধর্ষণের ঘটনায় আমরা হা-হুতাশ করলেও প্রতিদিন হত-দরিদ্র কত কিশোরীর নির্মম পরিহাসে আমাদের চোখে নোনাজল আসেনি। এমন মানসিকতাই হলো আমাদের এগিয়ে যাবার প্রধান অন্তরায়। স্বাধীনতার আটচল্লিশ বছর হয়ে গেলেও ধনী-গরিবের বৈষম্য দূর হয়নি আজও। সম্পত্তি অর্জনে যেমন ধনীরা আঙ্গুল ফুলে কলা গাছ হচ্ছেন, তেমনি গরিবদের নি¤œগামী জীবন স্থায়ী করতেও তাদের তৎপরতা থেমে নেই। তা নাহলে দেশে জনপ্রতি আয় ১ হাজার ৯শ মার্কিন ডলার হলেও ৯৫% ভাগ সম্পদ রয়েগেছে ৫% লোকের কাছে। দেশের রাষ্ট্রায়ত্ব কোন প্রতিষ্ঠানের অর্থ মানে দেশের জনগণেরই অর্থ। এই অর্থ লোপাটের কত কান্ড যে দেশে বারো মাস ঘটে তার সুবিচার কি হয়? বিচারের বাণী নিভৃতে কাঁদে। আইনের আশ্রয় নেয়া গরিব লোকটির জন্য যা করা হয়, তার স্বাক্ষী আদালতের সাদা দেয়ালগুলো শুনতে পেলেও যাদের শুনার কথা তাদের কান স্পর্শ করেনি। গরীব লোকটি টাকা কোথা হতে দেবে? এমন অবস্থায় সমাজে শোষণ বাড়লেও সুবিচার বাড়েনি। প্রজাতন্ত্রের আমলা, কর্মচারীদের এমন চলনে সমাজও আজ অর্থ ছাড়া কথা বলা বন্ধ করে দিয়েছে। অর্থের গন্ধ আজ মানুষকে মেশকে আম্বরের চেয়েও বেশি বিমোহিত করে। সমাজটা তাই আজ আম্বর ওয়ালাদের হাতে বন্দি। শিক্ষিত যোগ্য লোকটি আজ অকেজো।
দেশের কৃষক শ্রেণির কথা বলছিলাম, যারা আমাদের খাদ্যের যোগান দেন তাদের সুবিধা, নিরাপত্তার বিষয়টি আমাদের আগে ভাবতে হবে। নিরাপত্তার বিষয়টি যখন আসে, তখন রাষ্ট্রের সকল নাগরিকের নিরাপত্তার প্রশ্নটিও চলে আসে। কিন্তু যেখানে বহু নাগরিক আজ নিরাপত্তাহীনতায় ভোগছেন, সেখানে গ্রামের খেটে খাওয়া নিরীহ কৃষকের নিরাপত্তার কথা আর কে-ইবা ভাবে! যে মানুষটির হাড়ভাঙ্গা শ্রমে অনুপোযোগী জমি শস্য দানায় ভরিয়ে দেন; সেই ব্যক্তিটির সুরক্ষা রাষ্ট্র কি অস্বীকার করতে পারে? শ্রমজীবী মানুষের জীবনাচরণ নি¤œগামী হবে, এটা আমাদের যেন এক অহংকার। যে মাঠে কাজ করবে, আর খোরমা পোলাও খাবে সে বড়াই আমাদের সয় না! একটি দেশ তখনই সত্যিকার অর্থে উন্নতির দাবি করতে পারে, যখন দেশের সকল শ্রেণি-পেশার লোকজন যার যার অবস্থানে সুন্দরভাবে বেঁচে থাকতে পারে। কিন্তু আমাদের দেশের প্রান্তিক কৃষকদের দুঃখ-দুর্দশা দেখলে হতাশ হতে হয়। সকাল থেকে সন্ধ্যা পর্যন্ত খেত-খামারে কাজ করলেও তাদের ভাগ্যে জুটেনা সময় মত খাবার, থাকে না বিশুদ্ধ পানীয়জলের সুবিধা। স্বাস্থ্যকর বিষয় সম্পর্কেও তাদের অবগত হওয়ার সুযোগ থাকে না। বাপ-দাদাদের আমলের বিষয়গুলোতেই তারা অভ্যস্ত আছেন। যার দরুন আমাদের আর্থ-সামাজিক উন্নতি ঘটছে না। প্রত্যাশিত গড় আয়ু বৃদ্ধি পাচ্ছে না। স্বাস্থ্য বিষয়ক অজানা বিষয়ের পরিণতি আমাদের মাতৃ ও শিশু মৃত্যু প্রত্যাশিত হ্রাস পাচ্ছে না। সচেতন না হওয়ায় ধীরে ধীরে বাসা বাঁধেছে অজানা কোন রোগ;যা জীবন প্রদীপ কুরে কুরে নিভিয়ে দেয়ার কাজে ব্যস্ত। অপরিচ্ছন্ন পরিবেশে বসবাস, সুষম খাবারের অপ্রতুলতা, মাঠে বসেই অপরিষ্কার হাত দিয়ে খাবার গ্রহণ, বিশুদ্ধ পানীয়জল পান ইত্যাদি সবই তারা না জানার কারণেই করেন। সারা দিনের কাদা মাখা শরীরটি সাবান দিয়ে পরিস্কার করনের বিষয়টিও তাদের জানা থাকে না। এমন সব না জানা আর অক্ষমতা এবং বেঁচে থাকার নানা অনুসঙ্গের অপর্যাপ্ততা কোনটিই আমরা এড়িয়ে যেতে পারি না।
আমরা যদি দেশের প্রকৃত উন্নতি চাই, তাহলে প্রথমেই এসব খেটে খাওয়া মানুষের উন্নতির কথা চিন্তা করতে হবে। গ্রামীন এসব প্রান্তিক শ্রেণির ঘরেই লালিত হচ্ছে দেশের আগামীর সম্ভাবনার কর্ণধার। গ্রামীণ অবকাঠামো ও যোগাযোগের যে বৈপ্লবিক উন্নতি হয়েছে তা অস্বীকারের সুযোগ নেই; কিন্তু সে অনুযায়ী গ্রামীণ মানুষের স্বাস্থ্য সুরক্ষার বিষয়টির তেমন অগ্রগতি নেই। শুধুমাত্র গ্রামে কমিউনিটি ক্লিনিক থাকলেই যে গ্রামের মানুষের স্বাস্থ্য শতভাগ নিশ্চিত হবে তা ভাবার সুযোগ নেই। গ্রামে রয়েছে একেতো জনসংখ্যার চাপ,তার উপর রয়েছে নানা সীমাবদ্ধতা। মানুষ হিসেবে সুস্থভাবে বেঁচে থাকার অধিকার ধনী-গরিব সকলের বেলায় সমভাবে প্রয়োজ্য। কথা হচ্ছে, ধনীরা সচেতন, তারা সচেতনতার নানা অনুসঙ্গের সাথে যুক্ত হওয়ার সুযোগ পান,যা গরিব খেটে খাওয়া মানুষজন পান না। এ জন্য প্রয়োজন এসব দরিদ্র মানুষের জীবনমান উন্নতি। তাদের জন্য এসব বিষয়ের সরকারি-বেসরকারি আলাদা কর্মসূচির প্রবর্তন জরুরী। এদেশে নানা এনজিও, সরকারী-বেসরকারী সংস্থা স্বাস্থ্য সুরক্ষা, সেনিটেশন, পানীয়জল ইত্যাদি বিষয়ে কাজ করছেন, তাদের কাজে লাগিয়ে কৃষক-শ্রমিকদের সুস্থ্য রাখতে যেসব অভ্যাসাদী ও উপায়-উপকরণ শেখানোর প্রয়োজন তা শেখাতে হবে। বর্তমান সময়ে সন্তানদের পড়ালেখার বিষয়ে মা-বাবারা পূর্বের চেয়ে অনেক বেশি সচেতন। তারা শিশু সন্তানকে পারতপক্ষে শিক্ষা থেকে বঞ্চিত করতে চান না। হোন না তিনি অর্থ-বিত্তহীন বা অশিক্ষিত। মানুষের ধারণার এমন পরিবর্তনে সরকারসহ শিক্ষা নিয়ে কাজ করা প্রত্যেকেরই প্রাপ্য। সমাজে বর্তমানে এমন এক টেনডেনসি যে, আর যাই হোক ছেলে-মেয়েকে স্কুলে পাঠাতেই হবে। এর ব্যতিক্রম করা যাবে না। এমন ধারণা যা এক কালে কল্পনাও করা যেত না। আমরা দিনে দিনে বেশকিছু বিষয়ে সাফল্য অর্জনে স্বক্ষম হলেও আলোচিত শ্রমজীবী মানুষের স্বাস্থ সুরক্ষার বিষয়ে গভীরভাবে চিন্তা না থাকায় বাস্তবায়ন সম্ভব হয়নি। মনে রাখতে হবে, দেশের সকল শ্রেণি পেশার লোকজনকে সুস্থ-সুন্দর বেঁচে থাকার অনুসঙ্গ থেকে দূরে রাখলে প্রত্যাশিত উদ্দেশ্য সাধনে অন্তরায় হয়ে দেখা দেবে। শিক্ষার্থীরা স্কুলে অর্জিত স্বাস্থ্য বিষয়ক নানা জ্ঞান বাড়িতে এসে বাস্তবায়নে বাধার সম্মুখীন হয়। মা-বাবার না জানা ও অদক্ষতার জন্য তারা সমর্থন পায় না। তাদের গুরুজন মা-বাবারা দীর্ঘ দিনের অভ্যস্থ্যতা, অজ্ঞতা, কুসংস্কার থেকে বের হতে পারছেন না। তাই তাদের এমন চিন্তা চেতনার পরিবর্তন করাতে স্বল্প দেয়াদী প্রশিক্ষণের মাধ্যমে দেশের সকল শ্রেণির লোকজনকে একসাথে এগিয়ে নিয়ে যেতে হবে। দেশের আগামীর কর্ণধার শিক্ষার্থীদের সুনাগরিক হিসেবে গড়ে তুলতে স্কুল-কলেজ শিক্ষকদের ট্রেনিংয়ের আদলে জাতীর ভবিষ্যত প্রজন্মের কথা চিন্তা করে ভিন্ন আঙ্গিকে স্বল্প পরিসরে অল্প ব্যয়ে তাদের মা-বাবা ও অভিভাবকদের জরুরী এসব বিষয় প্রশিক্ষণ দিতে হবে। যদি তা করতে পারি তাহলে স্বপ্নের সোনার বাংলা গড়তে বেশি দিন সময় লাগবে না।
লেখক : কলামিস্ট।

শেয়ার করুন

ফেসবুকে সিলেটের ডাক

উপ সম্পাদকীয় এর আরো সংবাদ
  • নিরাপদ খাদ্য নিশ্চিতকরণে সচেতন হতে হবে
  • কোভিড-১৯ মানব ইতিহাসে বড় চ্যালেঞ্জ
  • একটি খেরোখাতার বয়ান
  • পরিবেশ রক্ষা ও জীববৈচিত্র্য সংরক্ষণ
  • পর্নোগ্রাফির বিষবাষ্প থেকে মুক্তি মিলবে কবে?
  • জীববৈচিত্র এবং মনুষ্য সমাজ
  • করোনার ছোবলে জীবন-জীবিকা
  • মানুষ কেন নিমর্ম হয়
  • করোনায় আক্রান্ত শিক্ষা ব্যবস্থা
  • প্রসঙ্গ : ব্যাংকিং খাতে সুদহার এবং খেলাপি ঋণ
  • করোনা, ঈদ এবং ইসলামে মানবতাবোধ
  • ত্যাগের মহিমায় চিরভাস্বর ঈদুল আযহা
  • করোনাকালে শিক্ষার্থীদের প্রত্যাশা
  • আনন্দযজ্ঞে আমন্ত্রণ
  • ত্যাগের মহিমায় কুরবানির ঈদ
  • চাই পথের দিশা
  • ভাটি অঞ্চলের দুর্দশা লাঘব হবে কি?
  • মুক্ত পানির মাছ সুরক্ষায় যা প্রয়োজন
  • উন্নত দেশে মসজিদে গৃহহীনদের আশ্রয়
  • তাইওয়ান সংকট
  • Image

    Developed by:Sparkle IT