বিশেষ সংখ্যা

রাবেয়া খাতুন চৌধুরী এক ক্ষণজন্মা নারী

মুহিত চৌধুরী প্রকাশিত হয়েছে: ১২-১২-২০১৯ ইং ০০:৫২:৫৫ | সংবাদটি ১৬১ বার পঠিত

কিছু মানুষ মরে গিয়েও অমর হয়ে থাকেন তাঁর কর্মের মাধ্যমে। বেঁচে থাকেন মানুষের হৃদয়জুড়ে অনন্তকাল। তেমনি এক মহীয়সী নারীর নাম রাবেয়া খাতুন চৌধুরী। অর্থ আর প্রাচুর্য থাকার পরও যিনি অত্যন্ত স্বাভাবিক এবং সাধারণ মানুষের মতো জীবন যাপন করতে ভালবাসতেন। তিনি মনে প্রাণে বিশ্বাস করতেন বিলাসী জীবন যাপনের চেয়ে শিক্ষার আলোয় সমাজকে আলোকিত করা অনেক উত্তম।
উপমহাদেশের প্রখ্যাত দানবীর ড. রাগীব আলী শুরু থেকেই এক সফল ব্যবসায়ী হলেও তাঁর প্রতিটি সুকর্মে স্ত্রী রাবেয়া খাতুন চৌধুরীর উৎসাহ উদ্দীপনা ব্যাপক ভূমিকা রেখেছে।
সমাজের উন্নয়ন, শিক্ষা ব্যবস্থার উন্নয়ন ও গরীব দুঃখী মানুষের উন্নয়নে রাবেয়া খাতুন ছিলেন দানশীলতার অনন্য উদাহরণ।
দেশ মাটি ও মানুষের কল্যাণে দানবীর ড. রাগীর প্রতিষ্ঠা করেন ‘রাগীব রাবেয়া ফাউন্ডেশন’ যা মধুবন সুপার মার্কেটে অবস্থিত। এই ফাউন্ডেশন থেকে মানব কল্যাণে যে সব কার্যক্রম চালানো হয় বা হয়েছে তা এই উপমহাদেশে আর কেউ করেছে কি না এ নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে।
আমি ব্যক্তিগতভাবে ড. রাগীব আলী ও মহীয়সী নারী রাবেয়া খাতুন চৌধুরীকে শিক্ষা ক্ষেত্রে তাদের বলিষ্ঠ অবদান রাখার জন্য মনে প্রাণে শ্রদ্ধা করি। সিলেট কিংবা দেশে অনেক বিত্তশালী রয়েছেন কিন্তু তারা কয়জন এমন কাজ করেছেন। সিলেট শহরের ঐতিহ্যবাহী পুরাতন সকল শিক্ষ প্রতিষ্ঠান আমাদের হিন্দু সম্প্রদায়ের গুণি মানুষদের করা। মুসলমানদের মধ্যে ড. রাগীব আলী একমাত্র ব্যক্তি যিনি সবচেয়ে বেশি শিক্ষা প্রতিষ্ঠান সিলেটসহ সারা দেশে করেছেন। আর সেজন্য দেশ-বিদেশের গুণী মানুষেরা ড. রাগীব আলীর প্রশংসায় পঞ্চমুখ।
বিশিষ্ট অর্থনীতিবিদ,বাংলাদেশ উন্নয়ন পরিষদের সাবেক চেয়ারম্যান ড.কাজী খলীকুজ্জামান আহমদ বলেন ‘এই বয়সেও তিনি কর্মচঞ্চল। নিরলস পরিশ্রমী। ব্যক্তিগত জীবনে তিনি সহজ সরল ও অনাড়ম্বর জীবন যাপন করেন। তিনি কাজের মধ্যে ডুবে থাকতে ভালোবাসেন। রাগীব আলী একজন দানশীল ও শিক্ষানুরাগী ব্যক্তি। এরকম লোকের সংখ্যা দেশে যত বাড়বে, দেশের জন্য ততই মঙ্গল। ’
পশ্চিমবঙ্গের বরেণ্য লেখক-ঔপন্যাসিক সুনীল গঙ্গোপাধ্যায় বলেন ‘একজন রাগীব আলীর কথা শুনে আমি মুগ্ধ ও বিস্মিত হয়ে পড়ি। এ যুগেও এমন সম্ভব? চতুর্দিকে ঈর্ষা,ক্ষুদ্রতা, লোভ ও স্বার্থপরতার নানান কদর্য রূপ দেখতে দেখতে একসময় মানুষ সম্পর্কে নৈরাশ্য এসে যায়। হঠাৎ এরকম কোনো মানুষের কথা শুনলে আবার আশা জাগে।’
সাবেক ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী টনি ব্লেয়ার দানবীর ড. রাগীব আলী সম্পর্কে বলেন

You have certainly acted most charitably towards those less fortunate than yourself and a great many people have benifited from your kind and worthwhile endeavours to improve their lives.You set an outstanding example,which I trust that others might follow.
মহীয়সী নারী রাবেয়া খাতুন চৌধুরী সর্ম্পকেও কবি, সাহিত্যিক, সাংবাদিক ছাড়াও সমাজের বিশিষ্টজনেরা অসংখ্য অগণিত কবিতা ও প্রবন্ধ লিখেছেন। প্রকাশ হয়েছে অনেক গ্রন্থ। এই সব লেখায় ফুটে উঠেছে রাবেয়া খাতুন চৌধুরীর মানবিক মূল্যবোধ, সামাজিক কর্মকান্ডসহ বিস্তারিত জীবন আলেখ্য।
দানবীর ড. রাগীব আলীও লিখেছেন। তিনি তাঁর 'আমার জীবন আমার স্মৃতি‘ গ্রন্থে স্ত্রী সম্পর্কে এভাবে লিখেছেন-
'মনে ভয় ছিল, একটি অভিজাত পরিবারের মেয়ে হঠাৎ শহর থেকে গ্রামে এসে নতুন পরিবেশে খাপ খাওয়াতে পারবে কী না। আল্লাহর রহমতে রাবেয়া নিজগুণে তাঁর শ্বশুর-শাশুড়ি, দেবর ভাসুর, আত্মীয়-স্বজনকে আপন করে নিলেন। মাইজি অনেক খুশি হলেন তাঁর পুত্রবধূর আচার-ব্যবহারে। ....বুঝলাম আল্লাহতায়ালা আমাকে এক গুণবতী স্ত্রীরতœ দান করেছেন। আমি কর্মপাগল মানুষ। স্ত্রীকে পেলাম আমার সকল কাজের সাথী হিসেবে।'
আরেক জায়গায় দানবীর ড. রাগীব আলী স্ত্রী সর্ম্পকে বলেছেন এভাবে-
‘রাবেয়া খাতুন চৌধুরী একাধারে আমার সহধর্মিণী এবং সহযোদ্ধা। আমার দীর্ঘপথ পরিক্রমায় তাঁর অসামান্য অবদানের কথা আমি বারবার স্বীকার করি। অগাধ ভালোবাসাময় তাঁর কর্মস্পৃহা আমাকে তাঁর প্রতি অগাধ শ্রদ্ধাশীল করে তোলে। জীবন চলার পথে আমি রাবেয়া খাতুনের যে অসীম সহযোগিতা পেয়েছি, তা খুব কম স্বামীরই ভাগ্যে জোটে। এ অনিন্দ্য বিষয়টি রোমন্থন করলে আমার খুব বেশি গর্ববোধ হয়, শ্রদ্ধায় ভালোবাসায় আবেগে আপ্লুত হয়ে পড়ি।’
দানবীর ড. রাগীব আলী এবং বেগম রাবেয়া খাতুন চৌধুরী মধ্যে ছিলো পারস্পরিক শ্রদ্ধাবোধ, বিশ্বাস আর অঘাত ভালোবাসা। সকল ক্ষেত্রে রাগীব আলী পেয়েছেন স্ত্রীর সাহচর্য। আর সেজন্য তিনি যে কাজে হাত দিয়েছেন তাতে সফল হয়েছেন। স্ত্রী বেগম রাবেয়া খাতুন চৌধুরীর প্রেরণায় সিক্ত রাগীব আলী এখনও এই বয়সে একজন যুবকের মতো দেশ-জাতি ও মানুষের জন্য কর্ম তৎপরতা চালিয়ে যাচ্ছেন। তাঁর মধ্যে যেন কোন ক্লান্তি নেই। তিনি বিশ^াস করেন কাজের মধ্যে বেঁচে থাকাই একজন মানুষের বড় সার্থকতা।
মহীয়সী নারী রাবেয়া খাতুন চৌধুরী উৎসাহে দানবীর ড. রাগীব আলীর প্রতিষ্ঠিত কয়েকটি প্রতিষ্ঠান:
লিডিং ইউনিভার্সিটি, জালালাবাদ রাগীব-রাবেয়া মেডিকেল কলেজ ও হাসপাতাল সিলেট, বেগম রাবেয়া খাতুন চৌধুরী নার্সিং কলেজ সিলেট, রাগীব-রাবেয়া হোমিওপ্যাথিক মেডিকেল কলেজ ও হাসপাতাল, মধুবন, রাবেয়া বানু জেনারেল হাসপাতাল রাগীবনগর, রাবেয়া খাতুন চৌধুরী জেনারেল হাসপাতাল সোনাসার, জকিগঞ্জ, রাবেয়া খাতুন মা ও শিশুকল্যাণ কেন্দ্র রাগীবনগর, রাগীব-রাবেয়া ডিগ্রী কলেজ রাগীবনগর, রাগীব-রাবেয়া হাইস্কুল ও কলেজ পানিউমদা, নবীগঞ্জ, রাগীব-রাবেয়া হাইস্কুল ও কলেজ লামাকাজী, বিশ্বনাথ, রাগীব-হাসান টেকনিক্যাল এন্ড বিজনেস ম্যানেজমেন্ট কলেজ কুমারখালি, কুষ্টিয়া, বরকল রাগীব-রাবেয়া কলেজ বরকল, রাগীব-রাবেয়া কাচালং টেকনিক্যাল ট্রেনিং সেন্টার, লংগদু, রাঙ্গামাটি, হাজী রাশীদ আলী হাইস্কুল দক্ষিণ সুরমা, সিলেট, রাগীব-মজিব হাইস্কুল নারায়নডহর, পূর্বধলা, নেত্রকোনা, রাগীব-রাবেয়া উচ্চ বিদ্যালয়, বালিউড়াবাজার, দোয়ারাবাজার, সুনামগঞ্জ, রাগীব আলী রেজিঃ প্রাইমারী স্কুল,রঘুপুর, বিশ্বনাথ, রাগীব-রাবেয়া ফুলকুঁড়ি প্রাইমারী স্কুল, রাঙ্গামাটি সদর, রাগীব-রাবেয়া বিদ্যানিকেতন, হাওলদারপাড়া, শাহজালাল রাগীব-রাবেয়া প্রতিবন্ধী ইনস্টিটিউট, শাহী ঈদগাহ, জামেয়া ইসলামিয়া রাগীবিয়া, পাঠানটুলা, রাগীব-রাবেয়া জামেয়া ইসলামিয়া, সিদাইরগুল, সাহেববাজার।
মসজিদ : রাগীব-রাবেয়া জামে মসজিদ, আহমদনগর, কমলগঞ্জ, মৌলভীবাজার, রাগীব-রাবেয়া জামে মসজিদ, উত্তরপাড়া, হাজীপুর, মাগুরা, রাগীব-রাবেয়া জামে মসজিদ, ইব্রাহিমপুর, তারুপাশা, রাজনগর, মৌলভীবাজার।
শিক্ষা ও গবেষণামূলক প্রতিষ্ঠান : রাগীব-রাবেয়া রিসার্চ সেন্টার, মাজবন, জকিগঞ্জ।
প্রেসক্লাব: দানবীর ড. রাগীর আলী শিক্ষা এবং সাংবাদিকতায় সিলেটকে এগিয়ে নিতে নানাভাবে কাজ করে যাচ্ছেন। সিলেট প্রেসক্লাবের বর্তমান ভবন নির্মাণের আগে তিনি একতলা ভবনটি নির্মাণ করে দিয়েছিলেন।
অনলাইন প্রেসক্লাব : ডিজিটাল বাংলাদেশকে এগিয়ে নিতে দানবীর ড. রাগীর আলী মধুবনস্থ সিলেট অনলাইন প্রেসক্লাবের অফিসটি দান করেন। তাঁর এই মহান কাজের জন্য সিলেট অনলাইন প্রেসক্লাবের ইতিহাসে তিনি কিংবদন্তি হয়ে বেচেঁ থাকবেন।
দেশ-জাতি ও মানুষের কল্যাণে দানবীর ড. রাগীর আলীর অবদান এই ক্ষুদ্র পরিসরে লিখে শেষ করা যাবেনা।
আমাদের সমাজে কিছু দুষ্ট লোক রয়েছে যারা মানুষের ভালো কাজকে সহ্য করতে পারেনা। এরা সব সময় গুনী মানুষদের বিতর্কিত করার চেষ্টা করে।
গরীব দুঃখী মানুষের বন্ধু, শিক্ষা-দীক্ষায় আলোকিত বাংলাদেশ গঠনের প্রাণ পুরুষ দানবীর ড. রাগীব আলীকে একটি মহল বহুদিন থেকে নানাভাবে বিতর্কিত করতে চেষ্টা করেছে। কিন্তু সফলকাম হতে পারেনি। রাগীব আলী তাঁর কর্মগুণে হিমালয়ের মতো স্থির এবং অবিচল আছেন থাকবেন মানুষের ভালোবাসায়।
বাংলাদেশে যেখানে কোটি কোটি টাকা পাচার হচ্ছে, লুটপাট হচ্ছে দেশের হাজার হাজার কোটি টাকা সেখানে রাগীব আলী বিদেশ থেকে টাকা এনে দেশে বিনিয়োগ করেছেন। এই বিনোয়োগের ক্ষেত্রে যে কোন ভুল-ত্রুটি হতেই পারে। একজন এনআরবি হিসেবে এটাকে স্বাভাবিক দৃষ্টিতে বিবেচনা করা যেতে পারে। তাঁর বিনোয়োগ শুধু অর্থ উপার্জন করা নয় সমাজ ও দেশের কল্যাণ করা একটি অন্যতম লক্ষ। যার প্রমাণ জালালাবাদ রাগীব-রাবেয়া মেডিকেল কলেজ ও হাসপাতাল। যেখানে প্রতি দিন হাজার হাজার মানুষ চিকিৎসা সেবা নিচ্ছে।
দানবীর ড. রাগীব আলীর পক্ষে এতো সব জনহিতমূলক কাজ করা সম্ভব হয়েছে মহীয়সী নারী রাবেয়া খাতুন চৌধুরী তাঁর পাশে থাকার জন্য।
রাবেয়া খাতুন চৌধুরী ২০০৬ সনের ১২ ডিসেম্বর ভোরবেলা মালনীছড়া চা বাগানের বাংলোতে হৃদরোগে আক্রান্ত হন। তাৎক্ষণিকভাবে তাঁকে জালালাবাদ রাগীব-রাবেয়া মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নেয়া হলে তিনি মহান মাবুদের ডাকে পরপারে চলে যান।
বরেণ্য শিক্ষানুরাগী এই মহীয়সী নারীর ইন্তেকালে সিলেটের সকল ক্ষেত্রে যে শূন্যতার সৃষ্টি হয়েছে তা সহজে পুরণ হওয়ার নয়। আমি দৃঢ়ভাবে বিশ^াস করি রাবেয়া খাতুন চৌধুরী মানুষের মনে চির দিন বেঁচে থাকবেন। আজকের এই দিনে প্রার্থনা করি মহান আল্লাহ রাব্বুল আলামীন যেন মানবতার কল্যাণে তাঁর সকল কর্মকে কবুল করেন।
লেখক : সভাপতি সিলেট অনলাইন প্রেসক্লাব

 

শেয়ার করুন

Developed by: Sparkle IT