শিশু মেলা

বাংলাদেশের চন্দ্রাভিযান

জসীম আল ফাহিম প্রকাশিত হয়েছে: ০৫-১২-২০১৯ ইং ০১:০২:১৭ | সংবাদটি ২৪৮ বার পঠিত
Image

বাংলাদেশ মহাকাশ গবেষণা কেন্দ্রের বিজ্ঞানীদের প্রথম চন্দ্রাভিযান। কদিন থেকে প্রিন্ট মিডিয়া এবং ইলেকট্রনিক মিডিয়াতে খবরটা ফলাও করে প্রচার হচ্ছিল। ইতিমধ্যে পৃথিবীর অনেক দেশই চন্দ্রপৃষ্ঠে অবতরণ করে সাফল্যের খাতায় নাম লিখিয়েছে। চাঁদের ভূমিতে তারা নিজ নিজ দেশের জাতীয় পতাকা উড়িয়ে দিয়ে এসেছে। এবার পালা বাংলাদেশের।
বাংলাদেশী বিজ্ঞানীরা যদি চন্দ্রাভিযানে সফল হতে পারেন, তবে এটা হবে বিরাট সম্মানের ব্যাপার। শুধু সম্মানের ব্যাপারই নয়। বাংলাদেশের জাতীয় পতাকাও চাঁদের আকাশে পতপত করে উড়বে। বাংলাদেশ মহাকাশ গবেষণা কেন্দ্রের বিজ্ঞানীদের তৈরি মনুষ্যবিহীন রকেটযান ‘বীরশ্রেষ্ঠ-৭’ ইতিমধ্যে ছয়-ছয়বার চাঁদের ভূমিতে সফল অবতরণ করেছে। ‘বীরশ্রেষ্ঠ-৭’ এ চড়ে এখন পর্যন্ত স¦-শরীরে কোনো মানুষ যায়নি। মানুষ না-গেলে কী হবে? বাংলাদেশে তৈরি মানবসদৃশ অত্যাধুনিক রোবট ‘মতিউর-৬’ ঠিকই গেছে। বীরশ্রেষ্ঠ মতিউরের নামে নাম রোবটটিকে রকেটযান চালানোর উপযোগী করেই তৈরি করা হয়েছে। ‘বীরশ্রেষ্ঠ-৭’ এ চড়ে ‘মতিউর-৬’ ছয়-ছয়বার চাঁদের মাটিতে পা রেখেছে। তারপর ওটা অক্ষত অবস্থায় ফিরে আসতেও সক্ষম হয়েছে। তাই বলা যায় রোবট ‘মতিউর-৬’ চন্দ্রাভিযানে পুরোপুরি সফল একটা রোবট।
এবারই প্রথম ‘বীরশ্রেষ্ঠ-৭’ এ চড়ে কোনো মানুষ চন্দ্রাভিযানে যাবেন। বিষয়টা নিয়ে বাংলাদেশ মহাকাশ গবেষণা কেন্দ্রের বিজ্ঞানীদের মধ্যে বিরাট কৌতূহল। কারণ তাদের বহুদিনের চেষ্টা ও সাধনা খুব শীঘ্রই সফল হতে চলেছে। বাংলাদেশের বিজ্ঞানীরা মনে করেনÑরোবট ‘মতিউর-৬’ যখন ছয়-ছয়বার চন্দ্রাভিযানে সফল হয়েছে, তাহলে চন্দ্রপৃষ্ঠে মানুষ গমনে আর কোনো সমস্যা থাকার কথা নয়। তাছাড়া রোবট ‘মতিউর-৬’ চাঁদের আবহাওয়া, ভূ-প্রকৃতি এবং পরিবেশ সম্পর্কে যেসব তথ্য নিয়ে এসেছে, তা গবেষণা করে দেখা গেছে চন্দ্রপৃষ্ঠ মনুষ্য বসবাসের জন্য অনেকটাই অনুকূল। তাই ঠিক হলো সপ্তমবারের মিশনে মানুষই চন্দ্রাভিযানে যাবে।
বিষয়টা নিয়ে জগদ্বিখ্যাত বিজ্ঞানী এবং বাংলাদেশ মহাকাশ গবেষণা কেন্দ্রের মাননীয় চেয়ারম্যান প্রফেসর ড. ইকবাল সাহেবের উৎসাহ-উদ্দীপনা একটু বেশিই বলা যায়। কারণ তাঁর নেতৃত্বেই রোবটচালিত রকেটযান ‘বীরশ্রেষ্ঠ-৭’ ছয়-ছয়বার সফল চন্দ্রাভিযানে সক্ষম হয়েছে। প্রবীণ বিজ্ঞানী ড. ইকবাল একদিন সহবিজ্ঞানীদের নিয়ে জরুরি সভায় বসলেন। সভায় প্রথমে তিনি সকলের উদ্দেশে ছোটো করে একটা ভাষণ দিলেনÑ
‘আমার প্রিয় বিজ্ঞানীগণ। আপনাদের সকলের সম্মিলিত প্রচেষ্টাতেই বাংলাদেশ মহাকাশ গবেষণা কেন্দ্রের পক্ষে ছয়-ছয়বার রোবটচালিত রকেটযানের মাধ্যমে চন্দ্রাভিযান সম্ভব হয়েছে। তাই আমি সংস্থার পক্ষ থেকে আপনাদের অশেষ ধন্যবাদ জানাচ্ছি। সে সঙ্গে আমি এও জানাচ্ছি যে, সপ্তমবারের মিশনে আমরা আর কোনো রোবট পাঠাব না। আমরা এবার সরাসরি মানুষই পাঠাব। এই প্রথম কোনো মানুষ বাংলাদেশের পক্ষ থেকে চাঁদের মাটিতে পা রাখবে। চাঁদের মাটিতে বীরদর্পে হেঁটে বেড়াবে। বিষয়টা ভেবে আমার মনটা খুবই পুলকিত হয়ে ওঠেছে। আমার বিশ্বাস আপনাদেরও হয়তো এমনি হচ্ছে। আমরা ছয়-ছয়বার যখন সফল হয়েছি, এবারও সফল হবো আশা রাখি।’
মহান বিজ্ঞানী ড. ইকবালের ভাষণ শুনে হলরুম ভর্তি সহবিজ্ঞানীদের মধ্যে বিপুল কলরোল শোনা গেল। সকলেই খুব উচ্ছ্বাস প্রকাশ করলেন। কাউকে আবার গর্ব করে স্লোগানের সুরে বলতে শোনা গেলÑজয় বাংলা। জয় বাংলাদেশ।
ড. ইকবাল বেল চেপে সকলকে শান্ত হতে বললেন। সহবিজ্ঞানীরা চুপ হলে তিনি জানতে চাইলেন, ‘এবারের চন্দ্রাভিযানে কে কে যেতে ইচ্ছুক? একবার হাত ওঠান।’
দেখা গেল দেড়শোজন বিজ্ঞানীর মধ্যে প্রায় একশোজনই হাত তুলেছেন। এত লোকের হাত ওঠানো দেখে ড. ইকবাল বুঝতে পারলেন, সকলেই কমবেশি চন্দ্রাভিযানে যেতে ইচ্ছুক। কিন্তু এমন সুযোগ তো সকলকে দেয়া সম্ভব নয়। সুযোগটা বড়োজোর দুজনকে দেয়া যেতে পারে। তাহলে উপায়? তিনি এখন কাকে রাখবেন। আর কাকে বাদ দিবেন। বিষয়টা নিয়ে তিনি বিরাট ভাবনায় পড়ে গেলেন। অনেকক্ষণ ভাবাভাবির পর তিনি হঠাৎ সরব হয়ে ওঠলেনÑ
‘প্রিয় বিজ্ঞানীগণ। আমি জানি আপনারা প্রত্যেকেই আমাদের দেশটাকে খুব ভালোবাসেন। দেশের জন্য সকলেই প্রাণপাত করতে পর্যন্ত প্রস্তুত আছেন। আপনারা সকলেই রকেটযান বীরশ্রেষ্ঠ-৭ এর ধারণক্ষমতা সম্পর্কে অবগত। তাই আপনাদের মধ্য থেকে কেবলমাত্র দু’জন লোক এ সুযোগ পেতে পারেন। বাকিদের আমরা নিতে পারছি না বলে আন্তরিকভাবে দুঃখ প্রকাশ করছি। এখন কথা হলো কে হবেন সেই দু’জন ভাগ্যবান? চিন্তার কোনো কারণ নেই। তার জন্য আমরা একটা খেলার আয়োজন করেছি। খেলাটির সাথে আপনারা সকলেই কমবেশি পরিচিত। এটা একটা চমৎকার ভিডিও গেম। এর নামÑআর্থ টু মুন। এ খেলার মাধ্যমে আপনারা সকলেই চন্দ্রাভিযানের স্বাদ উপভোগ করবেন। আমরা আপনাদের প্রত্যেককেই নির্দিষ্ট একটি পিসির সামনে বসিয়ে দেবো। পিসিতেই আপনারা মিশনটা সম্পন্ন করবেন। তবে কথা হলো, যে সবচেয়ে কম সময়ে আর্থ টু মুন খেলার মাধ্যমে চন্দ্রপৃষ্ঠে অবতরণ করতে পারবেন, আমরা কেবল তাকেই চন্দ্রাভিযানের যোগ্য বলে মনোনীত করব।’
তার কিছুসময় পরই সকলের জন্য পিসি সাজানো হয়ে গেল। প্রতিটি পিসির সামনে একজন করে বিজ্ঞানীকে বসিয়ে দেয়া হলো। সবকটি পিসিকে আবার একটি মাস্টার পিসির সাথে সংযুক্ত করা হলো। এই মাস্টার পিসির সামনে বসলেন বিজ্ঞানী ড. ইকবাল এবং বিজ্ঞ বিচারকম-লী। ড. ইকবাল মাস্টার পিসির মাধ্যমে একটি বিশেষ সংকেত দিলেন। অমনি ‘আর্থ টু মুন’ খেলা শুরু হয়ে গেল।
গেম শুরু হওয়ার মোটামুটি আধা ঘণ্টার মধ্যেই ফলাফল হাতে চলে এল। চন্দ্রাভিযানের জন্য দুজন বিজ্ঞানীকে পাওয়া গেল। নির্বাচিত বিজ্ঞানী দুজনই অত্যন্ত মেধাবী ও চৌকস। খেলা শেষ হওয়ার কয়েক মিনিটের মধ্যেই সকলে মনোনীত দুজনের নাম জেনে গেল। তারা হলেনÑড. মঈন ও ড. নাসিমা খান।
পরে সকলেই মনোনীত দুজনকে শুভেচ্ছা জানাতে ছুটে এলেন। কেউ আবার তাদের সাথে কোলাকুলি করতেও ভুললেন না। শুভেচ্ছা জ্ঞাপন পর্ব শেষ হলে মনোনীত বিজ্ঞানী দু’জন নিজেদের অনুভূতি জানাতে মঞ্চে ওঠে এলেন। প্রথমে ড. মঈন কথা বলা শুরু করলেন।
‘সম্মানিত সহবিজ্ঞানীগণ। সকলেই আমাদের সালাম ও শুভেচ্ছা গ্রহণ করুন। আমরা যাতে চন্দ্রাভিযানে গিয়ে সফলভাবে ফিরে আসতে পারি, দেশ ও জাতির মুখ উজ্জ্বল করতে পারি; তার জন্য আপনাদের সহযোগিতা ও ভালোবাসা কামনা করি। আমাদের জন্য আপনারা আশীর্বাদ করুন। আপনাদের সকলের জন্য আমাদের অফুরন্ত শুভেচ্ছা ও ভালোবাসা রইল।’
এটুকু বলে তিনি নিজের আসনে গিয়ে বসলেন।
তার কথামালা শুনে উপস্থিত বিজ্ঞানীদের সকলেই তুমূল করতালি দিয়ে তাকে অভিনন্দিত করলেন। হলরুম যখন কিছুটা শান্ত হলোÑতখন ড. নাসিমা খান মঞ্চে ওঠে এলেন। তাঁকে বাংলাদেশের নারী জাতির প্রতিনিধি করা হয়েছে। তিনি তাঁর অনুভূতি প্রকাশ শুরু করলেন।
‘আমার প্রাণপ্রিয় বিজ্ঞানী ভাইবোনেরা। সকলে আমার সালাম গ্রহণ করুন। এ মুহূর্তে আমি খুবই গর্বিত ও রোমাঞ্চিত। কারণ বাংলাদেশ মহাকাশ গবেষণা কেন্দ্রের পক্ষ থেকে চন্দ্রাভিযানের জন্য আমি মনোনীত হয়েছি। আপনারা আমাদের জন্য প্রাণভরে দোয়া করুন। আমরা যেন দায়িত্বটা যথাযথ পালন করে বাংলাদেশ তথা আপনাদের সম্মান রক্ষা করতে পারি। সকলের জন্য আমাদের অফুরন্ত শুভকামনা।’
অনুভূতি জানাতে গিয়ে ড. নাসিমা খান আবেগে একেবারে কেঁদে ফেললেন। তিনি যখন নিজ আসনে গিয়ে বসলেন, তখনো তার চোখের কোণে পানি চিকচিক করছিল। তিনি পার্স খুলে এক টুকরো টিস্যু নিলেন। তারপর চোখের পানি মুছলেন।
সেদিনের সেই সভার পর আরও কিছুদিন গত হলো। এরই মধ্যে ডিসেম্বর মাস চলে এল। ড. ইকবাল ও সহবিজ্ঞানীগণ ঠিক করলেনÑএ মাসেই বাংলাদেশ চন্দ্র জয়ের গৌরব অর্জন করবে। সেইমতো রকেটযান ‘বীরশ্রেষ্ঠ-৭’ কে যথাযথভাবে প্রস্তুত করা হলো। দিন-তারিখ ঠিক করে বাংলাদেশ মহাকাশ গবেষণা কেন্দ্রের স্পেসস্টেশন থেকে মনোনীত বিজ্ঞানী দু’জন রকেটযান নিয়ে মহাকাশে উড়াল দিলেন।
এদিকে রকেটযান ‘বীরশ্রেষ্ঠ-৭’ এর সাথে বিশেষ কনট্রোল রুম থেকে সার্বক্ষণিক যোগাযোগের ব্যবস্থা করা হলো। কনট্রোল রুমের বিশাল প্রজেক্টরে তাদের মিশনটা সরাসরি প্রদর্শনের ব্যবস্থা করা হলো। উৎসুক বিজ্ঞানীগণ প্রজেক্টরের দিকে অবাক চোখে তাকিয়ে আছেন। ড. মঈন ও ড. নাসিমা খানকে নিয়ে ‘বীরশ্রেষ্ঠ-৭’ চাঁদের পানে অবিরাম ছুটে চলেছে। দিন নেই রাত নেই রকেটযান চলছে তো চলছেই। উড়তে উড়তে ওটা যখন চাঁদের একেবারে আকাশসীমায় গিয়ে পৌঁছল, তখন সমগ্র জাতিকে দেখানোর জন্য সেই দৃশ্যের ধারাবিবরণী ইলেকট্রনিক মিডিয়াগুলোতে সরাসরি সম্প্রচারের ব্যবস্থা করা হলো। সারা দেশের মানুষ টেলিভিশন সেটের সামনে বসে শেষ মুহূর্তে কী ঘটে দেখার জন্য অপেক্ষা করতে লাগল।
এদিকে রাত পোহালেই ১৬ ডিসেম্বর। বাংলাদেশের বিজয় দিবস। ১৯৭১ সালে বর্বর পাকিস্তানি শাসকগোষ্ঠীকে চিরতরে হটিয়ে বাংলাদেশের চূড়ান্ত বিজয় অর্জনের দিন। এমনি দিনে বাংলাদেশের মানুষ আরও একটি বিজয় দেখতে অপেক্ষার প্রহর গুনতে লাগল। অবশেষে সকল প্রতীক্ষার অবসান ঘটিয়ে ভোর ৪:০ টায় খবর পাওয়া গেলÑ‘রকেটযান বীরশ্রেষ্ঠ-৭ এর চন্দ্রপৃষ্ঠে অবতরণ সফল হয়েছে।’

শেয়ার করুন

Developed by:Sparkle IT