উপ সম্পাদকীয়

চিকিৎসা সেবা বনাম ব্যবসা

নওরোজ জাহান মারুফ প্রকাশিত হয়েছে: ০৬-১২-২০১৯ ইং ০০:২৮:০৯ | সংবাদটি ৩৯৬ বার পঠিত
Image

আগের দিনে বলা হত ডাক্তারী পেশা মহৎ পেশা। সেবামূলক পেশা। সেবামূলক এ পেশাটি অতি সম্মানেরও। কিন্তু বর্তমান জমানায় এসে দেখা য়ায় এটি কোন সেবামূলক পেশা নয়! এ পেশায় রোগীর নয়, টাকার সেবায় নিয়োজিত থাকেন অনেক ডাক্তার। তাই এখন ডাক্তারী পেশাকে অনেকেই বলেন ডাক্তারী ব্যবসা! শুনলে খারাপ লাগে, লাগারই কথা; কারণ সত্যকথা সব সময় তেতো হয় এবং গায়ে জ্বালাও ধরায়।
বর্তমান এমন এক যুগে আমরা বসবাস করছি। এ যুগটি শুধু ডিজিটাল কায়দা-কানুনে চলে। আগের দিনে দেখতাম ডাক্তারগণ ষ্ট্রেথো চাপিয়ে সারা শরীরের রোগ নির্ণয়ের চেষ্টা করতেন এবং হাতের আন্দাজে অভিজ্ঞতার আলোকে রোগ সনাক্ত করতেন। রোগীর চোখ, মুখ হা করে জ্বিহবা দেখতেন, হাতের পাল্স মাপতেন। রোগীর বুকে, পাজরে, পিঠে ষ্ট্রেথো চাপিয়ে রোগের লক্ষণ বুঝে নিতেন। ডাক্তাররা রোগীর কথাবার্তা ফলো করতেন, নানান কথা জিজ্ঞাসা করে রোগের উপসর্গ বোঝে রোগ নির্ণয় করতেন। কিন্তু বর্তমান আধুনিক এবং ডিজিটাল জমানায় রোগ ধরেন রোগীর হাজার হাজার টাকা খরচা করিয়ে প্যাথোলজি টেষ্ট করে। প্যাথলজি রিপোর্টের উপরই তাদের ভরসা বেশী। এখন কারণে অকারণে স্তরে স্তরে রক্ত পরীক্ষা করেন। মল, মুত্র, থুথু, লালা, কাশ, ঘাম, সবই টেষ্ট করেন তারপরও রোগের লক্ষণ খুঁজে পান না। আগের দিনে হাতেগোনা কয়েকজন ডাক্তার ছিলেন। শুধু মেডিসিনের ডাক্তারদেরই দেখতাম সর্বরোগের চিকিৎসা করতেন। তাদের চিকিৎসায় সফলতার হারও ছিল অনেক বেশী। প্রেসক্রিপশন বাবৎ তারা টাকা নিতেন ২০০-৩০০। তার বেশী নয়। এখন শরীরের বিভিন্ন পার্টসের আলাদা আলাদা ডাক্তার। মেডিসিনের ডাক্তার ছাড়াও এখন আছেন বিশেষজ্ঞ হার্টের ডাক্তার, কিডনির ডাক্তার, হাড়জোড়া, হাড়ভাঙ্গা ডাক্তার, বক্ষব্যাধি ডাক্তার, নাক কান গলার ডাক্তার, হরমোন বিশেষজ্ঞ ডাক্তার, গাইনীর ডাক্তার, মানসিক রোগ বিশেষজ্ঞ, ফুসফুসের ডাক্তার, চোখের ডাক্তার। আরো ডাক্তার আছেন শ’য়ে শ’য়ে। তারা বিভিন্ন পাড়ায় চিকিৎসা করেন প্রাইভেট চেম্বারে। বিকেল বেলায় ষ্ট্রেডিয়াম এলাকায় গেলে মানুষের ভীড় দেখে মনে হবে এখানে জমজমাট মেলা বসেছে। শহরের আনাচে কানাচে সব জায়গায়ই ডাক্তারদের চেম্বার আছে। ঐ যে শ’য়ে শ’য়ে ডাক্তার শ’য়ে শ’য়ে চেম্বার কিন্তু মানের দিক দিয়ে সব এক। বিশেষজ্ঞ ডাক্তার বা বিশেষ মানের ডাক্তারের অভাব আজো রয়ে গেছে বিদেশী অধ্যুষিত সিলেটে।
বর্তমানে ডাক্তার যেমন বেড়েছে, রোগীরও সংখ্যা গুনে শেষ করা যাবে না। ঘরে ঘরে রোগীর সংখ্যা দিনে দিনে বাড়ছেই। শিশু, কিশোর, বৃদ্ধ সব বয়সের রোগীর সংখ্যা এখন বেড়েছে। সিলেটে আরো বেড়েছে ডাক্তারের দালালের সংখ্যাও। দালালেরা ডাক্তার পাড়ায় নিজেকে ডাক্তারের পরিচিত এবং কাছের লোক পরিচয় দিয়ে ভাল ডাক্তার দেখানোর নাম করে অখ্যাত-অদক্ষ ডাক্তারদের কাছে নিয়ে যায় রোগীদের, বিনিময়ে তারা ঐ ডাক্তারের কাছ থেকে মালপানি কামায়। বেশীরভাগ রোগীই গ্রামগঞ্জের। তারা কোন ডাক্তার ভাল বা বিশেষজ্ঞ, কিছুই বুঝেন না। কৌশলে এদের ধরে দালাল চক্র। তাছাড়া গরীব রোগীর সংখ্যাই বেশী হওয়াতে তারা কম টাকায় ডাক্তার দেখানোর নামে দালালের খপ্পরে পড়েন। তখন টাকাও যায় চিকিৎসাও বিফলে যায়। প্যাথলজি ক্লিনিকও কিন্তু এখন দোকানের মত শতশত। প্যাথলজি ক্লিনিক চালায় ডাক্তারদের গৎ বাধা কিছু টেষ্ট করে বিনিময়ে কমিশন দিয়ে। বর্তমানে অনেক প্যাথলজি ক্লিনিক নামে-বেনামে। বড় সাইনর্বোডের ব্যানারে বড় পরিসরে প্যাথলজিক্যাল ক্লিনিক দেখে আপনি অনুপ্রাণিত হবেন। সুন্দর এবং বড় হলেও কিন্তু গুনাগুনের জন্য কোনোটি তেমন যথেষ্ট নয়। সঠিক গুণাগুণের অভাব কখনো মেয়াদ উত্তীর্ণ মেডিসিন দিয়ে (ক্যামিকেল) পরীক্ষা করা হয়। এমনও শুনা গেছে প্যাথলজিষ্টের পাতায় সাইনকরা কাগজে টেকনিশিয়ানরাই ইচ্ছেমত ফলাফল লিখে রোগীর সাথে প্রতারণা করে। এমন অনিয়ম দেখলে যে কারো মাথা ঠিক থাকে কি করে?
বড় কথা হল ডাক্তারদের লোভনীয় পরিমাণে কমিশন নির্ধারণ করে প্যাথলজি ক্লিনিকের মালিকেরা। আগে কিছু ডাক্তার এর নির্ধারিত কমিশন ভিত্তিক প্যাথলজি ছিল। তারা রোগীর প্রেসক্রিপশনে পিন মেরে স্লিপ দিতেন নির্ধারিত কিছু প্যাথলজির নাম দিয়ে। সেখান থেকে টেষ্ট না করালে ডাক্তাররা রোগীর সাথে খারাপ আচরণ করেন এবং অখুশী হন। বর্তমানে তারা আরো বেশী বাণিজ্যিক হয়েছেন। সব ক্লিনিকেই তারা সিষ্টেম করে রেখেছেন যাতে কমিশন পাওয়া যায়। ডাক্তাররা রোগীর কাছ থেকে বড় অংকের ফিস নেন। আবার রোগীর প্যাথলজি টেষ্টের পর ক্লিনিক থেকে ৪০% কমিশন নেয়। এটা ডাক্তারদের রেট করা এমাউন্ট। একটু খোঁজ নিয়ে দেখবেন কি রকম জমজমাট ডাক্তারী ব্যবসা সিলেটে !
বাংলাদেশে দিনে দিনে চিকিৎসা সেবার মান কমছে। এত প্রাইভেট ক্লিনিক, হাসপাতাল থাকার পরও মানুষ সঠিক চিকিৎসা পায় না। ডাক্তার যেমন ক্লিনিকের মালিকও তেমন। তারা চায় রাতারাতি পয়সা বানাতে, বড় লোক হতে! ডাক্তাররা চেম্বারে ৫০-৬০ জন রোগী দেখনে। তাদের রাত ১টা, ২টা বাজে চেম্বার শেষ করে বাড়ি ফিরতে। এটা তারা করেন রোগীর স্বার্থে নয়, টাকার স্বার্থে। বেশি রোগী দেখার কারণে ডাক্তারদের মেজাজ ঠিক থাকে না। তাই রোগীর সাথে অসদাচারণ করেন। রোগীর কথা না শুনে চিকিৎসা দিবেন কি করে? রোগীর কথা না শুনে ফর্দ ধরিয়ে দিয়ে টেষ্ট করাতে বলেন। পকেটে টাকা থাকুক বা না থাকুক তাদের কিছু যায় আসে না। এটা তাদের কমিশন বাণিজ্য। পত্রিকায় দেখা যায় ভুল চিকিৎসার কারণে প্রায়ই রোগীর মৃত্যু হয়। ঢাকা থেকে এসে সিলেটে অনেক ডাক্তার চেম্বারে রোগীর চিকিৎসা করেন। বৃহস্পতিবার বিকেলের ফ্লাইটে এসে সন্ধা থেকে রোগী দেখা শুরু করেন। চলে মধ্যরাত পর্যন্ত। পরের দিন শুক্রবার সকাল-বিকাল রোগী দেখেন। কেউ শনিবার সকালের শিফটেও ঝড়ের গতিতে রোগী দেখে বিকেলের ফ্লাইটে ঢাকায় ফিরে যান। অনেকে রোগী অপারেশন করে ফেলে চলে যান। রোগীকে লোকাল ডাক্তারদের দেখাশুনার দায়িত্ব দিলে তারা সে দায়িত্ব ঠিকমত পালন করেন না। রোগীর অবস্থা সিরিয়াস হলে বিশেষজ্ঞ কাউকে মিলেনা। ঢাকায় ডাক্তারদের ফোনে কোন সময় মিলে কোন সময় মিলে না। এ-সময় রোগী মরলে মরুক বাঁচলে বাঁচুক তাদের কি? আসলে ডাক্তার মানবিক হন না। মানবিক হলে এভাবে দায়সারা গোছের চিকিৎসা চালাতেন না।
ক্লিনিকের ব্যবসার সাথে যারা জড়িত (বেশির ভাগ ডাক্তারাই ক্লিনিকের মালিক) তারা আরো নির্দয়। তারা রোগী ক্লিনিকে ভর্তি করে নানা ধরনের হিসাব দেখিয়ে মস্তবড় বিল করেন যাবার সময়। রোগী বিল দেখে মাথায় বাজ পাড়ার মত অবস্থা হয়। গাইনী ডাক্তারের অবস্থা আরো পীড়াদায়ক! গাইনী ডাক্তার কোন রূপ উপসর্গ ছাড়াই গর্ভবতী মায়ের সিজার করেন। সিজারিয়ান হলে ডাক্তারের/ ক্লিনিকের লাভ বেশী হয়। তাই শতকরা ৮০-৯০ ভাগ গর্ভবতী মায়ের সিজারের ডিসিশান দেন। সিজার না করালে গর্ভের সন্তান বা প্রসূতি মায়ের সংকটাপন্ন অবস্থার সৃষ্টি হবে বললে, ভয় পেয়ে রোগীর আত্মীয়-স্বজন সিজারের পারমিশন দেন। মূলত সিজারের কোন প্রয়োজনই নেই। তারা বিনা কারণে গর্ভবতী মায়ের সিজার করেন। প্রতিদিন প্রাইভেট ক্লিনিকে সিজারিয়ান বেবির জন্ম হয়। ডাক্তাররা টাকার জন্য বিবেকহীন হয়ে ভাল মানুষের পেটে ছুরি চালান। অনেক সিজারিয়ান রোগীর নানা জটিলতা নিয়ে বাড়ি ফিরেন। কখনও অবস্থার পরিবর্তন না হলে ফের ক্লিনিকে এসে ভর্তি হন। কোন রোগী সময় মত ক্লিনিকে আসতে না পারলে অবস্থা শোচণীয় হয়ে ওঠে। অনেক সময় রোগী মারাও যায়। আমাদের দেশে এখনো মাতৃমৃত্যুর হার অনেক বেশী। বিদেশে মাতৃমৃত্যুর হার শূন্যের কোঠায়।
সরকার যতদিন ডাক্তারদের প্রাইভেট চিকিৎসা বন্ধ না করবে ততদিন হাসপাতাল গুলোতে ভাল চিকিৎসা মিলবে না। প্রাইভেট চেম্বার, ক্লিনিকে ডাক্তারদের অবহেলা এবং বেশী রোগী দেখার প্রবণতায় পড়ে তারা ভাল মান-সস্মত চিকিৎসা দিতে পারেন না। যদিও ডাক্তাররা বড় অংকের ফিস নেন রোগীর কাছ থেকে। বাংলাদেশের সব জায়গায় একই অবস্থা বিরাজমান, যার কারণে টাকাওয়ালারা চিকিৎসা নিতে হরদম বিদেশে যাতায়াত করেন। বাংলাদেশ ঔষধ কোম্পানিগুলো বাজার ধরার জন্য বিক্রয় প্রতিনিধিদের বিভিন্ন ডাক্তারের চেম্বারে পাঠান। তারা ডাক্তারদের নানা ভাবে সুবিধা দিয়ে নিজ কোম্পানির ঔষধ চালানোর একটি প্রবণতা অনেক দিন থেকে চলছে। ডাক্তাররা ঔষধের মান এবং কোয়ালিটি যাই হোক না কেন দেদারসে রোগীকে ঐ কোম্পানি ঔষধ প্রেসক্রাইব করেন। বিনিময়ে নানা উপঢৌকন তারা ঘরে তুলেন। ফ্রিজ, টেলিভিশন, এসি ছাড়াও ঘরের নিত্য প্রয়োজনীয় কোন জিনিস বাদ যায় না যেটা তারা ফার্মাসিটিক্যাল কোম্পানী থেকে পান না।
অনেক সময় দেখা গেছে প্যাথলজি রির্পোটও ভুল হয়। তাই সচেতন নাগরিকেরা অন্য প্যাথলজির আশ্রয় নিয়ে পুনরায় টেষ্ট করান। ফল স্বরূপ টাকার শ্রাদ্ধ হয়, সময়ের অপচয় হয় আর রোগীর অবস্থা হয় জীবন মরণ। এ অবস্থা থেকে উত্তরণের পথ বের করতে হবে। প্রথমত সরকারের মূখ্য ভূমিকাই দেখতে চায় জনগণ। ৩০০-৪০০ টাকার মধ্যে ডাক্তারের ফিস ধার্য করতে হবে। নেহায়েত প্রয়োজন না পড়লে প্যাথলজির দ্বারস্থ না হন সেটির তদারকী করতে হবে। টিম গঠন জরুরী বর্তমান প্রেক্ষাপটে। ডাক্তারদের হাসপাতালে চাকুরী করা অবস্থায় প্রাইভেট চিকিৎসা চালাতে পারবেন না। এর ব্যত্যয় ঘটলে শাস্তির ব্যবস্থা নিতে হবে। ২০ জনের বেশী রোগী দেখা নিষেধ করতে হবে। ডাক্তারদের পর্যবেক্ষণে রাখতে হবে তারা রোগীর সাথে ভাল আচরণ করছেন কি না। ক্লিনিকগুলির সঠিক ছাড়পত্র আছে কি না যাচাই বাচাই করতে হবে। দেখতে হবে মানসম্পন্ন ক্যামিকেল দিয়ে প্যাথলজির টেষ্ট হচ্ছে কি না ইত্যাদি বিষয়ে সরকারের তদন্তকারী টিম যদি ভ্রাম্যমান আদালতের মত জরুরী ভিজিট করেন, তাহলে সব অনিয়ম দূর হবে। নতুবা ভুক্তভোগী রোগীর সংখ্যা বাড়বেই।
লেখক : কলামিস্ট

শেয়ার করুন

ফেসবুকে সিলেটের ডাক

উপ সম্পাদকীয় এর আরো সংবাদ
  • আমাদের রাজনীতির কবি ও জাতীয় কবি
  • বেকারত্ব বর্তমান সময়ে হুমকি
  • বঙ্গবন্ধুর সাংবাদিকতা
  • সমকালীন কথকতা
  • চামড়া শিল্প কি ধ্বংস হয়ে যাবে!
  • ‘সিসা বিষে’ আক্রান্ত শিশু
  • ‘সিসা বিষে’ আক্রান্ত শিশু
  • সম্ভাবনাময় যুব সমাজ : অবক্ষয় এবং উত্তরণের উপায়
  • নিরাপদ খাদ্য নিশ্চিতকরণে সচেতন হতে হবে
  • কোভিড-১৯ মানব ইতিহাসে বড় চ্যালেঞ্জ
  • একটি খেরোখাতার বয়ান
  • পরিবেশ রক্ষা ও জীববৈচিত্র্য সংরক্ষণ
  • পর্নোগ্রাফির বিষবাষ্প থেকে মুক্তি মিলবে কবে?
  • জীববৈচিত্র এবং মনুষ্য সমাজ
  • করোনার ছোবলে জীবন-জীবিকা
  • মানুষ কেন নিমর্ম হয়
  • করোনায় আক্রান্ত শিক্ষা ব্যবস্থা
  • প্রসঙ্গ : ব্যাংকিং খাতে সুদহার এবং খেলাপি ঋণ
  • করোনা, ঈদ এবং ইসলামে মানবতাবোধ
  • ত্যাগের মহিমায় চিরভাস্বর ঈদুল আযহা
  • Image

    Developed by:Sparkle IT