বিশেষ সংখ্যা

তিনি আজও আমার সব কর্মের প্রেরণা

ড. রাগীব আলী প্রকাশিত হয়েছে: ১২-১২-২০১৯ ইং ০১:০৬:২৯ | সংবাদটি ৩৭৮ বার পঠিত
Image

স্মৃতি তাড়ায় মানুষকে; সেটা সুখস্মৃতি কিংবা কষ্টের স্মৃতিই হোক। আজ থেকে এক যুগের বেশী আগে সংঘটিত আমার জীবনের একটি বিয়োগান্তক ঘটনার স্মৃতি আজও কাতর করে আমাকে। সেদিনও আজকের মতো দূর পাহাড়ের গা বেয়ে শীতল হাওয়া প্রকৃতিতে নেমে আসার প্রস্তুতি নিচ্ছিলো; আর দিন কয়েক পরেই ঝাপিয়ে পড়বে পৌষের শীত। ঋতুচক্রের ঠিক এমনই সন্নিক্ষণে আমার কাছ থেকে চলে যান আমার কর্মময় জীবনের একান্তসঙ্গী দূরে, অনেক দূরে। যেখান থেকে কেউ ফেরে না কোন দিন। ১৩ বছর আগে আজকের এই দিনে মৃত্যুর হিমশীতল কোলে ঢলে পড়েন আমার সহধর্মিনী আমার সব কাজে অনুপ্রেরণার উৎস রাবেয়া খাতুন চৌধুরী। সত্যি বলতে কি, তিনি আমার কর্মময় জীবনের ছায়াসঙ্গী হিসেবে আছেন এখনও। ইতোমধ্যেই চলে গেছে এক যুগের বেশী সময়, কিন্তু মনে হয় এই তো সেদিন তিনি ছিলেন আমার পাশে, অবচেতন মুহূর্তে মনে হয় এখনও তিনি আছেন আমার সাথেই। আমি কর্মেই ব্যস্ত থাকতে চাই; আমি বিশ্বাস করি সৎ কর্মেই মুক্তি, কর্মেই পাওয়া যায় ¯্রষ্টাকে। তাইতো জনসেবায় নিবেদিত রয়েছি সারা জীবন। আমার সময় কাটে দেশ, সমাজ আর রাষ্ট্রের কল্যাণে গড়ে তোলা বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান পরিচালনার কর্মযজ্ঞে। জনকল্যাণে গৃহীত বিভিন্ন পরিকল্পনা এবং গরীব-দুঃখীদের সাহায্যে যখন নিজেকে ব্যস্ত রাখি, তখনই তার অস্তিত্ব অনুভব করি। যখন আমার কর্মে-সাধনায় অনাকাংখিত প্রতিবন্ধকতা আসে, যখন চলার পথ কন্টকাকীর্ণ হয়ে ওঠে, তখনই চিত্রপটে ভেসে ওঠে তাঁর ছবি। তিনি যেন পরপারে থেকেও আমাকে শক্তি দিয়ে যাচ্ছেন, অনুপ্রেরণা দিয়ে যাচ্ছেন। তাঁর উৎসাহ-উদ্দীপনা ও প্রাণচাঞ্চল্যের মুহূর্তগুলো আজও অনুভব করি মরমে। মনে হয় তিনি ছিলেন, আছেন এখনও।
প্রতি বছরই আজকের দিনটি পালন করা হয় নানা আয়োজনের মধ্যদিয়ে। স্বজন-অনুরাগীরা আয়োজন করেন কবর জিয়ারত, দোয়া মাহফিল, স্মরণসভা সহ নানা অনুষ্ঠান। একজন নিরহংকারী সরল জীবন যাপন অথচ উদার মানসিকতাসম্পন্ন মানুষ ছিলেন তিনি। তাঁর চিন্তা-চেতনায় সব সময়ই ছিলো মানুষের কল্যাণে ভালো কিছু করার। সেটা হয়েছেও। তাঁর চিন্তার সঙ্গে আমার পরিকল্পনার সমন্বয় ঘটিয়ে বাস্তবায়ন করা সম্ভব হয়েছে মানবসেবার লক্ষে গৃহীত বিভিন্ন প্রকল্প। এর স্বাক্ষর বহন করে রাগীব-রাবেয়া মেডিকেল কলেজ ও হাসপাতাল, লিডিং ইউনিভার্সিটিসহ আরও অনেক প্রতিষ্ঠান। এইসব প্রতিষ্ঠান মানবের কল্যাণে-সমাজ উন্নয়নে গৌরবোজ্জ্বল ভূমিকা রাখছে নিঃসন্দেহে। তাই প্রতি বছরই তাঁর মৃত্যু দিবসে তাঁকে স্মরণ করেন সর্বস্তরের মানুষ; তারা দোয়া করেন অন্তরের অন্তঃস্থল থেকে। এতে করে আমার বিশ্বাস সুদৃঢ় হয় যে, জনকল্যাণে খালিস নিয়তে কাজ করলে তার বিনিময় দুনিয়া-আখেরাতে পাওয়া যায়। আল্লাহর দরবারে এই মানুষদের মোনাজাত বিফলে যাবেনা।
সৃষ্টিকর্তার বিধান এই যে, পৃথিবীতে আমরা সকলেই ক্ষণস্থায়ী। পরকালীন জীবন অসীম। সেই পরকালীন অসীম জীবনে শান্তির জন্য ইহকালে ভালো কাজে সময় কাটাতে হয়; ¯্রষ্টার এই অমোঘ নির্দেশনাকে আরাধ্য করেই রাবেয়া খাতুন চৌধুরী কাটিয়েছেন সারা জীবন। যা যে কোন মানুষের জন্য অনুকরণীয় দৃষ্টান্ত। তাঁর প্রতিটি মৃত্যুবার্ষিকীতেই যখন স্মৃতি রোমন্থন করি, তখন নতুন করেই যেন ভালো কাজের উৎসাহ পাই।
আমার স্মৃতিতে আজও জ্বলজ্বল করছে তাঁর সঙ্গে বিবাহবন্ধনে আবদ্ধ হওয়ার প্রাক্কালের অনেক কথা। তখন আমার মনে সংশয় ছিলো শহুরে পরিবেশে বেড়ে উঠা রাবেয়া খাতুন চৌধুরী বিয়ের পর গ্রামীণ পরিবেশকে আদৌ মেনে নেবেন কি-না, এ নিয়ে। কিন্তু আমার সব শঙ্কার অবসান ঘটলো যখন দেখলাম তিনি আমার বাড়ি এবং পরিবারে সকলের সঙ্গে খুব সহজেই মানিয়ে নিয়েছেন, প্রিয় হয়ে ওঠেছেন সকলের। পরবর্তী জীবনে নানা ব্যস্ততায়ও পরিবারের সঙ্গে তাঁর সম্পর্ক ছিলো অটুট। প্রকৃত অর্থে তাঁর গুণাবলী আমাকে শুধু মুগ্ধই করেনি, বরং আমি নিজেও তাঁর আচার-আচরণ, দৃষ্টিভঙ্গি ও গুণাবলী থেকে উপকৃত হয়েছি।
সবচেয়ে বড় কথা, একজন অতি উদার মনের মানুষ ছিলেন রাবেয়া খাতুন চৌধুরী। সমাজের জন্য, গরীব-দুঃখী মানুষের জন্য ভালো কিছু করার তাড়না ছিলো তাঁর মধ্যে সর্বক্ষণ। তেমনি নিজের পরিবার পরিজনের প্রতিও ছিলেন গভীর মনোযোগী। তিনি যেমন ছিলেন একজন আদর্শ মা, তেমনি ছিলেন একজন আদর্শ গৃহিণী। শত ব্যস্ততার মধ্যেও তিনি সন্তানদের প্রতি ছিলেন দারুন যতœশীল। তাছাড়া বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের সকলস্তরের কর্মীদের তিনি নিজ পরিবারের সদস্যদের মতোই মনে করতেন। তাদের সুখে-দুঃখে পাশে থাকতেন। যে কারণে যারাই তার সান্নিধ্য পেয়েছেন, তারা কখনও তাকে ভুলতে পারছেনা। তাই বিরল গুণাবলীর অধিকারী এই মহীয়সী নারী আজও স্মরণীয়; ভবিষ্যতেও স্মরণীয়-বরণীয় হয়ে থাকবেন তাঁর গুণমুগ্ধদের কাছে। আজ তাঁর মৃত্যু দিবসে সবার সঙ্গে আমিও আল্লাহর দরবারে মোনাজাত করছি তাঁর আত্মার মাগফেরাতের জন্য।
লেখক : প্রতিষ্ঠাতা ও চেয়ারম্যান, রাগীব-রাবেয়া ফাউন্ডেশন।

 

 

 

 

 

 

শেয়ার করুন

ফেসবুকে সিলেটের ডাক

বিশেষ সংখ্যা এর আরো সংবাদ
  • বঙ্গবন্ধু ও জাতীয় কবি নজরুল
  • বঙ্গবন্ধুর জীবনালোচনায় কিছু কথা ও কাহিনী
  • বঙ্গবন্ধুকে কাছে থেকে দেখার টুকরো স্মৃতি
  • মুজিববর্ষের তাৎপর্য
  • মাতৃভাষা আন্দোলন ও সিলেট
  • ভাষাশহীদদের প্রতি কৃতজ্ঞতা : ইসলামি দৃষ্টিকোণ
  • দেশে বিদেশে গৌরবের শহীদ মিনার
  • বিশ্বজুড়ে বাংলা ভাষা চর্চা
  • মানুষ জন্মগত বিজয়ী, পরাজয় মানে না
  • মুক্তিযুদ্ধ ও নদী
  • আমাদের মুক্তিযুদ্ধ
  • তিনি আজও আমার সব কর্মের প্রেরণা
  • রাগীব আলীর উন্নয়নের পৃষ্ঠপোষক
  • একজন বিচক্ষণ সম্পাদক আমার মা
  • একজন মহীয়সী নারী
  • রাবেয়া খাতুন চৌধুরী ও সিলেটের ডাক
  • অনন্যা
  • স্মৃতিতে ভাস্বর রাবেয়া খাতুন চৌধুরী
  • বেগম রাবেয়া খাতুন চৌধুরী এক মহীয়সী নারীর কথা
  • তিনি বেগম রাবেয়া খাতুন চৌধুরী
  • Image

    Developed by:Sparkle IT