ইতিহাস ও ঐতিহ্য

বঙ্গভঙ্গের সূচনার ইতিহাস

বেলাল আহমদ চৌধুরী প্রকাশিত হয়েছে: ১১-১২-২০১৯ ইং ০০:১১:২৬ | সংবাদটি ১৭০ বার পঠিত

সমাজতন্ত্রী দেশ সোভিয়েট রাশিয়ার স্থপতি ভি, আই লেনিন-এর বক্তব্য বিশেষভাবে লক্ষণীয়। তিনি বলেছেন, “যেখানেই জনসাধারণ, সেখানেই রাজনীতির আরম্ভ, আর যে যেখানে কেবল কয়েক হাজার নয়- লক্ষ লক্ষ কোটি মানুষের বাস, সেখান হইতেই আরম্ভ হয় অতি গুরুত্বপূর্ণ রাজনীতি।” ইংরেজ আমলের সবচেয়ে চাঞ্চল্যকর বংগভংগের সম্পর্কে কিছুটা সংক্ষিপ্ত আলোকপাত করা অপরিহার্য। এখানে আরও উল্লেখ করতে হয় যে, ভি,আই লেনিন সগর্বে যে আপামর জনসাধারণের কথা বলেছেন, ইংরেজ আমলে বংগীয় এলাকায় সেই জনগোষ্ঠীর সংখ্যাগরিষ্ঠ অংশ হচ্ছে বঞ্চিত ও অবহেলিত বাঙালি মুসলমান এবং অবশিষ্টরা নি¤œবর্ণের হিন্দু সম্প্রদায়।
ইতিহাসের কেন্দ্রস্থলে আগ্নেয়গিরির উত্তপ্ত গলিত লাভা এবং চারদিক প্রজ্বলিত অগ্নিশিখা। এই বহ্নিশিখায় লর্ড কার্জনের মতো জাঁদরেল ইংরেজ গভর্ণর জেনারেলের ভবিষ্যৎ ভস্মীভূত হয়েছে আর ঢাকার সন্তান নবাব সলিমুল্লাহ মন:কষ্টে মৃত্যুবরণ করেছেন।
বঙ্গ-বিভাগের চিন্তার সূত্রপাত কিভাবে হয়েছিলো সে ব্যাপারে ঐতিহাসিক ঘটনার আলোকপাত করা হল। ইতিহাস গেটে জানা যায় যে, লর্ড কার্জন বঙ্গভঙ্গের চিন্তার উদগাতা ছিলেন না। যে ইংরেজি সিভিলিয়ান কর্মচারীর মাথায় সর্বপ্রথম এই বংগভংগের প্রয়োজনীয়তা অনুভূত হয়েছিলো তাঁর নাম স্যার এ্যান্ডু হেন্ডারস ফ্রেসার (১৮৪৮-১৯১৯)। ১৮৬৯ খ্রীষ্টাব্দে ফ্রেসার ভারতীয় সিভিল সার্ভিসে প্রবেশ করেন। ১৮৭১ খ্রীষ্টাব্দ থেকে ১৮৯৮ খৃষ্টাব্দ পর্যন্ত একনাগাড়ে ২৭ বছর মধ্য প্রদেশে চাকরির পর তিনি কিছুদিন কলিকাতাস্থ ভারত সরকারের স্বরাষ্ট্র সচিব ছিলেন এবং একই বছর ১৮৯৮ খ্রীষ্টাব্দে মধ্য প্রদেশে চীফ কমিশনারের দায়িত্ব লাভ করেন।
১৯০৩ খ্রীষ্টাব্দে হেন্ডারসন ফ্রেসার তৎকালীন গভর্ণর জেনারেল লর্ড কার্জনের অধীনে বেঙ্গল ফোর্ট উইলিয়াম প্রেসিডেন্সীর লেফটেন্টে গভর্ণর পদে অধিষ্ঠিত হন। ভারতের বিশিষ্ট ইংরেজি দৈনিক ‘টাইমস অব ইন্ডিয়া’র অন্যতম সহকারী সম্পাদক (১৯০৭-১৯২২) এবং পরবর্তীতে প্রধান সম্পাদক ল্যোভাট ফ্রেসার তাঁর রচিত ‘ইন্ডিয়া আন্ডার কার্জন এ্যান্ড আফটার’ গ্রন্থে এ মর্মে তথ্য প্রকাশ করেছেন যে, ১৯০১ সালের ফেব্রুয়ারি মাসে মধ্য প্রদেশের চীফ কমিশনার হিসেবে স্যার এ্যান্ডু ফ্রেসার সম্বলপুর জেলার কোর্টের ভাষা ওডিয়ার পরিবর্তে হিন্দি করার অনুমতি চেয়ে গভর্ণর জেনারেল কার্জনের কাছে যে চিঠি লিখেছিলেন সেই চিঠিতে প্রসঙ্গত: সুপারিশ করেছিলেন যে, প্রশাসনিক কাজের বৃহত্তর স্বার্থে অবিলম্বে বেঙ্গল প্রেসিডেন্সী থেকে উড়িষ্যাকে বিচ্ছিন্ন করে মধ্য প্রদেশের সংগে সংযুক্ত করা বুদ্ধিমত্তার পরিচায়ক হবে। কিন্তু ভারত সরকারের তৎকালীন কৃষি সচিব বি ফুলার এবং স্বরাষ্ট্র সচিব জে পি হেওয়েট বেংগল প্রেসিডেন্সী থেকে উড়িষ্যাকে বিচ্ছিন্ন করার প্রস্তাবে সরাসরি বিরোধিতা করে ফাইলে যথাক্রমে ১৯০২ সালের ২৩শে এবং ২৯শে জানুয়ারি স্বহস্তে নোট লিপিবদ্ধ করেন। (কার্জন কালেকশন: খন্ড ২৪৭)। ল্যোভাট ফ্রেসার আলোচ্য গ্রন্থে আরও উল্লেখ করেছেন যে, এই গুরুত্বপূর্ণ ফাইলটি নোট সহকারে গভর্ণর জেনারেলের টেবিলে উপস্থাপিত হতে প্রায় ১৪ মাসের প্রয়োজন হওয়ায় লর্ড কার্জন কটাক্ষপূর্ণ মন্তব্য লিপিবদ্ধ করেন। ইতিমধ্যে ইংরেজ ভারতের বেরার অঞ্চল অন্তর্ভূক্ত হলে সব ক’টি ইংরেজ শাসিত প্রদেশের সীমানা পুন: নির্ধারণের লক্ষ্যে জরুরী আলোচনার প্রয়োজনীয়তা দেখা দেয়। ফলে এক উচ্চ পর্যায়ের সম্মেলন অনুষ্ঠিত হয়। লেখক ও সাংবাদিক লোভাট ফ্রেসারের মতে, এই সম্মেলনে স্যার এ্যান্ডু ফ্রেসার প্রদেশগুলোর সীমানা পুন: নির্ধারণকালে বেঙ্গল প্রেসিডেন্সীকে বিভক্ত করার পক্ষে সর্বপ্রথম যৌক্তিকতা প্রদর্শন করেন।
১৮৬২ খ্রীষ্টাব্দে যখন কোলকাতা হাইকোর্ট প্রতিষ্ঠিত হয়, তখন বেঙ্গল ফোর্ট উইলিয়াম প্রেসিডেন্সীর এলাকা ছিলো ২ লক্ষ ৪৬ হাজার ৭৮৬ বর্গমাইল (সূত্র এম কে ইউ মোল্লাঃ নিউ প্রভিন্স অব ইস্টার্ণ বেঙ্গল এ্যান্ড আসামঃ পৃ: ১৫) অর্থাৎ আসাম, পূর্ব বাংলা, পশ্চিম বাংলা, উড়িষ্যা, বিহার এবং ছোট নাগপুর এলাকা এই বেঙ্গল প্রেসিডেন্সীর অন্তর্ভূক্ত ছিলো। প্রশাসনিক কাজের সুবিধার জন্য ১৮৭৪ খ্রীষ্টাব্দের ১২ই সেপ্টেম্বর আসামকে পৃথক করে একজন চীফ কমিশনারের অধীনে ন্যস্ত করা হয়। অবশ্য এই চীফ কমিশনারও কার্যত: বেঙ্গল-এর লেঃ গভর্ণরের অধীনে ছিলেন এবং আসামের জন্য কোন আলাদা সার্ভিস করা হয়নি। এ সময় আসামের ৪১, ৭৯৮ বর্গমাইল এলাকা পৃথক করা সত্ত্বেও বিশাল বেঙ্গল প্রেসিডেন্সীর আয়তন দাঁড়ায় প্রায় ২ লাখ ৫ হাজার বর্গমাইল এলাকা এবং লোকসংখ্যা ৭ কোটি ৮০ লাখ। বঙ্গভঙ্গের প্রকৃত ইতিহাসের সূচনা তখন থেকেই।
১৭৫৭ সালের পলাশীর যুদ্ধ থেকে ১৯৪৭ সালের দেশ বিভাগ পর্যন্ত অর্থাৎ লর্ড রবার্ট ক্লাইভ পর্যন্ত এই উপমহাদেশে ইংরেজরা ১৯০ বছর ক্ষমতায় অধিষ্ঠিত ছিলো। এই সময়কালে বহু চাঞ্চল্যকর ঘটনার মধ্যে যে বিষয়ের ইতিহাসকে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ও সুদূরপ্রসারী হিসেবে চিহ্নিত সেটি হলো ইংরেজ বিরোধী অসংখ্য কৃষক বিদ্রোহ যা নি¤েœ বর্ণিত করা হলো।
১. সন্যাসী ও ফকির বিদ্রোহ ১৭৬৩-১৮০০ খ্রী:, ২. মেদিনীপুরের কৃষক বিদ্রোহ ১৭৬৬-১৭৮৩ খ্রী:, ৩. ত্রিপুরায় শমসের গাজীর বিদ্রোহ ১৭৬৭-১৭৬৮ খ্রী:, ৪. সন্দীপের কৃষক বিদ্রোহ ১৭৬৯ খ্রী:, ৫. কৃষক তন্তুবায়দের আন্দোলন ১৭৭০-১৭৮০ খ্রী:, ৬. পার্বত্য চট্টগ্রামে রামু খাঁর বিদ্রোহ ১৭৭৬-১৭৮৭ খ্রী:, ৭. নীলচাষীদের প্রথম বিদ্রোহ ১৭৭৮-১৮০০ খ্রী:, ৮. রেশমচাষীদের সংগ্রাম ১৭৮০-১৮০০ খ্রী:, ৯. রংপুরে নূরুলউদ্দিনের বিদ্রোহ ১৭৮৩ খ্রী:, ১০. যশোর-খুলনার প্রজা বিদ্রোহ ১৭৮৪-১৭৯৬ খ্রী:, ১১. বীরভূম-বাঁকুড়ার বিদ্রোহ ১৭৮৯-১৭৯১ খ্রী:, ১২. বাখরগঞ্জে বোলাকি শা’র বিদ্রোহ ১৭৯২ খ্রী:, ১৩. বীরভূম-বাঁকুড়ার ২য় বিদ্রোহ ১৭৯৮-১৭৯৯ খ্রী:, ১৪. করম শা’র নেতৃত্বে ‘পাগলপন্থী’ আন্দোলন ১৭৭৫-১৮০২ খ্রী:, ১৫. মেদিনীপুরে নায়েক বিদ্রোহ ১৮০৬-১৮১৬ খ্রী:, ১৬. ময়মনসিংহ পরগণায় কৃষক বিদ্রোহ ১৮১২ খ্রী:, ১৭. সন্দীপের কৃষক বিদ্রোহ ১৮১৯ খ্রী:, ১৮. ময়মনসিংহে ‘হাতীখেদা বিদ্রোহ’ ১৮০০-১৮৩০ খ্রী:, ১৯. মংমনসিংহে ‘পাগলপন্থী’দের বিদ্রোহ ১৮২৫-১৮২৭ খ্রী:, ২০. নীল চাষীদের সংগ্রাম ১৮৩০-১৮৪৮ খ্রী:, ২১. তীতুমীর-এর বিদ্রোহ ১৮৩১ খ্রী:, ২২. ‘পাগলপন্থীদের’ ৩য় বিদ্রোহ ১৮৩২-১৮৩৩ খ্রী:, ২৩. গারোদের বিদ্রোহ ১৮৩৭-১৮৮২ খ্রী:, ২৪. ফরিদপুরে ফারাজীদের অভ্যুত্থান ১৮৩৮-১৮৪৮ খ্রী:, ২৫. ত্রিপুরায় কৃষক বিদ্রোহ ১৮৪৪-১৮৯০ খ্রী:, ২৬. মহাজনদের বিরুদ্ধে সাঁওতাল বিদ্রোহ ১৮৫৫-১৮৫৭ খ্রী:, ২৭. সিপাহী বিপ্লব ১৮৫৭ খ্রী:, ২৮. নীল বিদ্রোহ ১৮৫৯-৬১ খ্রী:, ২৯. সিরাজগঞ্জের কৃষক বিদ্রোহ ১৮৭২-১৮৭৩ খ্রী:, ৩০. যশোরে নীল বিদ্রোহ ১৮৮৯ খ্রী:। বংগীয় এলাকায় অষ্টাদশ এবং ঊনবিংশ শতাব্দীতে ইংরেজ রাজশক্তি এবং জমিদার শ্রেণির বিরুদ্ধে একের পর এক রক্তক্ষয়ী কৃষক বিদ্রোহ সংঘটিত হয়েছে।
লে: গভর্ণর ফ্রেসার-এর লিখিত নোট এবং আলোচ্য সম্মেলনে উচ্চপদস্থ কর্মচারীদের বক্তব্য গভর্ণর জেনালের লর্ড কার্জনের চিন্তাধারাকে দারুণভাবে প্রভান্বিত করে। তিনি ১৯০২ সালের ২৪শে মে তারিখে লন্ডনে ভারত সচিব লর্ড জর্জ ফ্রান্সিস হ্যামিলটনের (১৮৪৫-১৯২৭) নিকট প্রেরিত প্রতিবেদনে প্রচ্ছন্ন অবয়বে বংগভংগর প্রস্তাব করেন। এক উত্তপ্ত পরিবেশে প্রশাসনিক কাজের সুবিধা এবং অনুন্নত এলাকায় সমৃদ্ধির কথা বর্ণনা করে ১৯০৫ সালের ১৬ই অক্টোবর ঘোষিত হলো ‘বংগভঙ্গ’।

শেয়ার করুন
ইতিহাস ও ঐতিহ্য এর আরো সংবাদ
  • শহীদ মিনারের ইতিকথা
  • সিলেটের লোকসংগীত : ধামাইল
  • পর্যটক ইবনে বতুতার কথা
  • বই এল কোথা থেকে?
  • লোক সাহিত্যে মননশীলতা
  • পার্বত্য সংকটের মূল্যায়ন
  • স্বাধীন বাংলাদেশে জনতার উদ্দেশ্যে প্রথম ভাষণ
  • সাচনাবাজার উচ্চ বিদ্যালয়
  • একাত্তরের শরণার্থীর স্মৃতি
  • আরব বিশ্বের অনন্য শাসক
  • জননেতা আব্দুস সামাদ আজাদ
  • বালাগঞ্জের আজিজপুর উচ্চবিদ্যালয়
  • হারিয়ে যাচ্ছে ডাকপিয়ন ও ডাকবাক্স
  • সুনামগঞ্জের লোকসংস্কৃতি
  • সিলেটে বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার আন্দোলন ও শাবি
  • মরমী কবি শেখ ভানু
  • মুক্তিযুদ্ধে কানাইঘাট
  • বিপ্লবী এম.এন.রায়
  • শতাব্দীর বন্দরে জামেয়া রেঙ্গা
  • রেফারেণ্ডাম ও সিলেটে বঙ্গবন্ধু
  • Developed by: Sparkle IT