ধর্ম ও জীবন

জৈন্তা অঞ্চলে হিফজুল কোরআন পরিক্রমা

সরওয়ার ফারুকী প্রকাশিত হয়েছে: ০৬-১২-২০১৯ ইং ০০:৩৫:৪৩ | সংবাদটি ১৮৩ বার পঠিত

[পূর্ব প্রকাশের পর] ধারা ২ :
হাফেজ ক্বারী আব্দু হাই ও হাফেজ মাহমুদ আলীÑ দু’জনেই ভারতের পানিপথে একই ওস্তাদের কাছে হিফজ সম্পন্ন করেন। এ দু’জনের ধারা কেবল জৈন্তা নয়, সিলেট জুড়েই ব্যাপকতা পায়। হাফেজ ক্বারী আব্দুল হাই (রহ.) ১৮৯০ সালে কানাইঘাট উপজেলার ব্রাহ্মণগ্রামে জন্মগ্রহণ করেন। ১৮ বছর বয়সে তিনি ভারতের হারিয়ানা রাজ্যের বিখ্যাত এলাকা পানিপথে গমন করেন। কোরআন শেখার অদম্য আগ্রহ নিয়ে আব্দুল হাই ভর্তি হন পানিপথের বিখ্যাত আলেম ও হাফেজ ক্বারী আলী হোসেন (রহ.)-এর কাছে। সেখানে তিনি কোরআন এভাবে পড়তেনÑ মনে হতো তিনি যেনো এ জগতে নেই। জায়গির পরিবারের দ্বীনদার গৃহকর্ত্রী যখন শিক্ষানবিশ আপন ছেলেকে লক্ষ্য করে উপদেশ দেন ‘কোরআন এভাবে পড়, যেভাবে পাশের কক্ষের বাঙালি ছেলে কোরআনকে টুকরো টুকরো করে গিলছে’। জায়গির-কর্ত্রীর এমন মূল্যায়নে তার কোরআন প্রেমের উদ্দীপনা উপলব্ধি করা যায়।
আব্দুল হাই ১৯১৭ সালের দিকে দেশে ফিরেন। হাফিজ আব্দুল হাই যখন দেশে ফিরেন, তখনও কানাইঘাট এলাকার কোনো মাদ্রাসায় হিফজ বিভাগ চালু হয়নি। তিনি বাড়িতে অবসর যাপন করেন। কখনো নদীতে বড়শি বেয়ে অবসর যাপন করতেন। দু’একজন উৎসাহী ছাত্র তার কাছে হিফজের জন্য আসেন এবং তিনি তাদেরকে যথাযথ মূল্যায়ন করেন। ১৯৩০ সালে রাজাগঞ্জ মাদ্রাসা প্রতিষ্ঠা হলে হাফেজ আব্দুল হাইয়ের মাধ্যমে হিফজ বিভাগ চালু হয়, এটা কানাইঘাটের প্রথম এবং জৈন্তা অঞ্চলের দ্বিতীয় হিফজ মাদ্রাসা হিসেবে খ্যাতি অর্জন করে। রাজনৈতিক মতপার্থক্যের দরুন ১৯৩৫ সালে তিনি নিজ বাড়িতে চলে আসেন এবং শশুর সৈয়দ ইয়াকুব আলীর সহযোগীতায় মীরারচটি গ্রামে ‘মীরারচটি মিফতাউল উলুম ক্বওমি মাদ্রাসা’ প্রতিষ্ঠা করেন। এ মাদ্রাসায় তিনি জীবনের শেষ দিন পর্যন্ত খেদমত করে ১৯৬২ সালে ইন্তেকাল করেন।
হাফিজ আব্দুল হাই কোরআন শেখানোর ব্যাপারে কড়াকড়ি নীতি মানতেন। তার অন্যতম ছাত্র হাফেজ আব্দুর রকিব বলেন ‘মেয়াসাব আমাকে শুধু আউযুবিল্লাহ একটানা সাত দিন এবং বিসমিল্লাহ সাত দিন পড়িয়েছেন’। তার খ্যাতিমান ছাত্র হাফেজ এহসান উল্লাহ বলেন ‘আমাকে একটানা তিন বছর সবকের পাশাপাশি আউযুবিল্লাহ-বিসমিল্লাহ আলাদাভাবে পড়াতেন এবং শুনতেন। মেয়াসাব বলতেন, যদি আউযুবিল্লাহ-বিসমিল্লাহ ঠিক হয়ে যায়, তাহলে পুরা কোরআনই ঠিক হয়ে যাবে’। হাফেজ আব্দুল হাই-এর ধারাই জৈন্তা অঞ্চলে অধিক প্রসারতা লাভ করে। ১৯৬২ সালে হাফেজ আব্দুল হাই ইন্তেকাল করেন। হাফিজ আব্দুল হাই-এর অন্যতম ছাত্ররা হলেনঃ হাফিজা নুরুন নেছা (তিনি জৈন্তা অঞ্চলের প্রথম হাফেজা হিসেবে স্বীকৃত)/ হাফিজ এহসান উল্লাহ, ভাটি বিরদল/ হাফেজ মাওলানা জওয়াদ, রাজাগঞ্জ/ হাফেজ মাওলানা ইউসুফ, ছত্রপুর/ হাফেজ সাজিদ আলী, মইনা/ হাফেজ আব্দুল হক, মইনা/ হাফেজ আব্দুর রকিব, সরুফৌদ/ হাফেজ গুরা মিয়া, মইনা/ হাফেজ ক্বারী শফিকুর রহমান (ছেলে)/ হাফেজ আব্দুল গফুর, হাউদপাড়া, জৈন্তা।
হাফিজ মাহমুদ আলী ১৮৯৫ সালে কানাইঘাটের নারাইনপুর গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন। কৈশোরে তিনি পানিপথের হাফিজ আলী হোসেনের কছে হিফজ সম্পন্ন করে ১৯২০ সালের দিকে দেশে ফিরেন। তার মাধ্যমে গাছবাড়ি মাদ্রাসা-মসজিদে হিফজ চালু হয়। হাফিজ মাহমুদ আলী উদ্যোমী মানুষ ছিলেন। তিনি আসামের ডিব্রুগড় মাদ্রাসায় হিফজ চালু করেন। তার মাধ্যমে সিলেটের শাহজালাল দরগাহ মাদ্রাসা ছাড়াও বাদাঘাটস্থ রাজারবাগ মাদ্রাসায় হিফজ শাখা উদ্বোধন হয়। ১৯৯৩ সালে ৯৮ বছর বয়সে তিনি ইন্তেকাল করেন।
১৯২৮ঃ হাফেজ আব্দুল হাই-এর খ্যাতিমান ছাত্র এহসান উল্লাহ তেইশ বছর বয়সে হিফজ পড়া শুরু করেন এবং ২৮ বছর বয়সে ১৯২৮ সালে হিফজ সম্পন্ন করেন। এরপর উস্তাদের অনুমতি নিয়ে ভাটিদিহি গ্রামে মসজিদের ইমাম হিসেবে দায়িত্ব গ্রহণ করেন। পার্শ্ববর্তী উমরগঞ্জ ইমদাদুল উলুম মাদ্রাসায় তখনও হিফজ বিভাগ চালু হয়নি। এসময় তার কাছে হিফজ করেনঃ হাফেজ মাওলানা আব্দুশ শাকুর (সাবেক মোহাদ্দিস, সিলেট আলীয়া), হাফেজ খলিলুর রহমান, শেবনগর/ হাফেজ মাওলানা রফিক আহমদ, লাতু, করিমগঞ্জ/ হাফেজ ক্বারী আব্দুল হাই, ভাটিদিহি/ হাফেজ আব্দুল মান্নান, বাটইআইল।
হাফেজ এহসান উল্লাহ পুরো সিলেটেই পরিচিতি অর্জন করেন। ১৯৪৭ সালে গণভোটের প্রাক্কালে মহাত্মা গান্ধীর সিলেট আগমন উপলক্ষে যে বিশাল জনসভা হয়Ñ হাফেজ এহসান উল্লাহ সেখানে তেলাওয়াত করেন। তার সুমধুর তেলাওয়াতে মুগ্ধ হয়ে গান্ধী সুরায়ে সফ তেলাওয়াতের অনুরোধ করলে তিনি আবারও পাঠ করেন। সভায় সভাপতিত্ব করেন খ্যাতিমান আলেমেদ্বীন আল্লামা মোশাহিদ বায়মপুরি (রহ.)।
১৯৫২ঃ হাফিজ আব্দুর রকিবের মাধ্যমে চতুল ঈদগাহ মাদ্রাসা প্রতিষ্ঠার পাঁচ বছর পর উদ্বোধন হয়। হাফিজ আব্দুর রকিব ক্বারি আব্দুল হাই-এর অন্যতম ছাত্র। তিনি ২২ বছর বয়সে খেতের হাল ছেড়ে বাড়ি এসে সোজা উস্তাদের কাছে চলে যান এবং প্রায় ৬ বছরে হিফজ সম্পন্ন করেন। তার মাধ্যমে চতুল ঈদগাহ মাদ্রাসায় হিফজ চালু হয়ে অদ্যাবধি সে ধারা বিদ্যমান।
১৯৫৮ঃ উমরগঞ্জ ইমদাদুল উলুম মাদ্রাসায় হিফজ বিভাগ চালু হয়। হাফিজ এহসান উল্লাহের ছাত্র হাফেজ রফিক আহমদ ছিলেন প্রথম উস্তাদ। হাফিজ রফিক আহমদ ও তার আব্বা দেশ বিভাগের পূর্বে উমরগঞ্জে আসেন। তার আব্বা তৎকালীন সময়ের খ্যাতিমান বুজুর্গ ক্বারি নজিব আলী ছিলেন আশরাফ আলী থানবীর মুরিদ। ইবরাহীম তশ্নার সাথে অন্তরঙ্গতার সুবাদে তিনি করিমগঞ্জ থেকে উমরগঞ্জে আসেন। হাফিজ রফিক আহমদের মাধ্যমে ১৯৬২ সালে ফতেহপুর মাদ্রাসায় হিফজ বিভাগ চালু হয়। তিনি জৈন্তা অঞ্চলের অনেক মাদ্রাসায় হিফজ চালু করতে উল্লেখযোগ্য ভূমিকা রখেন।

 

শেয়ার করুন

Developed by: Sparkle IT