ইতিহাস ও ঐতিহ্য

ঢাকার আকাশে প্রথম নারী

সেলিম আউয়াল প্রকাশিত হয়েছে: ১১-১২-২০১৯ ইং ০০:১৩:৩১ | সংবাদটি ১৯১ বার পঠিত

ঢাকার আকাশে উড়েছিলেন একজন তরুণী, একাকী। তরুণীটি ছিলেন বিদেশী, বেলুনে করে উড়েছিলেন তিনি। কিন্তু আকাশ থেকে নিরাপদে নেমে আসতে পারেননি ভূমিতে, মৃত্যু হয়েছিলো তার। ঢাকায়ই তাকে সমাধিস্থ করা হয়। হয়তো কেউ জানতে পারতো না সেই তরুণীর কথা, যদি গণিউর রাজা তার কথা লিখে না রাখতেন। গণিউর রাজা [জন্ম: ১৮৭৬ খ্রিষ্টাব্দ, ২২ আষাঢ় ১২৮৩ বাংলা, তেঘরিয়া, সুনামগঞ্জ, মৃত্যু: ১৯৩২ খ্রিষ্টাব্দ, ১৩৩৯ বাংলা] হচ্ছেন মরমি কবি হাসন রাজার বড়ো ছেলে এবং দার্শনিক দেওয়ান মোহাম্মদ আজরফের শ^শুর। তিনিও কবি ছিলেন, তিনটি খাতা ভরে তিনি গান লিখেছিলেন, নিজেই নাম দিয়েছিলেন ‘গণি সঙ্গীত’। ১৯৭৭ সালে তার একশ’টি গান দিয়ে একটি গানের বই বেরিয়েছিলো। ‘গণি সঙ্গীত’ নামের তার গানের বইটি সম্পাদনা করেছিলেন আবদুল হাই হাছন পছন্দ। গণিউর রাজা বাংলায় গান লেখতেন, আবার উর্দুতেও গান লেখতেন। তিনি দীর্ঘদিন সুনামগঞ্জ মিউনিসিপ্যালিটি ও লোকাল বোর্ডের সদস্য হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন। ১৯২২ খ্রিষ্টাব্দে তিনি ইংরেজ সরকারের কাছ থেকে খান বাহাদুর খেতাব লাভ করেন। ১৯২৫ থেকে ১৯৩২ পর্যন্ত তিনি অবৈতনিক হাকিমের দায়িত্ব পালন করেন।
দেওয়ান গণিউর রাজা গানের পাশাপাশি একটি আত্মজীবনীও লিখেছিলেন। গণিউর রাজা তার আত্মজীবনীতে পাঁচ বার ঢাকা ভ্রমণের কথা উল্লেখ করেছেন। প্রথমবার ‘আনুমানিক সম্ভবতঃ ১২৯৯ সনের ফাল্গুন মাসে পড়ার উদ্দেশ্যে শহর ঢাকায় প্রথম যাওয়া হয়। তৎকালে সঙ্গে মৃত সেখ পাওপুছা ও মৃত সেখ নাজিমকে নেওয়া হয়। প্রায় ৪০ বৎসরের কথা সঠিক মনে পড়িতেছে না তবে যে পর্যন্ত মনে পড়িতেছে তাহাই লিখিত হইবে। বোধহয় অনুমান প্রথম দিবস অধিক রাত্রে মার্কুলি পৌঁছিয়া, সে স্থানেই স্টীমারে রাত্রি যাপন করিতে হইয়াছিল, সে স্থানে স্টীমার বদলি হইয়াছিল কিনা মনে নাই। অতি ভোরে বা রাত্রাংশ থাকিতে বোধ হয় স্টীমার ছাড়িয়াছিল।’ কিন্তু পড়াশোনা আর হয়ে উঠেনি গণিউর রাজার। তিনি আবার ফিরে আসেন সিলেটে। দ্বিতীয়বার ‘সম্ভবতঃ ১৩০০ বাঙ্গালার ফাল্গুন মাসের ১ম ভাগে নি¤œলিখিত ব্যক্তিগণসহ আমার ভগ্নীত্রয়ের বিবাহের বাজার করার নিমিত্ত শহর ঢাকায় রওয়ানা হই।’ দ্বিতীয় যাত্রায় গণিউর রাজার সহযাত্রী ছিলেন সিলেট শহরের সদাগরটুলা নিবাসী আবদুল আজিজ খাঁ ওরফে ছুবা মিয়া, মশ্রব আলী ওরফে উদাই মিয়া, সুনামগঞ্জের তেঘরিয়া নিবাসী সেখ কলন্দর। তৃতীয়বার ‘সম্ভবতঃ ১৩০২ কি ১৩০৩ বাংলার কিংবা আনুমানিক ১৩০৪ বাংলার চৈত্র কি বৈশাখ মাসের ১ম ভাগে সেখ লরু উরফে টেকইর বাপকে সঙ্গে লইয়া পৈন্দা নদী দিয়া ইতনা স্টেশন হইয়া নারায়ণগঞ্জ যাই ও নারায়ণগঞ্জ হইতে ট্রেনযোগে শহর ঢাকায় পৌঁছি।’ চতুর্থবার ‘সন ১৩০৫ বাংলার ফালগুন কি চৈত্র মাসে আমার স্ত্রী বিয়োগের ৩/৪ মাস পর এক দিবস ৭টা ৮টার সময় বগার বাপের বাড়ি বসিয়া গাঁজা খাইতেছিলাম, হঠাৎ ভাটীয়াল স্টীমারের হুইছেল আমার কর্ণে প্রবেশ করিল, আমি ৫/৭ দিন পূর্ব হইতেই মনে ২ স্ত্রী বিয়োগজনিত দুঃখে দুঃখিত হইয়া ও নানা অসুবিধায় পড়িয়া বিদেশ যাওয়ার কল্পনা মনোমধ্যে করিয়াছিলাম। ও আগামীকল্য ভাটীয়াল জাহাজে ঢাকায় একা চলিয়া যাইব বলিয়া সঙ্কল্প করিয়াছিলাম। স্টীমারের হুইছেল শুনামাত্রই গাঁজার কল্কি বগার বাপের হাতে দিয়া তাহার বাড়ি হইতেই পূর্বমূখী ‘পাগলা’র সড়কে উঠিলাম। উঠিয়াই উত্তরমুখী গোদামঘাটে গেলাম। গিয়া নরায়ণগঞ্জের টিকেট কিনিলাম, বগার বাপ ও মসতী আমার সঙ্গে ঢাকা যাইবে বলিয়া উভয়েই অতিশয় কাকুতি-মিনতি করিতে লাগিল। কিন্তু আমি তাহাতে কান না দিয়া কাহাকেও সঙ্গে নিব না বলিয়া প্রতিজ্ঞা করিলাম। সঙ্গে নিলাম মাত্র ১ খানা কম্বল, যাহা নিচে বিছাইয়াছিলাম। ও নিলাম একটা ইলেকট্রিক বেটারীর বাক্স ও একটি মখমলের চৌগা, যাহা দ্বারা রাস্তায় বালিশের কাজ লইয়াছিলাম, একখানা জরীর শাল, পরনে ছিল একখানা ধুতি, গায়ে ছিল একটি ওয়াস্কোট, গলায় ছিল আমার পিতৃব্যের সময়ের একছড়া তছবী, ধুতি খুটে বাঁধা ছিল ৫৫, পাঁচপঞ্চাশটি টাকা, ওয়াস্কোটোর পকেটে ছিল ২০০ দুইশত টাকার নোট, হাতে ছিল একটি বেতের গল্লা, এইমাত্র দ্রব্যাদিসহ রওয়ানা হইলাম।’ গণিউর রাজার শেষবারের ঢাকা ভ্রমণ ছিলোÑ‘সন ১৩১২ বাংলার ১২ ই ভাদ্র তারিখে আমার কনিষ্ঠা ভগিনী রওসান আক্তার বানু উরফে বাদশার মা স্বর্গারোহণ করেনÑতাহার স্বর্গারোহণের প্রায় দুইমাস পর আমিও আমার সঙ্গে রাজ সরকারের পুত্র মায়ার বাপকে সঙ্গে লইয়া একত্রে ঢাকা শহরে রওয়ানা হই।’
গণিউর রাজার আত্মজীবনী সংগ্রহ প্রসঙ্গে মুনতাসির মামুন লিখেছেনÑ‘গণিউর রাজার এই রচনাটির প্রতি প্রথম আমার দৃষ্টি আকর্ষণ করেছিলেন, ‘বিচিত্রা’র নির্বাহী সম্পাদক জনাব শাহরিয়ার কবির। তিনিই গণিউর রাজার আত্মীয় জনাব মমিনুল মউজদীনকে ভার দিয়েছিলেন, মূল রচনা থেকে ঢাকার অংশটুকু কপি করে দেওয়ার জন্য। এরপর আমার একটি সংক্ষিপ্ত ভূমিকাসহ তা ছাপা হয়েছিল সাপ্তাহিক বিচিত্রায়। শিরোনাম ছিলÑউনিশ শতকের ঢাকার সমাজচিত্র: দেওয়ান গণিউর রাজার রোজনামচা থেকে। ’
গণিউর রাজার আত্মজীবনী সম্পর্কে মুনতাসির মামুনের মন্তব্যÑ‘এই আত্মজৈবনিক রচনা থেকে ফুটে ওঠে ক্ষুদে জমিদারদের জীবন প্রণালী। তাদের দৈনন্দিন জীবনের প্রায় পুরো সময়টাই অতিবাহিত হতো ভোজন, সহবাস এবং নিদ্রায়। জানতে পারি, নব্বই দশকের ঢাকা শহর সম্পর্কে। এটা ঠিক গণিউর রাজা যদি শহরের পথঘাট এবং অন্যান্য বিষয়ের বর্ণনা করতেন তাহলে আমরা আজ আরও উপকৃত হতাম। কিন্তু আমাদের মনে রাখতে হবে, গণিউর রাজা প্রায় সময়ই ঢাকায় এসেছিলেন একই উদ্দেশ্যে এবং অন্য কোন বিষয়ে নজর দেওয়ার অবকাশ তাঁর ছিল না। তাই একই বিষয়ের বর্ণনা বার বার ঘুরে ফিরে এসেছে তাঁর লেখায়। কিন্তু এখানে উল্লেখ্য যে, বাংলা ভাষায় এ ধরনের অশপট আত্মজৈবনিক রচনা আর লেখা হয়েছে বলে আমাদের জানা নেই।’
গণিউর রাজা তার আত্মজীবনীতে ঢাকায় বিভিন্ন বাইজির বাড়িতে তার নিত্য যাতায়াত কাহিনী বর্ণনা করায় সেই সময়ের ঢাকার সাংস্কৃতিক জীবনের একটি চিত্র ফুটে উঠেছে। তার আত্মজীবনী মুনতাসীর মামুন তার ‘স্মৃতিময় ঢাকা’ গ্রন্থে ‘গণিউর রাজার ঢাকা ভ্রমণ’ শিরোনামে প্রকাশ করেছেন। এই আত্মস্মৃতির সূত্র ধরেই আবিস্কৃত হয়েছে ঢাকার আকাশে প্রথম কোন নারী পরিভ্রমণ করেছিলেন।
গণিউর রাজা প্রথমবার ঢাকা যান বাংলা ১২৯৯ সন, অর্থাৎ ১৮৯২ খ্রিষ্টাব্দ। সেই প্রথমবার ঢাকা সফরকালে তিনি ঢাকার আকাশে একজন তরুণীকে উড়তে দেখেছিলেন। আকাশে ওড়ার জন্যে তাকে দশ হাজার টাকা দিয়ে বিদেশ থেকে আনা হয়। গণিউর রাজা তাঁর আত্মজীবনীতে উল্লেখ করেছিলেন ঢাকার আহসান মঞ্জিল সংলগ্ন বুড়িগঙ্গার দক্ষিণ তীর থেকে একজন বিদেশী মহিলাকে বেলুনে চড়ে আকাশে উড়েছিলেন। হাজার হাজার মানুষের উপস্থিতিতে সেই মহিলা বিশালাকার একটি বেলুনের নীচে ঝুলানো দোলনায় বসে আকাশে উড়েন। তার পরনে ছিলো চুড়িদার পায়জামা, গেঞ্জির মতো জামা। বিদেশীনীর টার্গেট ছিলো আকাশ থেকে তিনি আহসান মঞ্জিলের ছাদে নামবেন। মহিলা বেলুন ছেড়ে প্যারাসুট দিয়ে নেমে আসার সময় আহসান মঞ্জিল থেকে আড়াই তিন মাইল দূরে রমনার বাগিচার একটি ঝাউ গাছে তার প্যারাসুট আটকে যায়, মহিলা অসহায়ভাবে ঝুলতে থাকেন।
গণিউর রাজা বর্ণনা করেছেনÑ‘সর্বপ্রথম সেইস্থানে গাড়ি দৌড়াইয়া ঢাকা শহরস্থ পুলিশের সাহেব উপস্থিত হন। তখন রাত্রি হইয়াছে, আকাশে মেঘ থাকায় অন্ধকারাচ্ছন্ন হইয়াছিল। তখন অনুমান ৭টা বাজিয়াছে। পুলিশের সাহেব তাহার সহচর কনষ্টেবল ইত্যাদিকে বলিলÑজলদি বাম্বু লও। তখন তাহারা বাঁশ আনিয়া ঐ গাছে লাগাইয়া দিল এবং সাহেব ঐ উড়নেওয়ালী মিসকে বলিতে লাগিল, মেম সাহেব ঐ বাম্বু অবলম্বন করিয়া গাছ হইতে নামিয়া পড়। কিন্তু মিস বলিল, আমার মা ও ভাইকে আনাও, রশি ও লেন্টন আনাও নতুবা আমি নামিতে পারিব না। কিন্তু পুলিশ সাহেব তাহাকে ধমকাইয়া জোর গলায় বলিতে লাগিল, বাম্বু মজবুত হেয়, কুচ পরওয়া নেই, উতার যাও, হাম লোক নীচে হেয়, তখন ঐ উড়নেওয়ালী মিস বাঁশ অবলম্বন করিয়া নামিতে আরম্ভ করিল। অর্দ্ধেক বাম্বু নামিলে পর বাম্বু ভাঙ্গিয়া গেল, ও মিস পাক্কা ভূমিতে পড়িয়া প্রাণত্যাগ করিল।’
গণিউর রাজা তার লেখায় ঘটনার সাল তারিখ উল্লেখ করেননি। কিন্তু ঢাকার আকাশে একজন মানুষের ওড়াওড়ি, তাও আবার নারীর আকাশ ভ্রমণ ইতোপূর্বে কোন বইয়ে বিষয়টি আসেনি। গণিউর রাজার আত্মজীবনীর সূত্র ধরে সামাজিক ইতিহাসের গবেষক শামীম আমিনূর রহমান অনেক ঘাটাঘাটি করে আবিস্কার করেন ঢাকার আকাশে পরিভ্রমণকারী প্রথম মানবী হচ্ছেন জিনেট ভান তাসেল। আমেরিকার সিনসিনাটির ওহাইতে তার জন্ম। ঢাকার সেন্ট টমাস গির্জায় রক্ষিত ডেথ রেজিস্ট্রারে দেখা যায় জিনেটের পেশা লেখা হয়েছে আকাশচারী (এয়ারোনট), মৃত্যু হয়েছিলো ১৮ মার্চ ১৮৯২ খ্রিষ্টাব্দে এবং মৃত্যুর কারণ দুর্ঘটনা। তখন তার বয়স ২৪ বছর। শামীম উল্লেখ করেছেনÑ‘সিলেটের খ্যাতিমান গীতরচয়িতা হাসন রাজার ছেলে গণিউর রাজা একবার ঢাকা এসেছিলেন। লিখেছিলেন তাঁর ঢাকার দিনপঞ্জি। সেই দিনপঞ্জিতেই প্রথম জিনেটের কথা জানতে পারি। গণিউর রাজা ঢাকায় এসে জিনেটের আকাশে ওড়ার ঘটনাটি নিজে দেখেছিলেন। তার লেখায় অবশ্য জিনেটের নাম, পরিচয় বা কোত্থেকে তিনি এসেছিলেনÑতার উল্লেখ ছিলো না। ঢাকার প্রথম আকাশচারী সম্পর্কে জানার কৌতুহল অদম্য হয়ে উঠল।’ বুঝা যাচ্ছে গণিউর রাজা তার আত্মজীবনীতে জিনেটের আকাশে ওড়ার কথা না লেখলে, ঢাকার আকাশে প্রথম উড়ে বেড়ানো মানবীর নামটি জানার জন্যে আমাদেরকে আরো কতোকাল অপেক্ষা করতে হতো কে জানে!

 

শেয়ার করুন
ইতিহাস ও ঐতিহ্য এর আরো সংবাদ
  • শহীদ মিনারের ইতিকথা
  • সিলেটের লোকসংগীত : ধামাইল
  • পর্যটক ইবনে বতুতার কথা
  • বই এল কোথা থেকে?
  • লোক সাহিত্যে মননশীলতা
  • পার্বত্য সংকটের মূল্যায়ন
  • স্বাধীন বাংলাদেশে জনতার উদ্দেশ্যে প্রথম ভাষণ
  • সাচনাবাজার উচ্চ বিদ্যালয়
  • একাত্তরের শরণার্থীর স্মৃতি
  • আরব বিশ্বের অনন্য শাসক
  • জননেতা আব্দুস সামাদ আজাদ
  • বালাগঞ্জের আজিজপুর উচ্চবিদ্যালয়
  • হারিয়ে যাচ্ছে ডাকপিয়ন ও ডাকবাক্স
  • সুনামগঞ্জের লোকসংস্কৃতি
  • সিলেটে বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার আন্দোলন ও শাবি
  • মরমী কবি শেখ ভানু
  • মুক্তিযুদ্ধে কানাইঘাট
  • বিপ্লবী এম.এন.রায়
  • শতাব্দীর বন্দরে জামেয়া রেঙ্গা
  • রেফারেণ্ডাম ও সিলেটে বঙ্গবন্ধু
  • Developed by: Sparkle IT