ইতিহাস ও ঐতিহ্য

বিজয়োল্লাসের মধ্যে বিষাদের ভয়াল স্মৃতি

রফিকুর রহমান লজু প্রকাশিত হয়েছে: ১৮-১২-২০১৯ ইং ০০:২৮:০৬ | সংবাদটি ২৩৯ বার পঠিত

‘একাত্তর’ বারবার আসে না। এসেছিলো মাত্র একবার। ইতিহাসে একবারই এসেছে চিরস্মরণীয় ১৯৭১ সাল। বাংলাদেশের স্বাধীনতার লড়াই ও সশস্ত্র মুক্তিযুদ্ধের জন্য এই একাত্তর সাল ইতিহাসে স্মরণীয় হয়ে আছে। মাতৃভূমি বাংলাদেশকে স্বাধীন করতে বাঙালি জাতিকে যে পরিমাণ ত্যাগ স্বীকার করতে হয়েছে, তার নজির ইতিহাসে বিরল। স্বাধীনতার জন্য একাত্তরে ত্রিশ লক্ষ বাঙালিকে প্রাণ দিতে হয়েছে। দুই লক্ষাদিক মা-বোন নির্যাতনের শিকার হয়েছেন। ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণ সীমাহীন। একাত্তরের ষোল ডিসেম্বর পাকিস্তানি হানাদার বাহিনীকে পর্যুদস্ত করে আমরা স্বাধীনতা অর্জন করেছি। বিজয়ের মাস ডিসেম্বর তার মহিমা নিয়ে বারবার ফিরে আসে। একাত্তরের মহান মুক্তিযুদ্ধের গৌরবে মহিমান্বিত হয়ে আছে ডিসেম্বর। নয় মাসের সশস্ত্র মুক্তিযুদ্ধের শেষ ১৬টি দিন ছিলো অনাস্বাদিত উত্তেজনার দোলা চালে উদ্দীপিত। মরণ-পণ লড়াই-সংগ্রামের পর ১৬ ডিসেম্বর বিজয় ধরা দেয় বাঙালির মুঠোয়। মুক্তিযুদ্ধ, স্বাধীনতা ও বাংলাদেশ বাঙালি জাতির শ্রেষ্ঠ অর্জন। বিংশ শতাব্দীর সত্তরের দশকের একাত্তর সালে নয় মাস ব্যাপী চলেছে বাঙালির মুক্তিযুদ্ধ, বাংলাদেশের স্বাধীনতার লড়াই। সশস্ত্র মুক্তিযুদ্ধ ও স্বাধীনতার লড়াইয়ের গৌরবে গোটা একাত্তর সালটিই ইতিহাসে দীপ্যমান হয়ে আছে। পৃথিবীর অন্য কোনো দেশ এরকম এককভাবে পুরো একটি সাল বা বছরকে নিয়ে গৌরব করতে পারে না। বাংলাদেশ এই গৌরবে এককভাবে গৌরবান্বিত।
আমাদের বাঙালি জীবনের শ্রেষ্ঠ ও স্বর্ণোজ্জ্বল দিন বিজয় দিবস ১৬ ডিসেম্বর। ডিসেম্বর মাস এলে বিজয় দিবসের আনন্দে, বিজয়ের গর্বে আমরা উদ্বেলিত হই, আনন্দে মেতে উঠি। হৃদয় মনে অন্য রকম পুলক অনুভব করি। বিজয় ক্ষণের আনন্দ-উচ্ছ্বাসের পাশাপাশি আমরা কয়েকজন রাজনৈতিক কর্মীর জীবনে এক কঠিন দুর্যোগ-দুঃসময় নেমে এসেছিলো। ১৬ ডিসেম্বর বিজয় দিবস, পরের দিন ১৭ ডিসেম্বর, তারপরের দিন ১৮ ডিসেম্বর আমরা জীবন-মরণ সন্ধিক্ষণে থেকে ভাগ্যগুণে ফিরে এসেছি। ওইদিন রাতে মুক্তিযোদ্ধা নামধারী একদল সশস্ত্র যুবকের কবলে পড়েছিলাম আমরা। এক ভয়াল দুঃস্বপ্ন ও মৃত্যু ভয় পেয়ে বসেছিলো আমাদের। নয় মাসের সশস্ত্র লড়াই শেষে ১৬ ডিসেম্বর দেশ শত্রুমুক্ত হয়। বিজয় গর্বে বুক ফুলিয়ে উল্লসিত হৃদয়ের পরের দিন ১৭ ডিসেম্বর শত্রু সৈন্যমুক্ত স্বাধীনদেশে, মুক্ত বাংলাদেশে ফিরে এলাম। অথচ এই মুক্ত স্বদেশে বিজয়ের তৃতীয় দিনে অর্থাৎ ১৮ ডিসেম্বর সিলেটে বন্দি হলাম একটি তথাকথিত মুক্তিযোদ্ধা গ্রুপের হাতে।
১৭ ডিসেম্বর ভারতের করিমগঞ্জ থেকে আসার সময় কয়েকজন ভারতীয় বন্ধু আমার সঙ্গে এসেছিলেন। তাদের নিয়ে ঘুরাফেরা করে সমস্ত দিন কেটে যায়। বিকেলে তাদের বিদায় দিয়ে বাসায় ফিরতে সন্ধ্যা হয়ে যায়। সারা দিনের দৌড়াদৌড়িতে ক্লান্ত হয়ে পড়েছিলাম। তাই রাতে আর বের হইনি। তাছাড়া অন্ধকার নির্জন পরিবেশে বাসা থেকে বের হওয়াও নিষিদ্ধ ছিল।
পরদিন ১৮ ডিসেম্বর সকালে প্রথমেই পাড়া প্রতিবেশীর খোঁজ করলাম, খবর নিলাম। পরে বের হলাম আত্মীয়-স্বজন, বন্ধু-বান্ধব ও পার্টির লোকজনদের খোঁজ নিতে। সারা দিনই ঘুরলাম। এক সময় গেলাম চারাদীঘির পারে ন্যাপ নেতা এডভোকেট আ ফ ম কামালের বাসায়। তার কাছ থেকে অনেকের খবর পেলাম, নয় মাসের বিভীষিকাময় দিনগুলোর বর্ণনা শুনলাম। তার মুখ থেকে খবর পেলাম ডাক্তার দিগেন্দ্র চন্দ্র এন্দ’র পরিবারের মর্মান্তিক বিপর্যয়।
ডিসেম্বর হানাদার বাহিনীর আত্মসমর্পনের মাত্র ক'ঘন্টা আগে দেশবাসী যখন আসন্ন মুক্তির আনন্দে বিভোর, তখনই বিপর্যয় ঘটলো ডাক্তার এন্দ’র পরিবারে। তাদের বাসা ছিল শহরের মণিপুরী রাজবাড়ী এলাকায়। বাঁচার আশায় তারা তখন নিজ বাসা ছেড়ে পাশেই রাস্তার অপর পার্শ্বের একটি বাসায় আশ্রয় নিয়ছিলেন। সেখানেই ঘটলো সম্ভবত সিলেট অঞ্চলের সর্বশেষ ট্র্যাজেডি। সে দিন সিলেট শহরে পাকিস্তানি জল্লাদ বাহিনী ছিল না। জল্লাদ সেনাদের এদেশীয় সহযোগী রাজাকার-আলবদররা বিভিন্ন ভাবে লুকিয়ে ছিল। একদল রাজাকারকে টার্গেট করে দক্ষিণ সুরমার টেকনিকেল স্কুল থেকে মুক্তিযুদ্ধের সৈনিকরা শক্তিশালী মর্টার নিক্ষেপ করেছিল। এই মর্টারটা লক্ষ্যভ্রষ্ট হয় এসে পড়েছিলো মির্জাজাঙ্গালে যে বাসায় এন্দ পরিবার আশ্রয় নিয়েছিলেন। এই মর্টার আক্রমণের মধ্য দিয়ে সিলেটে যুদ্ধের সমাপ্তি ঘটে। এই শেষ আঘাতে এন্দ পরিবার বড় ছেলে রানা এন্দ সহ চারজন ঘটনাস্থলেই এবং পরে পাচ জন সহ মোট নয়জন প্রাণ হারান। ছোট ছেলে আমাদের বন্ধু সাথী এন্দসহ কয়েকজন আহত হন। আহতরা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে চিকিৎসাধীন। মনে মনে ঠিক করলাম বিকেলে বের হলে হাসপাতালে গিয়ে সাথীদের দেখে আসবো।
বিকেলে বের হবার আগেই বাসায় আসেন শিক্ষক মিলন দা ও সুধীর বিশ্বাস। মিলনদার পুরো নাম দেবেশ্বর পাল। প্রগতিশীল চিন্তা-চেতনার অধিকারী মিলন দা এডভোকেট দ্বিতেশ্বর পাল কানন ও শহীদ কাজল পালের জ্যেষ্ঠ ভ্রাতা। সুধীর বিশ্বাস ন্যাশনাল আওয়ামী পার্টির নেতা ও মুক্তিযুদ্ধের সংগঠক ছিলেন। মিলন দা ও সুধীর বিশ্বাসকে নিয় হাসপাতালের উদ্দেশ্যে রওয়ানা হই। পথে আমাদের সঙ্গে যুক্ত হয় ছাত্র ইউনিয়নের দুজন কর্মী। এদের একজন সম্ভবত আব্দুল খালিক। অপরজনের নাম এখন স্মরণ করতে পারছি না। শহরে রিক্সা না থাকায় আমরা পায় হেঁটে হাসপাতালে পৌছাই। হাসপাতালের বেডে সাথী’র সঙ্গে দেখা হয়, কথা হয়। হাসপাতালে থাকতে থাকতেই সন্ধ্যা নামে। বিদ্যুৎ না থাকায় রাতের অন্ধকার সহজেই গ্রাস করলো দিনের শেষ আলোটুকু। আমরা সাথীদের জন্য এবং অন্য রোগীদের জন্য মোমবাতি ও দেয়াশলাই সংগ্রহ করে দিলাম। সন্ধ্যার কিছু পরে আমরা সাথীদের কাছ থেকে বিদায় নিয় হাসপাতাল থেকে বের হলাম। থ অন্ধকার ও নির্জন রাস্তা দিয়ে আমরা হেঁটে বাড়ি ফিরছি। মানুষের আনাগোনা নেই বললেই চলে। হঠাৎ দু’একজন পথচারী ও দু'একটা গাড়ি চোখে পড়ে। ফেরার পথে আমরা আ ফ ম কামালের বাসায় উঠলাম। রাত সাড়ে আটটার কাছাকাছি সময় আমরা সেখান থেকে বের হলাম। আমরা মীরাবাজার কিশোরীমোহন পাঠশালা যখন অতিক্রম করছি তখন পিছনের দিক থেকে একটি জীপগাড়ি এসে ঠিক আমাদের পাশে ব্রেক কষলো। সঙ্গে সঙ্গে আমাদের প্রতি এক ঝাঁক প্রশ্ন :
আপনারা কারা?
কোথা থেকে আসছেন?
কোথায় যাবেন?
অন্ধকারের মধ্যে এত রাতে বাইরে কেন? ইত্যাদি প্রশ্ন।
কোন উত্তর দেবার আগেই আমি জীপের একদম নিকটে গিয় লোকগুলোকে চিনবার চেষ্টা করলাম। দেখলাম সামনের সিটে দুইজন এবং পিছনে আরো তিনজন। সবাই অপরিচিত। কাউকেই চিনতে পারলাম না। মিনিটকাল যেতে না যেতেই ড্রাইভিং সিট থেকে একজন গর্জন করে উঠলো :
কী? কথা বলছেন না যে?
আমি উত্তর দিলাম, আমরা হাসপাতাল থেকে ফিরছি। মর্টারের আঘাতে আহত আমাদের বন্ধুকে দেখতে গিয়েছিলাম।
আবার প্রশ্ন : আপনারা কারা?
আমি বললাম : আমরা মুক্তিযুদ্ধের পক্ষের লোক।
গাড়ির স্টিয়ারিং-এ বসা ছিল মাথায় লম্বা চুল, দীর্ঘদেহী সুন্দর স্বাস্থ্যের অধিকারী এক যুবক। বোঝা গেল সেই-ই দলপতি, এবার সে মুখ খুললো ঃ আপনারা কোন পার্টির লোক?
এবার উত্তর দিলেন সুধীর বিশ্বাস ঃ আমরা ন্যাপ, ছাত্র ইউনিয়ন, কমিউনিস্ট পার্টির কর্মী।
একথা শুনে সে স্বগতোক্তির মতো বললো। তাই তো! কমিউনিস্ট না হলে অন্ধকার রাতে এভাবে ঘুরে বেড়াবার সাহস আর কার হবে?
একথা বলে সে সজোরে গাড়ি থেকে নামলো এবং কর্কশ স্বরে নির্দেশ দিলো : পিছনের দিকে গাড়িতে উঠুন। দলনেতার কথায় আমরা প্রমাদ গুনলাম। তবুও আমি সাহস সঞ্চয় করে তাকে অনুরোধ করলাম, বেশ রাত হয় গেছে। আমরা বাসায় যাব। আমাদের যেতে দিন।
এ কথার সঙ্গে সঙ্গে জীপের পিছন থেকে রাইফেলধারী অপর এক যুবক নেমে এসে হাতের অস্ত্র দিয়ে ইশারা করলো গাড়িতে উঠতে।
অসহায়ভাবে আমরা একে একে গাড়ির পিছন দিকে ওঠে বসলাম। দেখলাম গাড়িতে বসে আছে আরো তিনটি লোক। তাদের হাতে রাইফেল। গাড়ি চালিয়ে তারা আমাদের নিয়ে গেল তাদের ক্যাম্পে মধুশহীদের একটি বাসায়। এই বাসাটি ছিল নেজামে ইসলাম নেতা হোমিও ডাক্তার আবদুল মালিকের। গাড়ি থেকে নেমে তারা আমাদের নিয়ে ঘরের ভিতর প্রবেশ করলো। হারিকেনের আলোতে দেখা গেল ঘরে আরও ৪-৫ জন যুবক রয়েছে। তারা সেখানে রক্ষিত মেশিনগান, রাইফেল প্রভৃতি আগ্নেয়াস্ত্র নাড়াচাড়া করছে। আমাদের ঘরের আরও ভেতরে অন্য একটি কক্ষে নিয়ে যাওয়া হলো। দেখে বোঝা গেলো এটি মাস্টার বেড রুম। কক্ষের মধ্যে একটি বড় বেড, একটি সিঙ্গেল বেড, একটি স্টীলের আলমিরা, আলনা, একটি টেবিল এবং বেশ ক'খানা কাঠের চেয়ার। কক্ষটি খুবই অগোছালো এবং অপরিচ্ছন্ন। মিলন দা ও আমি চেয়ারে বসলাম। অন্যরা বিছানার উপর বসল।
যুবকদের কথাবার্তা ও চেহারা দেখে আন্দাজ করলাম এদের মধ্যে ৩-৪ জন যুবক চা বাগানের শ্রমিক। সবাইকেই মুক্তিযোদ্ধা মনে হলো। কিছুক্ষণ পর সুন্দর সুঠামদেহী যে যুবক জীপ চালাচ্ছিল সে এসে আমাদের দিকে মুখ করে একটি চেয়ারে বসল। অন্যরা সবাই দাঁড়িয়েছিল। এক ফাকে আমি একটি যুবককে জিজ্ঞেস করে জেনে নিয়েছি যে, সুঠামদেহী যুবকের নাম গোপাল এবং সে-ই তাদের লিডার। (দলপতি)। এবার গোপাল অন্য রূপ ধারণ করল। প্রথমেই আপনি ছেড়ে তোমরা দিয় ৫রু করল। সে বলল- তোমরা ভারতে আমাদের খুব জ্বালিয়েছ। বিভিন্ন ফ্রন্টে আমাদের বহু ছেলেকে তোমরা হত্যা করেছ। তোমরা ধড়িবাজ, ধূর্ত। তোমাদের আমরা চিনি। তোমাদের পরিচয় একটাই- তোমরা মুজিববাদ বিরোধী শক্তি। তোমরা মুজিববাদের দুশমন। রাইফেলধারী যুবকরা অত্যন্ত মনোযোগ দিয়ে আমাদের কথাবার্তা শুনছে। দুটি যুবকের হাতে তখনো রাইফেল। তারা এমনভাবে রাইফেল দুটি নাড়াচাড়া করছে যেন আমাদের উদ্দেশ্যেই তেমনটা করছে। এতক্ষণ আমি ভয়কে প্রশ্রয় দিইনি। এবার কিন্তু শঙ্কিতবোধ করলাম। সঙ্গীরাও দেখলাম ভীতসন্ত্রস্ত। আমাদের অন্তরাত্মা তখন কেঁপে কেঁপে উঠছে। ঘরের পিছন দিকে ডোবার মতো একটি পুকুর জঙ্গলাবৃত্ত। তা দেখে জীবনাশঙ্কা আরও বেড়ে যায়। গোপাল এক নাগাড়ে অনেকক্ষণ কথা বলল এবং মাঝে। মাঝে আমাদের গালাগাল দিলো। একপর্যায় আমি বললাম, দেখুন, আপনারা অযথা আমাদের ভুল বুঝছেন। সিলেটের আওয়ামী লীগের নেতারা আমাদের ভালো করে চিনেন, জানেন। আমাদের দল মুক্তিযুদ্ধের পক্ষের শক্তি, আমরা মুক্তিযুদ্ধে অংশ নিয়েছি। এ সময় গোপাল আমাকে ধমক দিয় প্রশ্ন করে আওয়ামী লীগের কোন নেতা তোদের চিনে, দুই একজনের নাম বল দেখি!
এ কথায় আমি আশ্বস্ত হলাম এবং ভাবলাম এবার আমাদের ছেড়ে দেবে। আমি খুশি হয়ে বললাম অনেকেই আমাদের জানেন। গোপাল আবার ধমক দেয় এবং বলে, যারা চিনে তাদের নাম বল। আমি আস্তে আস্তে বললাম, দেওয়ান ফরিদ গাজী, ডা. আব্দুল মালিক, আব্দুর রহিম এডভোকেট, ইসমত আহমদ চৌধুরী, দেওয়ান নুরুল হোসেন চঞ্চল তারা সবাই আমাদের ভালো করে চিনেন, জানেন। এই নামগুলো বলার পর গোপালের চেহারায় একটু পরিবর্তন ও ভাবান্তর লক্ষ্য করলাম। সে তার লোকদের দিকে তাকালো এবং মনে হলো কি বলতে গিয়ে না বলে থেমে গেলো। এই সুযোগে আমি ফললাম, দয়া করে আমাদের যেতে দিন, রিকশা নেই, হেঁটে হেঁটে যেতে হবে অনেক দূরে।
এ কথা বলার সঙ্গে সঙ্গে গোপাল তেতিয়ে উঠে। হুংকার ছাড়ে, চুপ, কথা বলবি না। তোদের সব মতলব জানা আছে। কমিউনিস্টরা দেশের শত্রু।
এই বলে একটা গাল ছুঁড়ে গোপাল আমার দিকে তাকালো এবং বলল- তোকে এদের গ্যাং লিডার মনে হচ্ছে। তোর নাম কি?
আমি আস্তে করে আমার নাম বললাম। এরপর একে একে অন্যদের নামও জিজ্ঞেস করলো।
গোপাল কিছুক্ষণ স্থির থেকে তার লোকদের দিকে তাকিয়ে বললো-এদের ছেড়ে দেওয়া যায় না। এ কথায় রাইফেলধারীরা খুব উল্লসিত হলো; মনে হলো লিডারের নির্দেশের অপেক্ষায় মাত্র তারা।
এক সময় গোপাল বলল, তারা মুজিব বাহিনীর ট্রেইন্ড লোক। মুজিব বাহিনীর দুষমনদের খতম করাই তাদের কাজ। এ সময় খুব সম্ভব সুধীর বিশ্বাস বলে উঠলেন, আমরা তো মুক্তিযুদ্ধের পক্ষের শক্তি, আমরা পাকিস্তানি শত্রুর বিরুদ্ধে যুদ্ধ করেছি।
একথায় গোপাল অত্যন্ত তাচ্ছিল্যভরে উচ্চস্বরে হাসল। হাসি থামিয়ে সে মণিসিংহ, মোজাফফর আহমদ ও মতিয়া চৌধুরীর নাম ধরে ধরে বিশ্রী গালাগাল দিল। গোপালের ব্যবহার এবং এই গালাগালিতে আমরা আরো শংকিত হয় পড়লাম।
একে অন্যের মুখের দিকে তাকালাম। মিলন দা সবচেয়ে বেশি ভয় পেয়েছিলেন। তার মুখটা একদম মলিন হয় যায়। আরও বিপদের আশঙ্কায় আমাদের মুখে কোন কথা বের হচ্ছিল না। এমন সময় রাত তখন আনুমানিক ১০টা হবে- এক লোক টিফিন ক্যারিয়ারে করে গোপালের জন্য ভাত নিয়ে এলো। আমাদের সম্মুখেই সে খেতে বসল। এ সময় মিলন দা মুখ খুললেন। তিনি কথা বলার সময় তোতলাতেন। তাই কথা জড়িয়ে জড়িয়ে বললেন, আপনি ভাত খাচ্ছেন। আমাদেরও খুব ক্ষুধা পেয়েছে। রাতও বেশ হয়েছে। বাড়িতে আমাদের মা-বোনরা আমাদের জন্য উৎকণ্ঠায় আছেন। বিশ্বাস করুন আমরা খারাপ মানুষ নই। দয়া করে এবার আমাদের বাড়ি যেতে দিন। মিলন দার এই কথায় জাদুর মত কাজ হলো এবং মুহূর্তেই গোপাল অন্য মানুষে রূপান্তরিত হলো। গোপাল তৎক্ষণাৎ খাওয়া বন্ধ করে অবশিষ্ট খাবার আমাদের দিকে ঠেলে দিলো। বলল, খাবারগুলো ভাগ করে তাড়াতাড়ি খেয়ে বাড়ি চলে যাও। গোপালের কথা আমাদের বিশ্বাস হচ্ছিলো না। আমাদের ইতস্তত ভাব ও সংকোচ দেখে গোপাল আবার বললো, তাড়াতাড়ি খেয়ে নাও। তখন মিনদা হাত ধুয়ে বসে যায় খেতে। এতে গোপাল খুশিই হয়। আমরা নিঃশব্দ বসে রইলাম। এদিকে মিলন দা খেতে খেতে গোপালের সঙ্গে গল্প জুড়ে দেন। সুযোগ বুঝে মিলন দা এক পর্যায়ে গোপালকে বললেন, এতরাতে আমরা কীভাবে যাই, রাস্তায় আপনাদের লোক আবার আমাদের আটকাতে পারে।
কোন অসুবিধা হবে না। আমি সব ব্যবস্থা করে দিচ্ছি-
এই বলে গোপাল খুব জোরে জোরে ড্রাইভারকে ডাকলো। ড্রাইভার আসলে পরে তাকে নির্দেশ দিলো, দুইজন লোক সঙ্গে নিয় যাও এবং এদের সবাইকে নিজ নিজ বাসায় পৌঁছিয়ে দিয়ে এসো।
কথা শেষ করেই আমাদের দিকে তাকিয়ে বলল, গাড়ি রেডি। তাড়াতাড়ি উঠে পড়ো। রাতে বাইরে বেরোবে না।
বন্দীদশা থেকে বেরিয়ে আমরা যখন গাড়িতে উঠলাম তখন রাত এগারোটা। মৃত্যু যন্ত্রণার বর্ণনা বা অভিজ্ঞতা কেউই বর্ণনার সুযোগ পায় না। আমরা সেদিন মৃত্যু যন্ত্রণা অনুভব না করলেও মৃত্যুর আশংকার যন্ত্রণা অনুভব করেছি। তারা যদি আমাদের হত্যা করে পিছনের ডোবায় ফেলে রাখতো কেউ টেরই পেতো না।
গোপালের বন্দীশালায় আমরা সেদিন মৃত্যুর আশংকার যে ভয়ংকর বিভীষিকা অনুভব করেছি, পলে পলে হিমশীতল মৃত্যুর প্রহর অনুভব করেছি, তা মনে হলে আজও ভয়ে কুঁজো হয়ে যাই। ১৬ ডিসেম্বর বিজয়ের আনন্দে ও মুক্তিযুদ্ধের সফলতায় প্রাণের গহীনে সূর্যের ঔজ্জ্বল্যের মতো দীপ্তিময়। ১৬ ডিসেম্বর এলে বিজয় আনন্দের পাশাপাশি বিভীষিকাময় ১৮ ডিসেম্বরের কথাও আমার মনে পড়ে যায়।
লেখক : অবসরপ্রাপ্ত শিক্ষক, প্রাবন্ধিক ও কলাম লেখক

 

শেয়ার করুন
ইতিহাস ও ঐতিহ্য এর আরো সংবাদ
  • শহীদ মিনারের ইতিকথা
  • সিলেটের লোকসংগীত : ধামাইল
  • পর্যটক ইবনে বতুতার কথা
  • বই এল কোথা থেকে?
  • লোক সাহিত্যে মননশীলতা
  • পার্বত্য সংকটের মূল্যায়ন
  • স্বাধীন বাংলাদেশে জনতার উদ্দেশ্যে প্রথম ভাষণ
  • সাচনাবাজার উচ্চ বিদ্যালয়
  • একাত্তরের শরণার্থীর স্মৃতি
  • আরব বিশ্বের অনন্য শাসক
  • জননেতা আব্দুস সামাদ আজাদ
  • বালাগঞ্জের আজিজপুর উচ্চবিদ্যালয়
  • হারিয়ে যাচ্ছে ডাকপিয়ন ও ডাকবাক্স
  • সুনামগঞ্জের লোকসংস্কৃতি
  • সিলেটে বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার আন্দোলন ও শাবি
  • মরমী কবি শেখ ভানু
  • মুক্তিযুদ্ধে কানাইঘাট
  • বিপ্লবী এম.এন.রায়
  • শতাব্দীর বন্দরে জামেয়া রেঙ্গা
  • রেফারেণ্ডাম ও সিলেটে বঙ্গবন্ধু
  • Developed by: Sparkle IT