উপ সম্পাদকীয়

শিক্ষকদের অবদান ও মর্যাদা

সামছুল আবেদীন প্রকাশিত হয়েছে: ০৭-১২-২০১৯ ইং ০০:৪০:৫৬ | সংবাদটি ৩১৯ বার পঠিত

কবি গোলাম মোস্তফা বলেছেন, ‘পিতা গড়েন শরীর আর শিক্ষক গড়েন মন, পিতা বড় না শিক্ষক বড় বলিবে কোন জন।’ হয়তো কবির এ অভিব্যক্তি সমালোচক বন্ধুদের দৃষ্টিতে বাস্তবিক কোনো ভিত্তি নেই। কিন্তু আপেক্ষিক বিষয়াবলী বিশ্লেষণ করলে দেখা যাবে যে, এ কথার গভীরে বিশাল অন্তর্নিহিত তাৎপর্য বিদ্যমান। তাই ‘এ পৃথিবীর সর্বশ্রেষ্ঠ শিক্ষক নিজের বাবা। যে ছেলে গোটা ছাত্রজীবন তার বাবার সাথে বসে রাতের খাবার খাবে, সে কোন দিনই নীতি থেকে বিচ্যুত হবে না।’ --হুমায়ূন আহমেদ স্যারের এ কথার সূত্রধরে বলতে পারি, পিতা-মাতা হচ্ছেন সন্তানের কাছে প্রাথমিক জ্ঞান ভান্ডার। সত্যিকার অর্থে, একজন পিতা-মাতা একজন সন্তানের কাছে একটা বিশ্ববিদ্যালয় সম কিংবা তার চেয়েও ঢের। যেখান থেকে সে জীবনের সার্বিক জ্ঞান অর্জন করতে সক্ষম। সন্তানের ভালো-মন্দ দেখভাল করার পাশাপাশি একজন পিতা তার সন্তানকে সঠিক দিকনির্দেশনা দিয়ে থাকেন। যে কাজটা একজন প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষকও পিতামাতার অবর্তমানে পরম মমতা, ভালবাসা আর আন্তরিকতার সাথে নিজ সন্তানের মতো লালন করেন। অথচ বিনিময়ে শিক্ষার্থীদের কাছ থেকে কোন উপঢৌকন প্রত্যাশা করেন না। তাদের এ দান সকল স্বার্থের উর্দ্ধে, বিনিময় দ্বারা অপরিমাপযোগ্য, সরল সম্প্রদান। বাবা মায়েরা যেভাবে পরম মমতায় তাদের সন্তানদের আগলে রাখেন, ঠিক তেমনি একজন শিক্ষকও (বাংলাদেশের প্রেক্ষিতে ৬০-৭০ জন) শিক্ষার্থীদের একইসাথে দেখভাল করার গুরুদায়িত্ব পালন করে থাকেন। একসাথে লালন-পালনের সংখ্যাটা একটু তুলনা করে দেখুন কোথায় দুই-তিন জন আর কোথায় ষাট-সত্তর জন। মনস্তাত্ত্বিক বিষয়টিকে মূল্যায়ন করার এটিই সবচেয়ে বড় ক্ষেত্র। একই পরিবারের একাধিক সন্তানকে সামলে নিতে আপনি যতটা না বিব্রত হচ্ছেন, ঠিক ততটাই বিরক্তির কাল গ্রাসে আপনি তলিয়ে যাচ্ছেন। মাত্রাটা এতটাই মর্মান্তিক যে, কোনো কোনো পিতা-মাতাগণ সন্তানদের চাহিদার ভারসাম্য বজায় রাখতে না পেরে সন্তান হত্যা কিংবা আত্মহত্যার মত কঠিন পথ বেছে নিতে বাধ্য হচ্ছেন। অপর দিকে একজন শিক্ষক বিভিন্ন পরিবার থেকে আসা শিক্ষার্থীদের সামাজিক, পারিপার্শ্বিক এবং মনস্তাত্ত্বিক বিষয়গুলো মাথায় রেখে বছরের পর বছর বিচক্ষণতার সাথে সবার মধ্যে ভারসাম্য বজায় রাখার মত পেশাজীবনের কঠিনতম কাজটি হাসিমুখেই করে যাচ্ছেন। আপনার সন্তান আপনার কাছে কোনো বিষয়ে তিন-চার বার জানতে চাইলেই ঠাস করে চড়থাপ্পড় শুরু করেন, আপনাকে তার চাহিদার কথা বারবার বললেই চরম বিরক্তিবোধ করেন, বকাঝকা করেন, তুই-তাচ্ছিল্য করেন। আর একজন শিক্ষক এতগুলো বাচ্চার আব্দার একই সময়ে কৌশলে মিটানোর চেষ্টা করেন। এক্ষেত্রে তাকে কী পরিমাণ ধৈর্যের পরিচয় দিতে হয় তা কেবলমাত্র ভুক্তভোগী শিক্ষকরা বুঝতে পারেন।
আপনি অভিভাবক হিসেবে চিন্তা করুন, আপনার বাচ্চাকে দিনে একটানা কতটুকু সময় দিচ্ছেন। অথচ সে সকালে ঘুম থেকে উঠে চোখ-মুখ কচলাতে কচলাতে বিদ্যালয়ের আঙ্গিনায় প্রবেশ করে। তখন থেকেই সব চাহিদা মিটিয়ে যাচ্ছেন কোন এক মহামানব। আপনার চোখের অন্তরালে কতটা ঝক্কি সামলাতে হচ্ছে তা হয়তবা জানেন হয়তবা আপনি জানেন না, কিন্তু দিন শেষে আপনার সবটুকু অভিযোগ অনুযোগ শিক্ষকেরা মাথা পেতে নিচ্ছেন। অবশেষে সফলতা সব আপনার এবং ব্যর্থতার ফুটো ঝুড়ি সংশ্লিষ্ট শিক্ষকের।
আরেকটা বিষয় লক্ষ্য করুন, প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা জীবন শেষে আপনার সন্তান কোনো না কোনো গুরুত্বপূর্ণ পদে চাকরি করে আপনার পরিবারকে সাচ্ছন্দ্যে চালিয়ে নিয়ে যাচ্ছে। সন্তানের এমন সাফল্যে আপনি পরম তৃপ্তির চওড়া হাসি দিচ্ছেন। ক্ষেত্রবিশেষে সে বাড়ি-গাড়ির মালিক হচ্ছে, কাড়ি কাড়ি টাকা কামাচ্ছে, সুখ নামের স্বপ্নপুরীতে অবাধ বিচরণ করছে। সে সচিব হচ্ছে, এমপি হচ্ছে কিংবা মন্ত্রী হচ্ছে। নতুবা বিদেশ বিভুইঁয়ে দেশের হয়ে প্রতিনিধিত্ব করছে। আপনার সাফল্যমন্ডিত সন্তানকে দেখতে দূর হতে বহু দূরের পথ পাড়ি দিয়ে ছুটে আসেন কোনো এককালের কড়া কন্ঠের মমতায় আচ্ছাদিত একজন মহান শিক্ষক। আপনার সন্তানের অবস্থান বদলালো, ভাগ্য বদলালো, জীবনও পাল্টে গেলো। কিন্তু তার শিক্ষকের অবস্থার কোনো পরিবর্তন নেই।
অপরদিকে একজন শিক্ষক ধনে গরীব হলেও মনের দিক থেকে পর্বতসম বিশাল, আকাশসম উদার। তার সংসারে সবসময় টানাপোড়েন থাকে। কিন্তু একজন শিক্ষক সেই টানাপোড়েনের সংসারটাকে হাসি মুখেই চালিয়ে নিচ্ছেন কোনো ধরনের অভিযোগ ছাড়াই। শিক্ষকেরা অল্পতেই তুষ্ট হন, যদি সমাজ তার যথাযথ সম্মানটুকু সমুন্নত রাখে। তারা দুঃখকে জয় করতে অজেয়, অসম্ভবকে সম্ভব করতে বদ্ধপরিকর। শিক্ষকেরা অন্যের আচ্ছাদিত কালোমেঘ সরিয়ে চাঁদের আলো উপহার দেন। তারা নিজের স্বার্থ বিসর্জিত এক মহামানব, চৌকস পথ প্রদর্শক। তাদের দায়িত্ব, কর্তব্য, সততা, সময়নিষ্ঠতা, মহানুভবতা, উদারতা এবং বিসর্জনের মত মহান গুণের সমষ্টিগত সংমিশ্রনের কারণে শিক্ষক সমাজের মর্যাদা পৃথিবীতে এত উপরে উঠে গেছে। এজন্যই তারা মহান, তারা শ্রেষ্ঠ, তারা সর্বজন শ্রদ্ধেয়। তাই একজন সন্তানের কাছে পিতা যতটুকু শ্রদ্ধার পাত্র, একজন শিক্ষকও ঠিক তেমনি। এজন্যই হয়তো বলে, ‘পিতা বানান ভূত, আর শিক্ষক বানান পুত।’
মানুষের মন তার বিবেক দ্বারা তাড়িত। বড় অনুশোচনার বিষয় যে, আজকাল সমাজের যৎসামান্যই অভিভাবক ও সমালোচক আছেন যারা শিক্ষকদের সুন্দর ও সাবলীল চলাফেরা নিয়ে কট্টরভাবে হাসিঠাট্টা করছেন। তাঁদেরকে নিয়ে অলিগলিতে, ফুটপাতে বা চায়ের স্টলে চরম তোষামোদের আসর জমিয়েছেন। তারা চায়ে চুমুক কিংবা পানখিলিয়ে ঢালাওভাবে কপটচারীতার পরিচয় দিয়ে যাচ্ছেন। এ ধরনের স্বল্পবুদ্ধিসম্পন্ন প্রতিবন্ধীর সংখ্যা খুব কম হলেও গলাবাজির গর্জে মাতোয়ারা পুরো সমাজ। তারা কোনো শিক্ষকের হাতে কখনো মাছ, মাংসের থলে অথবা একটু ভালো খাবার বা পোশাক দেখলেই তোষামোদ করে বলেন, ‘মাস্টর, কে দিলো এগুলো?’ ‘নাকি কিনেছ?’ ‘কতদিন পরপর কিনো?" ‘তোমরা মাস্টররা টাকা কোথায় পাও?’ ইত্যাদি ইত্যাদি অবাঞ্ছিত ও হাস্যকর প্রশ্ন করে শিক্ষকদের বিব্রত করেন। তারা কদাচিত বা কখনো শখের বসে স্কুলের বারান্দায় গেলেও বিদ্যার গন্ডি পেরিয়ে বেশিদূর এগুতে পারেন নি। কিন্তু অর্থ-প্রতিপত্তির গরিমা দেখিয়ে বারবার আঘাত করেন শিক্ষকদের প্রস্ফুটিত কোমল হৃদয়ে। আর অন্তরীক্ষে ক্ষত-বিক্ষত হৃদয়, লাঞ্ছনার উত্তাল সমুদ্রে হাবুডুবু খান অথচ বাহিরে সহস্র ফুলের সুভাষে সুভাষিত সৌরভ, পূর্ণিমার ঝলমলে জোছনা এবং নির্মল প্রাণের সতেজ হাসিতে বিশ্ব দাপিয়ে বেড়ান একজন মহান শিক্ষক। শিক্ষকের এমন পরিস্থিতিতে বলা যায়, শৈলপ্রপাতের বুক চেপে কান্নার নির্যাসটুকু কোনো রকম বের হয় ঠিকই, কিন্তু তাদের কষ্টটুকু আজো অজানাই রয়ে গেলো!
সবশেষে বলবো, চারপাশ নিয়েই আমাদের এ সমাজ। এখানে বাস করতে হলে চাহিদার শেষ নেই। কিন্তু একা একজন মানুষ সব চাহিদা পূরণে সক্ষম নয়। তাইতো বিভিন্ন শ্রেণি পেশার সৃষ্টি। ‘মসজিদের কাজ যেমন কোনো পুরোহিত করতে পারেন না, তেমনি মন্দির সম্পর্কে মৌলভীও অজ্ঞাত।’ তাই আমাদের মেনে নিতে হবে যে, শিক্ষকরাও এ সমাজের মানুষ।
লেখক : শিক্ষক।

 

শেয়ার করুন
উপ সম্পাদকীয় এর আরো সংবাদ
  • বিশ্ববিদ্যালয়ে সমন্বিত ভর্তি পরীক্ষা প্রসঙ্গে
  • স্যার ফজলে হাসান আবেদ
  • সামাজিক অবক্ষয় আয়শা আক্তার নিশু
  • রোহিঙ্গা সমস্যা সমাধানের পথ উন্মুক্ত হল
  • নারীর প্রতি দৃষ্টিভঙ্গি
  • মাতৃমৃত্যু ও শিশুমৃত্যু রোধে সাফল্যের পথে বাংলাদেশ
  • নারী নির্যাতন প্রসঙ্গ
  • বাংলাদেশ: আগামী দিনের স্বপ্ন দেখে
  • বৃক্ষনিধন রোধে চাই জনসচেতনতা
  • ইতিবাচক দৃষ্টিভঙ্গি
  • প্রসঙ্গ : সুন্দরী শ্রীভূমি
  • একই বচন পুনর্বার
  • নারী নিপীড়ন ও অপরাধ প্রসঙ্গ
  • সভ্যতার পেছনে দৃষ্টিপাত
  • উন্নয়নে বিশ্বের রোল মডেল
  • নতুন সূর্যের প্রত্যাশায়
  • ভেজাল ও নকল ওষুধের দৌরাত্ম্য
  • বকুল ফুলের মালা
  • লিবিয়ায় তুরস্কের সেনা মোতায়েনের কারণ
  • প্রসঙ্গ ফসলের ন্যায্যমূল্য
  • Developed by: Sparkle IT