ধর্ম ও জীবন

বড়পীর আব্দুল কাদির জিলানী (র:)

মাওলানা আব্দুল হান্নান তুরুকখলী প্রকাশিত হয়েছে: ০৬-১২-২০১৯ ইং ০০:৪১:৫৩ | সংবাদটি ৬৩০ বার পঠিত
Image

রাসূলেপাক (সা:) এর ওফাতের পর মানব সমাজে ইসলামকে সঞ্জীবিত করে রাখার জন্য যুগে যুগে আগমন ঘটেছে অনেক সংস্কারকের। হিজরি ষষ্ঠ শতকের সর্বশ্রেষ্ঠ মুজাদ্দিদ বা সংস্কারক হচ্ছেন বড়পীর হযরত আব্দুল কাদির জিলানী (র:)। তাঁর চারিত্রিক গুণাবলী ও সুমহান নীতি দ্বারা মুসলিম উম্মাহর চরম দুর্দিনে পথহারা মানুষকে সঠিক পথের সন্ধান দান করেছিলেন। তৎকালে আব্বাসীয় খলিফাদের দুর্বলতার কারণে সমাজে অন্যায়-অপকর্ম, অবিচার-অরাজকতা চরমে পৌঁছেছিল। ইসলামী জীবন ব্যবস্থা ছিল চরম সংকটে। ইসলাম ও মুসলমানদের এহেন দূরবস্থায় আব্দুল কাদির জিলানী (র:) নানা পরিকল্পনা প্রণয়ন করে ইসলামকে পুনর্জীবন দান করেন বলে তাঁকে ‘মহিউদ্দিন’ (দ্বীনের পুনর্জীবন দানকারী) উপাধিতে ভূষিত করা হয়। হযরত আব্দুল কাদির জিলানী (র:) তৎকালীন পাস্য বর্তমানকালের ইরান দেশের অন্তর্গত জিলান শহরে ৪৭০ হিজরি ১লা রমজান সুবহে সাদিকের সময় জন্মগ্রহণ করেন। তাঁর পিতার নাম সৈয়দ আবু সালেহ মুসা জঙ্গী। আর মাতার নাম সৈয়দা উম্মুল খায়ের ফাতেমা। পিতা হাসান বংশীয় এবং মাতা হোসাইন বংশীয়। উভয় দিক থেকে তিনি সৈয়দ ও আওলাদে রাসূল (সা:)। রাসূলে পাক (সা:) এর পবিত্র রক্তধারা হযরত আব্দুল কাদির জিলানী (র:) এর শরীরে প্রবাহমান। তাঁর পিতামাতা উভয়েই ছিলেন ধার্মিক। তাঁর পিতার সততা এবং তাঁর মাতার পর্দানশীলতার কথা মুসলিম উম্মাহর জন্য অনুপম দৃষ্টান্ত হয়ে আছে। নদীর তীর ঘেঁষে একটি পাকা আপেল নদীর ¯্রােতে ভেসে যাচ্ছিল। ক্ষুধার তাড়নায় তার পিতা আবু সালেহ মুসা জঙ্গী সেই আপেলটি খেয়ে ফেলেন। পরক্ষণেই তাঁর মধ্যে দারুন অনুশোচনা দেখা দিল। মালিকের অনুমতি ছাড়া পরিত্যাক্ত আপেলটি খাওয়া ঠিক হয়নি। তিনি আপেলের মালিকের বাড়িতে গিয়ে ক্ষমা প্রার্থনা করলেন। সেই আপেলের মালিক ছিলেন সৈয়দ আব্দুল্লাহ সাওমাই (র:)। সৈয়দ আব্দুল্লাহ সাওমাই (র:) শর্তারোপ করলেন-যদি আমার গৃহে ১২ বছর আমার খেদমত কর তাহলে আমি ক্ষমা করে দেব। বড়পীর হযরত আব্দুল কাদির জিলানীর পিতা আবু সালেহ মুসা জঙ্গী সেই আপেল খাওয়ার দায়মুক্তির জন্য মালিকের গৃহে ১২ বছর চাকরি করলেন। যে ব্যক্তি মালিকের অনুমতি ব্যতিত আপেল খেয়ে এর দায়মুক্তির জন্য ১২ বছর চাকুরি করবে এরূপ ব্যক্তি কি সাধারণ ব্যক্তি? সততার এরূপ দৃষ্টান্ত কি আছে? সেই সৎ ও মহৎ ব্যক্তির ছেলে হলেন বড়পীর হযরত আব্দুল কাদির জিলানী (র:)।
হযরত আব্দুল কাদির জিলানীকে তাঁর মাতা প্রাথমিক শিক্ষার জন্য মক্তবে পাঠান। মক্তবের উস্তাদ তাঁকে প্রাথমিক স্তরের ছাত্র মনে করে কুরআনের প্রথম কয়েকটি সুরা তাঁকে শেখাতে মনস্থ করেন। দেখা যায়, আব্দুল কাদির জিলানী একে একে পবিত্র কুরআনের প্রথম থেকে ১৮ পারা পর্যন্ত মুখস্থ বলে ফেলেছেন। উস্তাদ অবাক হলেন। তিনি এর কারণ জানতে পারলেন, বড়পীর আব্দুল কাদির জিলানীর মাতা সৈয়দা উম্মুল খায়ের ফাতেমা পবিত্র কুরআনের ১৮ পারা মুখস্ত করেছিলেন। তিনি গর্ভাবস্থায় সেই ১৮ পারা কুরআন বেশি বেশি তেলাওয়াত করতেন। ফলে আব্দুল কাদির জিলানী মায়ের গর্ভে থেকেই অলৌকিকভাবে পবিত্র কুরআনের ১৮ পারা মুখস্থ করে ফেলেন-সুবহানাল্লাহ। কবির ভাষায়-‘গর্ভে বসে মায়ের মুখে শুনে কুরআনের বাণী / হেফজ করলে অর্ধ কুরআন ওগো গাউসে জিলানী / মায় জানেনা ছেলের খবর জানে আল্লাহু গনী / তোমারি নামের গুনে আগুন হয়ে যায় পানি।’ বড়পীর আব্দুল কাদির জিলানী ছিলেন অত্যন্ত তীক্ষ্ম মেধার অধিকারী। অতি অল্প বয়সেই তিনি প্রাথমিক শিক্ষা সমাপ্ত করেন। এরপর তিনি উচ্চ শিক্ষা লাভের জন্য উদগ্রীব হয়ে গেলেন। বয়স তখন ১৮ বছর। বাগদাদের নেজামিয়া মাদ্রাসায় ভর্তির জন্য মায়ের অনুমতি লাভ করলেন। মা তাঁকে ৪০টি স্বর্ণমুদ্রা জামার বগলের নিচে সেলাই করে দিয়ে বললেন ‘সর্বদা সত্য কথা বলবে’। নেজামিয়া মাদ্রাসা আব্দুল কাদির জিলানীর বাড়ি থেকে ৪০০ মাইল দূরে অবস্থিত। একটি বাণিজ্য কাফেলার সাথে আব্দুল কাদির জিলানী বাগদাদের নেজামিয়া মাদ্রাসা অভিমুখে যাত্রা শুরু করলেন। হামাদান ছেড়ে কিছুদূর যেতেই ৬০ জনের একটি ডাকাতের দল তাদের আক্রমণ করলো। ডাকাতরা কাফেলার সকলকে লুট করে নিল। ডাকাত সর্দার আহমদ বদভী বড়পীর আব্দুল কাদির জিলানীকে জিজ্ঞেস করলো-হে বৎস! তোমার নিকট কিছু আছে কি? তিনি বললেন-হ্যাঁ, আমার নিকট ৪০টি স্বর্ণমুদ্রা আছে। একথা শুনে ডাকাত সর্দার অবাক হয়ে জিজ্ঞেস করলো হে বৎস! তুমি একথা স্বীকার করলে কেন? আব্দুল কাদির জিলানী বললেন-আমার মা আমাকে বলেছেন-‘সদা সত্য কথা বলবে’। মায়ের কথা রক্ষার্থে আমি সত্য কথা বলেছি। ৪০টি স্বর্ণমুদ্রার কথা অকপটে স্বীকার করেছি। বালক আব্দুল কাদির জিলানীর মুখে সত্য কথা শুনে সেই ডাকাতরা অনুতপ্ত হয়ে তওবা করে ডাকাতি ছেড়ে দিল। তারা আব্দুল কাদির জিলানীর সুহবত লাভ করে আল্লাহর ওলী হয়ে গেল। আব্দুল কাদির জিলানীর সততা ও নেগাহহে করমে ৬০ জন ডাকাতের জীবনের চাকা ঘুরে গেল। জনৈক সাধক বলেছেন-‘নেগাহে ওলী মে ইয়ে তাছির দেখি / বদলতী হাজারো কি তাকদীর দেখি’ অর্থাৎ আল্লাহর ওলীদের নেক নজরের মধ্যে এমন তাছির রয়েছে যে, এক মুহূর্তে হাজারো তাকদীর পরিবর্তন হয়ে যায়।
আব্দুল কাদির জিলানী (১০৭৭-১১৬৭ খ্রিষ্টাব্দ) বাগদাদের নেজামিয়া মাদ্রাসায় ৮ বছরে কঠোর অধ্যবসায়ের মাধ্যমে তাফসীর হাদীস, ইলমে ফিকাহ ও ইলমে তাসাউফে ও আরবী সাহিত্যে অগাধ পান্ডিত্য অর্জন করেন। নেজামিয়া মাদ্রাসায় থাকাকালে তিনি যেসব ওস্তাদগণের নিকট থেকে ইলিম অর্জন করেন তাদের মধ্যে সাহিত্যিক হালাদ ইবনে মুসলিম, মুহাদ্দিস মুহাম্মদ ইবনে হাসান বাক্কেল্লানী, ফকীহ কাজী আবু সাঈদ মাখজুমী ছিলেন অন্যতম। তাঁরা আলেম ও দরবেশ ছিলেন। তন্মধ্যে কাজী আবু সাঈদ মাখজুমী ছিলেন শ্রেষ্ঠ ওলী। হাদীসের ভাষায়, ‘শত্রুর বিরুদ্ধে জিহাদ করা হল ছোট জিহাদ কিন্তু নাফসের বিরুদ্ধে জিহাদ করা হচ্ছে বড় জিহাদ’। ষড়রিপু (কাম, ক্রোধ, লোভ, মোহ, মদ, মাৎসর্য-এই ছয়টি হচ্ছে রিপু বা শত্রু) হচ্ছে নাফস। একে নাফসে আম্মারা বা কু-প্রবৃত্তি বলা হয়। এই রিপুগুলোকে নিয়ন্ত্রণ বা আজ্ঞাধীন করার জন্য যে সাধনা করা হয়, তাই হচ্ছে ইলমে তাসাউফের সাধনা। এজন্য একজন পীর বা মুর্শিদের শরণাপন্ন হওয়া অতি প্রয়োজন। তা না হলে সিদ্ধি লাভ করা যায় না। তাই ইলমে তাসাউফে পূর্ণতা লাভের জন্য আব্দুল কাদির জিলানী যুগশ্রেষ্ঠ ওলী ফকীহ কাজী আবু সাঈদ মাখজুমী (র:) এর নিকট বাইআ’ত গ্রহণ করেন এবং তাঁর নিকট থেকে ইলমে তাসাউফে দীক্ষা গ্রহণ করে ও ইলমে তাসাউফ জগতে তাঁর খলিফা নিযুক্ত হয়ে ওলীদের মধ্যে শ্রেষ্ঠত্ব অর্জন করেন। ইলমে তাসাউফে শ্রেষ্ঠত্বের জন্য তাঁকে ‘বড়পীর’ উপাধিতে ভূষিত করা হয়। আব্দুল কাদির জিলানী (র:) ২৫ বছরের মধ্যে শরীয়তের ১৩টি শাখায় ও তরিকতের বিভিন্ন মাকামের যাবতীয় বিদ্যা সমাপ্ত করেন। এরপরের ২৫ বছর কঠোর রিয়াজতে বনে-জঙ্গেল, বিরান মরুময় বিয়াবানে ঘুরে বেড়ান। ৫১৩ হিজরিতে তাঁর পীর ও মুর্শিদ আবু সাঈদ মাখজুমী (র:) ইন্তেকাল করলে তাঁর প্রতিষ্ঠিত ‘মাদ্রাসায়ে বাবুল আ’জাজ’-এর পরিচালনার ভার তাঁর উপর অর্পিত হয়। বড়পীর আব্দুল কাদির জিলানী (র:) উক্ত মাদ্রাসায় তাঁর ওফাতের পূর্ব পর্যন্ত অধ্যাপনায় রত ছিলেন। ৫২১ হিজরিতে রাসূল (সা:) স্বপ্নযোগে তাঁকে বিবাহ করার নির্দেশ দেন। রাসূল (সা:) নির্দেশে তিনি ৫২১ হিজরি থেকে সংসার জীবন শুরু করেন। তাঁর চার বিবির ঘরে ৪৯ জন ছেলে-মেয়ে জন্মগ্রহণ করেন। তন্মধ্যে ছেলে ২৭ জন এবং মেয়ে ২২ জন ছিলেন। ছেলেদের মধ্যে অনেকেই ইলমে শরীয়ত ও মারিফতে উচ্চ আসনে সমানীন হয়েছিলেন। ৫২১ হিজরি থেকে ৫৬১ হিজরি পর্যন্ত দীর্ঘ ৪০ বছর বড়পীর আব্দুল কাদির জিলানী (র:) সপ্তাহে তিন দিন ওয়াজ করতেন। চারশত আলেম তাঁর মূল্যবান ভাষণ লিপিবদ্ধ করে রাখতেন। তাঁর ওয়াজ-নসীহতে বরকত হওয়ার জন্য এক রাতে স্বপ্নযোগে রাসূলে পাক (সা:) এর নিকট দোয়া চাইলে রাসূল (সা:) সামান্য থুথু মোবারক তাঁর জিহ্বায় লাগিয়ে দেন। রাসূল (সা:) এর থুথু মোবারকের বরকতে আব্দুল কাদির জিলানীর আরবী বাচনভঙ্গি ও ভাবের গাম্ভীর্য ও গভীরতার খ্যাতি বিদ্যুতের মত চারিদিকে ছড়িয়ে পড়ে। দেশ-বিদেশের লোক ও পন্ডিত ব্যক্তিগণ তাঁর ওয়াজ শুনার জন্য বাগদাদে এসে ভিড় জমাতেন। খ্যাতনামা হাজার হাজার উলামায়ে কেরাম তাঁর ওয়াজ শুনার জন্য তাঁর মজলিসে উপস্থিত হতেন। আল্লামা জামালুদ্দীন ইবনুল জাওযী (র:) ছিলেন একজন হাদীসের খ্যাতনামা ইমাম। তিনি একটি আয়াতের ১১টি ব্যাখ্যা জানতেন। একদিন তিনি বড়পীর আব্দুল কাদির জিলানীর ওয়াজের মজলিসে বসে ঐ আয়াতের ৪০টি ব্যাখ্যা শুনলেন। এতে বড়পীর আব্দুল কাদির জিলানীর ইলমের গভীরতা দেখে আল্লামা জামালুদ্দীন ইবনুল জাওযী (র:) অবাক হলেন এবং সাথে সাথে তিনি বড়পীর সাহেবের নিকট বাইআ’ত গ্রহণ করেন। এভাবে অগণিত মুফাসসির মুহাদ্দিস ও ফকীহগণ বড়পীর আব্দুল কাদির জিলানীর অগাধ পান্ডিত্য দেখে তাঁর নিকট বাইআ’ত গ্রহণ করে নিজেদের জীবনকে ধন্য করে নিয়েছেন।
হযরত বড়পীর আব্দুল কাদির জিলানী (র:) রাতের অধিকাংশ সময় বিনিদ্র ইবাদতে কাটাতেন। তিনি এশার অজু দ্বারা সুদীর্ঘ ৪০ বছর পর্যন্ত ফজরের নামাজ আদায় করেছেন। তাঁর থেকে হাজার হাজার কারামত প্রকাশ পায়। তাঁর কারামত বিষয়ে বিগদ্ধ লেখকগণ অগণিত গ্রন্থ রচনা করেছেন। সুফী আরাধনার ক্ষেত্রে তিনি যে তরিকা প্রতিষ্ঠা করেন তাকে ‘কাদিরিয়া তরিকা’ বলা হয়ে থাকে। তাঁর ভক্তগণ তাঁকে ‘দরবেশদের সুলতান’ বলে অভিহিত করেন। তাছাড়া তাঁর ভক্তগণ তাঁর মোবাকর নাম উচ্চারণ করতে গিয়ে গাউসে সামদানী, নূরে ইয়াজদানী, মুশাহিদুল্লাহ, আমরুল্লাহ, ফাদলুল্লাহ, আমানুল্লাহ, নুরুল্লাহ, কুতুবুল্লাহ, সাইফুল্লাহ, ফরমানুল্লাহ, বুরহানুল্লাহ, আয়াতুল্লাহ, গাউসুল্লাহ, মাহবুবে সুবহানী, কুতুবে রব্বানী, গাউসুল আজম প্রভৃতি প্রশংসাসূচক শব্দ ব্যবহার করে থাকেন। বাংলাদেশে তিনি ‘বড়পীর’ নামেই সমধিক পরিচিত। বড়পীর আব্দুল কাদির জিলানী (র:) বেশ ক’টি মূল্যবান গ্রন্থ রচনা করেছেন। গুনিয়াতুত তালিবীন, ফতুহুলগাইব, সিররুল আসরার, কাসিদায়ে গাউসিয়া তাঁর অমূল্য গ্রন্থ। সিররুল আসরার তো মারিফতের রহস্যের খনি।
বড়পীর আব্দুল কাদির জিলানী (র:) ৫৬১ হিজরির ১১ই রবিউস সানি ৯০ বছর বয়সে ইন্তেকাল করেন। তাঁর ইন্তেকালের তারিখকে স্মরণ রাখার জন্য প্রতি বছর হিজরি সনের ১১ই রবিউস সানি তারিখকে ‘ফাতেহায়ে ইয়াজদাহম’ হিসেবে সারা বিশ্বে পালন করা হয়। ইসলাম প্রচারে বড়পীর আব্দুল কাদির জিলানী (র:) এর অবদান অনুসরণীয়। ইসলাম প্রচারে অনন্য অবদান রাখার জন্য তিনি সকলের নিকট চির অমর হয়ে থাকবেন।

শেয়ার করুন

Developed by:Sparkle IT