উপ সম্পাদকীয়

মানবিক মূল্যবোধ ও বাংলাদেশ

রঞ্জিত কুমার দে প্রকাশিত হয়েছে: ০৫-১২-২০১৯ ইং ০০:৫৪:১৬ | সংবাদটি ১৫১ বার পঠিত

১৯৭১ সালে একটি স্বাধীন রাষ্ট্র হিসেবে বাংলাদেশের অভ্যুদয় আন্তর্জাতিক ক্ষেত্রে একটি উল্লেখযোগ্য ঘটনা। জাতীয় সার্বভৌমত্ব ও সমতার প্রতি শ্রদ্ধা, অপর রাষ্ট্রের আভ্যন্তরীণ বিষয়ে হস্তক্ষেপ না করা, আন্তর্জাতিক বিরোধের শান্তিপূর্ণ সমাধান এবং আন্তর্জাতিক আইন ও জাতিসংঘের সনদে বর্ণিত নীতি সমূহের প্রতি শ্রদ্ধা, এ সকল নীতিই হবে রাষ্ট্রের আন্তর্জাতিক সম্পর্কের ভিত্তি। এ সকল নীতির ভিত্তিতে পৃথিবীতে আজ আধুনিক বিশ্বের সভ্যতার জয়জয়কার। বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী একটি মানবিক বার্তা বহন করেই আন্তর্জাতিক সম্মেলনগুলোতে অংশ গ্রহণ করে আসছেন। ন্যাম সম্মেলনেও এর ব্যতিক্রম করেননি। জলবায়ু পরিবর্তনের বিরূপ প্রভাব প্রসঙ্গে মাননীয় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বলেন, বৈশ্বিক উন্নয়নের ক্ষেত্রে বাংলাদেশের দায় খুবই নগণ্য হওয়া সত্ত্বেও বাংলাদেশের জলবায়ু পরিবর্তনের মারাত্মক প্রভাবে প্রবলভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। তিনি বলেন, জলবায়ু পরিবর্তনের ক্ষতি মোকাবেলায় আন্তর্জাতিক সম্প্রদায় বিশেষ করে উন্নত দেশগুলোকে অবশ্যই জাতিসংঘের জলবায়ু পরিবর্তন বিষয়ক ফ্রেমওয়ার্ক কনভেনশনের প্রতি পূর্ণ সম্মান জানাতে হবে।
সম্প্রতি ন্যাম সম্মেলনে সাইডলাইনে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা, মালয়েশিয়ার রাষ্ট্রপ্রধান মাহাথির মোহাম্মদ, ইরানের প্রেসিডেন্ট হাসান রাহানির সঙ্গে বৈঠক করেন। এছাড়া ভিয়েতনামের রাষ্ট্রপতি ও নেপালের রাষ্ট্রপতির সঙ্গেও দ্বি-পাক্ষিক বৈঠক করেন। ভিন্ন ভিন্ন বৈঠকগুলোতে তিনি রোহিঙ্গা ইস্যুটিকে প্রাধান্য দিয়ে আলোচনা করেন। মানবিক কারণে মিয়ানমারের নাগরিকদের আশ্রয় দিয়ে তাদের খাওয়া-পরার ব্যবস্থা করেছেন। মিয়ানমারের রাখাইন রাজ্যে মিয়ানমার সরকার রোহিঙ্গাদের ওপর বর্বরোচিত হামলা করলে তারা প্রাণ বাঁচাতে কক্সবাজারের টেকনাফ দিয়ে বাংলাদেশে প্রবেশ করে। আমাদের প্রধানমন্ত্রী উদার ও নৈতিক দৃষ্টিকোণ থেকে শরণার্থী হিসেবে প্রায় ১১ লাখেরও বেশী রোহিঙ্গাকে আশ্রয় দেন। এছাড়া মুক্তিযুদ্ধকালীন সময়ে ভারত বাংলাদেশের প্রায় ১ কোটি শরণার্থীকে আশ্রয় দিয়েছিল এবং খাওয়া-পরার ব্যবস্থা করেছিল। সে যন্ত্রণাদায়ক অভিজ্ঞতা থেকে তিনি উদার হস্ত প্রসার করেন রোহিঙ্গাদের আশ্রয়দানের মাধ্যমে। কিন্তু আশ্রয়দানের ফলে বাংলাদেশ যে চরম সঙ্কটে নিপতিত হয়, তা অনেকটাই অভাবনীয়। আজকের বাস্তবতায় রোহিঙ্গাদের যদি মিয়ানমারে শান্তিপূর্ণভাবে পাঠানো না যায়, তবে সুদূরপ্রসারী একটি নেতিবাচক রাজনৈতিক প্রভাবে সারা বিশ্বই যে ক্ষতিগ্রস্ত হবে, সেটা নিশ্চিত বলা যায়। এ বোধ থেকেই প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসনে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের সাহায্য কামনা করে আসছেন বিভিন্ন ফোরামের বৈঠকে। তিনি সদ্য সমাপ্ত জাতিসংঘ অধিবেশনেও এ বিষয়ে জোরালো বক্তব্য রেখেছেন, যা সারাবিশ্বের নেতৃবৃন্দও গ্রহণ করেছেন।
রোহিঙ্গাদের আশ্রয় দান করার কারণে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা সব মহলে প্রশংসিত হয়েছেন এবং মাদার অব হিউম্যানিটি উপাধিতে ভূষিত হয়েছেন। মিয়ানমার প্রায় ৭০ বছরের অধিক সময় টানা সামরিকতন্ত্র দ্বারা পরিচালিত হয়ে আসছিল। এমনকি উং সান সুচির নেতৃত্বে গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠা পেলেও কার্যত রাষ্ট্র পরিচালনায় সামরিকতন্ত্রেরই আধিপত্য। গণতন্ত্রের মোড়কে সামরিক আইনই বলবৎ রয়েছে মিয়ানমারে। দীর্ঘকাল বিশ্ব বিচ্ছিন্ন একটি রাষ্ট্র ছিল মিয়ানমার। তবে বর্তমান বিশ্ব থেকে বিচ্ছিন্ন না থাকলেও তাদের সুনির্দিষ্ট কোন পররাষ্ট্রনীতি আছে বলে মনে হয় না। যদি থাকত তবে বাংলাদেশে আশ্রিত রোহিঙ্গাদের সসম্মানে নিজ দেশে ফিরিয়ে নিয়ে নাগরিক মর্যাদা দিয়ে একটি শান্তিপূর্ণ রাষ্ট্রীয় সমাজ গড়ে তুলতে সবার সহযোগিতা চাইত। বলার অপেক্ষা রাখেনা যে, বাংলাদেশের মহান নেতা স্বাধীনতার স্থপতি জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান ছিলেন অসামান্য এক সৃজন প্রতিভাসম্পন্ন রাজনৈতিক ব্যক্তিত্ব। যিনি তাঁর আপন সত্ত্বায় বাংলাদেশের সংস্কৃতি, দর্শন ও বাঙালি জাতীয়তাবোধের বৈশিষ্ট্যকে সামগ্রিকভাবে মূর্ত করে তুলতে সক্ষম হয়েছিলেন বিশ্ব দরবারে। তিনি সদ্য স্বাধীন বাংলাদেশের জন্য একটি সুনির্দিষ্ট পররাষ্ট্রনীতিতে প্রতিভার স্বাক্ষর রেখে ছিলেন। সেই ধারাবাহিকতায় বঙ্গবন্ধু কন্যা জনগণ কর্তৃক রাষ্ট্র ক্ষমতাপ্রাপ্ত হবার পর থেকেই বাংলাদেশকে অনন্য এক উচ্চতায় নিয়ে যেতে সক্ষম হন। কী ধরণের রাজনৈতিক ব্যবস্থায় একটি জনকল্যাণমুখী সমাজ প্রতিষ্ঠা করা যায়, আমাদের পররাষ্ট্রনীতিতে সেটি স্থান পেয়েছে। সম্পূর্ণ একটি জনকল্যাণমুখী রাষ্ট্র গড়ে তুলতে হলে সাধারণ মানুষের মধ্যে তিনটি মূল্যবোধ জাগাতে কাজ করতে হবে। এ তিনটি মূল্যবোধ হচ্ছে প্রচুর কাজ, দক্ষ কাজ ও সম্মিলিত কাজ।
আধুনিক বিশ্ব সভ্যতায় কোনো রাষ্ট্রই এককভাবে এগিয়ে যেতে পারেনা। বাংলাদেশের পররাষ্ট্রনীতির মূলনীতি হচ্ছে ‘সকলের সাথে বন্ধুত্ব কারো সাথে শত্রুতা নয়’ এই শ্লোগানকে সামনে রেখে বর্তমান পরিবর্তিত বিশ্ব প্রেক্ষাপটে পররাষ্ট্রনীতি অনুসরণ করে বাংলাদেশ প্রতিনিয়ত তার লক্ষ অর্জনের পথে এগিয়ে যাবে, এটাই জাতির প্রত্যাশা।
লেখক : অবঃ শিক্ষক।

শেয়ার করুন
উপ সম্পাদকীয় এর আরো সংবাদ
  • নতুন সূর্যের প্রত্যাশায়
  • ভেজাল ও নকল ওষুধের দৌরাত্ম্য
  • বকুল ফুলের মালা
  • লিবিয়ায় তুরস্কের সেনা মোতায়েনের কারণ
  • প্রসঙ্গ ফসলের ন্যায্যমূল্য
  • প্রসঙ্গ : ভিক্ষাবৃত্তি
  • নৈতিক অবক্ষয় প্রতিকার
  • অসহায় প্রবীণদের দেখাশোনার দায়িত্ব কে নেবে?
  • আজকের শিক্ষা ও ভবিষ্যৎ প্রজন্ম
  • একাডেমিক শিক্ষা বনাম সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম
  • শেষ পর্যন্ত রোহিঙ্গা শরণার্থীদের কী হবে?
  • বাংলাদেশের শীতকাল
  • মাটির উৎকর্ষ ও সংরক্ষণ সাধন সরকার
  • নারী নিপীড়ন প্রসঙ্গ
  • আপন শ্রম ও মেধা ভাগ্য নির্মাণের নিয়ামক
  • ফেসবুক ও আমাদের সন্তান
  • পুলিশ জনগণের বন্ধু
  • প্রাথমিক শিক্ষার এক দশক : পরিপ্রেক্ষিত
  • শুদ্ধি অভিযানের শুদ্ধতা
  • বিপন্ন নদনদী ও খালবিল
  • Developed by: Sparkle IT