ধর্ম ও জীবন

শায়খ আশরাফ আলী বিশ্বনাথী (রাহ.)

মুহাম্মদ রুহুল আমীন নগরী প্রকাশিত হয়েছে: ১০-০১-২০২০ ইং ০০:৪৮:৩২ | সংবাদটি ৩৫৪ বার পঠিত
Image

মাওলানা শায়খ আশরাফ আলী বিশ্বনাথী (রাহ.) ছিলেন একজন সত্যিকারের দেশ প্রেমিক, বাতিলের বিরুদ্ধে আপোসহীন সংগ্রামী ব্যক্তিত্ব, ইসলামী আন্দোলনের সিপাহসালার। প্রখ্যাত আলেমে দ্বীন, বহুগ্রন্থ প্রণেতা, মাসিক আল ফারুক পত্রিকার প্রতিষ্ঠাতা সম্পাদক ও জামেয়া ইসলামিয়া দারুল উলূম মাদানিয়া বিশ্বনাথ এর প্রতিষ্ঠাতা মুহতামিম, জমিয়তে উলামায়ে ইসলাম বাংলাদেশের সাবেক কেন্দ্রীয় সভাপতি। ২০০৫ সালের ২০ মে তিনি ইন্তেকাল করেন। ১৯২৮ ঈসায়ী সালে বিশ্বনাথ থানার গড়গাঁও গ্রামের এক সম্ভ্রান্ত পরিবারে তিনি জন্মগ্রহণ করেন। তাঁর পিতার নাম মরহুম মুন্সি মোহাম্মাদ জাওয়াদ উল্লাহ তালুকদার ও মাতা হাবীবুন্নেছা। তিনি গ্রামেই প্রাথমিক ধর্মীয় শিক্ষা লাভ করেন। ৭ বছর বয়সে বিশ্বনাথ প্রাথমিক বিদ্যালয়ে ভর্তি হন এবং কৃতিত্বের সাথে পঞ্চম শ্রেণী উত্তীর্ণ হন। পঞ্চম শ্রেণীতে থাকা অবস্থায় মাত্র ১১ বছর বয়সে তিনি বুকে ব্যাজ ধারণ করে বৃটিশ বিরোধী আন্দোলনে অংশগ্রহণ করেন। পরবর্তীতে তিনি রানাপিং মাদ্রাসায় সাফেলা ২য় বর্ষ থেকে মিশকাত জামাত পর্যন্ত শিক্ষা নেন।
চট্টগ্রাম হাটহাজারী মাদ্রাসায় ভর্তি হয়ে ১৯৪৯ সালে তিনি প্রথম বিভাগে দাওরায়ে হাদীস পাশ করেন। শিক্ষা জীবন শেষ করে ১৯৫০ সালে তিনি গলমুকাপন মাদ্রাসায় শিক্ষকতা জীবন শুরু করেন। এরপর তিনি চক কাসিমপুর মাদ্রাসা, পারকুল মাদ্রাসা ও বিশ্বনাথ এম,ই মাদ্রাসায় শিক্ষকতা করেন। বিশ্বনাথ এম. ই মাদ্রাসাকে কওমী মাদ্রাসায় রূপান্তরিত করলে সরকার সাহায্য বন্ধ করে দেয় ও সরকারী মাদ্রাসায় রূপান্তর করতে চাইলে তার অক্লান্ত পরিশ্রমে মাদ্রাসাটি কাওমী মাদ্রাসা হিসেবে টিকে থাকে।
১৯৫৯ সালে প্রতিষ্ঠিত আজকের জামেয়া ইসলামিয়া দারুল উলূম মাদানিয়া বিশ্বনাথ মাদ্রাসায় দাওরায়ে হাদীস খোলা হয় ১৯৮৪ সালে। তিনি উক্ত জামেয়ার আজীবন মুহতামিম ছিলেন। কিশোর বয়সে বৃটিশ বিরোধী আন্দোলন, ১৯৪৭ সালে রেফারেন্ডামে অংশগ্রহণ সহ ২০০৫ সালের ৯-১০ মার্চ ভারতের টিপাইমুখ বাঁধ নির্মাণের প্রতিবাদে জকিগঞ্জ অভিমুখে লংমার্চে নেতৃত্ব দেন ও সমাবেশের সভাপতিত্ব করেন। ২০০৫ সালের ২রা এপ্রিল ঢাকার পল্টন ময়দানে জমিয়তে উলামায়ে ইসলাম বাংলাদেশ এর সম্মেলন অনুষ্ঠিত হয়। সম্মেলনে প্রধান অতিথি ছিলেন ফেদায়ে মিল্লাত হযরত আল্লামা সায়্যিদ আসআদ মাদানী (রাহ.)। সভাপতি ছিলেন শায়খ আশরাফ আলী বিশ্বনাথী (রাহ.)।
১৯১৯ সালে গঠিত জমিয়তে উলামায়ে হিন্দ ভারত ভাগের পর ১৯৫২ সনে জমিয়তে উলামায়ে ইসলাম নামে পাকিস্তানে রাজনৈতিক কার্যক্রম শুরু করে। তখন থেকে নিয়ে ১৯৬৪ পর্যন্ত পূর্ব পাকিস্তানে এর কোনো কার্যক্রম ছিলো না। পূর্ব পাকিস্তানে সর্বপ্রথম সিলেটেই এর কার্যক্রম চালু হয়। এর পেছনে সর্বাত্মক প্রচেষ্টা ছিলো তাঁর। ঐ বছর ১লা নভেম্বর তিনি জমিয়তে উলামায়ে ইসলাম সিলেট জেলা শাখার সাধারণ সম্পাদক নির্বাচিত হন। ১৯৬৬ খ্রিস্টাব্দে শায়খে বিশ্বনাথী মাওলানা মুহিউদ্দীন খান ও আল্লামা শামসুদ্দীন কাসেমীসহ সচেতন উলামায়ে কেরামের প্রচেষ্টায় পূর্ব পাকিস্তান জমিয়ত গঠনের উদ্যোগ নেয়া হয়।
এই প্রেক্ষিতে সে বছর ১৬ মার্চ ঢাকার আহসান মঞ্জিলে উলামায়ে কেরামের সম্মেলন হয়। পাকিস্তান থেকে আল্লামা দরখাস্তীসহ বড় বড় আলেম উলামা এ সভায় উপস্থিত ছিলেন। এ সম্মেলনে পূর্ব পাকিস্তান জমিয়তে উলামায়ে ইসলামের সভাপতি নির্বাচনের দায়িত্ব দেয়া হয় শায়খে বিশ্বনাথীকে। এ সম্পর্কে তাঁর ভাষ্য হল; ১৬ মার্চ আহসান মঞ্জিলে পূর্ব পাকিস্তান জমিয়তে উলামায়ে ইসলাম গঠন করা হয়। সকাল ৯টা হতে বেলা ১২টা ৩০ মিনিট পর্যন্ত ১ম অধিবেশনে কমিটির প্যানেল তৈরীর ব্যাপারে আলোচনা হয়।
খাজা আনিছ উল্লাহ সাহেব প্রস্তাব করলেন জমিয়তের পূর্ব পাকিস্তানের আমীর সিলেট থেকেই হতে হবে। ২য় অধিবেশন বিকাল ৩টায় শুরু হল। অনেক চিন্তা ভাবনার পর মাওলানা আব্দুল করিম শায়খে কৌড়িয়ার নাম পেশ করা হয়। ১৯৬৮ সনের পহেলা, দুসরা ও তেসরা মে পাকিস্তানে লাহোর অধিবেশন অনুষ্ঠিত হয়। সেখানে শায়খে বিশ্বনাথী ছয় জনের একটি প্রতিনিধিদলসহ সে সমাবেশে যোগদান করেন। ১৯৭১ সনের ২৬ সেপ্টেম্বর থেকে তিনদিন ব্যাপী জমিয়তে উলামায়ে ইসলামের নিখিল পাকিস্তান অধিবেশন চলে। এই অধিবেশনে পূর্ব পাকিস্তানের ২০ জনের প্রতিনিধিদলের সঙ্গে তিনিও ছিলেন অন্যতম।
১৯৭১ এর মুক্তিযুদ্ধপূর্ব সময়ে সংকট নিরসনে জেনারেল ইয়াহইয়ার শাসনামলে শেখ মুজিবুর রহমান ও জুলফিকার আলী ভুট্টোর মধ্যে যে সমস্যা প্রকট হয়ে দেখা দিয়েছিলো, তা নিরসনের লক্ষ্যে জমিয়ত পাকিস্তানের সেক্রেটারি জেনারেল মুফতী মাহমুদ (রাহ.) এর নেতৃত্বে অন্যান্য রাজনৈতিক নেতৃবৃন্দ শেখ মুজিব ও ইয়াহইয়া খানের সাথে আলোচনার জন্য যখন ঢাকায় এসেছিলেন, তখন ১৩ দিনব্যাপী তিনি মুফতী মাহমুদ (রাহ.) এর সঙ্গে থেকে আলোচনায় অংশ নেন। মাওলানা মুহিউদ্দীন খান (রাহ.) তখন সাথে ছিলেন। ১৯৭৫ সালে শায়খে বিশ্বনাথী জমিয়তে উলামায়ে ইসলাম বাংলাদেশের কেন্দ্রীয় সহ-সভাপতির দায়িত্বভার গ্রহণ করেন। ১৯৮৮ সাল পর্যন্ত এই পদে অধিষ্ঠিত ছিলেন।
অতঃপর নির্বাহী সভাপতির দায়িত্ব পালন করেন। শায়খে কৌড়িয়া ২০০১ সনে ইন্তেকাল করলে জমিয়তের কেন্দ্রীয় সভাপতির দায়িত্ব তাঁর ওপর অর্পিত হয়। আমৃত্যু এ পদে তিনি অধিষ্ঠিত ছিলেন।
১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধের সময় তিনি মজলুম মানবতার পক্ষে কাজ করেন। এ সম্পর্কে গোলাপগঞ্জ মুক্তিযোদ্ধা সংসদের অফিস সম্পাদক জনাব আব্দুল কাদির জানান, ১৯৭১ সালের মে মাসে পাকিস্তানী হানাদার বাহিনী আমাদের গোলাপগঞ্জে আক্রমণ করে, তখন চৌঘরী এলাকায় এক হিন্দু মহিলার ঘর তারা আগুন দিয়ে পুড়িয়ে ফেলে। খবর শুনে মাওলানা রিয়াসত আলী চৌঘরী (রাহ.) আসেন এবং শায়খে বিশ্বনাথীকে খবর দেন। পরদিন বিশ্বনাথী আসেন।
এরপর পাকিস্তানী হানাদার বাহিনীর এ কান্ডের প্রতিবাদে সমাবেশ ও মিছিল করেন এবং অত্র এলাকা ছেড়ে যাওয়ার জন্য পাকিস্তানী হানাদার বাহিনীকে আলটিমেটাম দেন। এরপর হিন্দু মহিলার ঘর নির্মাণে কিছু চাঁদা দেওয়ার জন্য উপস্থিত সকলের প্রতি আহ্বান জানান। সকলে মিলে যে টাকা উঠে সেই টাকা শায়খে চৌঘরীর হাতে দিয়ে বললেন, হুজুর আপনি এই মহিলাটিকে একটি ঘর নির্মাণের ব্যবস্থা করে দিন।
এ সময় মুক্তিযোদ্ধারা উপস্থিত উলামায়ে কেরামের সাথে সাক্ষাত এলে শায়খে বিশ্বনাথী তাদের খোঁজ-খবর নেন। এবং দেশ রক্ষার জন্য সংগ্রাম চালিয়ে যাওয়ার আহবান জানান। এসময় উপস্থিত ছিলেন মাওলানা রিয়াসত আলী চৌঘরী, শায়খে ফুলবাড়ীসহ অনেক উলামায়ে কেরাম ও বীর মুক্তিযোদ্ধা আব্দুল কাদির, শহিদ মানিক মিয়া, মুক্তিযোদ্ধা ফলিক মিয়া প্রমুখ। (সূত্র: মাসিক-আল ফারুক শায়খে বিশ্বনাথী সংখ্যা-২০১২)।
শাইখুল ইসলাম সৈয়দ হোসাইন আহমদ মাদানী (রাহ.) রমযান মাসে আসামের বাসকান্দিতে আসতেন। শায়খে বিশ্বনাথী বাসকান্দিতে গিয়ে শাইখুল ইসলাম মাদানী (রাহ.) এর হাতে বাইয়াত গ্রহণ করেন। এবং আত্মশুদ্ধির জন্য সচেষ্ট হন। হযরত শাইখুল ইসলাম আল্লামা মাদানী (রাহ.) এর ইন্তেকালের পর শায়খের ইশারা অনুযায়ী হযরত মাওলানা বশির আহমদ শায়খে বাঘা (রাহ.) এর সাথে আধ্যাত্মিক সম্পর্ক কায়েম করেন। তাঁরও ইন্তেকালের পর হযরত শাইখুল ইসলাম-এর প্রিয় খলীফা হযরত আল্লামা হাফেজ আব্দুল করীম শায়খে কৌড়িয়া (রাহ.) এর সাথে আধ্যাত্মিক সম্পর্ক কায়েম করেন এবং তার কাছ থেকে খেলাফত লাভ করেন।

শেয়ার করুন

Developed by:Sparkle IT