ইতিহাস ও ঐতিহ্য

সুনামগঞ্জের লোকসংস্কৃতি

পরিতোষ ঘোষ চৌধুরী প্রকাশিত হয়েছে: ০৮-০১-২০২০ ইং ০০:৫৮:০৪ | সংবাদটি ৩৪১ বার পঠিত

সুনামগঞ্জ একটি প্রাচীন জনপদ। এখানে রয়েছে অনেক লোকসংস্কৃতি, পল্লী সংস্কৃতি ও কৃষ্টির অনেক ইতিহাস। মাঝির ভরাট গলায় ভাটিয়ালি গান, রাখালের বাঁশির সুর, আউল-বাউলের উদাস করা গান, মানুষের মন করে আকুল। বার মাসে তের পার্বণে ভরপুর হিন্দুদের বিভিন্ন অনুষ্ঠানের পাশাপাশি মুসলিম সম্প্রদায়েরও রয়েছে গাজীর গীত, কাওয়ালী ইত্যাদি অনুষ্ঠান। আছে বিভিন্ন সংস্কৃতি ও আচার অনুষ্ঠান। অনেক কিছুই আজ হারিয়ে যাবার পথে।
ধামাইল: বিবাহ বৌভাত, মঙ্গলাচরণ, অধিবাস, জামাই স্নান ও অন্যান্য মাঙ্গলিক অনুষ্ঠানে ধামাইল গেয়ে গ্রামের মহিলারা আনন্দ করতেন। জামাই বা কন্যার মা-জেটি কিংবা তাদের জামাই বাবু ও বৌদিদের নিয়েও নানান রকম রঙ্গ রসের গীত গাইতে মাঘ মাসে প্রতি রবিবার হিন্দু গ্রামগুলিতে সূর্যের ব্রত অনুষ্ঠান হতে সারাদিন উপবাস থেকে মহিলারা এই ব্রত পালন করতেন। ভোরে সূর্য উদয় থেকে শুরু করে সন্ধ্যায় সূর্য অস্ত পর্যন্ত বিভিন্ন অনুষ্ঠান সহ ধামাইল গীত চলত। বড় বড় পিতলের করতাল বাজিয়ে এই গীত পরিবেশিত হতো। সারা গ্রামের মহিলারা এই সূর্যের ব্রতে যোগ দিতেন। গ্রামের মহিলাদের এমনিতে কোথাও যাওয়া হতো না বিধায় কোন ধর্মীয় সামাজিক অনুষ্ঠানাদিতে একে অন্যের বাড়িতে যেতেন। আনন্দ ফূর্তি গল্প হতো প্রাণ খোলে। এখন সূর্যের ব্রত খুব একটা চোখে পড়ে না। ধামাইলও সীমাবদ্ধতার মধ্যে হয়।
ঘোড়ার দৌড় ঃ শীতকালে ঘোড়ার দৌড় প্রতিযোগিতা হতো। পলক গ্রামের উত্তর দিকে অথবা চৌধুরীর বাড়ির পিছনে। আঞ্চলিক ভাষায় বলা হতো ঘোর দৌড়। অনেক প্রত্যন্ত অঞ্চল থেকে প্রতিযোগিতায় ঘোড়াকে নিয়ে আসা হতো। ঘোড়াগুলিকে আবার বিভিন্ন নামে যেমন রূপসী, বাহাদুর, উড়াল পংখী ইত্যাদি নামে দূষিত করা হতো। পলক গ্রামের আব্দুল হেকিম এ ব্যাপারে খুবই উদ্যোগী ছিলেন। ঘোড়ার দৌড় দেখার জন্য হাজার হাজার মানুষ একত্রিত হতেন। আনন্দ হতো। এখন আর ঘোড়ার দৌড় প্রতিযোগিতা দেখি না।
গরুর লড়াই ঃ সাধারণত চৈত্র/বৈশাখ মাসে গরুর লড়াই প্রতিযোগী হতো। বিভিন্ন গ্রাম থেকে বাছাই করা ষাড় আনা হতো মুরব্বি গান নির্বাচন করে দিতেন কোন ষাড়ের (স্থানীয় ভাষায় বিছাল) কোন ষাড়ের লড়াই হবে। গরুর গলায় মালা- ঘুংগুর পরিয়ে সাজিয়ে নিয়ে যেতেন এক ধরনের মিছিল দিয়ে। কেহ কেহ গরুর শিংকে চুকা করে দিতেন। মোট কথা একটা উৎসবের মতো গরুর লড়াই হতো। শতেক বিছাল আসতো তখন। এখন আর এসব হয় না। গ্রামে এখন তেমন গরুই চোখে পড়ে না।
মেষের লড়াই ঃ মেষের লড়াই দেখার মত। দুই পাশ থেকে দুইজন প্রায় ১০ হাত দূর থেকে ছেড়ে দিতো। মেষ ঠাস ঠাস করে যুদ্ধে অবতীর্ণ হতো। সাচনা গ্রামের কেতন দাস এ ব্যাপারে খুব উদ্যোগী ছিলেন। মোরগের লড়াইও দেখার মতো। নুতন প্রজন্ম এগুলি দেখে না।
কুস্তি খেলা ঃ বর্ষার সময় কুস্তি খেলার ধুম পড়তো। এক গ্রামের মানুষ অন্য গ্রামে যেতেন কুস্তি খেলতে কখনও বা দুই বা তিন গ্রাম মিলে কুস্তি খেলা হতো- খাওয়া দাওয়া হতো- মহব্বত হতো। কুস্তি খেলায় যারা ভালো খেলেন তাদের বলা হয় মাল। আমাদের এলাকায় এখনও কুস্তি খেলা হয়, তবে খাওয়া দাওয়া আগের মত হয় না।
নৌকা বাইচ ঃ নৌকা বাইচ একটা জনপ্রিয় খেলা। সাধারণ বর্ষার সময় নৌকা বাইচ অনুষ্ঠিত হয়। আজও এর রেশ শেষ হয়ে যায়নি।
লাঠি খেলা ঃ কোন উৎসব আয়োজনে লাঠি খেলার প্রচলন ছিল। অনেকসময় বাদ্যের তালে তালে লাঠি খেলা চলে। বর্ষার সময় বরযাত্রীর নৌকার ছাদে নিপুন কলা কৌশলে লাঠি খেলা খেলে নৌকা চলে। দেখতে খুব ভালো লাগে।
মাটির শিল্প ঃ আগেকার দিনের মানুষ মাটির তৈরি হাড়ি, পাতিল, কলস, ঘট, গ্লাস সহ নানা রকম জিনিস ব্যবহার করতেন। কালক্রমে কাসা, পিতল, চিনামাটি, সিলভার, স্টিল এলোমেনিয়ামের তৈরি বাসন কোসন ব্যবহারের ফলে মাটির তৈরি জিনিসের প্রয়োজন পড়ে না। সাচনা, বেহেলী, বদরপুরের কুমার সম্প্রদায়ের লোকেরা মাটির কাজ করতেন। মাটির তৈরি শিকড় তৈরি করতেন যা তখন অনেকেই খেতেন। হিন্দু সম্প্রদায়ের বিয়ে কিংবা অন্য কোন শুভ কাজে এখনও কিছু কিছু ঘট, পাতিল, কলস, ধূপদানীর প্রয়োজন হয়। আদিকাল থেকেই সাচনা বেহলী ও বদরপুরের পাল সম্প্রদায়ের লোকেরা মনসা পূজার মূর্তি তৈরি করেন। এছাড়াও সরস্বতী মূর্তি, কালী মূর্তিও কেহ কেহ তৈরি করেন।
লোহা শিল্প ঃ দা, কোদাল, লাংগল, খন্তা, শাফল, কাচি, কাস্তে, শরতা থেকে শুরু করে যাবতীয় লোহার কাজ করতেন এক শ্রেণির মানুষ। তারা কামার সম্প্রদায়ের। শালমারা কচুখালি এলাকায় এই পেশার লোক বেশি। তবে লোহার ব্যবহার অনেক কমে যাওয়ায় নুতন করে কেহ এ পেশায় আসতে চান না।
মূত্রাবেত-জালিবেত ঃ আগে সাচনা এলাকায় প্রচুর মুত্রাবেত-জালিবেত পাওয়া যেতো। মুত্রাবেত দিয়ে পাটি, পাখা ইত্যাদি তৈরি হতো। চানপুর, কদমতলী, বিছনা কালিপুরের অনেক মানুষ এই পেশায় মুক্ত ছিলেন। ক্রমে মুত্রাবেত হারিয়ে যাবার পথে। জালিবেত এখন নাই বললেই চলে। জাতিবেত দিয়ে খাট, টেবিল, চেয়ার ইত্যাদি তৈরি হয়।
রূপকথার কাহিনী ঃ রূপকথার কাহিনী অবলম্বনে অনেক পালাগান গ্রামে গ্রামে হতো। এসব পালাগানের মধ্যে রূপবান, আবার বনবাস বানেছা পরি। প্রতি গ্রামেই দিনে বা রাত্রে এ পালা অনুষ্ঠিত হতো। ছেলে মেয়ে সাজতো। গ্রামের সব বয়সী লোকজন উপভোগ করে আনন্দ পেতেন। বানেছা পরির গান ছেলে মেয়েদের মুখে মুখে প্রচারিত হতো। ‘ও বানেছা তালের পিঠা খাইয়া গো বানেছা- তেলং তেলং করে।’ কিংবা কাগজের গুড্ডি আকাশে উড়ে- গো সই- সেই উড়ানি মোরে উড়াইলে- শ্যাম পিরিতি মোর অন্তরে....।’
মাঘের শিন্নি-মেঘের শিন্নী ঃ মাঘ মাসে রাত্রিবেলা বাঘের শিন্নীর দল হ্যাজাক লাইট জ্বালিয়ে বাড়ি বাড়ি মাঘের শিন্নীর মাগার জন্য যেতেন। দলে রাধা-কৃষ্ণ সাজতো, একজন বাঘ সাজতো। বড় বড় করতাল বাজিয়ে গান পরিবেশন করতেন। এইরূপ একটি গান ‘মাঘে দেখা দিলরে- রাখাল রাজাভাই।’ মেঘের শিন্নী ও মাঘ মাসের ১৩ তারিখের পর হতো। যেমন একটি গান ছিল- ‘মাঘ মাসের তের তারিখ চালউকরা মাঘ আইলে....’ অথবা আইলাম বর আইলামবর, আইলাম তো মরল বাড়ি- মরল বাড়ি ডুগির বাসা.....।’ এত টাকা পাইলামরে’। চৈত্র মাসে বৃষ্টির জন্য ছেলেরা সন্ধ্যার পর বাঘা সিন্নী ও মেয়েরা বেংগাবেংগির বিয়ের গীত গাইতো। কেহ কেহ ওদের পানি ছিটিয়ে ভিজিয়ে দিতো, এতে উভয় পক্ষই মজা পেতো।
তাদের একটি গান-
‘আল্লা মেঘ দে,পানি দে, ছায়া দে.....’।
সাচনা এলাকা যেহেতু ভাটি এলাকা, তাই এ অঞ্চলে ভাটিয়ালী গান, বাউল গান, পল্লীগীতি, লোকগীতি খুব বেশি জনপ্রিয় ছিল। আব্দুল করিম, রাধারমন, হাছনরাজা ও দুর্বিন শাহের গান লোকের মুখে মুখে শুনা যেতো। হযরত শাহজালাল, শাহপরাণ ও অন্যান্য আউলিয়াদের নিয়ে এখনও অনেক গান শুনতে পাই (১) ‘ও বাবা জালাল/ আমি হই তোমারি কাঙ্গাল বাবা শা-জালাল। সুরমা নদী পাড়ি দিলায় তুমি/ না টাংগাইয়া পাল। (২) সিলেট পরথম আজান ধ্বনি বাবায় দিয়াছে/ তোরা শোন সেই আজানের ধ্বনি আইজও হইতাছে।’
এখনও হারিয়ে যায়নি আব্দুল করিম, হাছনরাজা, রাধারমণের গান।
হাছন রাজার গান ঃ ‘আগুন লাগাইয়া দিল কোনে হাছন রাজার মনে’।
শাহ আব্দুল করিমের গান ঃ (১) সখী কুঞ্জ সাজাও গো/ আজ আমার প্রাণনাথ আসিতে পারে। (২) আগে কি সুন্দর দিন কাটাইতাম।
রাধা রমণের গান ঃ ‘আজ পাশা খেলবো রে শ্যাম/ তোমার সনে একেলা পাইয়াছিরে শ্যাম/ এ নিধু বনে।’

শেয়ার করুন

ফেসবুকে সিলেটের ডাক

ইতিহাস ও ঐতিহ্য এর আরো সংবাদ
  • বালাগঞ্জের বাতিঘর বাংলাবাজার উচ্চ বিদ্যালয়
  • বঙ্গবন্ধু ও গান্ধীজী
  • সিলেটের দ্বিতীয় সংবাদপত্রের সম্পাদক ছিলেন ‘মেশিনম্যান’
  • একটি যুদ্ধ : একটি শতাব্দী
  • বালাগঞ্জের প্রাচীন জনপদ শিওরখাল গ্রাম
  • ভাটিপাড়া
  • সময়ের সোচ্চার স্বর সোমেন চন্দ
  • বঙ্গবন্ধুর সিলেট সফর ও কিছু কথা
  • বায়ান্নতেই লিখেছিলেন ‘ঢাকাই কারবালা’
  • জীবনের শেষক্ষণে অর্থ-স্বর্ণ সবই জড়পদার্থ
  • কমরেড বরুণ রায়
  • বঙ্গবন্ধু ও রাষ্ট্রভাষা আন্দোলন
  • নারী ভাষাসৈনিকদের কথা
  • মুক্তিযুদ্ধ ও বঙ্গবীর ওসমানী
  • ভাটির বাতিঘর সুনামগঞ্জ সরকারি কলেজ
  • মাওয়ের লংমার্চের ৪ বছর পর সিলেটিদের লং মার্চ
  • শহীদ মিনারের ইতিকথা
  • সিলেটের লোকসংগীত : ধামাইল
  • পর্যটক ইবনে বতুতার কথা
  • বই এল কোথা থেকে?
  • Developed by: Sparkle IT