উপ সম্পাদকীয়

সড়ক দুর্ঘটনা এবং সড়ক আইন-২০১৮

মো. রফিকুল ইসলাম প্রকাশিত হয়েছে: ০৮-১২-২০১৯ ইং ০০:৩১:৪৭ | সংবাদটি ১৪৯ বার পঠিত

আমাদের দেশে সড়ক পথে চরম বিশৃঙ্খলা বিরাজ করছে। দেশের সড়ক-মহাসড়কগুলো প্রতিদিন মানুষের রক্তে রঞ্জিত হচ্ছে। যার ফলে সড়কে মৃত্যুর মিছিল দীর্ঘ থেকে দীর্ঘতর হচ্ছে। এই মৃত্যুর মিছিল কবে থামবে, একমাত্র আল্লাহই ভাল জানেন। তাই যাত্রীরা মৃত্যুর পরওয়ানা মাথায় নিয়ে সড়কপথে চলাচল করছে।
আমাদের দেশ হচ্ছে পৃথিবীর সবচেয়ে দুর্ঘটনা প্রবণ দেশ। আমাদের দেশে প্রতি বছর যে পরিমাণ সড়ক দুর্ঘটনা ঘটে, বিশ্বের অন্য কোন দেশে এ পরিমাণ সড়ক দুর্ঘটনা ঘটেনা। আমাদের দেশে প্রতিবছর সড়ক দুর্ঘটনায় হাজার হাজার মানুষ মারা যায় এবং পঙ্গু হয় এর আরো কয়েক গুণ বেশী। এক কথায় সড়ক পথে যাত্রী এবং পথচারী কারো জীবন আজ নিরাপদ নয়। সড়ক দুর্ঘটনা কেবলই বৃদ্ধি পাচ্ছে কমার কোন লক্ষণ নেই। সড়কে রক্তের হুলি খেলা এবং কান্নার রোল থামছেনা। প্রতিদিন দেশের বিভিন্ন স্থানে সড়ক দুর্ঘটনায় নিহত এবং আহত মানুষের স্বজনদের কান্নায় আকাশ-বাতাস ভারি হলেও ড্রাইভার-হেলপারদের তাতে কিছু আসে যায় না। কারণ, ড্রাইভার ও হেলপাররা কোন প্রকার নিয়ম-নীতি মানতে চায় না। শতকরা ৮০ ভাগ দুর্ঘটনা বেপরওয়া গতিতে গাড়ি চালানোর কারণে ঘটে থাকে। নিয়ম মেনে গাড়ি চালালে এত দুর্ঘটনা ঘটত না। তাছাড়াও ফিটনেসবিহীন গাড়ি এবং অদক্ষ ড্রাইভারও সড়ক দুর্ঘটনার জন্য বহুলাংশে দায়ী। আমাদের দেশের সড়কে চলাচলকারী অধিকাংশ গাড়ি পুরাতন এবং ফিটনেসবিহীন। আবার অনেক অদক্ষ ড্রাইভার পুলিশকে ঘুষ দিয়ে লাইসেন্স ছাড়াই গাড়ি চালাচ্ছে। যে কারণে সড়ক দুর্ঘটনা দিন দিন বৃদ্ধি পাচ্ছে।
ড্রাইভার-হেলপাররা যদি বেপরওয়া গতিতে গাড়ি না চালাত এবং নিয়ম মেনে গাড়ি চালাত, তাহলে শতকরা ৮০ ভাগ দুর্ঘটনা হ্রাস পেত এবং যাত্রীদের জীবন অনেকটা নিরাপদ হত। কাজেই ড্রাইভার ও হেলপারদেরকে আইন মেনে গাড়ি চালাতে বাধ্য করতে হবে এবং যে কোন মূল্যে সড়ক পথে যাত্রীদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে হবে। আবার কোন কোন সময় দেখা যায় যে, ড্রাইভার ও হেলপাররা বেপরওয়া গতিতে গাড়ি চালিয়ে পথচারীকে গাড়ি চাপা দিয়ে হত্যা করে। কখনোবা কথা কাটাকাটির জের ধরে হেলপার যাত্রীকে গাড়ি থেকে ধাক্কা দিয়ে নীচে ফেলে দেয় এবং ড্রাইভার ঐ যাত্রীকে গাড়ি চাপা দিয়ে হত্যা করে। এসব ঘটনা অহরহ সড়কপথে ঘটছে। এসব হত্যাকান্ডকে কোন অবস্থাতেই দুর্ঘটনা বলা যায় না বরং এগুলো স্পষ্ট খুন। এসব হত্যাকান্ডের জন্য দায়ী ড্রাইভার ও হেলপারদেরকে আইনের আওতায় এনে ফাঁসি দিতে হবে। নতুবা সড়ক দুর্ঘটনার নামে এসব হত্যাকান্ড কোন দিন বন্ধ হবে না।
আমাদের দেশে সড়কপথে শৃঙ্খলা প্রতিষ্ঠার দায়িত্বে আছে বিআরটিএ নামক সংস্থা। কিন্তু এই সংস্থাটি দুর্নীতিতে আকন্ঠ নিমজ্জিত বলে অভিযোগ প্রচুর। ঘুষ ছাড়া এখানে কোন কাজ হয় না। ড্রাইভিং লাইসেন্স নিতে, রোড পারমিট নিতে অথবা ফিটনেস সনদ নিতে এই সংস্থার অসাধু কর্মচারীদের মোটা অঙ্কের ঘুষ দিতে হয়। বিআরটিএ’র অফিসগুলোতে দালালদের উৎপাতও রয়েছে। বিআরটিএ’র অসাধু কর্মকর্তা-কর্মচারীদের ঘুষ দিয়ে গাড়ির মালিকরা রাস্তায় ফিটনেসবিহীন গাড়ি চালানোর অনুমতি লাভ করে এবং ড্রাইভাররা জাল লাইসেন্স দিয়ে গাড়ি চালায়। কাজেই বিআরটিএ’র দুর্নীতিবাজ এবং অসাধু কর্মকর্তা-কর্মচারীদের বিরুদ্ধে কঠোর শাস্তিমূলক ব্যবস্থা গ্রহণ করে বিআরটিএ’র অফিসগুলোকে দুর্নীতিমুক্ত করতে হবে। সড়কপথে পুলিশের বিরুদ্ধে চাঁদাবাজীর অভিযোগও রয়েছে। এসব চাঁদাবাজ পুলিশদের বিরুদ্ধে কঠোর শাস্তির ব্যবস্থা করতে হবে।
পরিবহন মালিক ও শ্রমিকরা সড়কে শৃঙ্খলা ফেরাতে বারবার বাধার সৃষ্টি করে। সরকার যখন সড়কে শৃঙ্খলা ফিরিয়ে আনার জন্য কঠোর আইন করে তখনই পরিবহন মালিক ও শ্রমিকরা সরকারের বিরুদ্ধে আন্দোলন শুরু করে এবং তারা অযৌক্তিক পরিবহন ধর্মঘটের ডাক দিয়ে সারাদেশ অচল করে ফেলে। শেষ পর্যন্ত সরকার পরিবহন মালিক ও শ্রমিকদের নিকট নতি শিকার করে কঠোর আইন প্রয়োগ করা থেকে পিছপা হয়ে যান। যে কারণে সরকার সড়কে শৃঙ্খলা ফিরিয়ে আনতে পারেন নি। এক কথায় বলা যায় যে, সরকার পরিবহন মালিক ও শ্রমিকদের আন্দোলনের কারণে সড়কে শৃঙ্খলা ফিরিয়ে আনতে পারেননি-এটা সরকারের চরম ব্যর্থতা। এখন প্রশ্ন হচ্ছে পরিবহন মালিক ও শ্রমিকরা কি আইনের উর্ধ্বে? তারা মানুষ মারবে অথচ শাস্তি পাবে না-এটা তো সম্পূর্ণ অন্যায় কথা। কাজেই সরকার যদি পরিবহন মালিক ও শ্রমিকদের অযৌক্তিক আন্দোলনের কারণে সড়কে শৃঙ্খলা ফিরিয়ে আনার জন্য কঠোর আইন প্রয়োগ করতে না পারেন, তাহলে দেশে কোন দিন আইনের শাসন প্রতিষ্ঠিত হবে না এবং সড়কে কোন দিন শৃঙ্খলা ফিরে আসবেনা। কাজেই সরকারের উচিত যে কোন মূল্যে কঠোর আইন বাস্তবায়ন করে সড়কে শৃঙ্খলা ফিরিয়ে আনা এবং যাত্রী ও পথচারীদের জানমালের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা।
কঠোর আইনের বাস্তবায়ন ছাড়া সড়কে শৃঙ্খলা ফিরিয়ে আনা এবং সড়ক দুর্ঘটনা প্রতিরোধ করা সম্ভব নয়। গত বছরের অক্টোবর মাসে সরকার সড়ক আইন ২০১৮ সংসদে পাশ করেন। জনগণ আশা করেছিল এবার সড়কে শৃঙ্খলা ফিরে আসবে এবং নিরাপদ সড়ক নিশ্চিত হবে। কিন্তু এক বছর পর গত পহেলা অক্টোবর থেকে সরকার যখন সড়ক আইন ২০১৮ বাস্তবায়নের ঘোষণা দিলেন, তখন পরিবহন মালিক ও শ্রমিকরা এর বিরুদ্ধে ধর্মঘটের ডাক দিয়ে দেশে অচলাবস্থার সৃষ্টি করল। যে কারণে সরকার সড়ক আইন ২০১৮ বাস্তবায়ন করা থেকে পিছু হটলেন এবং আগামী ৩০ শে জুন পর্যন্ত আইন বাস্তবায়ন স্থগিত ঘোষণা করলেন। সুতরাং ভবিষ্যতে এটা বাস্তবায়ন সরকারের জন্য কঠিন হয়ে গেল। কাজেই জনগণ নিরাপদ সড়কের যে আশা করেছিল সেই আশা সুদূর পরাহত। কারণ ভবিষ্যতে সরকার যখন এই আইন বাস্তবায়ন করতে চাইবে, তখন যে মালিক ও শ্রমিকরা আইনটি মেনে নেবে এর নিশ্চয়তা কোথায়? সংসদে পাশ করা আইন যদি সরকার কোন গোষ্ঠীর বা সংস্থার আন্দোলনের কারণে বাস্তবায়ন করতে না পারে, তবে এটা সরকারের ব্যর্থতা ছাড়া আর কিছুই নয়। তাই সরকারের উচিত যে কোন মূল্যে সড়ক আইন ২০১৮ বাস্তবায়ন করা, নতুবা জনগণের আদালতে সরকারকে একদিন জবাবদিহি করতে হবে।
লেখক : কলামিস্ট।

শেয়ার করুন
উপ সম্পাদকীয় এর আরো সংবাদ
  • বিশ্ববিদ্যালয়ে সমন্বিত ভর্তি পরীক্ষা প্রসঙ্গে
  • স্যার ফজলে হাসান আবেদ
  • সামাজিক অবক্ষয় আয়শা আক্তার নিশু
  • রোহিঙ্গা সমস্যা সমাধানের পথ উন্মুক্ত হল
  • নারীর প্রতি দৃষ্টিভঙ্গি
  • মাতৃমৃত্যু ও শিশুমৃত্যু রোধে সাফল্যের পথে বাংলাদেশ
  • নারী নির্যাতন প্রসঙ্গ
  • বাংলাদেশ: আগামী দিনের স্বপ্ন দেখে
  • বৃক্ষনিধন রোধে চাই জনসচেতনতা
  • ইতিবাচক দৃষ্টিভঙ্গি
  • প্রসঙ্গ : সুন্দরী শ্রীভূমি
  • একই বচন পুনর্বার
  • নারী নিপীড়ন ও অপরাধ প্রসঙ্গ
  • সভ্যতার পেছনে দৃষ্টিপাত
  • উন্নয়নে বিশ্বের রোল মডেল
  • নতুন সূর্যের প্রত্যাশায়
  • ভেজাল ও নকল ওষুধের দৌরাত্ম্য
  • বকুল ফুলের মালা
  • লিবিয়ায় তুরস্কের সেনা মোতায়েনের কারণ
  • প্রসঙ্গ ফসলের ন্যায্যমূল্য
  • Developed by: Sparkle IT