ধর্ম ও জীবন

হাদীস সংগ্রহকারী ইমাম মুসলিম ও তিরমিজি

রফিকুর রহমান লজু প্রকাশিত হয়েছে: ০৬-১২-২০১৯ ইং ০০:৪৯:১৪ | সংবাদটি ৬৬৩ বার পঠিত
Image

ইমাম মুসলিম (রহ:) এর পুরো নাম ইমাম মুসলিম ইবনে হাজ্জাজ (রহ:)। তাঁর জন্মস্থান ইরানের খোরাসান রাজ্যের নিশাপুর অঞ্চলে। ৮১৫ সালের পর কোনো এক সময়ে তাঁর জন্ম হয় বিখ্যাত কুশাইরী বংশে। তাঁর পূর্বপুরুষ ছিলেন আরব গোত্রীয় এবং নবী করীম হযরত মুহাম্মদ (সা:)-এর সঙ্গী। পরবর্তীকালে এই বংশের লোকজন ইরানে বসবাস শুরু করেন। তাঁর পিতা ইমাম হাজ্জাজ (রহ:)। তিনি পারিবারিক পরিবেশেই ইসলামী ধর্মীয় জ্ঞান, বিশেষত হাদীসের ওপর ব্যাপক অধ্যয়ন করেন। মাত্র ১৪ বছর বয়সে তিনি জ্ঞান অন্বেষণের লক্ষ্যে ইরান দেশের বসরা নগরীতে গমন করেন। অতঃপর তিনি মক্কায় গমন করেন এবং হজ পালন শেষে মক্কা ও মদীনায় বিশিষ্ট ওলামাদের কাছ থেকে হাদীসের সংগ্রহে ব্রতী হন। বিশুদ্ধ ও সহি হাদীসের তালাশে তিনি ইরাক, সিরিয়া, মিশরসহ মধ্যপ্রাচ্য ও আফ্রিকার বিভিন্ন দেশে ১৫ বছর ঘুরে বেড়ান এবং হাদীস সংগ্রহ করেন। তিনি কঠোর পরিশ্রম ও সাধনায় বিভিন্ন দেশের প্রায় ২২০ জন ইসলামী গবেষক এবং হাদীস বর্ণনাকারীর নিকট থেকে প্রায় ৩ লাখ হাদীস সংগ্রহ করেন। তিনি তন্নতন্ন করে বিশুদ্ধ হাদীস শনাক্ত করতে আপ্রাণ চেষ্টা করেন। এ সময় তিনি ইমাম বুখারি (রহ:) এর সান্নিধ্যে যান এবং নিজ সাধনালয়ে অত্যন্ত মর্যাদা দিয়ে তাঁকে অভ্যর্থনা জানান। তিনি ইমাম বুখারি (রহ:) এর সংগৃহীত ও অনুমোদিত সহী হাদিস সমূহের সঙ্গে একমত পোষণ করেন।
ইমাম মুসলিম (রহ:) প্রথম চার হাজার হাদীসকে সহী বলে ধরে নিলেও পরে তিনি দুই হাজার হাদীসকে পৃথক করে শুদ্ধরূপে গ্রহণ করেন। তাঁর এই বাছাই ও যাচাইয়ের কারণে মুসলিম বিশ্বে বিশুদ্ধতার প্রশ্নে ইমাম বুখারি (রহ:)-এর পাশাপাশি ইমাম মুসলিম (রহ:) এর স্বীকৃত ও অনুমোদিত হাদীস অত্যন্ত সমাদৃত। ইমাম মুসলিম (রহ:) রচিত গ্রন্থের সংখ্যা নয়টিরও বেশি। তাঁর সম্পাদিত সহী মুসলিম শরীফ এর কদর রয়েছে সারা বিশ্বে। তাঁর ছাত্র ও শিষ্যের সংখ্যা অগণিত। তাঁদের মধ্যে অন্যতম হলেন ইমাম তিরমিজি (রহ:)।
ইমাম মুসলিম (রহ:) দীর্ঘ জীবনের অধিকারী ছিলেন না। মাত্র ৫৫ বছর বয়সে তাঁর মৃত্যু হয়। ইরানের খোরাসান রাজ্যের নিশাপুরে তাঁকে দাফন করা হয়।
[সূত্র : হাদিসের সন্ধানে হেঁটেছেন যাঁরা। মেজর নাসির উদ্দিন আহাম্মেদ (অব.) পিএইচডি, দৈনিক বাংলাদেশ প্রতিদিন, ১৮ অক্টোবর, ২০১৯]
ইমাম তিরমিজি (রহ:)
ইমাম তিরমিজি (রহ:) আরব জাহানের পথে প্রান্তরে ঘুরে ঘুরে সহী-শুদ্ধ হাদীস সংগ্রহ করে অমর হয়ে আছেন। তাঁর আসল নাম মুহাম্মদ ইবনে ইসায়াত তিরমিজি (রহ:)। তাঁর জন্ম মধ্য এশিয়ার উজবেকিস্তানে আনুমানিক ৮২৪-২৫ সালে। তিনি তাঁর শৈশবকাল অতিবাহিত করেন ইরান ও ইরাকে ইসলামী জ্ঞানচর্চার মধ্য দিয়ে। ইসলামী শিক্ষার পাশাপাশি তিনি ভাষা, ব্যাকরণ ও বিজ্ঞান বিষয়ে পড়ালেখা করেন। তাই তাঁর রচনাসমূহ ভাষাগত ও ব্যাকরণগতভাবে শুদ্ধ ও সুন্দর।
ইমাম তিরমিজি (রহ:) বিশ বছর বয়স থেকেই সহী-শুদ্ধ হাদীসের সন্ধানে ব্যাপৃত হন। তিনি বিভিন্ন দেশের দুইশত ইসলামী বিজ্ঞান ও চিন্তাবিদ এবং হাদীস সংগ্রহকারীর কাছ থেকে বিশুদ্ধ হাদীস এবং হাদীসের সূত্র অনুসন্ধান করেন। শুধু কুফা নগরেই তিনি ৪২ জন আলেম ওলামার নিকট থেকে হাদীস সংগ্রহ করেন। তিনি দীর্ঘ পাঁচ বছর ইরানের নিশাপুর অঞ্চলে ইমাম বুখারি (রহ:) এর সান্নিধ্যে ছিলেন এবং তাঁর সঙ্গে মতবিনিময় করে নিজ সংগৃহীত হাদীসের শুদ্ধতার বিষয়ে নিশ্চিত হন। তিনি ইমাম বুখারি (রহ:) এর ওপর এতটাই বিশ্বাস স্থাপন করেছিলেন এবং নির্ভরশীল ছিলেন যে, ইমাম তিরমিজি (রহ:) তাঁর একটি হাদীসের গ্রন্থে ১১৪ বার ইমাম বুখারি (রহ:) এর রেফারেন্স টেনেছেন। তিনি বেশ কয়েকটি হাদীস গ্রন্থ লিখেছেন এবং তাঁর সংকলিত ৩৯৬২টি হাদীস বিশুদ্ধতার প্রশ্নে বিতর্কের ঊর্ধ্বে রয়েছে। ইমাম বুখারি (রহ:)-এর মৃত্যু তাঁর জীবনের ওপর গভীর প্রভাব ফেলে এবং তিনি শোকে একেবারে ভেঙ্গে পড়েন। শেষ জীবনে তিনি অন্ধ হয়ে গিয়েছিলেন। জীবনের অন্তিমকালে ইমাম তিরমিজি তাঁর জন্মস্থান তিরমিজে চলে যান। এখানে ৮৯২ সালের ৯ অক্টোবর তিনি শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন। তিরমিজের শিরাবদ নামক স্থানে তাঁকে সমাহিত করা হয়। পরে এখানে একটি স্মৃতিসৌধ নির্মাণ করা হয়।
[সূত্র : হাদিসের সন্ধানে হেঁটেছেন যাঁরা। মেজর নাসির উদ্দিন আহাম্মেদ (অব.) পিএইচডি, দৈনিক বাংলাদেশ প্রতিদিন, ১৮ অক্টোবর, ২০১৯]

শেয়ার করুন

Developed by:Sparkle IT