বিশেষ সংখ্যা

মুক্তিযুদ্ধ ও নদী

আব্দুল হাই আল-হাদী প্রকাশিত হয়েছে: ১৬-১২-২০১৯ ইং ০১:৩৬:৫৭ | সংবাদটি ১১৮ বার পঠিত

বাংলাদেশকে বলা হয় ‘নদীমাতৃক’ দেশ। এ জনপদের দর্শন ও সংস্কৃতির ভ্রুণের জন্ম দিয়েছে এ নদীধারা। নদীই নিরন্তর গড়ে তুলছে এ ভূখন্ডের আত্মপরিচয়ের বুনিয়াদ। দেশটির সভ্যতা, সংস্কৃতি, যোগাযোগ ব্যবস্থা, উৎপাদন ব্যবস্থা, প্রাণ-পরিবেশ-প্রতিবেশ সবই নদীর আশীর্বাদধন্য। পলি মাটির জমাটের ফলেই দেশটির খোদ ভূখন্ডটি গড়ে উঠেছে এবং এখনও দক্ষিণে সম্প্রসারিত হচ্ছে নদীবাহিত পলির ক্রমাগত জমাটবদ্ধতার কারণে। পৃথিবীর আর পাঁচটা ব-দ্বীপের সঙ্গে বাংলাদেশের স্বাতন্ত্র হচ্ছে, নদ-নদী কেবল ভূখন্ডটি গড়েই তোলেনি, এর রাজনৈতিক স্বাধীনতা ও সার্বভৌমত্বেও ভূমিকা রেখেছে। যে কারণে বলা হয়, বাংলাদেশের ‘প্রকৃতি থেকে প্রতিরক্ষা’ সবই নদীর অবদান। প্রতিরক্ষার ক্ষেত্রে নদী ঐতিহাসিক কাল থেকেই অবদান রেখে আসছে।
বাঙালির হাজার বছরের সর্বাধিক গুরুত্বপূর্ণ ও আলোচিত ঘটনা হচ্ছে ’একাত্তরের মুক্তিযুদ্ধ’। একসাগর রক্ত, ত্রিশ লক্ষ শহীদ আর হাজার হাজার মা-বোনের ইজ্জতের বিনিময়ে ’মুক্তিযুদ্ধের’ মধ্য দিয়েই স্বাধীন হয়েছে বাংলাদেশ। এদেশের ছাত্র-কৃষক-শ্রমিক-বুদ্ধিজীবি তথা সকল শ্রেণী ও পেশার মানুষের সর্বস্ব ত্যাগ করে দুঃসাহস নিয়ে এ যুদ্ধে অংশগ্রহণ করে। সামান্য কিছু রাজাকার-আলবদর-আলসামস নামের কুলাঙ্গার পাকসেনাদের দোসর হিসেবে কাজ করলেও, তাদের সংখ্যা ছিল সীমিত। সাধারণ মানুষ এদের ঘৃণাভরে প্রত্যাখান করেছে এবং এখনও করে যাচ্ছে। এদেশের মুক্তি সংগ্রামে আম-জনতা এককথায় অসীম।
আগেই বলা হয়েছে, বাংলাদেশের ভৌগোলিক পরিবেশ ও প্রকৃতি মুক্তিযুদ্ধে কাজ করেছে অনুঘটক হিসেবে। বিশেষ করে, মহান মুক্তিযুদ্ধে নদীর অবদান অপরিমেয়। নদ-নদী থেকে প্রাকৃতিক প্রতিরক্ষা সুবিধা পেতেই মুক্তিযোদ্ধারা পাল্টা আক্রমণের জন্য বর্ষাকাল অবধি অপেক্ষা করেছিলেন। মুক্তিযুদ্ধে নদ-নদীর অবদান ফুটে উঠেছে সেই সময় নিউইয়র্ক টাইমসে প্রকাশিত কিছু প্রতিবেদনে। পুলিৎজার বিজয়ী মার্কিন সাংবাদিক সিডনি শনবার্গ ’নিউইয়র্ক টাইমসে’ বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধ নিয়ে উল্ল্যেখযোগ্য প্রতিবেদন ও বিশ্লেষণ পাঠিয়েছেন। এ সব প্রতিবেদন ও বিশ্লেষণ নিয়ে পরবর্তীকালে প্রকাশ হয়েছে একটি বই। সেখানেই তিনি লিখেছেন মুক্তিযুদ্ধে এ দেশের নদ-নদী কীভাবে ‘দ্বিতীয় বাহিনী’ হয়ে উঠেছিল। ১৩ এপ্রিল ডেটলাইনে তিনি লিখেন- বাঙালিরা নির্ভর করছে বর্ষা মৌসুমের বৃষ্টির ওপর, কয়েক সপ্তাহের মধ্যে যা শুরু হবে। পূর্ব পাকিস্তানের গ্রামাঞ্চলের জটিল পথ- গাঙ্গেয় বহ্মপুত্র জলধারা ও সহ¯্র নদীর আঁকিবুকি- পশ্চিম প্রদেশের শুষ্ক ও পার্বত্য অঞ্চল থেকে আগত পাঞ্জাবি ও পাঠানদের কাছ অপরিচিত। যখন বর্ষায় নদী ফুলে উঠবে এবং মে থেকে অক্টোবর পর্যন্ত বন্যায় পূর্ব পাকিস্তানের বিস্তীর্ণ এলাকা জলমগ্ন হয়ে পড়বে, তখন এই অপরিচিতি আরও বাড়বে। ‘আমরা এখন বর্ষার অপেক্ষায় রয়েছি’, বললেন এক বাঙালি অফিসার। ‘তারা পানিকে এত ভয় পায় যে, আপনি ভাবতেই পারবেন না এবং আমরা হচ্ছি জলের রাজা। তারা তখন ভারি কামান ও ট্যাংক নিয়ে চলতে পারবে না। প্রকৃতি হবে আমাদের দ্বিতীয় বাহিনী’। (ডেটলাইন বাংলাদেশ : নাইন্টিন সেভেন্টিওয়ান/ সিডনি শনবার্গ/ মফিদুল হক অনুদিত/ সাহিত্য প্রকাশ, ১৯৯৫)। তাছাড়া বাঙালি নৌকমান্ডোদের দু:সাহসী নানা অভিযান ও ’অপারেশন জ্যাকপট’ এর কথা সবারই কম-বেশি জানা আছে।
মুক্তিযুদ্ধে বাংলার নদ-নদীর ভূমিকা নিয়ে সাধারণভাবো আলোচনা হলেও সুনির্দিষ্ট ও গভীরভাবে তেমন আলোচিত হয়নি। এটা প্রত্যাশিতও নয়। কারণ এখন পর্যন্ত বাংলাদেশের নদ-নদী বর্ণনা ও সেগুলোর পরিসংখ্যান নিয়ে অস্পষ্টতা রয়ে গেছে। সেজন্য কেস স্টাসি হিসেবে এখানে একটি নদীকে নেওয়া হয়েছে এবং সেটি কিভাবে মুক্তিযুদ্ধে সহায়ক হয়ে উঠেছিল- তা এখানে আলোকপাত করা হয়েছে। এর মধ্য দিয়ে ’জালের মতো ছড়ানো’ বাংলাদেশের নদীগুলোর মুক্তিযুদ্ধে ভূমিকার একটি সাধারণ চিত্র পাওয়া যেতে পারে।
মহান মুক্তিযুদ্ধের ১১ টি সেক্টরের মধ্যে ৫ নং সেক্টরটি অন্যতম। সেক্টর কমান্ডার ছিলেন মেজর মীর শওকত আলী এবং সদর দপ্তর ছিল বর্তমান সুনামগঞ্জের বাঁশতলা। ভারত থেকে নেমে আসা লুভা নদীর পশ্চিমাংশ থেকে সুরমা নদীর উত্তরাংশ ধরে বর্তমান সুনামগঞ্জের তাহিরপুরের টেকেরহাট পর্যন্ত বিস্তৃত ছিল এ সেক্টরের কর্মকান্ড। সুরমার ওপার অর্থাৎ দক্ষিণ ও পূর্বাংশ ছিল ৪ নং সেক্টরের অধীন। ৫ নং সেক্টরের অধীনে ৭ টি সাব-সেক্টর ছিল যার মধ্যে মুক্তাপুর অন্যতম। মুক্তাপুর সাব-সেক্টরের কমান্ডার ছিলেন ক্যাপ্টেন কাজী ফারুক আহমেদ, সেকেন্ড ইন কমান্ড ছিলেন সুবেদার মুজিবুর রহমান এবং এডমিন ইনচার্জ ছিলেন নায়েক সুবেদার নাজির হোসেন। এর পাশাপাশি ডাউকি ও সংগ্রামপুঞ্জি সাব-সেক্টরের অবস্থান ’মুক্তাপুর’ সাব-সেক্টরের কাছাকাছি ছিল। এখানে উল্ল্যেখ করা প্রয়োজন যে, মুক্তিযুদ্ধকালীন সময়ে সাব-সেক্টরগুলো পরিধি ও সদর দপ্তরগুলো সময়ের প্রয়োজনে পরিবর্তিত হয়েছে।
’মুক্তাপুর’ সাব-সেক্টরের অধীনে সারি নদী অববাহিকার বেশিরভাগ অংশ এবং লুভা নদীর পশ্চিমাংশের অবস্থান। কিন্তু এ অঞ্চলের যুদ্ধদিনের বিবরণ খুব একটা পাওয়া যায় না । এর কারণ হিসেবে যতটুকু জানা যায়, ৪ ও ৫ নং সেক্টরে প্রথম দিকে বাংলাদেশের নিয়মিত সৈন্য ও অফিসারের অপর্যাপ্ততা এবং প্রচারের অভাব। ’মুক্তিযুদ্ধের সময় গঠিত ১১টি সেক্টরের মধ্যে ৫ নং সেক্টরে প্রথম দিকে বাংলাদেশের নিয়মিত সৈন্য ও অফিসার যথেস্ট না থাকায় এবং ৪ ও ৫নং সেক্টরের মুক্তিযুদ্ধে যথেষ্ট প্রচারিত না হওয়াতে বিশেষ করে ৫ নং সেক্টরের অনেক অবদান বই-পুস্তকে খুব সামান্যই স্থান পায়। যাঁরাই ৫ নং সেক্টর সম্বন্ধে লিখেছেন নেহায়েত দায়সারা গোছের লেখণীতে স্পর্শ করেছেন এ অঞ্চলের বীরত্বগাথা।’ (১৯৭১-সময়ের সাহসী সন্তান- ব্রিগেডিয়ার জয়ন্ত কে.সেন, অনুপম প্রকাশনী, ঢাকা, ফেব্রুয়ারী ২০০৫ পৃষ্ঠা-৬০)।
যাহোক, ’মুক্তাপুর’ সাব-সেক্টরের এক বীর মুক্তিযোদ্ধা ছিলেন জয়ন্ত কে.সেন। ¯œাতক পড়–য়া এ টগবগে যুবকটি মুক্তিযুদ্ধের প্রথম দিকেই মুক্তিবাহিনীতে যোগদান করেন। তার জন্মস্থানও সারি নদীর তীরে। মুক্তাপুর সাব-সেক্টরের অধীনে তিনি ভারতে প্রশিক্ষণ গ্রহণ করেন এবং তার নেতৃত্বে এক কোম্পানী মুক্তযুদ্ধকালীন সময়ে অত্যন্ত বীরত্বের সাথে এ অঞ্চলে অনেক সফল অভিযান পরিচালনা করে। দেশ-মাতৃকার টানে জীবনের মায়া ত্যাগ করে তিনি যুদ্ধ করেছেন। পরবর্তীতে তিনি বাংলাদেশ সেনাবাহিনীতে কমিশনন্ড লাভ করেন এবং ২০০৪ সালে ব্রিগেডিয়ার হিসেবে অবসর গ্রহণ করেন। ’৫ নং সেক্টর সম্বন্ধে লিখেছেন নেহায়েত দায়সারা গোছের লেখণী’ এর বিপরীতে তিনি মুক্তিযুদ্ধের অভিজ্ঞতা নিয়ে ’১৯৭১-সময়ের সাহসী সন্তান’ নামে একটি বই প্রকাশ করেছেন যেটিতে সত্যিই মুক্তিযুদ্ধের এ অঞ্চলের অনেক অজানা অধ্যায় উঠে এসেছে। নির্মোহ ও বস্তুনিষ্ট সে বইয়ের অবলম্বণে মুক্তিযুদ্ধে সারি নদী ও এর শাখা-প্রশাখার অবদান আলোচনার প্রয়াস পাব।
মুক্তিযুদ্ধে এদেশের নদী-নালাগুলো সত্যিই মুক্তিযুদ্ধের দ্বিতীয় বাহিনী হয়ে উঠেছিল । সারি নদী জৈন্তাপুর ও গোয়াইনঘাট থানাকে পৃথক করেছে । সে নদীর তীরে একটি যুদ্ধ হয় পাক বাহিনীর সাথে যেখানে একটি খাল মুক্তিযোদ্ধাদের বিজয়ে নায়ক হিসেবে কাজ করেছিল। জয়ন্ত কে সেনের ভাষায়, ’----সেপ্টেম্বর মাসের একটি ঘটনা। পাকিস্তানিরা আমাদের প্রতিরক্ষা অবস্থানে প্রায় ১ কোম্পানী সৈন্যসহ আক্রমণ করে। প্রকাশ্য দিবালোকে আক্রমণ। আমাদের অবস্থান সারি নদীর তীরে। জৈন্তাপুর ও গোয়াইনঘাট থানা এ নদী দ্বারা বিভক্ত। জৈন্তাপুর থানার বিড়াখাই-পাঁচসেওতি গ্রামে আমার কোম্পানীর অবস্থান। অপর পারে আরও একটি কোম্পানী আমাদের গোয়াইনঘাট থানার আটলিহাই গ্রামে। একটা ছোটখাল গ্রামে প্রবেশ করে যোগাযোগ ব্যবস্থাকে নাজুক করে দেয়। মোটামুটি সাধারণ ব্যাংকার তৈরি করে আমাদের অবস্থান। সকাল ৯টায় পাকিস্তানি আর্টিলারি শুরু করে আমাদের প্রতিরক্ষা ব্যবস্থার উপর, এক ব্যাটারি আর্টিলারী অর্থাৎ ৬ টা কামান প্রায় একসঙ্গে শেলিং শুরু করে। প্রথম দিকে মনে হয়েছিল যে, এটা নৈমিত্তিক ঘটনা। যখন শেলিং তীব্রতর হয় , তখন আমি বেতার যন্ত্র দ্বারা মুক্তাপুর সাব-সেক্টরের সাথে যোগাযোগ করি এবং পাল্টা শেলিং এর জন্য অনুরোধ করি। পাকিস্তানি গানগুলো দরবস্ত এলাকার পেছনে ছিল। আমাদের মর্টারও আর্টিলারি কাউন্টার ফায়ার শুরু করে এবং আস্তে আস্তে পাক আর্টিলারি ফায়ার বন্ধ হয়ে যায়। ততোক্ষণে নদীর উভয় তীর দিয়ে পাক বাহিনী আক্রমণ শুরু করে। আমাদের সকল হাতিয়া গর্জে উঠে। পাকিস্তানিরা প্রথম পর্যায়ের আক্রমণে রাজাকার, সিএএফ ও মিলিশিয়াদেও সামনে পাঠিয়ে পেছন থেকে তারা অগ্রসর হতে থাকে। আমাদের গুলির জবাবে সম্মুখ সারির শক্রুরা ধান ক্ষেতের মধ্যে ধরাশায়ী হতে শুরু করে, তবু পাকিস্তানি সৈন্যদের জেসিও ও কমান্ডারদের বলতে শুনি, ’কুচ নেহি হোয়া, আগাড়ি বাড়ো, মুক্তি ভাগ রাহ হ্যায়’। .... ...প্রায় ১৫০ গজ সামনে শক্রু। আমাদের প্রবল প্রতিরোধের মুখে তাদের অভিযান বন্ধ হয়ে যায়।এজন্য আমাদের মর্টারের ভূমিকা ছিল প্রশংসনীয়। পাক বাহিনীর ডান দিকের সৈন্যরা আমাদের অন্য কোম্পানিটির প্রায় ১০০ গজ দূওে এসে পৌছে কিন্তু নদীর শাখা খালে পানি থাকায় নিচে নামতে ও খাল পার হয়ে আক্রমণ করতে ইত:স্তত করে। ---- যাক, ইতোমধ্যে পাক বাহিনী নদীর তীরের বাঁশঝাড়ের কভার দিয়ে সবাই প্রাণ নিয়ে দৌড়ায়। (ব্রিগেডিয়ার জয়ন্ত কে.সেন ২০০৫: ৬২-৬৩)।
মুক্তিযোদ্ধাদের কাছে নদী-নালা, খাল-বিল, হাওর-বাওর ছিল খুবই পরিচিত এবং এসবের সাথে তাদের সখ্যতা ছিল খুবই গভীর। ব্রিগেডিয়ার সেনের ভাষায় ’---তবে আমাদের সবচেয়ে সুবিধাজনক অবস্থান ছিল আমাদের দেশের প্রতিটি এলাকা আমাদের পরিচিত। বাংলাদেশের নদী-নালা, খাল-বিল, টিলা-সমতলভূমি সব ছিল আমাদের পরিচিত-শুধু পরিচিত নয়, অতি পরিচিত ও নিবিড় সম্পর্কে বাঁধা। তাই গেরিলা যুদ্ধে ভালো ফল পেতে আমাদের বেগ পেতে হয়নি মোটেই। (ব্রিগেডিয়ার জয়ন্ত কে.সেন ২০০৫:৬৩)। ’এছাড়া বাংলার প্রতিটি এলাকা ছিল তাদের জন্য নতুন, পরিবেশ ও আবহাওয়া ছিল প্রতিকুল। তদুপরি অসংখ্য নদী-নালা ও খাল-বিল থাকায় তাদের যুদ্ধ করার মানসিক শক্তি একদম লোপ পায়’। স্থানীয় নদীকেন্দ্রীক লোকায়ত জ্ঞান ও কৌশল জানা ছিল মুক্তিযোদ্ধাদের। তাই পরিকল্পনায় কোন ব্যাঘাত ঘটলে সাথে সাথে তারা ব্যবস্থা করে নিতে পারতেন। এরকম এক ঘটনার কথা তুলে ধরেছেন জয়ন্ত সেন।
’গোয়াইনঘাট থানার অধীন সারি নদীর পার। বর্ষার প্রকোপ এখনও শেষ হয়নি, নদীতে অনেক পানি। পাহাড়ি নদী অনেক খর¯্রােতা। প্রশস্থও বেশ, তা প্রায় ৫০০ ফুট হবে যেখানে দাঁড়িয়ে আমরা নদী পার হবো ও গন্তব্যস্থলে যাব। আমাদের পূর্ব-স্থিরকৃত স্থান-এর চেনার উপায় নদীর তীরে দু’টি গাছ একসাথে দাঁড়িয়ে আছে। জায়গামত আমরা দাঁড়িয়েছি, কিন্তু সন্ধ্যায় ঠিক করে রাখা নৌকা দু’টি কোথায়? ---আজকের প্ল্যান মাঠে মারা যাবে। সবাই নদীর ¯্রােতের শব্দ মাঝে মাঝে ভেসে যাওয়া কিছু কাঠ আর নদীর পার ভাঙ্গার দৃশ্য অবলোকন করছি। কিন্তু এত রাতে তো আর কেউ নৌকা দিয়ে সাহায্য করতে আসবে না। -----আমি ভাবছি এভাবে নদীর পানি দেখে ফিরে যাই। হঠাৎ টুনু মিয়া বলে, ’কিতা যেন দেখা যায়’। একটা কালো কাঠের টুকরার মতো তীরের পাশ দিয়ে আসছে বলে দেখা যাচ্ছে। সবাই প্রস্তুত যে শক্রু আসছে। আমাদের প্রায় ৫০ গজ সামনে আসার পর টুনু মিয়া তার ৩ ব্যাটারি এভারেডি টর্চ লাইট দিয়ে দেখে একটি নৌকা কিন্তু কোন লোকজন নাই। টুনু মিয়া নিমিষেই পানিতে নেমে নৌকা ধরার জন্য সাঁতরাতে লাগলো, আমাদের কোন কিছু বলার সুযোগ না দিয়েই। কোনক্রমে সে নৌকাটি ধরলো কিন্তু সমস্যা হলো যে, নৌকায় বৈঠা নেই। তাই সে সহজে নৌকা তীরে ভিড়াতে পারছে না। যাক অনেক কষ্টে তার হাত ও পা দিয়ে নৌকাকে সে কোনক্রমে তীরে আনলো যদিও আমাদেও থেকে প্রায় ১০০ গজ দূরে। আমার সঙ্গীর নৌকার সাথে সাথে তীর দিয়ে হেঁটে যাচ্ছিল। ভাগ্য সুপ্রসন্ন। একটা নৌকা পেলাম। হয়তো কারো বাঁধা থেকে ছুটে নদীতে ভাসতে ভাসতে আসছিল। আমরা খুব খুশি হলাম। গ্রাম থেকে ততক্ষণে ২ টা বৈঠা নিয়ে এসেছে হেমেন্দ্র ও আকবর । শুধু সাহস ও উপস্থিত বুদ্ধিও জোওে নদী পারাপারের ব্যবস্থা হলো। নৌকাকে কয়েকবার ফেরি করে সবাইকে নদীর ওপাওে নিয়ে যাওয়া হলো ও আমাদের কর্তব্যকর্মে ঠিকভাবে পৌছা হলো। (ব্রিগেডিয়ার জয়ন্ত কে.সেন ২০০৫: ৭৮)। অর্থাৎ বৈঠা ছাড়াই খর¯্রােতা নদীতে বেওয়ারীশ নৌকাকে কব্জায় এনে যুদ্ধ কাজে লাগানোর এক অনন্য উদাহরণ এ ঘটনা।
হাওর বা নদীতে কচুরিপানা মাথায় দিয়ে ছদ্মবেশ ধারণ করে হানাদারদের কাবু করা ছিল মুক্তিযোদ্ধাদের এক অন্যন্য কৌশল। পাক সেনাদের এরকম কৌশলের কথা কল্পাতেও আসেনি। এমনকি নদীতে খালি নৌকা ছেড়ে দিয়ে তার পেছনে গোপনে অগ্রসর হয়ে শক্রুকে নিশানায় এনে ঘায়েল করতেও মুক্তিযোদ্ধাদের বেগ পেত হত না। ব্রিগেডিয়ার সেনের ভাষায়, --হাওরের ভেতর দিয়ে বা নদীতে মাথায় একরাশ কচুরিপানার নিচে, একদল মুক্তিযোদ্ধা নাক ভাসিয়ে আর রাইফেলের ম্যাগাজিন বাঁচিয়ে ¯্রােতেল তালে তালে চলে গেছে পাক আর্মির টার্গেটে। যেটা পাক আর্মি হয়তো কষ্মিনকালেও কল্পনা করেনি। অথবা খালি নৌকা নদীর ¯্রােতে ভাসিয়ে দিয়ে নৌকার নিচে বা পাক আর্মিও অদেখা প্রান্তে করে তাদের চোখ ফাঁকি দিয়ে চলে গেছে লক্ষ্যস্থলে। পরে অবশ্য পাক আর্মি খালি নৌকা ভাসতে দেখলেও অঝোরে গুলি করতো (ব্রিগেডিয়ার জয়ন্ত কে.সেন ২০০৫: ৫৮-৫৯)। নদী পারাপারের ক্ষেত্রে নৌকার মাঝিদের সহযোগিতা ও দক্ষতা মুক্তিযোদ্ধাদের ব্যাপক সাহায্য করেছিল। এ প্রসঙ্গে ব্রিগেডিয়ার জয়ন্ত সেন বলেন, নদী-নালা ও খাল-বিলের দেশ বাংলাদেশ। গভীর রাতে নদী পারাপার বা দীর্ঘপথ পাড়ি দিতে নৌপথে নৌকা দিয়ে নিয়ে যাওয়া এবং সঠিক দিক-নির্দেশ করে গন্তব্যস্থলে পৌছে দিতে তাদের জুড়ি ছিল না। গভীর রাতে বৃষ্টি ও ঝড়ের মধ্যে নৌকা নিয়ে নদীর মাঝ দিয়ে চলাচল অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণও কষ্টসাধ্য কাজ। নৌডুবি হলে হয়তো সাতর দিয়ে তীরে কোন প্রকারে ওঠা যাবে কিন্তু সঙ্গেও হাতিয়ার ও গোলাবারুদ এগুলির কি হবে? আমার এলাকায় নৌকাডুবিতে কোন অঘটন ঘটেছে বা কিছু খোয়া গেছে এরকম ঘটনা ছিল বিরল। মাঝিরার জানতো যেভাবেই হোক তীরে পৌছতে হবে নিরাপদে , মাঝির ওপর সকল যোদ্ধার জীবন ও অভিযানের সফল সমাপ্তি নির্ভর করে (জয়ন্ত সেন ২০০৫:৭০-৭১)। তার মতে,পাকিস্তানিরা মুক্তিদের ভয়ে নদীতে সাধারণত: কোন ভাসমান নৌকা থাকতে দিত না। আমরাও দিনের বেলায় নদীতে নৌকা রাখতাম না।নৌকা পানির মধ্যে ডুবিয়ে রাখা হতো। আবার সেগুলো রাতে ভাসিয়ে পানি সেঁচে চালানোর অবস্থায় আনা হতো, নৌকার শেওলা ঘষা-মাজা করে। তাই অন্ধকার রাতে নৌকার অবস্থান নির্ণয় ও নৌকা ভাসিয়ে সকলকে নিরাপদে পারাপার করা অতীব কষ্টকর ও ঝুঁকিপূর্ণ কাজ ছিল। তার ওপর পাহাড়িয়া নদীতে সামান্য বৃষ্টি হলে নদীর পানি বেড়ে গেলে অবস্থা আরও কঠিন হয়ে দাঁড়াতো (জয়ন্ত সেন ২০০৫:৭১)।
মুক্তিযোদ্ধারা কোন রকম পালিয়ে বাড়ি ছেড়ে মুক্তিযুদ্ধে যোগদান করেন। তাদের গেরিলা যুদ্ধে খাবারের সাথে সাথে বিশুদ্ধ পানির সংকটেও পড়তে হয়েছে। একটি নিয়মিত বাহিনী হলে কিংবা ফরমাল ওয়ারের ক্ষেত্রে নিজস্ব বাহিনীই সেসববের ব্যবস্থা করে। কিন্তু মাঠে-ময়দানে, হাওর-বাওর আর পাহাড়-জঙ্গলে সেসবের সংস্থান করার কেউ ছিল না । স্থানীয় মানুষেরা অকৃপণ হাতে সহায়তা করেছেন তা যেমন সত্য তেমনি সবসময় তাদের সহায়তা নেওয়ারও কোন উপায় ছিল না। তখন কিন

শেয়ার করুন

Developed by: Sparkle IT