বিশেষ সংখ্যা

তিনি বেগম রাবেয়া খাতুন চৌধুরী

এএইচএম ফিরোজ আলী প্রকাশিত হয়েছে: ১২-১২-২০১৯ ইং ০০:৫৭:৩৬ | সংবাদটি ১৭২ বার পঠিত

পৃথিবীতে অনেক মানুষ মরেও অমরত্ব লাভ করেছেন। সিলেটের এমন এক রমণীর নাম বেগম রাবেয়া খাতুন চৌধুরী। পরোপরোকারী, সমাজ হিতৈষী এ রমণীকে আজ আমরা তাঁর ত্রয়োদশ মৃত্যুবার্ষিকীতে গভীর শ্রদ্ধা ভরে স্বরণ করছি। তিনি দৈনিক সিলেটের ডাক পত্রিকার সম্পাদক মন্ডলীর সভাপতি দেশ বরেণ্য শিল্পপতি, চা-কর এবং অগণিত শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের প্রতিষ্ঠাতা দানবীর ড. রাগীব আলীর সহধর্মীনী ও দৈনিক সিলেটের ডাক এর সাবেক সম্পাদক ছিলেন। ২০০৬ সালের ১২ ডিসেম্বর বেগম রাবেয়া খাতুন চৌধুরী আকস্মিকভাবে হৃদরোগে আক্রান্ত হয়ে মালনীছড়া চা বাগানে শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করে সিলেটের হাজার হাজার মানুষকে শোক সাগরে ভাসিয়ে চির বিদায় নেন।
তাঁর মৃত্যুতে সিলেটের আকাশ বাতাস ভারী হয়েছিল সেদিন। তাঁকে এক নজর দেখার জন্য মানুষের ভীড় সামাল দেয়া কঠিন হয়ে পড়েছিল। তাঁর মৃত্যুর সংবাদে নিজেই মর্মাহত বেদনাহত হয়েছিলাম। বেগম রাবেয়া খাতুন চৌধুরী এমন একজন মা, যার কোন খারাপ দিক আছে বলে কোনদিন শুনিনি। তাঁর বেঁচে থাকার জীবন ছিল পূর্ণময় এবং সাদাশিধে। তিনি সারা জীবন মানুষের কল্যাণে কাজ করেছেন। মানুষের দুঃখ কষ্ট লাঘবে মানুষের পাশে আপনজনের মত দাঁড়াতেন। সব সময় তাঁর হৃদয় ছিল মানুষের কল্যাণে। অসহায় কোন নারী-পুরুষ কোন দিন খালি হাতে ফেরত যাননি। তাঁর আচার-আচরণ হাঁসি মুখে কথা বলায় মুগ্ধ হতেন সবাই। শিক্ষা, চিকিৎসা, গরিব মেয়েদের বিবাহ দেয়া এবং সমাজের কল্যাণে নিরলসভাবে কাজ করেছেন।
মেয়েদের বিবাহের আগে পিতার পরিচয়ে পরিচয় দেয়া হয়, আর বিবাহের পর মেয়ের পরিচয় হয়, স্বামীর পরিচয়ে। একজন সফল পুরুষ হতে গেলেই তাঁর পিছনে একজন সফল নারী অবশ্যই থাকতে হয়। বাংলাদেশের একজন সফল মানুষ হ"েছন, ড. রাগীব আলী। তিনি জীবনে যা সাফল্য অর্জন করেছেন এর মূল দাবিদার রাবেয়া খাতুন চৌধুরী। তিনি ছিলেন রাগীব আলীর সাফল্যের চাবি। জীবনে তাঁরা দু’জন একে অপরের সাথে পরামর্শ করে সংসার নামের তরী পরিচালনা করেছেন আজীবন। বাংলাদেশের সমাজ ব্যবস্থায় যেখানে সম্পদ আহরণের প্রতিযোগীতায় মানুষ নীতি নৈতিকতা ত্যাগ করছে, সেখানে দুজন মিলে দুহাতে সম্পদ বিলিয়ে দিয়ে মানব সভ্যতার ইতিহাসে এক অনন্য নজির স্থাপন করেছেন।
আমার জানা মতে, বিবাহিত জীবনের প্রথমদিকের দিনগুলো সুদূর লন্ডনে কেটেছে আত্মপ্রতিষ্ঠার সংগ্রামে। সেখানে স্বামীভক্ত রাবেয়া খাতুন পর্বতের ন্যায় দাঁড়িয়ে স্বামীকে সহায়তা করতেন। এক কন্যা ও এক পুত্রের জননী মমতাময়ী রাবেয়া খাতুন চৌধুরী ছেলে-মেয়েকে মানুষ করতে নিরলস প্রচেষ্টা করেছেন। সেখানে স্বামীর ব্যবসা বাণিজ্য ও সামাজিক কর্মকান্ডে কঠোর দৃষ্টি রাখতেন। ড. রাগীব আলী প্রচুর ধন-সম্পদের মালিক, চাইলে সারা জীবন পৃথিবীর উন্নত যেকোন রাষ্ট্রে বিলাস বহুল জীবন যাপন করতে পারতেন। কিন্তু দেশের টানে, নাড়ীর টানে আকৃষ্ট হয়ে পুণ্যভূমি সিলেটের মানুষের দুঃখ কষ্টের সাথী হয়েছেন। অসহায়, গরিব-দরিদ্র মানুষের উন্নয়নে ব্যক্তিগতভাবে বলিষ্ট ভূমিকা পালন করছেন। যে যাই বলুক না কেন রাগীব আলী মুক্তিযুদ্ধের অন্যতম একজন সংগঠক ছিলেন। মুক্তিযুদ্ধে তাঁর অবদান ইতিহাসে স্বাক্ষ্য বহন করে আছে। শিক্ষা প্রতিষ্ঠান, হাসপাতাল, রাস্তাঘাট, মুক্তিযোদ্ধাদের বাড়িঘর তৈরী করে দেয়া ছিল বেগম রাবেয়া খাতুন চৌধুরীর মূল কর্ম পরিকল্পনা। এ ধরনের মানব প্রেমী দম্পতি দেশে খোঁজে পাওয়া হয়ত যাবেনা। বেগম রাবেয়া খাতুন চৌধুরী একজন সহজ সরল মহিলা হলেও তাঁর হৃদয় ছিল খুব বড় মাপের। তাঁকে নিয়মিত ধর্মকর্ম পালন করতে দেখেছি। অমায়িক ব্যবহারের অধিকারী রাবেয়া খাতুনের অতিথি আপ্যায়ন করানো ছিল বড় একটি গুণ। যে দিন মালনি ছড়া চা-বাগান, ঢাকার বাসায় এবং তালিবপুর গ্রামের বাড়িতে গিয়েছি কোন দিন না খেয়ে আসতে পারিনি। পরিচিত বা অপরিচিত যে কেউ এককাপ চা পান না করে আসতে পারতেন না। রাবেয়া খাতুন বাসায় কিংবা বাড়িতে থাকার সংবাদ শুনলে ধনী গরিব নারী পুরুষের ভীড় জমে যেত। মানুষের সাথে কথা বলছেন চা বিস্কুট দি"েছন, একবার ভেতরে প্রবেশ করে, একজনকে সাহায্য দেয়ার পর অপরজন হাজির হ"েছন। এভাবে চলতো তাঁর দিন। কখনও কারো সাথে বিরক্তিমুলক আচরণ করতে দেখা যায়নি। গরিব মেয়েদের বিবাহ দেয়া, বাড়ি ঘর তৈরী, ছিন্নমূল মানুষকে কাপড়-চোপড় কিনে দেয়া ছিল তাঁর স্বভাব।
রাবেয়া খাতুন চৌধুরী ছিলেন একজন শিক্ষানুরাগী নারী। মালনী ছড়া চা বাগানে কয়েকটি এতিম শিশুকে রেখে লেখা পড়া শেখাতে দেখেছি। রাগীব-রাবেয়া মেডিকেল কলেজ সহ তাদের প্রতিষ্ঠিত অসংখ্য স্কুল মাদরাসা সিলেটের বিভিন্ন শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের ছেলে মেয়েদের কলেজের ভর্তি ফি, সেশন ফি, বেতন, খাতা-কলম বই পুস্তক কেনার আর্থিক সাহায্য করতে দেখেছি। এখনো শত শত শিক্ষার্থী কৃতজ্ঞচিত্তে তাঁর দানের কথা স্বীকার করেন। বেগম রাবেয়া খাতুন চৌধুরী এখন আমাদের মাঝে জীবিত না থাকলেও তাঁর নিঃস্বার্থ দান মানুষ ভুলতে পারছেনা। তিনি আর্ত-পিড়িত মানুষের সেবা করে সৃষ্টিকর্তার নৈকট্য লাভ করার চেষ্টা করেছেন। বিভিন্ন সময় অসহায় রোগীদের বিনা মূল্যে নিজ হাসপাতালে চিকিৎসা করার সুপারিশ করতেন। নীতি নৈতিকতা পারিবারিক শৃংখলা, মানুষের ভাল করার মন ছিল তাঁর। মানবতার সেবা করা ছিল তার চরিত্রের বড় বৈশিষ্ট্য।
পরিশেষে ছোট্ট একটি ঘটনার কথা উল্লেখ্য করে শেষ করছি। ১৯৯৯ সালের কথা, দিনটি ছিল শুক্রবার। মালনি ছড়া চা বাগানে ড. দানবীর রাগীব আলীর সাথে দেখা করতে গিয়েছিলাম, সামান্য সময়ের ব্যবধানে রাগীব আলী বাংলা থেকে গাড়ি নিয়ে বাগানে গিয়েছিলেন। বাংলায় যাওয়ার পর বেগম রাবেয়া খাতুন চৌধুরী এসে আমাকে সোফায় বসিয়ে দৈনিক সিলেটের ডাকের খোঁজ খবর নিতে চাইলেন। ঠিক সেই সময় ছেড়া ময়লাযুক্ত লুঙ্গী শার্ট পড়া তিনজন লোক বাংলায় এসে হাজির হলেন, তাদের দুজনের পায়ে কোন জুতা নেই। লম্বা কাচাঁ-পাকা চুল ও দাঁড়ি, মলিন চেহারা। রাবেয়া খাতুন এগিয়ে এসে তাদেরকে নিয়ে সোফায় বসিয়ে আলাপ আলোচনা শুরু করেন। এক পর্যায়ে তারা জানালেন তিনজনই মুক্তিযোদ্ধা। পকেট থেকে সনদ কাগজপত্র দেখিয়ে দুজনই আবেগ-আপ্লুত হয়ে কান্নাকাটি শুরু করলেন। একজন জানালেন তার উপযুক্ত বিয়ের মেয়ে টাকার অভাবে বিবাহ দিতে পারছেন না। অপর দুজনের ঘরের চালের ছাউনী নেই। তাই তারা রাবেয়া খাতুনের নিকট সহযোগিতার অনুরোধ করেন। তাদের মুখের কথা শুনে রাবেয়া খাতুন অনেক্ষণ তাদের দিকে তাকিয়ে রইলেন। তারপর দেখা গেল তাঁর চোখ দিয়ে টপ টপ করে চোখের পানি পড়ছে। কোন কথা না বলে বাংলার রুমের ভেতরে গিয়ে ১০ হাজার টাকা এনে একজনকে চার হাজার এবং অপর দুজনকে ৩ হাজার টাকা করে দিয়ে লুঙ্গি শাট জুতা এবং কাপড়-চোপড় কেনার পরামর্শ দেন এবং জনাব রাগীব আলীর সাথে আলোচনা করে পরবর্তীতে তাদের দুজনের ঘর নির্মাণ ও মেয়ে বিবাহ দেয়ার আশ্বাসও দিয়ে ছিলেন। তার এমন মহানুবতা দেখে, আমি সেদিন বিস্ময় চিত্তে তাকিয়ে ছিলাম। তিনজন মুক্তিযোদ্ধাকে এভাবে সম্মানীত করে বেগম রাবেয়া খাতুন চৌধুরী যেন মুক্তিযোদ্ধাদের মাতা হয়ে অমর হয়ে গেলেন। এঘটনায় তার প্রতি আমার শ্রদ্ধাবোধ অনেক গুণ বেড়ে যায়।
আমার বিশ্বাস তিনি বেঁচে থাকলে গরিব অসহায় মানুষ এবং সিলেটের মুক্তিযোদ্ধাদের উপকার হত সবচেয়ে বেশি। এ শুণ্যতা হয়ত আর কোন দিন পূরণ হওয়ার নয়। পরবর্তীতে জানতে পেরেছি তিনজন মুক্তিযোদ্ধার অনুরোধ তিনি রক্ষা করেছিলেন। আজ এই ঘটনাটি আমার বার বার মনে পড়ছে। আমি বেগম রাবেয়া খাতুন চৌধুরীর স্মৃতির প্রতি গভীর শ্রদ্ধা ভরে স্মরণ করছি।
লেখক : কলামিস্ট

শেয়ার করুন

ফেসবুকে সিলেটের ডাক

বিশেষ সংখ্যা এর আরো সংবাদ
  • বঙ্গবন্ধু ও জাতীয় কবি নজরুল
  • বঙ্গবন্ধুর জীবনালোচনায় কিছু কথা ও কাহিনী
  • বঙ্গবন্ধুকে কাছে থেকে দেখার টুকরো স্মৃতি
  • মুজিববর্ষের তাৎপর্য
  • মাতৃভাষা আন্দোলন ও সিলেট
  • ভাষাশহীদদের প্রতি কৃতজ্ঞতা : ইসলামি দৃষ্টিকোণ
  • দেশে বিদেশে গৌরবের শহীদ মিনার
  • বিশ্বজুড়ে বাংলা ভাষা চর্চা
  • মানুষ জন্মগত বিজয়ী, পরাজয় মানে না
  • মুক্তিযুদ্ধ ও নদী
  • আমাদের মুক্তিযুদ্ধ
  • তিনি আজও আমার সব কর্মের প্রেরণা
  • রাগীব আলীর উন্নয়নের পৃষ্ঠপোষক
  • একজন বিচক্ষণ সম্পাদক আমার মা
  • একজন মহীয়সী নারী
  • রাবেয়া খাতুন চৌধুরী ও সিলেটের ডাক
  • অনন্যা
  • স্মৃতিতে ভাস্বর রাবেয়া খাতুন চৌধুরী
  • বেগম রাবেয়া খাতুন চৌধুরী এক মহীয়সী নারীর কথা
  • তিনি বেগম রাবেয়া খাতুন চৌধুরী
  • Developed by: Sparkle IT