ধর্ম ও জীবন

জৈন্তা অঞ্চলে হিফজুল কোরআন পরিক্রমা

সরওয়ার ফারুকী প্রকাশিত হয়েছে: ১৩-১২-২০১৯ ইং ০০:৪৬:৫৫ | সংবাদটি ২১১ বার পঠিত

[পূর্ব প্রকাশের পর]
ধারা ৩ : হাফেজ মোনাওর আলী কানাইঘাট উপজেলার দিঘীরপাড় গ্রামে ১৮৯০ সালে জন্ম। তার প্রবাহিত ধারায় পূর্ব-কানাইঘাট সহ জৈন্তার অনেক মাদ্রাসায় হিফজুল কোরআন চালু হয়। যুবক বয়সে তিনি হিফয পূর্ণ করেন। হাফিজ মোনাওরের ওস্তাদ ছিলেন ছাতক উপজেলার খেজাউরা গ্রামের হাফেজ মাওলানা বরকত উল্লাহ। পুরা সিলেট জুড়েই হাফেজ বরকত উল্লাহর সুনাম ছিল। ১৯৪৫ সালে প্রতিষ্ঠিত সাতবাক ঈদগাহ মাদ্রাসায় তার মাধ্যমে হিফজুল কোরআন চালু হয়। তিনি আসামের গৌহাটি জেলার লাখটেকি মসজদে ঈমামতির দায়িত্ব নিয়ে আসাম গেলে মাদ্রাসায় হিফজের দায়িত্ব আঞ্জাম দেন বাইওমপুর গ্রামের ‘বড় হাফেজ’ হিসেবে পরিচিত হাফেজ সঈদ উদ্দিন। হাফেজ সঈদ উদ্দিনও ছিলেন কানাইঘাটের প্রথম দিককার হাফিজদের অন্যতম। হাফিজ সঈদ উদ্দিনÑপরবর্তী হাফেজ মোনাওর-এর ছেলে হাফেজ আব্দুন নুর ঈদগাহ মাদ্রাসায় সুদীর্ঘ চল্লিশ বছর হিফজ পরিচালনা করে ২০০৬ সালে ইন্তেকাল করেন।
হাফেজ মোনাওর রাজনীতি-সচেতন ব্যক্তিত্ব ছিলেন। সিলেটের গণভোটে তিনি পাকিস্তানের পক্ষে প্রচুর খাটেন। ১৯৬০ সালে প্রায় সত্তুর বছর বয়সে ুুইন্তেকাল করেন। তার খ্যাতিমান ছাত্রদের মধ্যে অন্যতমঃ হাফেজ এবাদুর রহমান, বাইয়মপুর/ হাফেজ আব্দুন নুর (নিজ ছেলে)/ হাফেজ আশরফ আলী, ডাউকেরগুল।
১৯৫৪ঃ আল্লামা মোশাহিদ বায়মপুরি (র.) ১৯৫২ ইংরেজিতে দারুল উলুম কানাইঘাটে এলে মাদ্রাসায় অন্যরকম গতি সঞ্চার হয়। তার উদ্যোগে ১৯৫৫ ইংরেজিতে হাফিজ মোনাওরের অন্যতম ছাত্র হাফেজ এবাদুর রহমানের মাধ্যমে হিফজ বিভাগ চালু হয়। হাফেজ এবাদুর রহমান কড়া মেজাজের হলেও হিফজের ওপর তার দখলে সুনাম অর্জন করেন। পুরনো, ছেড়া একটি কোরআন হাতে তেলাওয়াত করতে দেখে তার মামা আল্লামা মোশাহিদ (রহ.) প্রশ্ন করেন ‘এমন ঝাপসা কোরআন তেলাওয়াত করলে তো ভুল হতে পারে বা পরবর্তীতে ভুলেও যেতে পারো’। জবাবে হাফেজ এবাদুর রহমান বলেন ‘দোয়া করবেন মামা, কোরআন যেনো আর দেখে তেলাওয়াত করতে না হয়’! এবাদুর রহমান তার প্রত্যয়ী জবাবের সাক্ষর রেখেছিলেন জীবদ্দশায়। তিনি সবসময় হিফজের ব্যাপারে সতর্ক থাকতেন, নিয়মিত তেলাওয়াত করতেন। বাজারে, খেতে অথবা অবসরে কখনও তিনি তেলাওয়াত ছাড়তেন না। তিনি দারুল উলুম কানাইঘাট মাদ্রাসায় হিফজ বিভাগ উদ্বোধনের পর বেশিদিন না থাকলেও তার প্রবাহিত ধারায় অনেক হাফেজে কোরআনের জন্ম হয়।
১৯৭৬ঃ হাফেজ মোনাওরের অন্যতম ছাত্র হাফেজ আশরফ আলীর মাধ্যমে মুলাগুল নেছারুল কোরআন হাফিজিয়া মাদ্রাসায় হিফজ চালু হয়। অদ্যাবধি এ মাদ্রাসা সুনামের সাথে হিফজুল কোরআনের খেদমত করে চলছে।
এ তিনটি ধারার বাইরেও সমসময়ে কয়েকজন ভারতের বিভিন্ন স্থানে হিফজের উদ্দেশ্যে চলে যান। কিন্তু তাদের বিস্তারিত উদ্ধার সম্ভব হয়নি। এ ব্যাপারে আরও গবেষণার প্রয়োজন।
জৈন্তার প্রথম হাফেজা নুরুন নেছা রাহিমাহুল¬াহঃ
১৯১৮ সালে নুরুন নেছা কানাইঘাটের পারকুল (বড়বাড়ি) গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন। তাঁর আব্বা আলহাজ্ব আবদুল্লাহ ছিলেন হোসেন আহমদ মাদানির শিষ্য। পারিবারিকভাবে দ্বীনি পরিবেশে বেড়ে ওঠা হাফেজা নুরুন নেছা (রাহি.) রাজাগঞ্জ মাদ্রাসার প্রতিষ্ঠা-পর্বে হাফিজ ক্বারী আব্দুল হাই (রহ.)-এর তত্ত্বাবধানে শিক্ষার্থী হিসেবে মক্তবে ভর্তি হন। তাঁর বিস্ময়কর প্রতিভা দেখে ওস্তাদেরা উৎসাহী হয়ে ওঠেন। মাত্র কয়েক দিনেই তিনি কোরআনের উল্লেখযোগ্য অংশ হিফজ করতে সমর্থ হন। তখন ওস্তাদেরা বিশেষ গুরুত্বারোপ করেন, হিফজের জন্য উৎসাহ দেন, এবং মাত্র এগারো বছর বয়সে এগারো মাসে নুরুন নেছা কোরআন হিফজ সম্পন্ন করে পাড়াপ্রতিবেশি সহ আত্মীয়স্বজনদের বিস্মিত করেন।
হাফেজা নুরুন নেছা নামাজে ধারাবাহিকভাবে তেলাওয়াত করতেন এতে কয়েক ওয়াক্তেই তার কোরআন খতম হয়ে যেতো। তেলাওয়াতের প্রতি তার ব্যাকুলতা ছিল কল্পনাতীত। একদিন তার নাতি বললেন ‘দাদী, এতক্ষণ লাগলো তোমার গোসল করতে! সেই কখন দেখলাম কাপড় কাচতে’! হাফেজা নুরুন নেছা বললেন ‘তেলাওয়াত শুরু করে শেষ করতে পারছিলাম না। পাঁচ পারা শেষ করতে গিয়ে দেরি হয়ে গেল’! বিদুষী এ হাফেজার কাছে অনেক খ্যাতিমান আলেম কোরআন পড়েছেন। আল্লামা হাফিজ জওয়াদ (রহ.) বলতেন আমার উস্তাদের মধ্যে অন্যতম হলেন হাফেজা নুরুন নেছা (রাহি.)। আল্লামা জওয়াদ (রহ.) আজীবন তার স্মরণে দোয়া করতেন। আল্লামা আব্দুল করিম শায়েখে কৌড়িয়া (রহ.)-র আব্বা আল্লামা আব্বাস আলী (রহ.) রাজাগঞ্জ মাদ্রাসায় দায়িত্বশীল থাকাকালীন তার তেলাওয়াত শোনার জন্যে বাড়িতে এসেছিলেন। একদিন শায়েখ আব্বাস আলী তার তেলাওয়াত শোনার পর নুরুন নেছা বলে ওঠলেন ‘আমার তেলাওয়াত শুনলেন, এবার আপনার তেলাওয়াত শুনান’!Ñ তার এমন প্রশ্নে শায়েখে কৌড়িয়া আব্বাস আলী (রহ.) বিস্মিত হয়ে পিতা হাজী আবদুল্লাহর কাছে কন্যার উচ্ছ্বসিত প্রশংসা ও দোয়া করেন।
হাফেজ ক্বারী আব্দুল হাই-এর ছাত্রী হিসেবে তিনি তাজবিদের উপর শক্ত থাকতেন। তার ছেলে প্রবীণ আলেমেদ্বীন মোহাম্মদ সালাহউদ্দিন স্মৃতিচারণ করেনÑ ‘আম্মাকে অনেক বড় বড় হাফেজেরা সমীহ করতেন। নয়া হাফিজেরা দাওরা দেওয়ার সময় তার কাছে এসে প্রথমে সবক ঠিক করে নিতেন। আম্মা তাজবিদের ব্যাপারে খুবই কঠিন ছিলেন। তাজবিদের উপর লেখা আল্লামা শা’তবীর শে’রগুলো প্রায়ই আওড়াতেন’। ২০০৯ সালের ৩০শে সেপ্টেম্বর জৈন্তা অঞ্চলের প্রথম হাফেজা নুরুন নেছা (রাহি.) ইন্তেকাল করেন। তার অনুসৃত পথে অনেকেই এগিয়ে এসেছেনÑ তিনি হয়েছেন আলোকবর্তিকা।

 

শেয়ার করুন

Developed by: Sparkle IT