স্বাস্থ্য কুশল

অ্যান্টিবায়োটিক এক অদৃশ্য ‘মহামারি’র নাম

রাজু আহমেদ প্রকাশিত হয়েছে: ৩০-১২-২০১৯ ইং ০০:৩৫:৪৩ | সংবাদটি ১৭৯ বার পঠিত

একটা সময় ছিলো সামান্য জ¦রে কিংবা মাথা ব্যথায় ডাক্তার ডাকতে হতোনা। ঐ বাসা বাড়িতে একটু আধটু জলপট্টি আর বাড়ির অভিভাবকের কিছু নির্দেশনা মানলেই জ¦র শেষ। আরো কত কিছু দেখলাম সেই ছোটবেলায় এই যেমন ধরুন পেটে ব্যথা কিম্বা ঘাড়ে ব্যথা সামান্য মালিশে সব শেষ। এখন আর সেই দিন নেই। গ্রাম বলেন আর শহর বলেন সবার জীবন যেমন যান্ত্রিক তেমনি আমাদের শরীরের অসুখ বিসুখেও যেন সেই যান্ত্রিকতার ছোঁয়া। সার, কীটনাশক, আর ফরমালিন যুক্ত খাবার গ্রহণের ফলে এখন সাধারণ অসুখে সেই জলপট্টি কিম্বা মালিশ আর কাজ করেনা। সামান্য সর্দি কাশি কিম্বা জ¦রে পড়েই দৌড়াতে হয় ডাক্তারের কাছে। আর ডাক্তারের কাছে গিয়েছেন তো সেরেছেন। আহারে হরেক রকমের পরীক্ষা নিরীক্ষা আর পর্যবেক্ষণ তার হিসেব রাখে কে। এইতো সেদিন আমার জনৈক প্রতিবেশী তার শিশু ছেলেটিকে নিয়ে একজন বিশেষজ্ঞ শিশু চিকিৎসকের সরণাপন্ন হন। দুদিনের জ¦রে ভুগছিলো ছেলেটি । ডাক্তার তাকে দেখে কোন প্রকার ওষুধ না লিখে পাচটি ডায়াগনষ্টিক এর কাগজ হাতে ধরিয়ে দিলেন। আর এতেই শিশুটির পিতা মাতার চিন্তার যেন শেষ নেই। যাই হোক পরীক্ষা নিরীক্ষার পর শেষ রক্ষা পেলেন তারা। এন্টিবায়োটিক সহ মোট ১শ’ ৬৫ টাকার স্তুধ লিখলেন বিশেষজ্ঞ এই ডাক্তার। আর সস্তির নিঃশ্বাস নিয়ে বাসার পথে রওয়ানা দিলেন তার পিতা মাতা। গল্পের এখানেই শেষ নয়। ওষধ সেবন শুরু করার আগেই মহান রবের কৃপায় শিশুটির জ¦র সেরে উঠলো। কিন্তু দুঃখজনক হলেও সত্য, এরই মধ্যে ডাক্তার ফি আর ডায়াগনষ্টিক ফি পরিশোধ করতে গিয়ে এই পরিবারের খরচ গুনতে হয়েছে তিন হাজার টাকা। জীবন খাতার গল্পে তাদের এক বছরের শিশুটির নামও যোগ করে দিলেন চিকিৎসক।
যাই হোক এই প্রসঙ্গটি উল্লেখ করার পেছনে কিন্তু আরেকটি কারণ রয়েছে। সেদিন দেশের একটি শীর্ষ দৈনিকে দেখলাম বিশ^ সাস্থ্য সংস্থা আমাদের দেশে এন্টিবায়োটিক সহিষ্ণুতাকে ‘অদৃশ্য মহামারি’ হিসেবে আখ্যায়িত করেছে। আমরা নাকি বুঝে না বুঝে এন্টিবায়োটিক গিলছি। আর এতে আমাদের শরীরের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা দিন দিন কমছে। প্রাদুর্ভাব ঘটছে নানা রকম অজানা সব রোগের। আমরা দৌড়াচ্ছি ডাক্তার হাসপাতাল আর ক্লিনিক গুলোতে। দেশের ২ লাখ ৩০ হাজার ফার্মেসীতে প্রতিদিন নাকি কোন প্রকার চিকিৎসকের পরামর্শ ছাড়া ১০ লাখ এন্টিবায়োটিক ওষধ বিক্রি হয়। লোকজন অনিয়ন্ত্রিতভাবে এন্টিবায়োটিক ব্যবহারের ফলে তাদের শরীরে এন্টিবায়োটিক রেজিষ্ট্রান্স বেড়ে চলছে। আর এতে এন্টিবায়োটিক আর মানুষের শরীরে কাজ করেনা। ফলে নানা রোগ বালাই লেগেই আছে। দেশের সিংহভাগ জনগোষ্টিকে এই বিষয়টি বোঝানোর দায়িত্ব কিন্তু সরকারের সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের। এক গবেষণায় নাকি দেখা গেছে, গত দুই বছরের ব্যবধানে মানুষের শরীরে এন্টিবায়োটিক ওষুধের কার্যকরিতা হারিয়েছে প্রায় ৩৩ শতাংশ। কিন্তু তার পরও নাকি দেশের হাসপাতাল গুলোতে এন্টিবায়োটিকের ব্যবহার বাড়ছে। এর মধ্যে সরকারী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালগুলোতে শিশু বিভাগে ৯৬ শতাংশ রোগীকে এন্টিবায়োটিক ওষুধ দেয়া হয়। মেডিসিন বিভাগে ৫৪ শতাংশ আর সার্জারিতে ৮১ শতাংশ রোগীকে এন্টিবায়োটিক দেয়া হচ্ছে। প্রাইভেট চেম্বার গুলোতে ৫০ শতাংশ চিকিৎসক তাদের চিকিৎসাপত্রে এন্টিবায়োটিক লিখে থাকেন। এমন কি প্রাথমিক চিকিৎসা কেন্দ্র গুলোতেও ২৫ শতাংশ রোগীকে নাকি এন্টিবায়োটিক ধরিয়ে দেয়া হয়। এন্টিবায়োটিকের ক্ষতিকর প্রভাব সাধারণ মানুষকে না বুঝিয়ে এন্টিবায়োটিক ধরিয়ে দেয়া কি তাহলে অপরাধের আওতায় পড়েনা। অথচ আমাদের হাসপাতাল ক্লিনিক আর প্রাইভেট চেম্বারই বলেন, সবখানে আমাদের সচেতন চিকিৎসক সমাজ সেই কাজটি করে যাচ্ছেন। এখানে আবার তারাও যুক্তি দেখাতে পারেন যে, রোগীর বেঁচে থাকার প্রয়োজনে তারা এন্টিবায়োটিক লিখছেন প্রেসক্রিপশনে। হ্যাঁ, সেটা হতেই পারে। কিন্তু যে রোগীকে তাৎক্ষণিক রক্ষার নামে পুরো জীবনের রোগী করে তুলছেন সেই বিষয়টিও আপনাদের বিবেচনায় নিতে হবে। কেননা এদেশের সিংহভাগ মানুষ এখনো জানেনা এন্টিবায়োটিক এর এই ভয়াবহতা সম্পর্কে। তাদেরকে এ বিষয়ে সচেতন করে তোলা কিন্তু চিকিৎসক সমাজের দায়িত্বের একটি অংশ বলা চলে।
গবেষণা প্রতিবেদন বলছে এন্টিবায়োটিক বিক্রি যে নিষিদ্ধ বা বন্ধ করে দিতে হবে তা নয়। যা করতে হবে তা হচ্ছে ওষুধের গায়ে এন্টিবায়োটিক লেখা,একটা সম্পূর্ণ ডোজে যতটা এন্টিবায়োটিক দরকার ততটা দিয়ে প্যাকেটজাত করা দেশের স্কুল কলেজের পাঠ্যপুস্তকে এন্টিবায়োটিক এর ক্ষতিকর দিক গুলো তুলে ধরে একটি পাঠ চালু, এছাড়াও সরকারী স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের উদ্যোগে দেশব্যাপী নানা রকম কর্মসুচী ইত্যাদি ইত্যাদি। ইউরোপের দেশগুলোতে নাকি এরকম নানা উদ্যোগ গ্রহণ করে এন্টিবায়োটিক এর ব্যবহার অনেকাংশে কমিয়ে আনা হয়েছে। আর আমাদের দেশের ওষুধ কোম্পানীগুলো তাদের ফ্যাক্টরী গুলোতে প্রতিনিয়ত এই এন্টিবায়োটিক ওষুধ তৈরি অব্যাহত রেখেছে। তারা তাদের এসব ওষুধ বাজারজাত করতে দেশের বিশেষঞ্জ চিকিৎসকদের নানা প্রণোদনা দিয়ে চলেছে। আর সবাই নয় এক শ্রেণীর চিকিৎসকরাও ওষুধ কোম্পানীগুলোর সব ফরমায়েশী ওষধ আমাদের ঘাড়ে চাপিয়ে দিচ্ছেন। সে দিন দেখলাম মহামান্য হাইকোর্ট মন্তব্য করে বলেছেন, ওষুধ কোম্পানীর প্রণোদনা পেয়ে ফরমায়েশী ওষুধ লিখে দেশের চিকিৎসক সমাজ সাধারণ মানুষের আস্থা সংকটে পড়েছেন।
সম্প্রতি আবার আরেকটি দৈনিকে দেখলাম ঢাকার লালবাগ থানার প্রাণী সম্পদ কর্মকর্তা নাকি জানিয়েছেন, বর্তমানে খামারের মুরগিতেও নাকি এন্টিবায়োটিক ব্যবহার করা হচ্ছে। যা পরিমাণের তুলনায় অনেক বেশী। এই খামারি মোরগ ক্রয় করেও আমরা কিন্তু নিজেদের শরীরে এন্টিবায়োটিক নিজেদের অজান্তে নিয়ে নিচ্ছি। দেশের ভোক্তা সমাজ তাহলে যাবে কোথায়। কি এক বিচিত্র দেশে বসবাস আমাদের। সবাই ছুটছি মুনাফার পেছনে। একদিন অবশ্যই এর অবসান হবে। এমন প্রত্যাশা আমরা করতেই পারি।

শেয়ার করুন
স্বাস্থ্য কুশল এর আরো সংবাদ
  • শাকসবজি ও ফলমূল কেন খাবেন
  • দৈনন্দিন জীবনে লেবুর চাহিদা
  • এ্যাপোলো হসপিটালে ভারতের প্রথম ইনভেসিভ ডবল কার্ভ কারেকশন সার্জারি
  • হাঁড়ের ক্ষয় রোগ : নীরব ঘাতক
  • আপনার সন্তানের চোখের যত্ন নিন
  • আয়োডিন স্বল্পতায় জটিল রোগ
  • শারীরিক শক্তি বাড়ায় যে খাবার
  • সুস্থতার জন্য পানি
  • রোগ প্রতিরোধে ডালিম
  • শীতে হাঁপানি এড়াতে কী করবেন
  • শীতে ঠোঁটের সুরক্ষা
  • এক জায়গায় বসে কাজ করার কুফল
  • সুঅভ্যাসে সুস্বাস্থ্য
  • ঠান্ডায় নাক বন্ধ হলে করণীয়
  • শশার গুণাগুণ
  • রোগ প্রতিরোধে কমলা
  • শিশুর খাবার
  • ডা. এ হাসনাত শাহীন অসুস্থ শিশুর যত্ন নিচ্ছেন মা
  • শীতে যেসব রোগের প্রকোপ বাড়ে
  • শীতকালে নাক, কান ও গলার সমস্যা
  • Developed by: Sparkle IT