ধর্ম ও জীবন

ধৈর্য প্রশান্তি এনে দেয়

মুন্সি আব্দুল কাদির প্রকাশিত হয়েছে: ১০-০১-২০২০ ইং ০০:৫০:১৪ | সংবাদটি ১০৯ বার পঠিত

মানব জীবন সুখ ও দুখের সমষ্টি। দুখ ছাড়া সুখ অনুভব করা যায় না। সুখের সময় ¯্রষ্টাকে ভুলে যাই। দুখের সময় হাঁপিয়ে উঠি। দুখের সময় অন্যের শান্তনা পাওয়া যায়। অন্যরা ধৈর্যের উপদেশ দেয়। কিন্তু ধৈর্য ধারন করার গুণ অর্জন করা খুবই কঠিন। ধৈর্য আল্লাহ তায়ালার এক বিরাট নেয়ামত। ধৈর্য ইমানের অর্ধাংশ। ধৈর্য ছাড়া ইমানদার হওয়া যায় না। ইমানদারগণকে প্রতি পদে পদে ধৈর্যের পরীক্ষা দিতে হয়। হযরত আলী (রা:) বলেন, সব বিষয়ে ধৈর্য ধারণ করার অভ্যাস গড়ে তোল। মানুষের মস্তিস্কের সাথে শরীরের যেমন সম্পর্ক ইমানের সাথে ধৈর্যের সম্পর্কও ঠিক তেমন। মাথা ব্যতিত দেহের যেমন কোন মূল্য নেই। তেমনি ধৈর্য ছাড়াও ইমানের কোন মূল্য নেই। ইবনে মাজা শরীফের হাদিসে বর্ণিত, আল্লাহর রাসুল (সা:) বলেন, সবচেয়ে বেশী বিপদের সম্মুখীন হন নবী (আ:) গণ। তারপর নবীগণের সঙ্গে যার আমলের সাদৃশ্য যত বেশী সে তত বেশী বিপদাপদের মুখোমুখি হয়। ব্যক্তিকে তার দীনদারির পরিমাণ অনুযায়ী বিপদগ্রস্ত করা হয়। অতএব যার দীনদারী শক্ত তার উপর আপতিত বিপদাপদও শক্ত হয় আর যার দীনদারি দুর্বল হয় তার উপর আপতিত বিপদাপদও দুর্বল হয়ে আসে। কাজেই বিপদ দেখলে ঘাবড়ানোর কারণ নেই কারণ নেক বান্দার সাথে বিপদাপদ লেগেই থাকে। এক পর্যায়ে এমন হয় যে, সে ভূপৃষ্ঠের উপর হেঁটে চলে অথচ তার আমলনামায় কোন গুনাহ থাকে না।
আমরা স্বাভাবিক ভাবেই বুঝতে পারি, কোন ছাত্র যত উপরের শ্রেণীতেই উত্তীর্ণ হতে থাকে তার পরীক্ষাও তত কঠিন হতে থাকে। এই বলে ছাত্র ঘাবড়িয়ে যায় না বরং আরো উদ্যম নিয়ে, আরও সাহস নিয়ে আরো পরিশ্রম করতে শুরু করে। আরো রাত জাগা, আরোও পড়ায় মনোনিবেশ করতে শুরু করে। তার এই পরিশ্রমে সে শান্তি খুঁজে পায়। সে উত্তর উত্তর তার শ্রম বাড়াতে থাকে। সে এক পরীক্ষায় যত ভাল করে পরের পরীক্ষায় আরো ভাল করতে চায়। আরো শ্রম বাড়িয়ে দেয়। শয়নে স্বপনে তার শুধু পড়াশোনা নিয়ে চিন্তা থাকে। এই পরীক্ষাকে সে জীবনের সফলতা মনে করে। জীবনের উন্নতির চাবিকাঠি মনে করে। অপর দিকে যে ছাত্র পরীক্ষাকে ভয় পায়, সে কি পড়াশোনায় ভাল করতে পারে? না তা কখনো নয়। ছাত্রের পরীক্ষা যেমন প্রশ্নপত্র দিয়ে কাগজে কলমে নেওয়া হয়। তেমনি ইমানদারদের পরীক্ষা আল্লাহ তায়ালা বিপদাপদ দিয়ে নিয়ে থাকেন। এই ক্ষেত্রে যে যত ধৈর্যশীল যে তত বেশী সফলকাম।
ধৈর্য মনে প্রশান্তি এনে দেয়। ছাত্র যেমন পরীক্ষার প্রস্তুতির জন্য রাত জাগাকে কষ্ট মনে করে না। সে যতই পড়ে ততই তৃপ্তি অনুভব করে। পরীক্ষার জন্য যত ভাল প্রস্তুতি নিতে পারে ততই মনে প্রশান্তি অনুভব করে। ইমানদারগণ তাই ধৈর্যকে প্রশান্তির হাতিয়ার মনে করে।
কোন বিপদে যদি আমি ঘাবড়ে যাই, হতাশ হয়ে পড়ি, কান্নাকাটি করতে থাকি, তবে কি আমার বিপদ সামান্য পরিমাণ কমবে? না সামান্য পরিমাণ সময় আগে বিপদ দূর হয়ে যাবে? আমার হা হুতাশ, আমার রোনাজারি আমার বিপদ সামান্য পরিমাণ দূর করবে না। রবং যতই হতাশ হব, আমার মসিবত ততই ভারি মনে হবে, বিপদ ততই কঠিন মনে হবে। আল্লাহর রাসুল (সা:) বলেন, সে ব্যক্তি ধৈর্য ধারণ করতে চেষ্টা করে আল্লাহ তায়ালা তাকে ধৈর্যধারণ করার শক্তি দান করেন। ধৈর্য অপেক্ষা সুপ্রশস্ত কল্যাণ কাউকে দেওয়া হয় না। (বুখারী, মুসলিম)

বিপদ যতই কঠিন হোক। তার একটি প্রান্ত সীমা আছে। বিপদ একদিন শেষ হবেই। আমার হতাশা তাকে তাড়াতাড়ি দূর করবে না। বরং ধৈর্যের সাথে তাকে দূর করার চেষ্টা করা আমার উচিত। বিপদের পর সুখ আসবেই। আর এই বিপদ কখনো অকল্যাণ বয়ে আনে না। রাসুল (সা:) বলেন, মুসলিম ব্যক্তির উপর যে সকল বিপদ আপদ আসে এর দ্বারা আল্লাহ তায়ালা তার পাপ দূর করে দেন। এমনকি যে কাঁটা তার শরীরে ফুটে তার দ্বারাও। (বুখারী, মুসলিম)
মুমিন ব্যক্তি বিপদের প্রথম ধাক্কাতেই সবর করে ফেলে এই জন্য কোন পেরেশানী, রোনাজারি তাকে স্পর্শ করতে পারে না। সে এরকম হয় না যে, কতক্ষণ বিলাপ করলাম, বুক থাবরালাম। যখন আর কোন কিছুই হচ্ছে না, তখন বললাম, হে আল্লাহ আমি সবর করলাম। মুমিন কখনো এমন হয় না। যেমন পরীক্ষার কেন্দ্রে একজন ভাল ছাত্রের এক দুইটি প্রশ্ন কমন না পড়লেও সে ঘাবড়িয়ে যায় না। যেগুলো কমন পড়েছে, সেগুলোর উত্তর সে লিখতে শুরু করে। সেগুলোর উত্তর লিখে পরে সে চিন্তা করে এগুলোর উত্তর দিতে। ইমানদারগণ পুরো জীবনই ইমানের পরীক্ষার কেন্দ্রে অবস্থান করে। সব সময়ই তার পরীক্ষা। সব সময়ই তার প্রস্তুতি। রাসুল (সা:) বলেন, বিপদের প্রথম অবস্থায়ই প্রকৃত সবর। (বুখারী)
মুমিন ব্যক্তি নবী আঃ গণের জীবন থেকে নবী (আ:) গণের সাথীদের জীবন থেকে, পরবর্তী আল্লাহ ওয়ালাগণের জীবন থেকে শিক্ষা গ্রহণ করে। সে দেখে তারা কত বিপদের সম্মুখিন হয়েছেন? কিভাবে ধৈর্য ধারন করেছেন? সব ধরনের বিপদে পর্বতের মত নিজের স্থানে অটল অবিচল থেকেছেন? কিভাবে বিপদ থেকে উদ্ধারের চেষ্টা করেছেন? আল্লাহর রহমত কিভাবে পেয়েছেন ইত্যাদি? এগুলো পাঠে তার হিম্মত বেড়ে যায়। আল্লাহর উপর ভরসা বেড়ে যায়। দুশ্চিন্তা আর পেরেশানী দূর হয়ে যায়।
ইমানদারগণ সবর করে হাত গুটিয়ে বসে থাকে না। সে এই বিপদ থেকে উদ্ধারের চেষ্টা করতে থাকে। সাথে আল্লাহ তায়ালার উপর ভরসা করে। আল্লাহর সাহায্য প্রাপ্তির আশা করে। আল্লাহর রহমতের প্রত্যাশা করে। ফলে পূর্ণ শক্তি নিয়ে মাঠে নামতে পারে। বিপদের আগে তার যে মনোবল ছিল, বিপদগ্রস্ত হওয়ার পর তার মনোবল আরো বেড়ে যায়, সে ভাবতে থাকে এই বিপদ তো আমার কোন না কোন কল্যাণের জন্যই এসেছে। পরীক্ষার পর ছাত্র যেমন উপরের শ্রেণীতে উত্তীর্ণ হবে। আমার জন্যও এই বিপদের পর কোন কল্যাণ অপেক্ষা করছে। আমি যদি ধৈর্যের সাথে এই বিপদে চেষ্টা চালাই তবে অবশ্যই আমি কল্যাণ লাভ করব। দুনিয়াবী কোন লাভ না হলেও আমার অন্তত গুনাহতো মাফ হবে। যা আামার জন্য পরকালীন সুখ বয়ে আনবে। আমার পরকালীন দুখ দূর করে দিবে। পরকালে আমি গুনাহের লজ্জা থেকে বেঁচে যাব। তাই ইমানদারদের কোন বিপদ তার রাতের ঘুমকে নষ্ট করে দেয় না। তাকে পঙ্গুর মত ঘরে আটকে দেয় না। বিপদ তাকে চলার পথে বাঁধার সৃষ্টি করে না। তার মনে শুধু শান্তি আর শান্তি বিরাজ করে। সে সব সময় মনে করে নিশ্চয়ই সংকীর্ণতার পরেই প্রশস্ততা রয়েছে। (সুরা ইনশিরাহ)

শেয়ার করুন

Developed by: Sparkle IT