পাঁচ মিশালী

কৃষি উন্নয়নে সাহিত্যের ভূমিকা

মো: লোকমান হেকিম প্রকাশিত হয়েছে: ১১-০১-২০২০ ইং ০০:২৮:১৫ | সংবাদটি ৩১৪ বার পঠিত
Image

বাংলাদেশ কৃষিপ্রধান দেশ। কৃষি আমাদের প্রাণ। কৃষক আমাদের অর্থনৈতিক উন্নয়নের কারিগর। কৃষি খাতে সমৃদ্ধি মানে জাতীয় খাদ্য নিরাপত্তা নিশ্চিত হওয়া। ক্ষুধার বিরুদ্ধে টিকে থাকার লড়াইয়ে জিতে যাওয়া। কৃষি ও কৃষক বাঁচলে বাংলাদেশ বাঁচবে। কৃষিই কৃষ্টি। কৃষিকে ঘিরেই বাঙালি সভ্যতার জাগরণ শুরু। মানুষের জন্ম থেকে মৃত্যু পর্যন্ত সর্বত্র কৃষির কোনো বিকল্প নেই। খাদ্য, বস্ত্র, বাসস্থান, শিক্ষা, চিকিৎসা, বিনোদন, অর্থনৈতিক উন্নয়ন, রাজস্ব বৈদেশিক মুদ্রা অর্জন, পরিবেশ উন্নয়ন, দারিদ্র্যবিমোচন, বেকারত্ব দূর, আত্মকর্মসংস্থানসহ সবকিছুতেই কৃষির অবদান রয়েছে। একসময় বলা হতো কৃষিই বাংলাদেশের মেরুদন্ড। শিক্ষাকে যেমন প্রগতির বাহন বলা হয়, তেমনি কৃষি আমাদের অর্থনীতির শোনিত। বাংলাদেশ মানেই হচ্ছে গ্রাম আর কৃষি। গত ৪৮ বছরে দেশের জনসংখ্যা দ্বিগুণের বেশী হয়েছে। জমি কমেছে অথচ খাদ্যশস্যের উৎপাদন বেড়েছে তিনগুণ। বাংলা সাহিত্য জাতিকে প্রেরণা দেয়, উৎসাহ যোগায়, জাতির দৈনন্দিন কর্মপদ্ধতি ও ইতিকর্তব্য নির্ধারণে সাহায্য করে। এমনকি জাতির উন্নতি বা অবনতির খতিয়ান সাহিত্যের মাধ্যমেই প্রকাশিত হয়। বস্তুতঃ সাহিত্যই জাতির দর্পণ স্বরূপ। আর্শি বা দর্পণে যেরূপ নিজ নিজ চেহারা দেখা যায়, সাহিত্যেও সেরূপ জাতির মুখচ্ছবির প্রতিফলন ঘটে। যে জাতির সাহিত্য যত বলিষ্ঠ সে জাতি তত উন্নত। উন্নত জাতির পরিচয় তার সাহিত্যের পাতায় পাওয়া যায়। কৃষি একটি সু-সংগঠিত গতিশীল বিজ্ঞান।
রুশো বলেছেন- ‘‘সবচেয়ে বড় ও সর্বাধিক গৌরবমন্ডিত শিল্প হচ্ছে কৃষি।’’ মহা-মনীষী রুশোর এই সুবিখ্যাত উক্তি আজ সারা পৃথিবীর দেশে দেশে ব্যাপক সাড়া জাগিয়েছে। অস্তিত্ব সংকটে আক্রান্ত পৃথিবীর মানুষ আজ সর্বাধিক গুরুত্ব আরোপ করেছে কৃষির সার্বিক মানোন্নয়নের ওপর। কৃষির উন্নতি সমগ্র মানব জাতির উন্নতি। মানুষের মৌলিক চাহিদাবলী যথা-খাদ্য, বস্ত্র, আশ্রয় প্রভৃতি সরবরাহ করে কৃষি। একটি চীনা প্রবাদ আছে যে, ‘‘জাতীয় উন্নতি ও সমৃদ্ধি হল গাছের ন্যায়। কৃষি তার মূল, শিল্প তার শাখা এবং বাণিজ্য তার পাতা। মূলে কোন ক্ষত দেখা দিলে তা গোটা গাছটিকে ধ্বংস করে দেয়’’। অত্যধিক তাৎপর্যপূর্ণ চীন দেশের এ প্রবাদটি কৃষিভিত্তিক বাংলাদেশের জন্য খুবই গুরুত্ববহ। বাংলাদেশের সামগ্রিক উন্নতি ও সমৃদ্ধি সুষ্ঠু কৃষি উন্নয়নের সঙ্গে ওতপ্রোতভাবে জড়িত। কৃষির উন্নয়ন ছাড়া এদেশের মানুষের ক্ষুধা, অপুষ্টি ও দারিদ্র বিমোচন সম্ভব নয়। তাই বাংলাদেশে কৃষির গুরুত্ব অপরিসীম। কৃষি সাহিত্য কৃষি উন্নয়নের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ উপকরণ। বস্তুুতঃ বৈজ্ঞানিক কৃষি প্রচারের সবচেয়ে নির্ভরযোগ্য ও শক্তিশালী মাধ্যম হচ্ছে কৃষি সাহিত্য। অতীতের তুলনায় যদিও বর্তমানে বাংলাদেশে কৃষি বিষয়ক গবেষণা ও উন্নয়ন কার্যক্রমের যথেষ্ট গুণগত ও পরিমাণগত উন্নতি সাধিত হয়েছে। কিন্তু গবেষণালব্ধ তথ্যাদি সহজ বাংলা ভাষার মাধ্যমে জনসাধারণের মধ্যে ছড়িয়ে দেয়ার প্রয়াস আশানুরূপ নয়। প্রকৃতপক্ষে কৃষি ও কৃষকের উপযোগি তেমন কোন সাহিত্য এ দেশে গড়ে উঠেনি। অথচ আধুনিক বিজ্ঞান সম্মত উপায়ে চাষাবাদের কলাকৌশল ও কায়দা-কানুন সম্বন্ধে চাষীগণ যত বেশি অবহিত হবেন ততই তারা কৃষি উৎপাদনে অধিক সাফল্য লাভ করবেন। তাই কৃষি ক্ষেত্রে উদ্ভাবিত নতুন প্রযুক্তি ও তথ্য সহজ, সরল ও সাবলীল বাংলা ভাষায় বই পুস্তক ও পত্র পত্রিকার মাধ্যমে তাদের দোর গোড়ায় পৌঁছে দিতে হবে।
সাহিত্য প্রচারের একটি বড় মাধ্যম। দেশের সাংবাদিক, সাহিত্যিক, কবি, দার্শনিক, অর্থনীতিবিদ, কৃষিবিদ, বিজ্ঞানী ও শিল্পীদের সমবেত প্রচেষ্টায়ই শুধু কৃষি সাহিত্যের মজবুত ভিত গড়ে উঠতে পারে। জাতীয় সাহিত্যের ভেতর দিয়ে কৃষির প্রতিফলন ঘটিয়ে জাতির প্রধান পেশা বা দৈনন্দিন কাজের রীতিনীতি বা প্রযুক্তি সংখ্যাগরিষ্ঠ জনগণের সমক্ষে তুলে ধরতে হবে। পাঠ্যপুস্তক থেকে শুরু করে আমাদের সাহিত্যের বিভিন্ন বিভাগ সমূহের বিষয় বস্তুতে রাখতে হবে কৃষি ও কৃষকের সুষ্পষ্ট ছাপ বা প্রতিবেদন। আমোদ-প্রমোদের ভেতর দিয়ে গল্প, উপন্যাস, নাটক বা জীবন্তিকার মাধ্যমে কৃষি প্রযুক্তির অব্যক্ত প্রকাশ মানুষের মন ও মস্তিষ্ককে সহজে দোলা দিতে সক্ষম হবে। সুতরাং কৃষক ও কৃষাণীর দৈনন্দিন ঘর গৃহস্থালী, চাষবাস, রীতিনীতি, ঘরকণ্যা বদনা বিধুর হাসি কান্নার বাস্তব চিত্র তুলে ধরতে হবে সাহিত্য, গল্প, ছড়া কবিতা, উপন্যাস, নাটক, জীবন্তিকা, চিত্রকলা ও ছায়াছবির মাধ্যমে, যাতে করে শিক্ষিত-অশিক্ষিত সকলেই কৃষির কারিগরি দিকগুলো সম্পর্কে উদ্ধুদ্ধ হতে পারে এবং কৃষি সম্পর্কিত সাধারণ জ্ঞানার্জন করতে পারে।
কৃষি প্রধান হওয়া সত্ত্বেও এ দেশে বাংলা ভাষায় কৃষি বিষয়ে লেখা বই পুস্তক ও পত্র-পত্রিকার সংখ্যা প্রয়োজনের তুলনায় খুবই কম। এর ফলে আমাদের কৃষি শিক্ষার্থীকে বিদেশি বই পুস্তক অধিক পড়তে হয়। এতে তারা অজ্ঞাতসারেই দেশের চেয়ে বিদেশি কৃষির সাথে অধিক পরিচিত হয়। কৃষির উপর সাময়িকী ও সাপ্তাহিক বা মাসিক পত্রিকা বড় একটা দেখা যায় না। দেশের দৈনিক সংবাদপত্রে কৃষির ওপর তেমন কোন নির্দিষ্ট পাতা ব্যবহৃত হয় না। অতএব নিঃসন্দেহে বলা যায় কৃষি সাহিত্যে আমরা কত দুর্বল। এ অবস্থার অবসান ঘটাতে হলে মাতৃভাষায় জোরালো কৃষি সাহিত্য সৃষ্টি করতে হবে। কৃষি বিজ্ঞানের বিভিন্ন শাখায় বর্তমানে বাংলাদেশে অনেক বিশেষজ্ঞ রয়েছেন। কিন্তু প্রয়োজনীয় প্রাতিষ্ঠানিক উদ্যোগের অভাবে অনেকেই বাংলা ভাষায় কৃষি বিষয়ক পুস্তক রচনায় এগিয়ে আসছেন না। এটা নিতান্তই দুর্ভাগ্যজনক। অবশ্য অনেক উদ্যোমী বিশেষজ্ঞ নানা সমস্যা অগ্রাহ্য করে ব্যক্তিগত উদ্যোগে কৃষি বিজ্ঞান বিষয়ক পুস্তক প্রণয়নের প্রয়াস নিচ্ছেন।
ব্যক্তিগত প্রচেষ্টায় পুস্তক রচনা, প্রকাশ ও বাজারজাত করা যে কত দুরূহ ব্যাপার তা অনেকেরই জানা আছে। বাংলাদেশের সরকারিভাবে কৃষি তথ্য সার্ভিস থেকে ‘মাসিক কৃষি কথা’ ও ‘সম্প্রসারণ বার্তা’ নামে কৃষি বিষয়ক দু’টি পত্রিকা প্রকাশিত হচ্ছে। এ ছাড়া ব্যক্তিগত উদ্যোগে ঢাকা থেকে ‘পাক্ষিক কৃষি বিপ্লব’, ‘কৃষি সওগাত’, ‘কৃষি প্রযুক্তি’ ও ‘মাসিক উর্বরা’ এবং পূর্ব রূপসা, খুলনা থেকে ‘মাসিক সারস’ নামক কৃষি বিষয়ক পত্রিকা প্রকাশিত হয়। কৃষি তথ্য সার্ভিস ও কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর থেকে বেশ কিছু পুস্তিকা প্রকাশ করছে। এছাড়া বাংলাদেশ কৃষি গবেষণা কাউন্সিল ও বাংলাদেশ ধান গবেষণা ইনস্টিটিউট থেকে কৃষি বিষয়ক আধুনিক তথ্য সম্বলিত বেশ কিছু বই প্রকাশ করেছে। কিন্তু এসব বইয়ের প্রচার ও মাঠ পর্যায়ে এর প্রসার আরও বেশি হলে ভাল হতো। দেশে বাংলা একাডেমি, ইসালামিক ফাউন্ডেশন, অনিন্দ্য প্রকাশ, প্রান্ত প্রকাশন ও পরাগ প্রকাশনী থেকে কিছু কিছু কৃষি বিষয়ক বই প্রকাশিত হচ্ছে। কিন্তু এসব প্রকাশনা সংস্থা থেকে কৃষি বিষয়ক পুস্তক প্রকাশের ক্ষেত্র সীমিত।
কৃষি সাহিত্যের শূন্যতা পূরণ ও দৈন্যতা দূর না হলে আমাদের উন্নয়ন প্রচেষ্টা দৃঢ় ভিতরে উপর প্রতিষ্ঠিত হবে না। এ কথা জোর দিয়েই বলা চলে। শুধু লাঙ্গলের টানে কোনো দেশের কৃষিই বেশি দূর এগোতে পারেনি। এর সাথে কলমের সংযোগই কৃষিকে শক্তিশালী করেছে, প্রগতি দিয়েছে। এই ঐতিহাসিক ও বাস্তব সত্যকে স্বীকৃতি দিয়ে লাঙ্গল ও কলমে মিতালি পাতাতে হবে। তাই আজকের শ্লোগান হচ্ছে- ‘লাঙ্গল ও কলম ভাই ভাই, একে অন্যের মদদ চাই।’কৃষি বিশেষজ্ঞরা সব কৃষকের দ্বারে যেতে পারেন না। আবার সব কৃষক বিশেষজ্ঞের কাছে আসতে পারে না। কারণ দেশে বিশেষজ্ঞের তুলনায় লোক সংখ্যা অধিক। তাই সম্প্রসারণ কার্যের মাধ্যমে কৃষির কলা-কৌশল ও চাষাবাদের রীতিনীতি বিশেষ করে নব নব আবিষ্কারের তত্ত্ব ও তথ্য ছড়িয়ে দিতে হবে। এদিক দিয়ে কৃষি সাহিত্যের ভূমিকা অনন্য। বিশ্ব কবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর বলেছেন-‘‘আমাদের দেশের চাষের ক্ষেতের উপর সমস্ত পৃথিবীর জ্ঞানের আলো ফেলিবার দিন আসিয়াছে’’। আর তা করতে হলে সরকারি ও বেসরকারি পর্যায়ে অধিক সংখ্যক কৃষি বিষয়ক পুস্তক প্রকাশের ব্যাপক উদ্যোগ নিতে হবে। সবশেষে এ সত্যটি মনে রাখুন-নিজের যতœ না নিলে নিজে, অন্যের ওপর ভরসা মিছে।

শেয়ার করুন

Developed by:Sparkle IT