উপ সম্পাদকীয় স্মরণ

আশাপূর্ণা দেবী

দুলাল শর্মা চৌধুরী প্রকাশিত হয়েছে: ১২-০১-২০২০ ইং ০০:১৪:০৫ | সংবাদটি ২১৯ বার পঠিত
Image

বাঙালি ঔপন্যাসিক, ছোট গল্পকার ও শিশু সাহিত্যিক আশাপূর্ণা দেবী বিংশ শতাব্দীর বাঙালি জীবন, বিশেষত সাধারণ মেয়েদের জীবন যাপন ও মনস্তত্ত্ব বিশ্লেষণের জন্য বিখ্যাত। ব্যক্তি জীবনে নিতান্তই এক আটপৌরে মা ও গৃহবধূ। আশাপূর্ণা ছিলেন পাশ্চাত্য সাহিত্য ও দর্শন সম্পর্কে সম্পূর্ণ অনভিজ্ঞ। বাংলা ছাড়া দ্বিতীয় কোনও ভাষায় তার জ্ঞান ছিল না। প্রথাগত শিক্ষালাভেও বঞ্চিত হয়েছিলেন। কিন্তু গভীর অন্তর্দৃষ্টি ও পর্যবেক্ষণ শক্তি তাকে স্থান করে বাংলা সাহিত্যের অন্যতম শ্রেষ্ঠ লেখিকার আসন। তার প্রথম প্রতিশ্রুতি-সুবর্ণলতা-বকুলকথা উপন্যাসত্রয় বিশ শতকের বাংলা সাহিত্যের শ্রেষ্ঠ রচনাগুলির অন্যতম বলে বিবেচিত হয়। তাঁর একাধিক কাহিনী অবলম্বনে রচিত হয়েছে জনপ্রিয় চলচ্চিত্র। তিন হাজার ছোট গল্প ও আড়াইশোর বেশি উপন্যাসের রচয়িতা আশাপূর্ণা দেবী সম্মানিত হয়েছিলেন জ্ঞানপীঠ পুরস্কারসহ দেশের একাধিক সাহিত্য পুরস্কার, অসামরিক নাগরিক সম্মান ও বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ের সম্মানিক ডক্টরেট ডিগ্রিতে। পশ্চিমবঙ্গ সরকার তাকে পশ্চিমবঙ্গের সর্বোচ্চ সম্মান রবীন্দ্র পুরস্কার প্রদান করেন। ভারত সরকার তাকে ভারতের সর্বোচ্চ সাহিত্য সম্মান অকাদমি ফেলোশিপে ভূষিত করেন।
আশাপূর্ণা দেবীর জন্ম ১৯০৯ সালের ৮ জানুয়ারি (বাংলা ২৪ পৌষ ১৩১৫)। বাবা হরেন্দ্রনাথ গুপ্ত ছিলেন কমার্শিয়াল আর্টিস্ট। সে যুগের জনপ্রিয় বাংলা পত্রিকাগুলিতে ছবিও আঁকতেন। মা সরলাদেবী সাহিত্যপাঠই ছিল তার জীবনের একমাত্র ‘পরমার্থ’। রাজনৈতিক আদর্শে ছিলেন কট্টর ব্রিটিশ বিদ্বেষী স্বদেশী। ঠাকুরমার কঠোর অনুশাসনে প্রথাগত শিক্ষার সৌভাগ্য হয়নি আশাপূর্ণা দেবীর। পরবর্তী জীবনে এক স্মৃতি চারণায় এ প্রসঙ্গে আশাপূর্ণা বলেছিলেন, স্কুলে পড়লেই যে মেয়েরা বাচাল হয়ে উঠবে, এ তথ্য আর কেউ না জানুক আমাদের ঠাকুরমা ভালভাবেই জানতেন এবং তার মাতৃভক্ত পুত্রদের পক্ষে ওই জানার বিরুদ্ধে কিছু করার শক্তি ছিল না। তবে এই প্রতিকূল পরিবেশেও মাত্র আড়াই বছরের মধ্যে দাদাদের পড়া শুনে শুনে পড়তে শিখে গিয়েছিলেন তিনি। মা সরলা সুন্দরী ছিলেন একনিষ্ঠ সাহিত্য পাঠিকা। সেই সাহিত্য প্রীতি তিনি তার কন্যাদের মধ্যেও সঞ্চারিত করতে চেষ্টার ত্রুটি রাখেননি। সাধনা, প্রবাসী, ভারতবর্ষ, সবুজপত্র, বসুমতী, বালক, শিক্ষাসাথী, সন্দেশ প্রভৃতি ১৬-১৭টি পত্রিকা এবং দৈনিক তো আসতোই। তাছাড়া সরলা সুন্দরী ছিলেন বঙ্গীয় সাহিত্য পরিষদ, জ্ঞান প্রকাশ লাইব্রেরি ও চৈতন্য লাইব্রেরির সদস্য। বাড়িতে সে যুগের সকল প্রসিদ্ধ গ্রন্থের একটি সমৃদ্ধ ভান্ডারও ছিল। এই অনুকূল পরিবেশে মাত্র ছয় বছর বয়স থেকেই পাঠ্য অপাঠ্য নির্বিশেষে পুরোদমে পড়াশোনা শুরু করে দেন। পরবর্তীকালে এই বাল্যকাল সম্পর্কে তিনি বলেছিলেন, হিসেব মত আমার ছেলেবেলা কেটেছে সংসারের ঊর্ধ্বে একটি স্বর্গীয় জগতে। বই পড়াই ছিল দৈনিক জীবনের আসল কাজ।
ছেলেবেলার দিনগুলি সম্পর্কে আশাপূর্ণা দেবী বলেছেন-খুব ডাকাবুকো ছিলাম। ছেলেবেলায় ঘুড়ি ওড়াতাম, মার্বেল খেলতাম, ক্যারাম খেলতাম দাদাদের সাথে। আর প্রিয় ছিল দিদি রত্মমালা ও সম্পূর্ণা। তারা তিনজনে ছিলেন, আশাপূর্ণার ভাষায় একটি অখন্ড ট্রিলজির অংশ। এক মলাটে তিনখানি গ্রন্থ্ দিদিদের বিয়ে হয়ে গেলে তিনি একা হয়ে যান। সেই নিসঙ্গতা দূর করতে একদিন রবীন্দ্রনাথকে চিঠি। পাঠান, লিখেন নিজের হাতে লিখে চিঠির উত্তর দিতে। কাক্সিক্ষত সেই উত্তর আসতেও দেরি হয়নি। আর এর পরেই বহির্বিশ্বে আত্মপ্রকাশ ঘটে স্যাঁতস্যাতে’ বাংলাদেশের বিদ্রোহিনী নারীর। এই বাঙালি মহীয়সী সাহিত্যিকের মৃত্যু হয় ১৯৯৫ সালের ১৩ জুলাই।
লেখক : কবি ও কলামিস্ট

শেয়ার করুন

ফেসবুকে সিলেটের ডাক

উপ সম্পাদকীয় এর আরো সংবাদ
  • বৈচিত্র্যের সৌন্দর্য
  • আল্লামা আহমদ শফী চলে গেলেন
  • কর্তৃত্ববাদী রাজনীতির নব্য রূপকার
  • স্মরণ:ডা. দেওয়ান নূরুল হোসেন চঞ্চল
  • কোভিড-১৯ এর সম্মুখ সমরে লড়ছে জিন প্রকৌশলীরা
  • মধ্যপ্রাচ্যের রাজনীতিতে তুরস্কের প্রভাব
  • বৃদ্বাশ্রম
  • পুষ্টি-অপুষ্টি প্রসঙ্গ
  • পুষ্টি-অপুষ্টি প্রসঙ্গ
  • সত্য যখন উক্তি হয়ে ফিরে আসে
  • প্রসঙ্গ : মহামারিতে ধৈর্য ধারণ
  • মা-বাবার সাথে থাকি
  • নব্যউদারনীতিবাদ নিয়ে কিছু কথা
  • মাওলানা আবুল কালাম আজাদ
  • বাউল সম্রাট ও গ্রামীণ সংস্কৃতি
  • সমাজসেবা ও দেশপ্রেম
  • ক্ষণজন্মা সৈয়দ মহসীন আলী
  • শিক্ষার সাথে চরিত্র গঠনও প্রয়োজন
  • জাতীয় প্রবীণ নীতিমালার লক্ষ্য ও উদ্দেশ্য
  • ম. আ. মুক্তাদির : বিপ্লবীর স্বপ্নের দেশ
  • Image

    Developed by:Sparkle IT