ইতিহাস ও ঐতিহ্য

রেফারেণ্ডাম ও সিলেটে বঙ্গবন্ধু

বেলাল আহমদ চৌধুরী প্রকাশিত হয়েছে: ২৫-১২-২০১৯ ইং ০০:৪১:২৭ | সংবাদটি ৭৭৪ বার পঠিত
Image

১৯৪৭ খ্রিস্টাব্দের মার্চ মাসে লর্ড মাউন্টব্যাটন ভারতে নতুন ‘ভাইসরয়’ হয়ে আসেন। তিনি সার্বিক পরিস্থিতি উপলব্ধি করে পাকিস্তান দাবীর যৌক্তিকতা উপলব্ধি করে ১৯৪৭ খ্রিস্টাব্দের ১৮ জুলাই ‘ভারত স্বাধীনতা আইন’ নামে একটি আইন পাশ করেন। এই আইন ভারতে ব্রিটিশ রাজত্বের সমাপ্তি ঘটায়। পেণ্ডারোল মুন ঝাঁঝালোভাবে বলেন- ‘পাকিস্তান’ একটা পোঁকায় কাটা দাবি নিশ্চিত সত্য হয়ে উঠলো। তিনি আরও জুড়ে দেন-এতে জিন্নার অল্পতেই তৃপ্তি হলো। তিনি তখনও ছয়টি পূর্ণ প্রদেশের পাকিস্তান চেয়েছিলেন।
১৯৪৭ খ্রিস্টাব্দের ১৪ আগস্টের মধ্য রাতে ব্রিটিশ কর্তৃক ভারত বিভাগের মাধ্যমে মুসলিম প্রধান অঞ্চলগুলোকে নিয়ে পাকিস্তান সৃষ্টির দাবি মেনে নেয়া হলেও আসাম প্রদেশের সিলেট জেলার পাকিস্তান অন্তর্ভুক্তি প্রশ্নটি অমীমাংসিত থেকে যায় এর দরুন পরবর্তী সময়ে তার জন্য রেফারেণ্ডাম বা গণভোট অনুষ্ঠিত হয়। ‘মিশন উইথ মাউন্টব্যাটন’ বইটি পড়লে দেখা যাবে ইংরেজ তখনও ঠিক করে নাই কলকাতা পাকিস্তানে আসবে না হিন্দুস্তানে যাবে। আর যদি কোন উপায় না থাকে তবে কলকাতা ‘ফ্রি শহর’ করা যায় কি-না? কারণ কলকাতার হিন্দু মুসলমান লড়ার জন্য প্রস্তুত। কলকাতা হিন্দুস্তানে পড়লেও শিয়ালদাহ স্টেশন পর্যন্ত পাকিস্তানে আসার কথা। এই বহিতে আরও আছে- একজন ইংরেজ গভর্নর হয়ে ঢাকা আসতে রাজি হচ্ছিলেন না। কারণ হলো, ঢাকা খুব গরম আবহাওয়া। তার উত্তরে লর্ড মাউন্টব্যাটন যে চিঠি দিয়েছিলেন তাতে লিখা ছিল- পূর্ব পাকিস্তানে দুনিয়ার অন্যতম পাহাড়ি শহর, থাকার কোন কষ্ট হবে না। অর্থাৎ দার্জিলিং আমরা পাব। যখন গোলমালের কোন সম্ভাবনা থাকল না, মাউন্টব্যাটন সুযোগ পেয়ে যশোর জেলার সংখ্যাগুরু মুসলমান অধ্যুষিত বনগাঁও জংশন কেটে দিলেন, নদীয়ার মুসলমান বেশি তবুও কৃষ্ণনগর ও রানাঘাট জংশন ওদের দিয়েদেন। মুর্শিদাবাদে মুসলমান বেশি কিন্তু সমস্ত জেলাই দিয়ে দিলেন। মালদাহ জেলার মুসলমান ও হিন্দু সমান সমান তবে অর্ধেক অংশ কেটে দিলেন। দিনাজপুরের মুসলমান বেশি বালুরঘাট কেটে দিলেন। যাতে জলপাইগুড়ি ও দার্জিলিং হিন্দুস্তানে চলে যায় এবং আসামের সঙ্গে হিন্দুস্তানের সরাসরি যোগাযোগ হয়। উপরোক্ত জায়গাগুলো কিছুতেই তৎকালীন পাকিস্তানে না এসে পারত না।
১৯৪৬ খ্রিস্টাব্দের ৩ জুন সিলেটে গণভোটের কথা ঘোষণা হলো। নির্বাচনের দিন ঠিক হলো ৬ ও ৭ জুলাই। ১৯৪৭ নির্বাচনে জয়লাভের জন্য অবিভক্ত বাংলার মুখ্যমন্ত্রী হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দী সাহেবের নেতৃত্বে মুসলিম লীগ নেতৃবৃন্দের এক বিরাট দল সিলেট আসেন। তাদের মধ্যে ছিলেন মৌঃ আব্দুর রশিদ তর্কবাগিশ, এ এইচ ইস্পাহানী পীর বাদশা মিয়া। অপরদিকে কলকাতা থেকে (বঙ্গবন্ধু) শেখ মুজিবুর রহমান, শাহ আজিজুর রহমান, মোল্লা জালাল উদ্দিন, তাজউদ্দিন সহ ১৯৪৭-এর গণভোটে স্বপ্নের সারথী বঙ্গবন্ধু সিলেট অঞ্চলকে পাকিস্তানের অন্তর্ভুক্ত করার জন্য পাঁচশত কর্মীর নেতা হিসাবে দায়িত্ব নিয়ে ক্লান্তিহীন কর্মতৎপরতা চালিয়ে যান।
তেজোদীপ্ত সুবক্তা শেখ মুজিবুর রহমান সিলেট শহরের বখতিয়ার বিবি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে অবস্থান করেন, তখন মুসলিম লীগ নির্বাহী কমিটির অন্যতম সদস্য তুখোড় নেতা দেওয়ান ফরিদ গাজী শেখ মুজিবুর রহমানের সঙ্গে থাকতেন, গাজী সাহেবের বিচক্ষণতায় শেখ সাহেব মুগ্ধ হন এবং তার সঙ্গে ঘনিষ্টতা নিবিড় হয়ে ওঠে।
বঙ্গবন্ধু রেফারেণ্ডামের সময় বখতিয়ার বিবি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে অবস্থানকালের কথা প্রধানমন্ত্রী হওয়ার পরও ভুলতে পারেননি। দেশপ্রেমিক স্বপ্নরাজ বঙ্গবন্ধু সিলেটের গণভোটে অংশ নিয়ে সিলেটবাসীর হৃদয় জয় করেছিলেন। তাইতো বঙ্গবন্ধু প্রেমিক বন্ধুবর এম এ হান্নান সেলিম লিখেছেন-
এই বিদ্যাপীঠ থেকে তোমার বজ্রকন্ঠে নির্ভীক ঘোষণা
রেফারেণ্ডামের মন্ত্র ‘শ্রীহট্ট’ ভারতে যাবে না,
৪৭-এর যুব নেতা হে মুজিব তোমার অক্ষয় বাণী
ব্যর্থ হয় নাই, কোন দিনও ব্যর্থ হবে না।
শান্তিপূর্ণভাবে দু’দিনে ২৩৯টি কেন্দ্রে ভোট পর্ব শেষ হয়। পূর্ব বাংলার পক্ষে ২ লক্ষ ৩৯ হাজার ৬১৯টি বিপক্ষে ১ লক্ষ ৮৪ হাজার ৪১৯টি ভোট পড়েছিল। ১৯৪৭ খ্রিস্টাব্দের ১২ জুলাই ফলাফল দিল্লীতে পাঠানো হলো। সিলেটের সর্বত্র উল্লাস- করিমগঞ্জ, হাইলাকান্দি, কাছাড়সহ আসামের সংখ্যাগরিষ্ঠ মুসলিম এলাকার জনপদে বাঁধভাঙ্গা জোয়ার। শেষ পর্যন্ত ভোটের রায় উল্টো হলো। রোয়েদাদ অনুযায়ী করিমগঞ্জ মহকুমার পাথারকান্দি, রাতারবাড়ি, বদরপুর ও করিমগঞ্জের অধিকাংশ এলাকা গেল ভারতের ভাগে। পাকিস্তান অংশে পাওয়া করিমগঞ্জ মহকুমার বাদ বাকী কিছু এলাকা জকিগঞ্জ থানা নামে এবং জলঢুপ থানাকে দুই ভাগ করে একভাগ বিয়ানীবাজার এবং আর এক ভাগ বড়লেখা থানা প্রতিষ্ঠিত হলো।
এই নতুন দেশ দু’টির কেউই জানতেন না তাদের সীমান্ত কোথায়? কোথায় সেই দাগ? যে দাগ ধরে হিন্দু আর মুসলমানদের আলাদা হয়ে যেতে হচ্ছে। ১৭ আগস্ট প্রথম সিদ্ধান্তগুলো সরকারি গেজেটে প্রকাশিত হলো, কখন এটি ধীরে ধীরে জেলা আর তারও নিচে গিয়ে পৌঁছিল। যেখানে সত্য জমির ওপর দাগ পড়ল তাড়াহুড়ো করে স্যার র‌্যাডক্লিফ ও মাউন্টব্যাটন কংগ্রেসের প্রণোদনায় যে রেখা টানা হয়েছিল সেটা সম্পূর্ণভাবে এবং শোকাবহভাবে ভুলে ভরা থাকল এবং সেই সাথে রেখে গেলেন অনন্ত চিরস্থায়ী দ্বন্দ্ব। এই তাড়াহুড়োর সীমান্ত যে কত অবর্ণনীয় দুরারোগ্য ব্যাধি তৈরি করল। কে এই নিষ্ঠুর মানুষ। যে একটি কলমের খোঁচায় আমাদের ন্যায্য পাওনাটুকু হরণ করল।
বঙ্গবন্ধু তাঁর আত্মজীবনী বহিতে লিখেছেন-আমরা আশা করেছিলাম আমাদের কাছাড় জেলা ও সিলেট জেলা পাকিস্তানের ভাগে না দিয়ে পারবে না। আমার বেশি দুঃখ হয়েছিল করিমগঞ্জ নিয়ে, কারণ করিমগঞ্জ আমি কাজ করেছিলাম গণভোটের সময়, নেতারা যদি নেতৃত্ব দিতে ভুল করেন জনগণকে খেসারত দিতে হয়। যে কলকাতা পূর্ববাংলার টাকায় গড়ে উঠেছিল, সেই কলকাতা আমরা স্বেচ্ছায় ছেড়ে দিলাম।
পরিশেষে মুন্সি জবান উল্লাহ কবিতায় বলব-
ভাগাভাগি হৈলা ছিলট ভারত পাকিস্তান
কেউ পাইলা ছিনা তান কেউ নিলা রান...।

 

শেয়ার করুন

ফেসবুকে সিলেটের ডাক

ইতিহাস ও ঐতিহ্য এর আরো সংবাদ
  • বালাগঞ্জের বাতিঘর বাংলাবাজার উচ্চ বিদ্যালয়
  • বঙ্গবন্ধু ও গান্ধীজী
  • সিলেটের দ্বিতীয় সংবাদপত্রের সম্পাদক ছিলেন ‘মেশিনম্যান’
  • একটি যুদ্ধ : একটি শতাব্দী
  • বালাগঞ্জের প্রাচীন জনপদ শিওরখাল গ্রাম
  • ভাটিপাড়া
  • সময়ের সোচ্চার স্বর সোমেন চন্দ
  • বঙ্গবন্ধুর সিলেট সফর ও কিছু কথা
  • বায়ান্নতেই লিখেছিলেন ‘ঢাকাই কারবালা’
  • জীবনের শেষক্ষণে অর্থ-স্বর্ণ সবই জড়পদার্থ
  • কমরেড বরুণ রায়
  • বঙ্গবন্ধু ও রাষ্ট্রভাষা আন্দোলন
  • নারী ভাষাসৈনিকদের কথা
  • মুক্তিযুদ্ধ ও বঙ্গবীর ওসমানী
  • ভাটির বাতিঘর সুনামগঞ্জ সরকারি কলেজ
  • মাওয়ের লংমার্চের ৪ বছর পর সিলেটিদের লং মার্চ
  • শহীদ মিনারের ইতিকথা
  • সিলেটের লোকসংগীত : ধামাইল
  • পর্যটক ইবনে বতুতার কথা
  • বই এল কোথা থেকে?
  • Image

    Developed by:Sparkle IT