ধর্ম ও জীবন

মসজিদ : শান্তি ও সভ্যতার প্রতীক

মোঃ আব্দুশ শহীদ নেগালী প্রকাশিত হয়েছে: ০৩-০১-২০২০ ইং ০০:৫৯:১১ | সংবাদটি ১৭৬ বার পঠিত

মসজিদ শব্দটি একবচন, বহু বচনে বলা হয় মাসাজিদ। শব্দটির অর্থ হচ্ছে সিজদার স্থান। শরীয়তের পরিভাষায়, নামাযের জন্য যে স্থান ওয়াক্বফ করে দেওয়া হয়, তাকে মসজিদ বলে।
পৃথিবীর প্রথম মসজিদ হচ্ছে বাইতুল্লাহ বা কা’বা শরীফ। যা ইবাদতের জন্য সর্ব প্রথম নির্মাণ করা হয়েছিল। কা’বা শরীফ নির্মাণের ইতিহাস থেকে জানা যায়, হযরত ইব্রাহিম (আঃ) ও তদীয় পুত্র হযরত ইসমাঈল (আঃ) কা’বা শরীফ নির্মাণের পর, কিছু সুরকি ও পাথরের টুকরো অবশিষ্ট্য থেকে যায়। সে গুলো চুর্ণ-বিচুর্ণ করে পৃথিবীতে নিক্ষেপ করার জন্য মহান আল্লাহতায়ালা হযরত ইব্রাহিম (আঃ) কে নির্দেশ প্রদান করেন। নির্দেশ মতে হযরত ইব্রাহিম (আঃ) তাই করলে, মহান রাব্বুল আলামীন স্বীয় কুদরতে পৃথিবীর সর্বত্র পৌঁছিয়ে দেন। যে সকল স্থানে চুর্ণগুলো পড়েছে, সে সকল স্থানে কিয়ামতের পূর্ব পর্যন্ত নির্মাণ হতে থাকবে একটি করে মসজিদ।
মসজিদ সমূহকে আল্লাহর ঘর বলা হয়, কেননা প্রথমতঃ আল্লাহর কুদরতি (নিরাকার) হাত স্পর্শ করে কা’বা শরীফের উদ্ধৃত মসলার একটি চুর্ণ এখানে পতিত হবার বরকতেই নির্মিত হয়েছে মসজিদ। দ্বিতীয়তঃ এ ভূমিটুকু মহান আল্লাহ পাকের ওয়াস্তে ওয়াক্বফকৃত স্থান। তৃতীয়তঃ আল্লাহয়ালাগণ তাদের শরীরের সবচাইতে সম্মানিত অঙ্গসমূহ, যেমন-হৃদয়, নাসিকা, ললাট মহান রাব্বে কারীমের কুদরতি ক্বদমে বিলীন করে দেয়। মহান রাব্বুল আলামীনের সাথে তাঁর বান্দাদের কথোপথনের শ্রেষ্ঠতম স্থানই হচ্ছে মসজিদ। পৃথিবীর যে সকল স্থানে মসজিদ সমূহ নির্মাণ করা হয়েছে, সে সকল স্থান কিয়ামত পর্যন্ত মসজিদের হুকুমেই থাকবে। যদিও কোন মসজিদ কোথায় ও স্থানান্তরিত হয়ে যায়। ছাদ এবং দেয়াল না থাকলেও এ স্থানটির হেফাযত করা মুসলমানদের উপর অপরিহার্য্য। ঐ স্থানটি ক্রয়-বিক্রয়ও করা যাবেনা যদি পবিত্রতা বিনষ্ট হবার সম্ভাবনা থাকে। কোন যুগে কোন কালে কোন ব্যক্তিবর্গ বিতর্কিত স্থানে, পতিত ভূমিতে বা আস্তাকুঁড়ে মসজিদ নির্মাণ করেননি। মহান আল্লাহর এ ঘর নির্মাণের জন্য বাছাই করে থাকেন মূল্যবান ও উপযুক্ত ভূমি।
যুগে যুগে মসজিদকে কেন্দ্র করেই গড়ে উঠেছে ইসলামী সভ্যতা, মানবতা আর ভ্রাতৃত্ববোধ। প্রতি শুক্রবার মসজিদ সমূহে অনুষ্ঠিত হয় মুসল্লিদের এক মহা সম্মেলন। মসজিদের খতিব সাহেবগণ সমাগত মুসল্লিগণের উদ্দেশ্যে সুদ, ঘুষ, মদ, জুয়া, জঙ্গি ও সন্ত্রাসবাদ, ধর্ষণ এবং হত্যাসহ যে সকল কুসংস্কার মানুষ ও সমাজকে ধ্বংসের আস্তাকুঁড়ে নিক্ষেপ করে সে সকল অপকর্মের বিরুদ্ধে গুরুত্বপূর্ণ নছিয়ত পেশ করে থাকেন। এ সকল নছিয়তকে পুঁজি করে মানুষ সংশোধন করে নেয় তার মূল্যবান চরিত্রকে। ভুলে যায় হিংসা, হানা-হানি, মানুষগুলো হয়ে যায় খোদার রাহে আত্মত্যাগী আর পরোপকারী। ভোর বেলা মসজিদে পড়–য়া ছাত্র-ছাত্রীরা পেয়ে যায় তাদের সুন্দর ভবিষ্যতের সন্ধান। এ জন্যই পৃথিবীর মসজিদ সমূহ হচ্ছে শান্তি ও সভ্যতার প্রতীক। যুগ-যুগ ধরে সভ্য জাতি প্রত্যক্ষ করেছে ধর্মান্ধ ও উগ্রবাদীরা, গোড়ামী নীতির লেজ ধরে শান্তির নীড় মসজিদ সমূহকে তালাবদ্ধ করে রেখেছে, মসজিদের ভিতর হত্যা করেছে অনেক মুসল্লিদেরকে, মসজিদ করেছে ভাংচুর, মসজিদে যাতায়াতের পথে মুসল্লিদেরকে করেছে উত্ত্যক্ত। ওরা শুধু ধর্মের শত্রু নয়, ওরা সভ্যতা শান্তিপ্রিয় মানুষের শত্রু।
বিশ্বের প্রতিপালক মহান আল্লাহতায়ালা বলেন-যে ব্যক্তি আল্লাহর মসজিদ সমূহে তার নাম উচ্চারণ করতে বাধা দেয় এবং সেগুলোকে উজাড় করতে চেষ্টা করে, তার চাইতে বড় জালেম আর কে? এদের পক্ষে মসজিদ সমূহে প্রবেশ করা বিধেয় নহে, অবশ্যই ভীত সন্ত্রস্ত অবস্থায়। ওদের জন্য ইহকালে লাঞ্ছনা ও পরকালে রয়েছে কঠিন শাস্তি। (সুরা বাকারা-১১৫)।
মহান আল্লাহতায়ালা অত্যন্ত ধৈর্য্যশীল ও দয়াপরশ, তিনি তাৎক্ষণিক প্রতিশোধ গ্রহণকারী নন। যদি ক্ষেত্র বিশেষ তাৎক্ষণিক প্রতিশোধ গ্রহণকারী হয়ে যান। তাহলে মুহূর্তের মধ্যে যে কোন জাতির অস্তিত্বকে নির্মূল করে মাটির সাথে মিশিয়ে দিতে পারেন। যেমনটি করেছিলেন জামেল বাদশা আবরাহার হস্তি বাহিনীর সাথে।
মসজিদ সমূহ হচ্ছে মুনিব ও গোলামদের যোগসূত্র স্থাপনের একটি অনন্য স্থান। সে স্থানে বান্দাগণ যাবার বেলায় বা নামায পড়ার বেলায় কিভাবে নিজেকে প্রস্তুত করে নেবে সে সম্পর্কে মহান আল্লাহপাক বলেন-হে বনী আদম তোমরা প্রত্যেক নামাযে (মসজিদে) যাবার বেলায় সাজ-সজ্জা পরিধান করে নাও। খাও ও পান কর এবং অপব্যয় করনা। তিনি (আল্লাহ) অপব্যয়কারীদের পছন্দ করেন না। (সুরা আরাফ-৩২) আয়াতের সারমর্ম থেকে অনুধাবন করা যায় মহান আল্লাহর সাথে মসজিদে বা নামাযে সাক্ষাতের বেলায় পোষাক পরিচ্ছদ থাকতে হবে পূত-পবিত্র, অহংকার মুক্ত, অন্তরও থাকতে হবে অনুরূপ, দেখলে মনে হবে ওরা সভ্য জনগোষ্ঠী।
মসজিদ নির্মাণ বা ঝরে পড়া মসজিদ পুনঃনির্মাণ অথবা মসজিদ আবাদ করা সম্পর্কে মহান আল্লাহতায়ালা বলেন-নিঃসন্দেহে তারাই আল্লাহর মসজিদ আবাদ করবে, যারা ঈমান এনেছে, আল্লাহর প্রতি ও শেষ দিনের প্রতি, কায়েম করে নামায ও আদায় করে যাকাত। আল্লাহ ব্যতিত আর কাউকে ভয় করে না। অতএব, আশা করা যায় তারা হেদায়ত প্রাপ্তদের অন্তর্ভূক্ত হবে (সুরা তাওবাহ-১৯)। এ আয়াতের ব্যাখ্যায় কাজী ছানাউল্লাহ পানিপথী (রঃ) বলেন, মসজিদ আবাদ মানে মসজিদে ক্রয়-বিক্রয়, দুনিয়াবী কথা-বার্তা, হারানো বস্তুর সন্ধান, ভিক্ষাবৃত্তি, গল্প-গুজব, ঝগড়া-বিবাদ, হৈ-হুল্লোড় প্রভৃতি থেকে মসজিদকে পবিত্র রাখাই মসজিদ আবাদ করার শামীল।
রাসূলে করিম (সাঃ) বলেন-‘আল্লাহতায়ালার কাছে সর্বাধিক প্রিয় স্থান হচ্ছে মসজিদসমূহ এবং সবচাইতে অপছন্দীয় স্থান হচ্ছে পৃথিবীর বাজারসমূহ’ (মুসলিম)।
হাদিছ শরীফে মসজিদ সমূহকে বেহেস্ত বা জান্নাতের সাথে তুলনা করা হয়েছে। যেমন হযরত আবু হুরায়রা (রাঃ) থেকে বর্ণিত রাসূলে করিম (সাঃ) বলেছেন-‘যখন তোমরা জান্নাতের বাগান সমূহের পাশ দিয়ে যাতায়াত করবে, তখন তথায় কিছু সময় খাদ্য গ্রহণ করবে।’ সাহাবীগণ জিজ্ঞাসা করলেন, ইয়া রাসুলুল্লাহ (সাঃ) জান্নাতের বাগান সমূহ কি? উত্তরে হুজুর আকরাম (সাঃ) বললেন, ‘দুনিয়ার মসজিদ সমূহ।’ পুনরায় সাহাবী জিজ্ঞাসা করলেন ইয়া রাসুলুল্লাহ (সাঃ) তথাকার খাদ্য কী? হুজুরে আকরাম (সাঃ) বললেন তথাকার খাদ্য হলো ছুবহানাল্লাহি ওয়াল হামদু লিল্লাহি ওলা-ইলাহা ইল্লাল্লাহু ওল্লাহু আকবার; এ দোয়াটি পাঠ করবে। প্রিয় রাসূল (সাঃ) আরও বলেছেন-কোন ব্যক্তি সকাল-সন্ধা মসজিদে প্রবেশ করুক না কেন (এবাদাতের উদ্দেশ্যে) আল্লাহতায়ালা তার জন্য জান্নাতে মেহমানদারীর উপকরণ প্রস্তুত করে রাখেন (বোখারী, মুসলিম)। মসজিদের মিনার হতে যখন মোয়াজ্জিন আযান পেশ করেন, তখন আশপাশের রঙ-তামাশা খেলাধূলা, ঝগড়া-বিবাদ নিঃস্তব্ধ হয়ে যায়। বাড়িতে বসে থাকা মা-বোনেরা এতক্ষণ মাথায় ঘোমটা ছেড়ে নিজ নিজ কাজে আর গল্পগুজবে ব্যস্ত ছিল, আযানের ধ্বনি কর্ণপাত হবার সাথে সাথে মাথায় ঘোমটা তুলে নেয়। মনে হয় সমাজে ফাঁসাদ সৃষ্টিকারী ‘শয়তান’ কিছু সময়ের জন্য হলেও পালিয়ে গেছে। আমার প্রিয় কবি কাজী নজরুল ইসলামের শেষ জীবনের কামনা, আযান সম্পর্কে-‘মসজিদেরই পাশে আমার কবর দিও ভাই, যেন গোর থেকেও মোয়াজ্জিনের আজান শুনতে পাই।’ কবি কায়কোবাদ আযান সম্পর্কে হৃদয় জুড়ানো কবিতায় বলেছেন-‘কে ওই শোনাল মোরে আযানের ধ্বনি, মর্মে মর্মে সেই সুর, বাজিল কি সুমধুর, আকুল হইল প্রাণ নাচিল ধ্বমনি, কি মধুর আযানের ধ্বনি।’ এতো মনোমুগ্ধকর আহবান পৃথিবীতে অদ্বিতীয়।
দুনিয়ার কাজে ব্যস্ততম মানুষ সব কাজকর্ম বন্ধ করে আযানের টানে মসজিদের জন্য নিজেকে প্রস্তুত করে নেয়। উযুর মাধ্যমে অঙ্গ-প্রত্যঙ্গের ধুলো-ময়লা ধুয়ে মুছে পরিষ্কার করে পাক পবিত্র জামা-কাপড় পরে মহান আল্লাহর ঘরে হাজিরী প্রদান করে। মসজিদের মাধ্যমেই দূর হয় রং, গোত্র, ধনী-নির্ধন, আমিত্ব, অহমিকা আর সম্পদের প্রাচুর্যের অহংকার। সৃষ্টি হয় একে অপরের প্রতি ভালবাসা আর ভ্রাতৃত্ববোধ। এ প্রভাব ধীরে ধীরে সমাজেও বিস্তার লাভ করে।
এ পৃথিবীতে শিক্ষা প্রতিষ্ঠান নির্মাণের বেলায় মুসলমানদের পাশাপাশি অন্যান্য ধর্মাবলম্বিদের অবদানও কম নয়। যত ধরনের প্রতিষ্ঠান আর উপাসনালয় রয়েছে তার মধ্যে মসজিদ হচ্ছে সর্বশ্রেষ্ঠ। মসজিদে যারা নিয়মিত যাতায়াত করে তাদের চরিত্রে মাদুর্যতা আসে।
ফতোয়ার কিতাব তালাশ করে জানা যায়, যদি কোন অমুসলিম সৎ উদ্দেশ্যে-তার বৈধ সম্পত্তি হতে মুসলমানদের মসজিদ বানানোর জন্য বা মসজিদের ব্যয় নির্বাহের জন্য কিছু সম্পত্তি ওয়াক্বফ করে দিতে চায়, তাহলে মসজিদ কর্তৃপক্ষ তা গ্রহণ করা জায়েয হবে। বিনিময়ে দাতা পক্ষ দুনিয়াতে উত্তম ফলাফল পাবে। (ফতোয়ায়ে মাহমুদিয়া) ২৯৫। মসজিদ আল্লাহর ঘর। মসজিদ এবং মসজিদের সম্পত্তি হেফাযত করা সকল মুসলমানদের উপর ফরয। যদি কোন সম্প্রদায় মসজিদের সম্পত্তি জোরদখল করে নেয়, তাহলে তাহা উদ্ধারের আইনগত সকল ব্যবস্থা গ্রহণ করা সকল মুসলমানদের জন্য অপরিহার্য। (তালিফাতে রশিদিয়া পৃ-৪৪৫) ধর্ম-বর্ণ নির্বিশেষে মসজিদকে সম্মান করুন। শান্তি-সভ্যতা, ভ্রাতৃত্ববোধ, আর ভালবাসার প্রাণকেন্দ্র হচ্ছে পৃথিবীর মসজিদ সমূহ। রাজা-প্রজা, প্রভু-ভৃত্য, চাকর-নকর কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে একই সারিতে দাঁড়িয়ে এটাই প্রমাণ করেন যে, হে আল্লাহ আমাদের মধ্যে কোন গৌরব ও অহংকার নেই তোমার ঘরে তোমার সম্মুখে আমরা সকলই সমান। সকল গৌরব আর অহংকারের মালিক একমাত্র তুমি আল্লাহ।

শেয়ার করুন

Developed by: Sparkle IT