সামরিক শাসন জারির পরে ১৯৬২-৬৩ সালে বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার আন্দোলন অন্যভাবে রূপ নেয়। '৬২ সালের ৩০ জানুয়ারি করাচীতে শহীদ সোহরাওয়ার্দীকে গ্রেফতার করা হলে ছাত্রসমাজ প্রতিবাদে ফেটে পড়ে। এই প্রতিবাদ আন্দোলনের মধ্যদিয়ে সামরিক শাসন বিরোধী আন্দোলনের সূচনা ঘটে। একই সময় আইয়ূব প্রবর্তিত সংবিধান ও শিক্ষা কমিশন বিরোধী আন্দোলনও গড়ে উঠে। সিলেটে আইয়ুব বিরোধী আন্দোলনের পাশাপাশি বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার আন্দোলন ও সিলেট মেডিকেলে কনডেন্সড্ প্রবর্তনের আন্দোলনও যুক্ত হয়। '৬২ সালে একুশে ফেব্রুয়ারি পালনে ছাত্রসমাজ সাহসী ভূমিকা পালনের মাধ্যমে প্রকাশ্যে আন্দোলন ছড়িয়ে দেয়। তখন থেকে সামরিক শাসনের বিরুদ্ধে কোন না কোন ভাবে প্রতিবাদ ও আন্দোলন চলতেই থাকে। এ সময় আন্দোলনের নেতৃত্বের পুরোভাগে ছিলেন গুলজার আহমদ, ইকবাল আহমদ চৌধুরী, দেওয়ান নূরুল হোসেন চঞ্চল (মরহুম), শ্রী কামদেব প্রমুখ। আন্দোলন দমনের জন্য একুশে ফেব্রুয়ারি দিবাগত রাতে পুলিশ ছাত্রনেতা গুলজার আহমদ, ইকবাল আহমদ চৌধুরী ও সামসুল হককে গ্রেফতার করে।
সিলেটে বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার দাবির প্রতি প্রকাশ্য জনসভায় সমর্থন জানান আওয়ামীলীগ নেতা শহীদ সোহরাওয়ার্দী, শেখ মুজিবুর রহমান এবং হামিদুল হক চৌধুরী। ১৯৬২ সালের ১০ নভেম্বর সিলেটের রেজিস্ট্রি মাঠে এক জনসভায় তারা এই সমর্থন জানান। ঐ বছর ২০ ডিসেম্বর সেনা প্রেসিডেন্ট আইয়ুব খান সিলেট সফরে আসেন। তিনিও সিলেটে বিশ্ববিদ্যালয়ের দাবি পূরণের আশ্বাস দেন। জনমতের চাপে বাধ্য হয়ে এই আশ্বাস দিলেও পরবর্তীতে তিনি এই ব্যাপারে সম্পূর্ণ নীরব ছিলেন।
এই সময় কালে বিশ্ববিদ্যালয়ের দাবিতে সিলেটে তুমুল আন্দোলন হয়। সভা, মিছিল, বিক্ষোভ প্রতিনিয়ত হয়েছে। লাগাতার ছাত্র ধর্মঘট ও লাগাতার হরতাল পালিত হয়েছে। বিশ্ববিদ্যালয়ের দাবিতে ১৯৬৩ সালে একসময় অনশন ধর্মঘট পালিত হয়। মুরাদ ও হাফিজ নামের মেডিকেলের দুইজন ছাত্রসহ চারজন ছাত্র এই অনশন কর্মসূচিতে অংশ গ্রহণ করেন। বিশ্ববিদ্যালয় আন্দোলনে এ সময় যে সকল ছাত্রনেতা যুক্ত ছিলেন তাদের মধ্যে মরহুম আব্দুল লতিফ সর্দার, মরহুম দেওয়ান নূরুল হোসেন চঞ্চল, মরহুম ডাঃ মোঃ মহশিন, মরহুম রমা মহশীন, গুলজার আহমদ, এনামুল হক, বাহাউদ্দিন জাকারিয়া, সামসুল আলম চৌধুরী, আব্দুল মুনিম, মহিলা কলেজের ছাত্রী মুর্শেদ জাহান, আমেনা আফতাব, দিপ্তী সেন, সাহানারা, আ ফ ম কামাল, নন্দ গোপন চৌধুরী, আইয়ুব আলী, এ কে এম গৌসুল আলম, মকসুদ আহমদ খান, লুৎফুর রহমান, আব্দুল খালিক, সিরাজ উদ্দিন, আফতাব আহমদ বাচ্চু, লতিফুর রহমান মাহমুদ, সরেকওম মুকুল, রফিকুর রহমান লজু প্রমুখের নাম উল্লেখযোগ্য।
রাজনৈতিক নেতৃবৃন্দের মধ্যে ছিলেন মরহুম আসাদ্দার আলী, মরহুম মতছির আলী, মরহুম ধলা বারী, দেওয়ান ফরিদ গাজী, আব্দুল হামিদ, আব্দুর রহীম লাল বারী মিয়া প্রমুখ। সামগ্রিক আন্দোলনে শীর্ষনেতা ছিলেন মরহুম আসাদ্দার আলী, গুলজার আহমদ ও ইকবাল আহমদ চৌধুরী। মরহুম দেওয়ান নূরুল হোসেন চঞ্চলও তাদের সঙ্গে যুক্ত ছিলেন। আন্দোলনের নেপথ্যে ছিলো গোপন কমিউনিস্ট পার্টি। কনভেনশন মুসলিম লীগ নেতা মরহুম আজমল আলী চৌধুরী (স্বাধীনতার পরে মুক্তিযোদ্ধাদের হাতে নিহত) ও বিশ্ববিদ্যালয়ের আন্দোলনে সক্রিয়ভাবে যুক্ত ছিলেন।
বিশ্ববিদ্যালয়ের দাবিতে সমগ্র সিলেট অঞ্চলের জনগণ যখন ঐক্যবদ্ধ ও আন্দোলনে সোচ্চার এবং যখন সেনা প্রেসিডেন্ট আইয়ুব খানেরও আশ্বাস রয়েছে তখন হঠাৎ করে চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয় স্থাপনের দাবি উঠে। তখন পাকিস্তান জাতীয় পরিষদের স্পিকার চট্টগ্রামের কনভেনশন মুসলিম লীগ নেতা ফজলুল কাদির চৌধুরী (মুক্তিযোদ্ধাদের হাতে নিহত) প্রেসিডেন্ট আইয়ুব ঠিক এ সময়েই বিদেশ ভ্রমণে যান। ফজলুল কাদির চৌধুরী এ সময় ভারপ্রাপ্ত প্রেসিডেন্ট নিযুক্ত হয়েই চট্টগ্রামে বিশ্ববিদ্যালয় স্থাপনের ঘোষণা দেন। সিলেটবাসী আবারও প্রতারিত ও বঞ্চিত হয় এবং বিশ্ববিদ্যালয়ের আন্দোলন অনেক পিছনে পড়ে যায়। এর আগে '৬৩ সালের ২১ জানুয়ারি আন্দোলনের অংশ হিসেবে সিলেটবাসী ‘বিশ্ববিদ্যালয় দিবস’ পালন করেন।
এরপর ’৬৪ সালে ফাতেমা জিন্নাহ'র নির্বাচন, পাক-ভারত যুদ্ধ, ৬ দফার আন্দোলন, গণ অভ্যুত্থান, সেই সাথে ’৭০-এর নির্বাচন এবং '৭১-এর মুক্তিযুদ্ধের উন্মাতাল দিনে সিলেটবাসীর বিশ্ববিদ্যালয়ের আন্দোলন চাপা পড়ে যায়। মুক্তিযুদ্ধ শুরুর ঠিক আগে ১৯৭০ সালে ঢাকার সাভারে জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয় স্থাপিত হয়। একাত্তুর সালে দেশ স্বাধীন হওয়ার পরে দেশের পুনর্গঠন এবং সব কিছু গুছিয়ে উঠার আগেই পচাত্তর সালে নিহত হন জাতির জনক বঙ্গবন্ধু। দেশবাসী আবার সামরিক শাসনের নিগড়ে বাঁধা পড়ে। সব কিছু উলটপালট হয়ে যায়। চলে যায় আরো কয়েকটি বছর। ১৯৮১ সালে সিলেটে বিশ্ববিদ্যালয় স্থাপনের দাবি আবার সামনে আসে। পরের বছর ১৯৮২ সালের রাজনৈতিক দল, ছাত্র সংগঠন ও সর্বস্তরের মানুষ ঐক্যবদ্ধ হয়ে আন্দোলনের ব্যাপক প্রস্তুতি নিতে শুরু করে। এবার আন্দোলনের ধরণ অন্যরকম। এই পর্যায়ে সিলেটী উচ্চপদস্থ সরকারী কর্মকর্তা, রাজনৈতিক নেতৃবৃন্দ এবং বিশিষ্ট ব্যক্তিবর্গ কেন্দ্রীয় ভাবে বিশ্ববিদ্যালয় স্থাপনে সরকারের সিদ্ধান্তকে প্রভাবিত করার উদ্যোগ গ্রহণ করেন। এই পর্যায়ে অন্যদের মধ্যে অগ্রণী ভূমিকা পালন করেন জাতীয় সংসদের স্পিকার হুমায়ুন রশীদ চৌধুরী, সাবেক সচিব আবুল মাল আব্দুল মুহিত, সাবেক রিয়ার এডমিরাল মরহুম এম এ খান । তারা তিনজনই তখন এরশাদ সরকারের উপদেষ্টা ছিলেন। এ সময় সিলেটে চলমান যে আন্দোলন ছিল সেটা মূলত এরশাদ বিরোধী এবং উপজেলা বাতিলের আন্দোলন ছিল। ১৯৮৪ সালে এই আন্দোলন খুব শক্তিশালী ছিল। সে সময় এরশাদ উপজেলা নির্বাচন করতে পারেন নি। ১৯৮৫ সালে এই আন্দোলনের সহিত বিশ্ববিদ্যালয়ের আন্দোলনও যুক্ত হয়। উপজেলা বাতিলের আন্দোলন চলাকালে সংগ্রামী ছাত্র সমাজ এরশাদের সিলেট আসা নিষিদ্ধ ঘোষণা করেন।
উপজেলা আন্দোলনের সময় কারাবরণ করেন ছাত্রনেতা লোকমান আহমদ, মিসবাহ উদ্দিন সিরাজ, তাপশ ভট্টাচার্য, এ টি এম ফয়েজ উদ্দিন, বিজিত চৌধুরী, জিয়া উদ্দিন লালা, আব্দুল মুছব্বির এবং পনের দলীয় জোটের নেতা আব্দুল মন্নান রাজন, মনজু মিয়া, সাত দলীয় জোটের নেতা রফিকুল ইসলাম শিশু। একই সময়ে ঢাকার একটি হোটেল থেকে গ্রেফতার হন আবুল কাহের শামীম, জাকির হোসেন ও শোয়েব আহমদ চৌধুরী। এই আন্দোলন চলাকালে সিপিবি সিলেট জেলা শাখার তৎকালীন সম্পাদক কমরেড আব্দুল মালেককে গ্রেফতারের জন্য পুলিশ কয়েকবার তার মীরাবাজার আগপাড়ার বাসায় রেইড করে। তাকে ধরার জন্য পুলিশ তার এক বন্ধুর বাগবাড়িস্থ বাসায়ও তল্লাশী চালায়। তখন কমরেড মালেকের উপর হুলিয়া ছিল। কমরেড মালেককে গ্রেফতারের লক্ষ্যে পুলিশ তার আরেক বন্ধু হামিদ মোহাম্মদের গাড়ি আটকিয়েও তল্লাশী চালায়।
সিলেট সদর উপজেলা থেকে চেয়ারম্যান নির্বাচিত হয়েছিলেন সাবেক পৌর চেয়ারম্যান বাবরুল হোসেন বাবুল। নির্বাচনের পর পরই বাবুল আটক ছাত্রনেতাদের দেখার জন্য জেলে গিয়ে ছিলেন।
সিলেটে বিশ্ববিদ্যালয় স্থাপনের দাবিতে ১৯৮৪ সালের শেষ দিকে সিলেট যুব নাগরিক কমিটি ২৪ ঘণ্টার এক অনশন কর্মসূচি পালন করে। সিলেট প্রেসক্লাবে পালিত এই অনশন কর্মসূচিতে অংশগ্রহণ করেন কমিটির সভাপতি মরহুম শমশের আলী বাবুল, সাধারণ সম্পাদক সাব্বির আহমদ মোসান্না, শফি আহমদ, আবুল হাসনাত চৌধুরী, আলী আহসান বাবুল, লোকমান আহমদ, জামিল আহমদ ও বাহার খন্দকার। অনশন শুরুর পরদিন ২৪ ঘণ্টা অতিবাহিত হওয়ার আগেই সিলেট পৌরসভার নবনির্বাচিত চেয়ারম্যান আ ফ ম কামাল শরবত দিয়ে তাদের অনশন ভঙ্গ করান। চেয়ারম্যান কামাল অনশনকারীদের দাবির সাথে একাত্মতা প্রকাশ করলে এবং এই ব্যাপারে দায়িত্বশীল ও কার্যকর উদ্যোগী ভূমিকা পালনের প্রতিশ্রুতি দিলে তারা অনশন ভঙ্গ করতে সম্মত হন। অনশন কালে সমন্বয়কারীর ভূমিকা পালন করেন বীর মুক্তিযোদ্ধা ইয়ামীন চৌধুরী।
ছাত্রদের প্রতিরোধ ও নিষিদ্ধ ঘোষণার কারণে এরশাদ সিলেটে আসতে অসমর্থ হন। অথচ তিনি সিলেট সফরের জন্য খুবই আগ্রহী। এই রকম পরিপ্রেক্ষিতে এরশাদ সরকারের অন্যতম উপদেষ্টা হুমায়ুন রশীদ চৌধুরী বিষয়টি নিয়ে তৎপর হন এবং প্রেসিডেন্ট এরশাদের সাথে আলোচনা করেন। যে কোন কিছুর বিনিময়ে এরশাদ সিলেট আসার জন্য প্রস্তুত ছিলে'/> SylheterDak.com.bd
ইতিহাস ও ঐতিহ্য

সিলেটে বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার আন্দোলন ও শাবি

রফিকুর রহমান লজু প্রকাশিত হয়েছে: ০৮-০১-২০২০ ইং ০০:৫৭:১৪ | সংবাদটি ৩০৯ বার পঠিত

দেশের প্রথম ও একমাত্র বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয় শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার পূর্ব পর্যন্ত শিক্ষা ক্ষেত্রে সিলেটের একমাত্র গর্বের ধন ছিল মুরারিচাঁদ কলেজ। শতাব্দী অধিক কাল আগে ১৮৯২ সালে আনুষ্ঠানিক ভাবে প্রতিষ্ঠিত এটি আসামের প্রথম কলেজ। নানা ঘাত-প্রতিঘাত ও প্রতিকূলতার মধ্য দিয়ে কলেজটি ধাপে ধাপে এগিয়ে যায় এবং এক সময় আকারে বিন্যাসে ও শিক্ষার গুণগত মানে কলেজটি স্বর্ণশিখরে আসীন হয়। বিস্তৃর্ণ ভূমি নিয়ে অপরূপ প্রাকৃতিক পরিবেশে নির্মিত কলেজটি কোন এক সময়ে আরো বৃহত্তর শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে রূপান্তরিত হবে অনেকের মনেই এরকম একটি মহতী আশার অংকুর ছিল।
সিলেট শহরের গোবিন্দ চরণ পার্ক থেকে কলেজটি স্থানান্তরের লক্ষ্যে ১৯২১ সালের ১৯ অগাস্ট শহরের পূর্ব দিকে টিলাগড়ে থ্যাকারে টিলায় কলেজটির প্রশাসনিক ভবনের ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন করা হয়। আসামের তখনকার নব নিযুক্ত গভর্ণর স্যার ইউলিয়াম মরিস ভিত্তি প্রস্তর স্থাপন অনুষ্ঠানে যে ভাষণ দেন তাতে কলেজটির বিশ্ববিদ্যালয়ে রূপ লাভের আশা আরো জোরদার হয়। স্যার মরিস তাঁর ভাষণে উল্লেখ করেন, There are signs that question of a separate university for Assam may ere long demand consideration. If any such project matures, your college will surely have still bigger future ১৯২১ কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয় এ্যাক্ট পাশ হয় এবং এর ফলে বিশ্ববিদ্যালয় পরিচালনার দায়িত্ব ও কর্তৃত্ব কেন্দ্রীয় সরকারের নিকট থেকে বঙ্গের প্রাদেশিক সরকারের নিকট চলে যায়। এর ফলে আসামে স্বতন্ত্র বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার দাবিটি আরো সামনে আসে। এ সময় আসামের চিফ কমিশনার স্যার এন.ডি. বীটসন বেল মুরারিচাঁদ কলেজ বিশ্ববিদ্যালয় হিসেবে প্রতিষ্ঠা পাবার এক ইঙ্গিত প্রদান করেন। এক ঘোষণায় তিনি বলেন, ‘আমি স্থির নিশ্চিত, সেদিন খুব দূরে নয় যেদিন সিলেট ও গৌহাটি সংযুক্ত আসামের অক্সফোর্ড ও কেমব্রিজে রূপান্তরিত হবে।’ এভাবে কর্তা ব্যক্তিগণের মন্তব্য বা ঘোষণায় এম.সি কলেজ বিশ্ববিদ্যালয়ে রূপান্তরিত বা সিলেটে বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার আকাক্সক্ষার ব্যাপ্তি বিস্তৃত হলেও আসলে বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার বিষয়ে বাস্তবে কোন অগ্রগতি হয় নি।
ঐতিহাসিক লাহোর প্রস্তাব গৃহীত হবার আগে যখন অখণ্ড ভারতের স্বাধীনতার জন্য আন্দোলন চলছিল, সে সময় ১৯৩৬ সালে এই স্বাধীনতা আন্দোলনের পাশাপাশি সিলেটে বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার আন্দোলনও গড়ে উঠে। এ সময় দল মত নির্বিশেষে সিলেট অঞ্চলের জননেতাগণ শিক্ষা বিষয়ক একটি কনভেনশন আহবান করেন। কনভেনশনে সিলেটে বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার ব্যাপারে সবাই একমত হন এবং বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার জন্য কনভেনশনে গৃহীত সিদ্ধান্ত অনুযায়ী আসাম সরকারের কাছে জোরদাবি জানানো হয়। কনভেনশন পরবর্তী সময়ে বিশ্ববিদ্যাল প্রতিষ্ঠার দাবি আরো প্রবল হয়। আন্দোলনের মাঝপথে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের দামামা বেজে উঠে। যুদ্ধের ডামাডোলে বিশ্ববিদ্যালয় আন্দোলন চাপা পড়ে যায়। বস্তুত ১৯৩৬ সালে কনভেনশন অনুষ্ঠানের মধ্য দিয়ে সিলেটে বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে মোটামুটি ভাবে সংগঠিত আন্দোলনের সূত্রপাত ঘটে।
দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ চলাকালে ১৯৪১ সালে সুনামগঞ্জের সুনাওর আলী আসামের শিক্ষামন্ত্রীর পদে আসীন হন। তিনি মন্ত্রী হবার পর সিলেটবাসীর দীর্ঘদিনের দাবি সিলেটে একটি বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার উদ্যোগ গ্রহন করেন। এই ব্যাপারে তিনি একটু সক্রিয় হলে বিশ্ববিদ্যালয়টি ব্রহ্মপুত্র উপত্যকার গৌহাটিতে স্থাপনের দাবি উঠে। বিশ্ববিদ্যালয় স্থাপন নিয়ে যখন সুরমা উপত্যকা ও ব্রহ্মপুত্র উপত্যকার মধ্যে প্রতিদ্বন্দ্বিতা শুরু হয় তখন পাহাড়িয়া উপজাতিরাও বিশ্ববিদ্যালয়ের জন্য সচেষ্ট হয়ে উঠে। তারা দাবি জানায় আসাম প্রদেশের বিশ্ববিদ্যালয় যেনো সিলং-এ স্থাপন করা হয়। শিক্ষামন্ত্রী মুনাওর আলী সুরমা উপত্যকায় বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার ব্যাপারে তৎপর থাকলেও এবারও একই কারণে অর্থাৎ যুদ্ধ জনিত কারণে বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার তৎপরতা আবার চাপা পড়ে যায়। সুরমা উপত্যকার জনগণ বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার দাবিতে অবিরাম সোচ্চার থাকার ফলে ১৯৪৫ সালের ২৯ জুলাই প্রাদেশিক বিশ্ববিদ্যালয় কমিটির সভায় ‘সিলেট বিশ্ববিদ্যালয়’ নামে সিলেটে অবিলম্বে একটি বিশ্ববিদ্যালয় স্থাপনের প্রস্তাব গ্রহণ করা হয়। পরবর্তীতে ঐ বছরই ২২ সেপ্টেম্বর সিলেটে অনুষ্ঠিত হয় আরেকটি বিশ্ববিদ্যালয় কনভেনশন। এই কনভেনশনে বিশ্ববিদ্যালয়ের জন্য একটি স্কীম বা প্রকল্প পেশ করা হয়। প্রকল্পে বিশ্ববিদ্যালয়ের সংবিধান, শিক্ষা কার্যক্রম ও অর্থ সংস্থানেরও বর্ণনা ছিল। কনভেনশনে উক্ত প্রকল্পটি অনুমোদন লাভ করার পরও সিলেটে বিশ্ববিদ্যালয় স্থাপিত হয়নি। এবার পাক-ভারতের স্বাধীনতা আন্দোলন ও ভারত বিভক্তি এবং বিভক্তিকালে সিলেটের ভাগ্য অনিশ্চিত হয়ে পড়ায় সিলেটে বিশ্ববিদ্যালয় গড়ে উঠার সমূহ সম্ভাবনা উবে যায়। এভাবে বিভিন্ন সময়ে সুযোগ ও সম্ভাবনা দেখা দেয়া সত্ত্বেও ব্রিটিশ-ভারত যুগ পর্যন্ত বিশ্ববিদ্যালয় প্রাপ্তি সিলেটবাসীর জন্য সোনারহরিণ হয়েই থাকে।
অতঃপর ঐতিহাসিক গণভোটের মধ্য দিয়ে সিলেট নবগঠিত পাকিস্তান রাষ্ট্রের অন্তর্ভূক্ত হয়। পাকিস্তান সৃষ্টির পর সিলেটে বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার আন্দোলনের নতুনভাবে অভিষেক হয়। এ পর্যায়ে সিলেটবাসী নতুন উদ্যমে বিশ্ববিদ্যালয়ের দাবিতে সোচ্চার হন। পাকিস্তান সৃষ্টির অব্যবহিত পরে ১৯৪৭ সালের ১৭ সেপ্টেম্বর স্থানীয় নেতৃবৃন্দ এ দাবি নিয়ে পূর্ব পাকিস্তানের মুখ্যমন্ত্রী খাজা নাজিমুদ্দিনের সঙ্গে সাক্ষাৎ করেন। তিনি সিলেটবাসীর দাবির যৌক্তিকতা মেনে নেন এবং দাবি পূরণের আশ্বাস দিয়ে বলেন ইতিমধ্যে ঘোষিত উত্তরবঙ্গের রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার পরে পূর্ব পাকিস্তানের তৃতীয় বিশ্ববিদ্যালয় সিলেটে স্থাপন করা হবে।
১৯৫৪ সালে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার পর সিলেটে বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার দাবিটি আবার আলোচনায় উঠে আসে। সভা-সমাবেশের মাধ্যমে বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার দাবি জানানো হয় বিভিন্ন দলীয় সভা-সমিতি, আলোচনা সভা, সেমিনার, সুধী সমাবেশ প্রভৃতি ফোরামে বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার দাবি জানিয়ে প্রস্তাব গৃহীত হতে থাকে। সিলেটে আন্দোলনের পাশাপাশি ঢাকায় অধ্যয়নরত ছাত্ররাও এক সময়ে আন্দোলনে শরীক হন। তারা এক সভায় মিলিত হয়ে তিন মাস সময় সীমার মধ্যে বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার দাবি জানান। মাসখানেকের ব্যবধানে এরকম আরেকটি ছাত্রসভা অনুষ্ঠিত হয়। এই সভায় ‘সিলেট বিশ্ববিদ্যালয় বাস্তবায়ন সংগ্রাম পরিষদ' নামে একটি কমিটিও গঠিত হয়। ঢাকাস্থ জালালাবাদ সমিতিও এই আন্দোলনের সাথে যুক্ত হয়। এভাবে এক দশকেরও বেশি সময় অতিবাহিত হলেও মুখ্যমন্ত্রী খাজা নাজিমুদ্দিনের প্রতিশ্রুতির কোন প্রতিফলন ঘটে নি। এ অবস্থায় আসে ১৯৫৮ সাল। এ বছর ৭ অক্টোবর সারা পাকিস্তানে জারি হয় সামরিক আইন। আবির্ভাব ঘটে সেনা প্রশাসক জেনারেল আইয়ুব খানের। সামরিক শাসন রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডসহ সব রকম মৌলিক অধিকার ও ব্যক্তিস্বাধীনতা হরণ করে নেয়। ফলে যে কোন ধরণের সভা-সমাবেশ, দাবি-দাওয়ার প্রচার বা উত্থাপন নিষিদ্ধ হয়ে যায়। এই কারণে সিলেটে বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার আন্দোলনেও ছেদ পড়ে।
সামরিক শাসন জারির পরে ১৯৬২-৬৩ সালে বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার আন্দোলন অন্যভাবে রূপ নেয়। '৬২ সালের ৩০ জানুয়ারি করাচীতে শহীদ সোহরাওয়ার্দীকে গ্রেফতার করা হলে ছাত্রসমাজ প্রতিবাদে ফেটে পড়ে। এই প্রতিবাদ আন্দোলনের মধ্যদিয়ে সামরিক শাসন বিরোধী আন্দোলনের সূচনা ঘটে। একই সময় আইয়ূব প্রবর্তিত সংবিধান ও শিক্ষা কমিশন বিরোধী আন্দোলনও গড়ে উঠে। সিলেটে আইয়ুব বিরোধী আন্দোলনের পাশাপাশি বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার আন্দোলন ও সিলেট মেডিকেলে কনডেন্সড্ প্রবর্তনের আন্দোলনও যুক্ত হয়। '৬২ সালে একুশে ফেব্রুয়ারি পালনে ছাত্রসমাজ সাহসী ভূমিকা পালনের মাধ্যমে প্রকাশ্যে আন্দোলন ছড়িয়ে দেয়। তখন থেকে সামরিক শাসনের বিরুদ্ধে কোন না কোন ভাবে প্রতিবাদ ও আন্দোলন চলতেই থাকে। এ সময় আন্দোলনের নেতৃত্বের পুরোভাগে ছিলেন গুলজার আহমদ, ইকবাল আহমদ চৌধুরী, দেওয়ান নূরুল হোসেন চঞ্চল (মরহুম), শ্রী কামদেব প্রমুখ। আন্দোলন দমনের জন্য একুশে ফেব্রুয়ারি দিবাগত রাতে পুলিশ ছাত্রনেতা গুলজার আহমদ, ইকবাল আহমদ চৌধুরী ও সামসুল হককে গ্রেফতার করে।
সিলেটে বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার দাবির প্রতি প্রকাশ্য জনসভায় সমর্থন জানান আওয়ামীলীগ নেতা শহীদ সোহরাওয়ার্দী, শেখ মুজিবুর রহমান এবং হামিদুল হক চৌধুরী। ১৯৬২ সালের ১০ নভেম্বর সিলেটের রেজিস্ট্রি মাঠে এক জনসভায় তারা এই সমর্থন জানান। ঐ বছর ২০ ডিসেম্বর সেনা প্রেসিডেন্ট আইয়ুব খান সিলেট সফরে আসেন। তিনিও সিলেটে বিশ্ববিদ্যালয়ের দাবি পূরণের আশ্বাস দেন। জনমতের চাপে বাধ্য হয়ে এই আশ্বাস দিলেও পরবর্তীতে তিনি এই ব্যাপারে সম্পূর্ণ নীরব ছিলেন।
এই সময় কালে বিশ্ববিদ্যালয়ের দাবিতে সিলেটে তুমুল আন্দোলন হয়। সভা, মিছিল, বিক্ষোভ প্রতিনিয়ত হয়েছে। লাগাতার ছাত্র ধর্মঘট ও লাগাতার হরতাল পালিত হয়েছে। বিশ্ববিদ্যালয়ের দাবিতে ১৯৬৩ সালে একসময় অনশন ধর্মঘট পালিত হয়। মুরাদ ও হাফিজ নামের মেডিকেলের দুইজন ছাত্রসহ চারজন ছাত্র এই অনশন কর্মসূচিতে অংশ গ্রহণ করেন। বিশ্ববিদ্যালয় আন্দোলনে এ সময় যে সকল ছাত্রনেতা যুক্ত ছিলেন তাদের মধ্যে মরহুম আব্দুল লতিফ সর্দার, মরহুম দেওয়ান নূরুল হোসেন চঞ্চল, মরহুম ডাঃ মোঃ মহশিন, মরহুম রমা মহশীন, গুলজার আহমদ, এনামুল হক, বাহাউদ্দিন জাকারিয়া, সামসুল আলম চৌধুরী, আব্দুল মুনিম, মহিলা কলেজের ছাত্রী মুর্শেদ জাহান, আমেনা আফতাব, দিপ্তী সেন, সাহানারা, আ ফ ম কামাল, নন্দ গোপন চৌধুরী, আইয়ুব আলী, এ কে এম গৌসুল আলম, মকসুদ আহমদ খান, লুৎফুর রহমান, আব্দুল খালিক, সিরাজ উদ্দিন, আফতাব আহমদ বাচ্চু, লতিফুর রহমান মাহমুদ, সরেকওম মুকুল, রফিকুর রহমান লজু প্রমুখের নাম উল্লেখযোগ্য।
রাজনৈতিক নেতৃবৃন্দের মধ্যে ছিলেন মরহুম আসাদ্দার আলী, মরহুম মতছির আলী, মরহুম ধলা বারী, দেওয়ান ফরিদ গাজী, আব্দুল হামিদ, আব্দুর রহীম লাল বারী মিয়া প্রমুখ। সামগ্রিক আন্দোলনে শীর্ষনেতা ছিলেন মরহুম আসাদ্দার আলী, গুলজার আহমদ ও ইকবাল আহমদ চৌধুরী। মরহুম দেওয়ান নূরুল হোসেন চঞ্চলও তাদের সঙ্গে যুক্ত ছিলেন। আন্দোলনের নেপথ্যে ছিলো গোপন কমিউনিস্ট পার্টি। কনভেনশন মুসলিম লীগ নেতা মরহুম আজমল আলী চৌধুরী (স্বাধীনতার পরে মুক্তিযোদ্ধাদের হাতে নিহত) ও বিশ্ববিদ্যালয়ের আন্দোলনে সক্রিয়ভাবে যুক্ত ছিলেন।
বিশ্ববিদ্যালয়ের দাবিতে সমগ্র সিলেট অঞ্চলের জনগণ যখন ঐক্যবদ্ধ ও আন্দোলনে সোচ্চার এবং যখন সেনা প্রেসিডেন্ট আইয়ুব খানেরও আশ্বাস রয়েছে তখন হঠাৎ করে চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয় স্থাপনের দাবি উঠে। তখন পাকিস্তান জাতীয় পরিষদের স্পিকার চট্টগ্রামের কনভেনশন মুসলিম লীগ নেতা ফজলুল কাদির চৌধুরী (মুক্তিযোদ্ধাদের হাতে নিহত) প্রেসিডেন্ট আইয়ুব ঠিক এ সময়েই বিদেশ ভ্রমণে যান। ফজলুল কাদির চৌধুরী এ সময় ভারপ্রাপ্ত প্রেসিডেন্ট নিযুক্ত হয়েই চট্টগ্রামে বিশ্ববিদ্যালয় স্থাপনের ঘোষণা দেন। সিলেটবাসী আবারও প্রতারিত ও বঞ্চিত হয় এবং বিশ্ববিদ্যালয়ের আন্দোলন অনেক পিছনে পড়ে যায়। এর আগে '৬৩ সালের ২১ জানুয়ারি আন্দোলনের অংশ হিসেবে সিলেটবাসী ‘বিশ্ববিদ্যালয় দিবস’ পালন করেন।
এরপর ’৬৪ সালে ফাতেমা জিন্নাহ'র নির্বাচন, পাক-ভারত যুদ্ধ, ৬ দফার আন্দোলন, গণ অভ্যুত্থান, সেই সাথে ’৭০-এর নির্বাচন এবং '৭১-এর মুক্তিযুদ্ধের উন্মাতাল দিনে সিলেটবাসীর বিশ্ববিদ্যালয়ের আন্দোলন চাপা পড়ে যায়। মুক্তিযুদ্ধ শুরুর ঠিক আগে ১৯৭০ সালে ঢাকার সাভারে জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয় স্থাপিত হয়। একাত্তুর সালে দেশ স্বাধীন হওয়ার পরে দেশের পুনর্গঠন এবং সব কিছু গুছিয়ে উঠার আগেই পচাত্তর সালে নিহত হন জাতির জনক বঙ্গবন্ধু। দেশবাসী আবার সামরিক শাসনের নিগড়ে বাঁধা পড়ে। সব কিছু উলটপালট হয়ে যায়। চলে যায় আরো কয়েকটি বছর। ১৯৮১ সালে সিলেটে বিশ্ববিদ্যালয় স্থাপনের দাবি আবার সামনে আসে। পরের বছর ১৯৮২ সালের রাজনৈতিক দল, ছাত্র সংগঠন ও সর্বস্তরের মানুষ ঐক্যবদ্ধ হয়ে আন্দোলনের ব্যাপক প্রস্তুতি নিতে শুরু করে। এবার আন্দোলনের ধরণ অন্যরকম। এই পর্যায়ে সিলেটী উচ্চপদস্থ সরকারী কর্মকর্তা, রাজনৈতিক নেতৃবৃন্দ এবং বিশিষ্ট ব্যক্তিবর্গ কেন্দ্রীয় ভাবে বিশ্ববিদ্যালয় স্থাপনে সরকারের সিদ্ধান্তকে প্রভাবিত করার উদ্যোগ গ্রহণ করেন। এই পর্যায়ে অন্যদের মধ্যে অগ্রণী ভূমিকা পালন করেন জাতীয় সংসদের স্পিকার হুমায়ুন রশীদ চৌধুরী, সাবেক সচিব আবুল মাল আব্দুল মুহিত, সাবেক রিয়ার এডমিরাল মরহুম এম এ খান । তারা তিনজনই তখন এরশাদ সরকারের উপদেষ্টা ছিলেন। এ সময় সিলেটে চলমান যে আন্দোলন ছিল সেটা মূলত এরশাদ বিরোধী এবং উপজেলা বাতিলের আন্দোলন ছিল। ১৯৮৪ সালে এই আন্দোলন খুব শক্তিশালী ছিল। সে সময় এরশাদ উপজেলা নির্বাচন করতে পারেন নি। ১৯৮৫ সালে এই আন্দোলনের সহিত বিশ্ববিদ্যালয়ের আন্দোলনও যুক্ত হয়। উপজেলা বাতিলের আন্দোলন চলাকালে সংগ্রামী ছাত্র সমাজ এরশাদের সিলেট আসা নিষিদ্ধ ঘোষণা করেন।
উপজেলা আন্দোলনের সময় কারাবরণ করেন ছাত্রনেতা লোকমান আহমদ, মিসবাহ উদ্দিন সিরাজ, তাপশ ভট্টাচার্য, এ টি এম ফয়েজ উদ্দিন, বিজিত চৌধুরী, জিয়া উদ্দিন লালা, আব্দুল মুছব্বির এবং পনের দলীয় জোটের নেতা আব্দুল মন্নান রাজন, মনজু মিয়া, সাত দলীয় জোটের নেতা রফিকুল ইসলাম শিশু। একই সময়ে ঢাকার একটি হোটেল থেকে গ্রেফতার হন আবুল কাহের শামীম, জাকির হোসেন ও শোয়েব আহমদ চৌধুরী। এই আন্দোলন চলাকালে সিপিবি সিলেট জেলা শাখার তৎকালীন সম্পাদক কমরেড আব্দুল মালেককে গ্রেফতারের জন্য পুলিশ কয়েকবার তার মীরাবাজার আগপাড়ার বাসায় রেইড করে। তাকে ধরার জন্য পুলিশ তার এক বন্ধুর বাগবাড়িস্থ বাসায়ও তল্লাশী চালায়। তখন কমরেড মালেকের উপর হুলিয়া ছিল। কমরেড মালেককে গ্রেফতারের লক্ষ্যে পুলিশ তার আরেক বন্ধু হামিদ মোহাম্মদের গাড়ি আটকিয়েও তল্লাশী চালায়।
সিলেট সদর উপজেলা থেকে চেয়ারম্যান নির্বাচিত হয়েছিলেন সাবেক পৌর চেয়ারম্যান বাবরুল হোসেন বাবুল। নির্বাচনের পর পরই বাবুল আটক ছাত্রনেতাদের দেখার জন্য জেলে গিয়ে ছিলেন।
সিলেটে বিশ্ববিদ্যালয় স্থাপনের দাবিতে ১৯৮৪ সালের শেষ দিকে সিলেট যুব নাগরিক কমিটি ২৪ ঘণ্টার এক অনশন কর্মসূচি পালন করে। সিলেট প্রেসক্লাবে পালিত এই অনশন কর্মসূচিতে অংশগ্রহণ করেন কমিটির সভাপতি মরহুম শমশের আলী বাবুল, সাধারণ সম্পাদক সাব্বির আহমদ মোসান্না, শফি আহমদ, আবুল হাসনাত চৌধুরী, আলী আহসান বাবুল, লোকমান আহমদ, জামিল আহমদ ও বাহার খন্দকার। অনশন শুরুর পরদিন ২৪ ঘণ্টা অতিবাহিত হওয়ার আগেই সিলেট পৌরসভার নবনির্বাচিত চেয়ারম্যান আ ফ ম কামাল শরবত দিয়ে তাদের অনশন ভঙ্গ করান। চেয়ারম্যান কামাল অনশনকারীদের দাবির সাথে একাত্মতা প্রকাশ করলে এবং এই ব্যাপারে দায়িত্বশীল ও কার্যকর উদ্যোগী ভূমিকা পালনের প্রতিশ্রুতি দিলে তারা অনশন ভঙ্গ করতে সম্মত হন। অনশন কালে সমন্বয়কারীর ভূমিকা পালন করেন বীর মুক্তিযোদ্ধা ইয়ামীন চৌধুরী।
ছাত্রদের প্রতিরোধ ও নিষিদ্ধ ঘোষণার কারণে এরশাদ সিলেটে আসতে অসমর্থ হন। অথচ তিনি সিলেট সফরের জন্য খুবই আগ্রহী। এই রকম পরিপ্রেক্ষিতে এরশাদ সরকারের অন্যতম উপদেষ্টা হুমায়ুন রশীদ চৌধুরী বিষয়টি নিয়ে তৎপর হন এবং প্রেসিডেন্ট এরশাদের সাথে আলোচনা করেন। যে কোন কিছুর বিনিময়ে এরশাদ সিলেট আসার জন্য প্রস্তুত ছিলে

শেয়ার করুন

ফেসবুকে সিলেটের ডাক

ইতিহাস ও ঐতিহ্য এর আরো সংবাদ
  • বালাগঞ্জের বাতিঘর বাংলাবাজার উচ্চ বিদ্যালয়
  • বঙ্গবন্ধু ও গান্ধীজী
  • সিলেটের দ্বিতীয় সংবাদপত্রের সম্পাদক ছিলেন ‘মেশিনম্যান’
  • একটি যুদ্ধ : একটি শতাব্দী
  • বালাগঞ্জের প্রাচীন জনপদ শিওরখাল গ্রাম
  • ভাটিপাড়া
  • সময়ের সোচ্চার স্বর সোমেন চন্দ
  • বঙ্গবন্ধুর সিলেট সফর ও কিছু কথা
  • বায়ান্নতেই লিখেছিলেন ‘ঢাকাই কারবালা’
  • জীবনের শেষক্ষণে অর্থ-স্বর্ণ সবই জড়পদার্থ
  • কমরেড বরুণ রায়
  • বঙ্গবন্ধু ও রাষ্ট্রভাষা আন্দোলন
  • নারী ভাষাসৈনিকদের কথা
  • মুক্তিযুদ্ধ ও বঙ্গবীর ওসমানী
  • ভাটির বাতিঘর সুনামগঞ্জ সরকারি কলেজ
  • মাওয়ের লংমার্চের ৪ বছর পর সিলেটিদের লং মার্চ
  • শহীদ মিনারের ইতিকথা
  • সিলেটের লোকসংগীত : ধামাইল
  • পর্যটক ইবনে বতুতার কথা
  • বই এল কোথা থেকে?
  • Developed by: Sparkle IT