বিশেষ সংখ্যা

মানুষ জন্মগত বিজয়ী, পরাজয় মানে না

সৈয়দ মবনু প্রকাশিত হয়েছে: ১৬-১২-২০১৯ ইং ০১:৩৭:৫৫ | সংবাদটি ৪২১ বার পঠিত

কোথায় মানুষের অস্তিত্ব? মাটির ‘অনু’গুলো খাদ্যরূপে বাবার রক্ত¯্রােতে মিশে রূপ নিলো কিছু রক্ত আর অনুতে। অতঃপর মস্তিষ্ক থেকে পা পর্যন্ত শুরু হলো রক্ত আর অনু’রমুক্তির মিছিল। রক্তগুলো পথ খুঁজে বীর্য হওয়ার, আর অনুগুলো পথ খুঁজে রক্ত থেকে বেরিয়ে যাওয়ার। রক্তের ¯্রােতে তাল মিলিয়ে ক্রমাগত মুক্তির মিছিল করতে থাকে অনুগুলো। মুক্তির মিছিলে ঘূর্ণনের ফাঁকে কিছু রক্ত সাদা হয়ে বীর্যে রূপ নিতে নিতে কিছু অনু ধ্বংস হয়, আর কিছু মিশে যায় বীর্য-ধাতুতে। শুরু হয় সেখানে বীর্যগুলোর আর বেঁচে থাকা অনুদের আবারও মুক্তির মিছিল, আন্দোলন-সংগ্রাম। জেগে ওঠে নারী কিংবা পুরুষের মনে মিলনের আকাঙ্খা। বৈধ কিংবা অবৈধ পথে কারো কারো মিলন ঘটে। এই মিলনে বীর্যের মুক্তির সাথে বেশ কিছু অনুও মুক্তি লাভ করে। যে বীর্য আর অনু সীমাহীন মুক্তি লাভ করে, তারা ধ্বংস হয়ে যায়। আর যখন কিছু অনু সাথে নিয়ে পুরুষের বীর্য নারীর জরায়ূতে পৌঁছে, তখন শুরু হয় অনুগুলোর বেঁচে থাকা ও মুক্তির নতুন আন্দোলন। তারা ঘুরতে থাকে জরায়ূর চারদিকে মাতৃকোষের প্রবেশ পথের সন্ধানে। অসংখ্য অনু ঘূর্ণন দিতে থাকে। অতঃপর একটা অনু নিজের প্রবেশ পথ খুলে ভেতরে যায়। বাকিগুলো ধ্বংস হয়। সফল অনু’র মধ্যে শুরু হয়ে যায় মানুষে রূপান্তিত হওয়ার প্রক্রিয়া। যাকে চিকিৎসা বিজ্ঞানের ভাষায় বলতে পারি, বাবার সমৃদ্ধ শুক্রাণু মায়ের ডিম্ব নিষিক্ত হয়ে জরায়ূতে মানুষের ভ্রূণের সৃষ্টি। এই ভ্রূণে ধীরে ধীরে অনু হারিয়ে ফেলে তাঁর নিজস্বতা, সে পরিবর্তিত হতে থাকে মানুষের কায়ারূপে। এক সময় সে হয়ে যায় একখন্ড রক্ত, এরপর একখন্ড গোস্ত। ধীরে ধীরে গোস্তে আসে হাট্টি এবং বিভিন্ন অঙ্গ। দেখতে দেখতে ভ্রূণের মধ্যে মানুষ-রূপ আসে। গোশস্তে আল্লাহ ‘দম’ দেন; ‘রূহ’ বা আত্মা আসে। শুরু হয় মায়ের পেটে মানুষের জীবন সংগ্রাম; নড়াচড়া। খাদ্যের জন্য নাভিতে নল লাগিয়ে মানুষকে মায়ের শরিরের রক্ত খাওয়ানো হয়। দেহ বড় এবং গঠন পরিবর্তন হতে থাকে। মানুষ পৃথিবীতে আসার চেষ্টা শুরু করে। কমবেশি দশমাস দশদিনে একটু পূর্ণাঙ্গতা অর্জন করে মানুষের আকৃতিতে মানুষ মায়ের জরায়ূ থেকে মুক্ত হয়ে পৃথিবীতে পা রাখে। মানুষ ভেবেছিলো পৃথিবী তার মুক্তির মঞ্জিল, কিন্তু পৃথিবীতে এসে চারিদিকে দৃষ্টি দিয়ে মানুষ হাউ-মাউ করে কাঁদতে থাকে। কেন এই কান্না?
ক্ষুদ্র জরায়ূ থেকে বিশাল পৃথিবীর মাঠে এসে কি মানুষ ভয় পায়? কিংবা মানুষ কি ভয় পায় বিশাল মুক্তিকে? না পৃথিবীর অশুভ বিষয়গুলো দেখে মানুষ আতংকিত? এই প্রশ্নগুলোর সঠিক উত্তর নেই যুগযুগের তাত্ত্বিকদের কাছে। একেকজন একেক ব্যাখ্যা দিয়েছেন। সবার ব্যাখ্যাই জ্ঞান বুদ্ধি কর্ম এবং প্রেমের সমন্বয়ে দয়াদর্শনের কাছে হয়তো যুক্তিসম্মত কিংবা যুক্তিসম্মত নয়। দয়াদর্শন মনে করে মায়ের জরায়ূ থেকে মানুষ রূপে যে অনু পৃৃথিবীতে আসে তা অবশ্য লাখ লাখ অনুর মধ্যে বিজয়ী বলে স্বীকৃত। কারণ, অনু থেকে মানুষ হয়ে পৃথিবীতে আসতে তার কম যুদ্ধ করতে হয়নি। প্রতিটি যুদ্ধে মানুষ বিজয়ী না হলে আজ বেঁচে থাকতে পারতো না। তাই দয়াদর্শন মনে করে, মানুষের জন্মটাই তার মুক্তির প্রাথমিক সফলতা এবং মানুষ আজীবন বুঝে কিংবা না বুঝে চেষ্টা করে এই মুক্তি বা স্বাধীনতাকে রক্ষা করতে।
মনে এই স্বাধীনতাকে রক্ষার সংগ্রামের নামই অহম। এই অহম কারো কারো মধ্যে অতিরিক্ত হয় এবং তারা নেতা বা শাসক হয়ে অন্যদেরকে নিয়ন্ত্রণ করে। আর এই নিয়ন্ত্রণের মাত্রা যখন অহমকে অতিক্রম করে অহংকারে রূপ নিতে থাকে তখন মানুষ হয়ে যায় পশুর মতো সর্বগ্রাসী। সে তার আশপাশকে শ^াসরুদ্ধকর নিয়ন্ত্রণের চেষ্টা করে। কিন্তু অনু থেকে ভ্রূণ হয়ে মানুষের রূপ নেওয়া পর্যন্ত যারা স্বাধীনতার জন্য লড়াই করে বেঁচে গেলো, তাদেরকে নিয়ন্ত্রণ করা কি এত সহজ? মোটেও না। শুরু হয় নিয়ন্ত্রক এবং নিয়ন্ত্রিতদের মধ্যে সংঘাত। নিয়ন্ত্রকরা নিয়ন্ত্রণকে আরও শক্তিশালী করতে চেষ্টা করে, আর নিয়ন্ত্রিতরা চেষ্টা করে মুক্তির। হাবিল-কাবিল থেকে এই যুদ্ধ চলে আসছে এবং পৃথিবী ধ্বংস হওয়া পর্যন্ত চলবে। ১৯৭১ খ্রিস্টাব্দে পাকিস্তানিদের সাথে আমাদের যুদ্ধটা ছিলো সেই যুদ্ধেরই একটি অংশ।
নয় মাস যুদ্ধ করে আমরা বিজয়ী হয়েছি পাকিস্তানিদের সাথে, তা শতভাগ সত্য। কিন্তু আমাদের যুদ্ধ শেষ, তা ভাবলে ভুল হবে। মানুষের যুদ্ধ ততদিন চলবে যতদিন সে প্রাণ নিয়ে বেঁচে থাকবে। কারণ, জীবন অর্থই যুদ্ধ এবং যুদ্ধ অর্থই জীবন। এই যুদ্ধকে না বুঝলে মানুষ চেতনাশূন্য হয়ে যায়। প্রকৃত অর্থে চেতনশূন্য মানুষই গন্ডমূর্খ। এই শ্রেণীর মানুষ নিয়ে হযরত ঈসা নবী (যাকে খ্রিস্টানেরা যিশু বলে বিশ^াস করে) বিব্রত ছিলেন বলে বাইবেলে উল্লেখ রয়েছে। তিনি বলতেন, ‘ অসুস্থ, মৃত, অন্ধ, খোঁড়া, বধির যাকেই চেয়েছি আমি স্বাভাবিক জীবনে ফিরিয়ে আনতে পেরেছি, এমনকি পর্বত, রক্ষিত পাথরও আমার কথায় চূর্ণবিচূর্ণ হয়েছে, কিন্তু চেতনশূন্য গন্ডমূর্খদের মধ্যে আলো উদ্ভাসিত করতে পারিনি। মাওলানা জালাল উদ্দিন রুমি বলেন,
‘বোধহীনদের হৃদয়ে হাজারবার আলোর স্ফূলিঙ্গ ঢুকাতে ব্যর্থ/ পাথরের মত অনড় রয়ে গেল একটুও পাল্টালো না/ শুধু বালিতে রূপ নিল-বীজ থেকে চারা গজায় না।’ (মসনবী ৩:২৫৪৭)।
এই অঞ্চলে স্বাধীনতার জন্য বুঝে-না বুঝে অসংখ্য যুদ্ধ হয়েছে এবং বারবার জয়-পরাজয়ও হয়েছে। এই জয় কিংবা পরাজয়গুলো যে আমাদের জীবনে কোন প্রভাব বিস্তার করেনি, তা কিন্তু নয়। তবে স্বীকার করতে হবে, মৌলিক এবং স্থায়ী মুক্তি বা উন্নয়নে স্থায়িত্ব সৃষ্টি করতে পারেনি। এনে দিতে পারেনি ব্যাপক হারে মানুষের মধ্যে সুখ। এর কারণ কী?
আমরা সবাই কারণ খুঁজতে গিয়ে সকল দৃষ্টি আমলাতন্ত্র বা সরকারের ব্যর্থতার দিকে দিয়ে বসে আছি। অথচ সরকার বা আমলারা এখানে অসংখ্য উপাদানের একটি উপাদান মাত্র। আর তারা তো সাধারণ মানুষেরই অংশ। সাধারণ মানুষ যদি বুঝে না নিজেদের ভাল-মন্দ, তা হলে তাদের নিজেদের ভাগ্য পরিবর্তন হবে কীভাবে? স্থিতিশীল উন্নয়ন আর সুখের জন্য মানুষকে প্রথমে বুঝতে হবে তার নিজের দৈহিক ও মানসিক সকল অবস্থান। অতঃপর সামনে এগিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করতে হবে। এ জন্যই পৃথিবীর সর্বকালের সকল দার্শনিকদের মতে; প্রথমে নিজে নিজেকে জানতে হয়। কেউ কেউ তো বলেছেন, নিজেকে না জানলে আল্লাহ বা ¯্রষ্টাকে জানা হয় না। স্বাধীনতাকে স্থিতিশীল এবং সুখ-সমৃদ্ধ করতেও একই কথা সত্য। প্রথমে আমরা আমাদের সম্পর্কে অবগত হয়ে অতঃপর অন্য চেষ্টা করবো। নতুবা হাজারও যুদ্ধের পর অর্জিত স্বাধীনতা স্থিতিশীল বিজয় আর সুখ এনে দিতে পারবে না।
আমরা যে স্বাধীনতার এতদিন পরও আশানুযায়ী কিছু করতে পারিনি, এর মূল কারণ এখানেই। তবে একেবারে কিছু হয়নি তা বলা যাবে না। কিন্তু এই হওয়া অবশ্যই আমাদের প্রত্যাশা কিংবা বিশে^র উন্নয়নের পরিস্থিতি অনুযায়ী নয়। স্মরণ রাখতে হবে, আমরা যদি আমাদের প্রত্যাশা বা বিশে^র অবস্থানুসারে স্বাধীনতা বা বিজয়কে স্থিতিশীল উন্নয়ন ও সুখে নিয়ে কিছু অর্জন করতে চাই তবে প্রথমে আমাদের মানুষদের চিন্তাচেতনায় উন্নয়ন ঘটাতে হবে। যারা বিষয়টি বুঝেছেন বা বুঝছেন, তারা মূলে কাজ করতে হবে, অন্যদেরকে বুঝানোর জন্য ক্রমধারায় চলতে হবে।
দেশের সার্বিক পরিস্থিতি নিয়ে আমাদের আত্ম-সমালোচনার সময় এসে গেছে। এ বিষয়ে আলোচনা কিংবা সমালোচনার পথকে জ্ঞান, বুদ্ধি কর্ম প্রেমের আলোকে মুক্ত করে দেওয়া উচিত। স্মরণ রাখতে হবে, সত্যসন্ধানীরা নিজের বিরুদ্ধে সত্য উপস্থাপিত হলেও ক্ষুব্ধ হন না। বুদ্ধিমানেরা নিজের ভুলের জন্য আফসোস করে নিজেকে পরিবর্তন করেন। তা হোক ব্যক্তিগত কিংবা রাজনৈতিক। আমাদের মধ্যে এই চরিত্র খুব দ্রুত গড়তে হবে। আমরা নিজের ভুলকে শুদ্ধ প্রমাণে প্রয়োজনে আর মিথ্যার আশ্রয় নেব না। ব্যক্তিগত কিংবা রাজনৈতিক কোন সমালোচনাই আমরা অসহ্য করবো না। আমরা মনে করি আত্মসমালোচনার নিয়তে দয়াদর্শনের মূল চারনীতি জ্ঞান, বুদ্ধি, কর্ম এবং প্রেমের আলোকে বাংলাদেশের ডান-বাম-ইসলামিকদের রাজনৈতিক ইতিহাসের পর্যালোচনা বারবার হওয়া প্রয়োজন। শ্লোগান কিংবা রাষ্ট্র ক্ষমতায় দিয়ে শাসন করে সত্য প্রতিষ্ঠা করা যায় না, সত্যকে প্রতিষ্ঠা করতে হয় হৃদয়ে ধারণ করে। প্রেম তো প্রেমই, হোক তা ব্যক্তি, রাষ্ট্র কিংবা ঈশ^র যার জন্যই। প্রেমিক তো আমি কিংবা আমরা, প্রেমিকা হয়তো মানুষ, রাষ্ট্র কিংবা ঈশ^র। যারা বাংলাদেশ স্বাধীন করতে গিয়ে প্রাণ দিয়েছেন, প্রেমের জায়গা থেকে তা অত্যন্ত উঁচু ত্যাগ, আমাদের স্বীকার করতে হবে। তাদের অন্তরে দেশের প্রতি অত্যন্ত প্রেম না থাকলে প্রাণ বিসর্জন অবশ্যই সম্ভব হতো না। কিন্তু আজকে আমরা যারা দেশপ্রেমের শ্লোগান দেই, দেশপ্রেমের কথা বলি, তারা যখন দেশের স্বাথর্, রাষ্ট্রের স্বার্থ কিংবা জনগণের স্বার্থ পরিপন্থী কাজ করি, তখন আমাদের দেশপ্রেমের বিষয়টি সন্দিহান হয়ে আসে। তবু আমাদের বিশ^াস, দেশপ্রেম বুকে নিয়ে আমরা সবাই বাংলাদেশকে তার মুক্তিযুদ্ধের চেতনায় সমৃদ্ধির পথে সামনে এগিয়ে নিতে সচেষ্ট রয়েছি।
লেখক : প্রাবন্ধিক, গবেষক।

শেয়ার করুন

ফেসবুকে সিলেটের ডাক

বিশেষ সংখ্যা এর আরো সংবাদ
  • বঙ্গবন্ধু ও জাতীয় কবি নজরুল
  • বঙ্গবন্ধুর জীবনালোচনায় কিছু কথা ও কাহিনী
  • বঙ্গবন্ধুকে কাছে থেকে দেখার টুকরো স্মৃতি
  • মুজিববর্ষের তাৎপর্য
  • মাতৃভাষা আন্দোলন ও সিলেট
  • ভাষাশহীদদের প্রতি কৃতজ্ঞতা : ইসলামি দৃষ্টিকোণ
  • দেশে বিদেশে গৌরবের শহীদ মিনার
  • বিশ্বজুড়ে বাংলা ভাষা চর্চা
  • মানুষ জন্মগত বিজয়ী, পরাজয় মানে না
  • মুক্তিযুদ্ধ ও নদী
  • আমাদের মুক্তিযুদ্ধ
  • তিনি আজও আমার সব কর্মের প্রেরণা
  • রাগীব আলীর উন্নয়নের পৃষ্ঠপোষক
  • একজন বিচক্ষণ সম্পাদক আমার মা
  • একজন মহীয়সী নারী
  • রাবেয়া খাতুন চৌধুরী ও সিলেটের ডাক
  • অনন্যা
  • স্মৃতিতে ভাস্বর রাবেয়া খাতুন চৌধুরী
  • বেগম রাবেয়া খাতুন চৌধুরী এক মহীয়সী নারীর কথা
  • তিনি বেগম রাবেয়া খাতুন চৌধুরী
  • Developed by: Sparkle IT