ইতিহাস ও ঐতিহ্য

শতাব্দীর বন্দরে জামেয়া রেঙ্গা

জীম হামযাহ প্রকাশিত হয়েছে: ২৫-১২-২০১৯ ইং ০০:৪২:১২ | সংবাদটি ২৮৭ বার পঠিত

সিলেট শহর থেকে দক্ষিণে প্রায় ১৩ কি.মি. দূরে দক্ষিণ সুরমা- মোগলাবাজার এলাকায়, সিলেট-মৌলভীবাজার মহাসড়ক ও লাগোয়া রেললাইনের পাশে দৃষ্টিনন্দন জামেয়া তাওয়াক্কুলিয়া রেঙ্গা সবারই নজর কাড়ে। যাবার পথে গাড়ি থেকে সবাই একনজর দেখে মুগ্ধ হয়। প্রাকৃতিক সৌন্দর্যে ভরপুর গ্রামীণ মনোরম পরিবেশে বিস্তৃত পরিসরে দেয়াল ঘেরা ভবনগুলো তার সামনের বিশাল মাঠ, সারি সারি নারকেল গাছ, লম্বা সিঁড়ি ঘাটের বড় পুকুর সব মিলিয়ে খুব চিত্তাকর্ষক এক ছবি! পাঞ্জাবি-টুপি পরিহিত ছাত্ররা যখন মাঠে বের হয়, একসাথে অজু করতে পুকুর ঘাটে আসে, সে দৃশ্য আরও চমৎকার! এদিকে যাবার সময় যে কেউ একবার হলেও উঁকি দিয়ে দেখে যায় ইতিহাসের নানা বাঁক পেরিয়ে শতাব্দীর সাক্ষী এই জামেয়া।
জামেয়া তাওয়াক্কুলিয়া রেঙ্গা বৃহত্তর সিলেটের অন্যতম ঐতিহ্যবাহী বৃহৎ এক ইসলামী বিদ্যাপীঠ। যা এক শতাব্দী কাল ধরে ইসলামী ভাবধারা,মূল্যবোধ ও দ্বীনী শিক্ষার প্রচার-প্রসারে গুরুদায়িত্ব আঞ্জাম দিয়ে আসছে। তৈরি করেছে বহু ইসলামী ব্যক্তিত্ব। এটা পুণ্যভূমি সিলেটের এক ঐতিহ্যও বটে। দেশের বিভিন্ন অঞ্চল থেকে ইলমে দ্বীন অন্বেষণের লক্ষ্যে এখানে এসে জড়ো হয় শত শত ছাত্ররা । বর্তমানে এ প্রতিষ্ঠানে প্রায় দেড় সহস্রাধিক ছাত্র ধর্মের নানা বিষয়ে জ্ঞান অর্জন করছে। বহির্বিশে^র অনেক জ্ঞানী-গুণী, পীর-মাশায়েখ ও ইসলামিক স্কলারগণ এ মাদরাসা পরিদর্শন করেছেন। ধন্য হয়েছে বহু মনীষীদের পদধূলিতে। অত্র এলাকার যে সুনাম এবং পরিচিতি তার মূলে রয়েছে এই প্রতিষ্ঠান।
১৯১৯ সালে মাওলানা আরকান উদ্দীন (র.) প্রতিষ্ঠা করেন এই বিদ্যাপীঠ। কিছুদিন এই মাদরাসার ভারপ্রাপ্ত দায়িত্ব পালন করেন মাওলানা সিকান্দার আলী (র.)। অতঃপর অত্র অঞ্চলের সর্বজন শ্রদ্ধেয় আলেম ও বুযুর্গ ব্যক্তিত্ব, উপমহাদেশের তুখোড় রাজনীতিবিদ ও আধ্যাত্মিক পুরুষ সাইয়েদ হুসাইন আহমদ মাদানীর অন্যতম খলিফা বদরুল আলম (শায়খে রেঙ্গা) এই মাদরাসার হাল ধরেন। মূলত তারই হাত ধরে বিকশিত হয়েছে এই জামেয়া। এলাকাবাসীর আগ্রহে তিনি মাদরাসাকে তাকমিল ফিল হাদিস জামাতে উত্তীর্ণ করে শুরু করেন হাদিসের দরস। এবং প্রথম শায়খুল হাদিসের দায়িত্ব পালন করেন মাওলানা কমরুদ্দীন। তারপর সুদীর্ঘ কাল ব্যাপী আমৃত্যু এই দায়িত্ব পালন করেছেন এই অঞ্চলের প্রখ্যাত হাদিসবেত্তা শায়খ শিহাব উদ্দীন (র.)।
হিফজুল কুরআন, নূরানী ও সাধারণ ইসলামী শিক্ষা প্রধানত এই তিনটি বিভাগে এখানে শিক্ষাদান কার্যক্রম পরিচালিত হয়ে আসছে। সাধারণ শিক্ষায় রয়েছে ইবতেদায়ি(প্রাথমিক), মুতাওয়াসসিতা (মাধ্যমিক),সানাবিয়্যা (উচ্চ মাধ্যমিক), ফজিলত (স্নাতক) ও তাকমিল (মাস্টার্স) এই পাঁচটি স্তর। এখান থেকে কুরআন, হাদিস, তাফসির, ফেক্বাহসহ আরবি সাহিত্য, বালাগাত,ফারায়েয, উসুল ছাড়াও বিভিন্ন বিষয়ে জ্ঞানার্জন করে সর্বোচ্চ স্তর তাকমিল ফিল হাদিসের ( মাস্টার্স সমমান) সনদ অর্জন করতে পারে। সম্প্রতি মাদরাসার পরিসর আরও বাড়িয়ে সময়োপযোগী বেশ কয়েকটি শিক্ষা শাখা খোলার লক্ষ্যে কাজ চলছে বলে জানা গেছে।
ভারতের দারুল উলুম দেওবন্দের ভাবধারায় পরিচালিত হাইয়্যাতুল উলইয়ার অন্তর্ভূক্ত এ জামেয়ায় ছাত্রদের শিক্ষাদানের পাশাপাশি সুন্নতে নববীর অনুকরণ, চারিত্রিক গঠন ও আত্মশুদ্ধির ওপর বিশেষ গুরুত্বারূপ করা হয়। পরীক্ষার রেজাল্টেও এখানকার ছাত্রদের অবস্থান বরাবরই শীর্ষস্থানে রয়েছে।
দেশের বিভিন্ন স্থান থেকে আগত ছাত্রসহ প্রায় দেড় হাজার শিক্ষার্থীর একটি অংশ মাদরাসার লিল্লাহ বোর্ডিংয়ে থেকে লেখাপড়া করলেও বড় একটি অংশ এখানকার লজিংয়ে থেকে তাদের লেখাপড়ার কার্যক্রম চালিয়ে যায়। এবং সেখানকার প্রায় প্রতিটি ঘরে ঘরে ছাত্রদের লজিংয়ে রাখা হয়। যা এই সময়ে অনেকটা অকল্পনীয়। আর এটা সেখানকার এক ঐতিহ্য বটে। এই মাদরাসা এতটা অগ্রসর হবার পেছনে অত্র এলাকাবাসীর অবদান ব্যাপক। নিবেদিতপ্রাণ মানুষের সাহায্য সহযোগিতা চোখে পড়ার মতো। শতাব্দীর এই পথ চলায় মাদরাসার শিক্ষকদের শ্রম এবং সাধারণ মানুষের নিঃস্বার্থ সহযোগিতা স্মরণীয়। শায়খে রেঙ্গার মৃত্যুর পর এই মাদরাসার পরিচালনার দায়িত্ব পালন করেন মাওলানা শামসুল ইসলাম খলিল। দীর্ঘ ৩৫ বছর এ দায়িত্ব পালনের পর তাঁর বার্ধক্যজনিত কারণে পরে এ দায়িত্ব দেয়া হয়েছে মাওলানা মুহিউল ইসলাম বুরহানকে। বর্তমানে তিনি নিষ্ঠা ও সাফল্যের সাথে পরিচালকের মতো এই গুরুদায়িত্ব বহন করে চলছেন।
শতাব্দীকাল ধরে জামেয়া তাওয়াক্কুলিয়া রেখে যাচ্ছে তার অবদান। ধর্মীয়মূল্যবোধ সম্পন্ন সু নাগরিক,আদর্শ জাতি গঠনে রয়েছে তার ব্যাপক ভূমিকা। এখান থেকে উত্তীর্ণ ছাত্ররা ধর্ম, সমাজ, রাষ্ট্রের বিভিন্ন শাখায় তাদের দায়িত্ব পালন করে যাচ্ছে সাফল্যের সাথে। বহির্বিশে^ও ছড়িয়ে ছিটিয়ে আছে অনেকে। তাদের অনেকেই গুরুত্বপূর্ণ অনেক দায়িত্ব আঞ্জাম দিয়ে যাচ্ছেন। নিজ নিজ ক্ষেত্রে রাখছেন আপন মেধা ও জ্ঞানের উজ্জ্বল সাক্ষর । বর্তমানে লেখালেখি সাহিত্য চর্চায় এ মাদরাসার শিক্ষার্থীরা অনেকটা অগ্রসর লক্ষ্য করা যায়। এখান থেকে তৈরি হয়েছেন অনেক লেখক-অনুবাদক। ছাত্রদের ব্যক্তি প্রচেষ্টায় বিভিন্ন সাময়িকী বের হওয়া ছাড়াও মাদরাসার পক্ষ থেকে আরবী, বাংলা দুটি দেয়ালিকা ও সাময়িকী বের হয়ে থাকে। মাদরাসায় রয়েছে বড় একটি পাঠাগার। এছাড়াও অত্যাধুনিক কম্পিউটার ল্যাব। যেখানে ছাত্রদের জন্য রয়েছে আইটি প্রশিক্ষণের সুবিধা। তাছাড়া বক্তৃতা ও বিতর্ক প্রতিযোগীতারও আয়োজন করে থাকে। থাকা খাওয়াসহ ছাত্রদের কিতাবাদি ছাড়াও দরিদ্র শিক্ষার্থীদের চিকিৎসা খরচও মাদরাসা বহন করে আসছে।
জামেয়া তাওয়াক্কুলিয়া রেঙ্গার যাত্রা শুরু সেই ১৯১৯ সাল থেকে। ঝঞ্জা-বিক্ষুব্ধ নানা ঘাত-প্রতিঘাত মোকাবেলা করে নিজেকে সামনে টেনে নিতে নিতে আজ সে নোঙ্গর ফেলছে শতাব্দীর বন্দরে। শতবর্ষ উদযাপনের লক্ষ্যে আয়োজন করতে যাচ্ছে তিনদিন ব্যাপী দস্তারবন্দী মহা সম্মেলন। এ সম্মেলনে এখান থেকে ফারেগ হওয়া সকল আলেমদের প্রদান করা হবে দস্তারে ফজিলত পাগড়ি। থাকবেন দেশ-বিদেশের বহু ইসলামী ব্যক্তিত্ব, পীর-মাশায়েখ ও শুভানুধ্যায়ী। আজ থেকে ২৭ ডিসেম্বর পর্যন্ত আয়োজিত এ বর্ষপূর্তি সম্মেলন সফলের লক্ষ্যে ইতিমধ্যে নেয়া হয়েছে ব্যাপক প্রস্তুতি। ধারণা করা হচ্ছে এবার এটিই হবে সিলেটের সবচেয়ে বড় ধর্মীয় সমাবেশ।
শতাব্দীর এই পথ চলায় জামেয়া হারিয়েছে তার বহু সাথী-সহচর, শুভাকাক্সক্ষীদের। বিশেষ করে প্রায় অর্ধশতাব্দীর শায়খুল হাদিস খ্যাতিমান বুযুর্গ শায়খ শিহাব উদ্দীনের (র.) আকস্মিক বিয়োগব্যথা জামেয়া ভুলতে পারবে না। শতবর্ষপূতির এই মহতি সম্মেলনে তার শূন্যতা হাহাকার জাগাবে। তাদের সবাইকে শতবর্ষের এই মাহেন্দ্রক্ষণে শ্রদ্ধার সাথে দোয়ার মাধ্যমে স্মরণ করা হবে।
শতাব্দীর বন্দর ছুঁয়ে জামেয়া এগিয়ে চলুক সময়ের সাথে সুদূর প্রসারী পথে। তিনদিন ব্যাপী দস্তারবন্দী মহা সম্মেলনের সার্বিক সফলতা কামনা করি।

শেয়ার করুন
ইতিহাস ও ঐতিহ্য এর আরো সংবাদ
  • একাত্তরের শরণার্থীর স্মৃতি
  • আরব বিশ্বের অনন্য শাসক
  • জননেতা আব্দুস সামাদ আজাদ
  • বালাগঞ্জের আজিজপুর উচ্চবিদ্যালয়
  • হারিয়ে যাচ্ছে ডাকপিয়ন ও ডাকবাক্স
  • সুনামগঞ্জের লোকসংস্কৃতি
  • সিলেটে বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার আন্দোলন ও শাবি
  • মরমী কবি শেখ ভানু
  • মুক্তিযুদ্ধে কানাইঘাট
  • বিপ্লবী এম.এন.রায়
  • শতাব্দীর বন্দরে জামেয়া রেঙ্গা
  • রেফারেণ্ডাম ও সিলেটে বঙ্গবন্ধু
  • বিজয়োল্লাসের মধ্যে বিষাদের ভয়াল স্মৃতি
  • জগন্নাথপুর উপজেলা সমিতি
  • ঢাকার আকাশে প্রথম নারী
  • বঙ্গভঙ্গের সূচনার ইতিহাস
  • স্বতন্ত্র আবাসভূমির আন্দোলন
  • সুনামগঞ্জের সাচনা: ইতিহাসের আলোকে
  • বদলে গেছে বিয়েশাদীর রীতি
  • স্বতন্ত্র আবাসভূমির আন্দোলন
  • Developed by: Sparkle IT