বিশেষ সংখ্যা

বেগম রাবেয়া খাতুন চৌধুরী এক মহীয়সী নারীর কথা

ওলীউর রহমান প্রকাশিত হয়েছে: ১২-১২-২০১৯ ইং ০০:৫৮:১৪ | সংবাদটি ১৯৯ বার পঠিত

এই পৃথিবীটা ক্ষণস্থায়ী। পৃথিবীকে বলা হয় ‘দুনিয়া’। আর ‘দুনিয়া’ শব্দের অর্থ হলো- অল্পক্ষণ। গোটা বিশ্ব-ভূবনের আয়ুই যেখানে ‘অল্পক্ষণ’ সেখানে মানুষের আয়ু আর কতক্ষণ হতে পারে। আমাদের জীবন-মৃত্যু মহান রবের কুদরতের ভিতরে। পবিত্র কোরআনের সূরা মুলকের ২নং আয়াতে বলা হয়েছে-‘যিনি জীবন ও মরণ সৃষ্টি করেছেন যাতে তিনি যাচাই করে নেন যে কে কর্মে উত্তম।’ মূলত এ পৃথিবীতে যারা ‘কর্মে উত্তম’ হয় তারা মরে ও অমর হয়ে থাকে, বেচে থাকে তারা বহুকাল পর্যন্ত মানুষের হৃদয়ে। আল্লামা শেখ সা’দি বলেন- ‘লাশ যখন মাটির সুপর্দ করা হয় তখন মাটি তাকে গিলে ফেলে, কিছু দিন পর তার আর কোন নাম নিশিানা পাওয়া যায় না, তবে নওশেরওয়া বাদশার নাম স্মরণীয় হয়ে আছে তার ন্যায়-বিচারের গুণে।’ বহু মানুষ আছে যারা এ নশ্বর পৃথিবী ছেড়ে চলে গেলেও তার মহানুভবতা, মানবতা, সততার ও কর্ম তৎপরতার কারণে আমরা জীবনের প্রতিটি পদক্ষেপে তাকে স্মরণ করি। এভাবে আমরাও একদিন এ পৃথিবীর মায়ার বাধন ছেড়ে চলে যেতে হবে কবর জগতের দিকে, তবে আমাদের জীবন ধন্য হবে যদি আমরা ভাল কাজ করে যেতে পারি, মানুষ আমাকে স্মরণ করবে, শ্রদ্ধা করবে, মনে রাখবে। আর আমাদের সৃষ্টিকর্তা মহান রাব্বুল আলামীন ও আমাদেরকে দয়া করবেন এবং মার্জনা করে দেবেন। বেগম রাবেয়া খাতুন চৌধুরী এমন এক মহীয়সী নারী যাকে আমরা আজ শ্রদ্ধাভরে স্মরণ করতে হচ্ছে তার কর্মের গুণে। তিনি চলে গেছেন কিন্তু তার সুকর্মসমূহ রেখে গেছেন আমাদের মাঝে যেগুলো তার কর্ম তৎপরতা, তার অবদান এবং স্মৃতিকে বহন করে চলেছে। এভাবে যদি মানুষ পৃথিবীতে সুকর্ম তথা ভাল কাজ রেখে যেতে পারে এবং তার মৃত্যুর পরও এই ভাল কাজগুলো সচল থাকে তাহলে কবর জগতেও সে এসব ভাল কাজের প্রতিদান পেতে থাকে।
উপমহাদেশের বিশিষ্ট দানবীর, ‘বাংলার হাতেমতাই’ শিল্পপতি ও দানবীর ড. রাগীব আলীর সহধর্মীনী বেগম রাবেয়া খাতুন চৌধুরী ২০০৬ সালের ১২ ডিসেম্বর এ পৃথিবীর মায়ার বাধন ছিন্ন করে চলে যান পর কালের না ফেরার জগতে। তিনি ছিলেন সিলেট অঞ্চলের গরীব দুঃখী দুস্থ-পীড়িত মানুষের এক একনিষ্ঠ বন্ধু। ইন্টার মিডিয়েডে অধ্যয়নরত অবস্থায় লন্ডন প্রবাসী রাগীব আলীর সাথে তার বিয়ে হয়। বিয়ের পর তিনি চলে যান বৃটেনে। সেখানে দীর্ঘ দিন অবস্থানের পর ফিরে আসেন নিজ জন্মভূমি সিলেটে। তিনি ছিলেন এক প্রকৃত মানব হিতৈষী। দুঃখী মানুষের মুখে হাসি ফোটানো তিনি সবচেয়ে বেশি পছন্দ করতেন। দেশের সেরা এক শিল্পপতির স্ত্রী হওয়া সত্ত্বেও তিনি একেবারে সাদা-সিধে জীবন যাপনে অভ্যস্থ ছিলেন, যা ছিল একজন প্রকৃত মানবতাবাদির অন্যতম গুণ এবং বৈশিষ্ট। তিনি বলতেন, ‘মানুষের জন্য কাজ করার মাঝেই আমি আনন্দ খুঁজে পাই।’
তার স্বামী দানবীর ড. রাগীব আলী আজ তার দানশীলতার কারণে প্রবাদ পুরুষে পরিণত হয়েছেন, তার জীবন, সম্পদ সবকিছু মানবতার কল্যাণে উৎসর্গ করে দিয়েছেন। এ জাতি তার অবদান কোন দিন ভূলতে পারবে না। একজন স্বামী তার স্ত্রীর সমর্থন ও সহযোগিতা ছাড়া হাতেমতাইয়ের মত দুই হাতে নিজের উপার্জিত সম্পদ মানুষের তরে বিলিয়ে দেওয়া কঠিন। স্বামীর অর্থ-বিত্তের উপর স্ত্রীর কর্তৃত্ব থাকে অনেক বেশি। এখানে কাকতালীয়ভাবে আল্লাহ তায়ালা দু’জন বড় মনের মানুষকে একত্র করে দিয়েছেন। স্বামী যেমন স্ত্রীও তেমন, দু’জনই মানবদরদী। স্বামীর মত স্ত্রীও জীবনের আনন্দ খোঁজে পেতেন মানব সেবায়। স্বামী-স্ত্রীর পবিত্র সম্পর্ককে চিরদিনের জন্য স্মরণীয় করে রাখার জন্য রাগীব আলী প্রতিষ্ঠা করেন রাগীব রাবেয়া ফাউন্ডেশন। এ প্রতিষ্ঠানের পক্ষ থেকে প্রতি বছর কোটি কেটি টাকা মানবতার কল্যাণে ব্যয় করেন। মসজিদ, মাদরাসা, স্কুল, কলেজ, মন্দির, এতিমখানা সহ সমাজের পিছিয়ে পড়া জনগোষ্ঠীর মধ্যে অকাতরে অর্থ-কড়ি বিলিয়ে দেওয়া হয় এই প্রতিষ্ঠানের পক্ষ থেকে। রাগীব-রাবেয়া ফাউন্ডেশনের মাধ্যমে দানবীর রাগীব আলী সারা দেশে বহু শিক্ষা প্রতিষ্ঠান প্রতিষ্ঠা করেছেন। কোন কোন প্রতিষ্ঠান স্বামী-স্ত্রী দু’জনের নামে নাম করণ করেছেন। এসব প্রতিষ্ঠানের মধ্যে উল্লেখযোগ্য কয়েকটি প্রতিষ্ঠান হলো- লিডিং ইউনিভার্সিটি সিলেট, জালালাবাদ রাগীব-রাবেয়া মেডিকেল কলেজ ও হাসপাতাল সিলেট, বেগম রাবেয়া খাতুন নার্সিং কলেজ সিলেট, রাগীব-রাবেয়া হোমিও প্যাথিক কলেজ ও হাসপাতাল মধুবন মার্কেট সিলেট, রাবেয়া বানু জেনারেল হাসপাতাল রাগীব নগর সিলেট, রাবেয়া খাতুন চৌধুরী জেনারেল হাসপাতাল সোনাসার, জকিগঞ্জ সিলেট, রাবেয়া খাতুন মা ও শিশু কল্যাণ কেন্দ্র রাগীব নগর সিলেট, রাগীব-রাবেয়া ডিগ্রী কলেজ রাগীব নগর, সিলেট, রাগীব-রাবেয়া হাইস্কুল ও কলেজ পানিউমদা, হবিগঞ্জ, রাগীব-রাবেয়া হাইস্কুল ও কলেজ লামাকাজি বিশ্বনাথ, রাগীব-রাবেয়া কাচালং টেকনিক্যাল ট্রেনিং সেন্টার, লংগদু, রাঙ্গামাটি, হাজী রাশিদ আলী হাইস্কুল দক্ষিণ সুরমা সিলেট, শাহজালাল রাগীব-রাবেয়া প্রতিবন্ধী ইনস্টিটিউট, শাহী ঈদগাহ, সিলেট, জামেয়া ইসলামিয়া রাগীবিয়া পাঠানটুলা সিলেট, রাগীব-রাবেয়া জামে মসজিদ আহমদনগর কমলগঞ্জ, মৌলভী বাজার। এছাড়া আরো বহু শিক্ষা প্রতিষ্ঠা করেছেন। অবশ্য দানবীর রাগীব আলীর এসব সুকর্মে তার মরহুমা স্ত্রী বেগম রাবেয়া খাতুন চৌধুরীর অসামান্য অবদান রয়েছে।
আমাদের সমাজে বহু শিল্পপতি আছেন, টাকাওয়লা আছেন কিন্তু দানশীলতা ও উদার মনের মানুষের অভাব রয়েছে। যেখানে আজ দেশের টাকা বিদেশে পাচার করে সম্পদের পাহাড় গড়া হচ্ছে সেখানে রাগীব-রাবেয়া দম্পতি দানশীলতার যে মহান নজীর স্থাপন করেছেন তা চির স্মরণীয় হয়ে থাকবে ইতিহাসের পাতায়। আজ মহিয়ষী নারী বেগম রাবেয়া খাতুন চৌধুরী পৃথিবীতে নেই কিন্তু তার নামে রয়েছে সারা দেশে প্রায় শতাধিক প্রতিষ্ঠান, এসব প্রতিষ্ঠান থেকে সমাজের সুবিধা বঞ্চিত হাজার হাজার শিক্ষার্থী শিক্ষা অর্জন করে নিজের জীবনকে আলোকিত করছে। অনুরূপ বহু মানুষের কর্মক্ষেত্র ও জীবীকার ব্যবস্থা ও হচ্ছে এসব প্রতিষ্ঠান থেকে। আজ বেগম রাবেয়া খাতুন চৌধুরীর মৃত্যু দিবসে আমরা তার আত্মার শান্তি ও মাগফেরাত কামনা করি এবং জীবনে তার সুকর্মগুলোর উত্তর প্রতিদান যেন মহান রাব্বুল আলামীন তাকে দান করেন এই কামনাও করি। এই সাথে বাংলার প্রবাদ পুরুষ, বঙ্গদানবীর ড. রাগীব আলীর দীর্ঘায়ু কামনা করি।
লেখক : প্রাবন্ধিক

 

 

 

 

 

 

শেয়ার করুন

ফেসবুকে সিলেটের ডাক

বিশেষ সংখ্যা এর আরো সংবাদ
  • বঙ্গবন্ধু ও জাতীয় কবি নজরুল
  • বঙ্গবন্ধুর জীবনালোচনায় কিছু কথা ও কাহিনী
  • বঙ্গবন্ধুকে কাছে থেকে দেখার টুকরো স্মৃতি
  • মুজিববর্ষের তাৎপর্য
  • মাতৃভাষা আন্দোলন ও সিলেট
  • ভাষাশহীদদের প্রতি কৃতজ্ঞতা : ইসলামি দৃষ্টিকোণ
  • দেশে বিদেশে গৌরবের শহীদ মিনার
  • বিশ্বজুড়ে বাংলা ভাষা চর্চা
  • মানুষ জন্মগত বিজয়ী, পরাজয় মানে না
  • মুক্তিযুদ্ধ ও নদী
  • আমাদের মুক্তিযুদ্ধ
  • তিনি আজও আমার সব কর্মের প্রেরণা
  • রাগীব আলীর উন্নয়নের পৃষ্ঠপোষক
  • একজন বিচক্ষণ সম্পাদক আমার মা
  • একজন মহীয়সী নারী
  • রাবেয়া খাতুন চৌধুরী ও সিলেটের ডাক
  • অনন্যা
  • স্মৃতিতে ভাস্বর রাবেয়া খাতুন চৌধুরী
  • বেগম রাবেয়া খাতুন চৌধুরী এক মহীয়সী নারীর কথা
  • তিনি বেগম রাবেয়া খাতুন চৌধুরী
  • Developed by: Sparkle IT