সাহিত্য

খোদক

আবু জাফর সিকদার প্রকাশিত হয়েছে: ১২-০১-২০২০ ইং ০০:১৫:৫৮ | সংবাদটি ৪৩ বার পঠিত

বিশ্বশ্বরের বিধবা পত্নী গৌরীবালা ছটফট করতে করতে আধা ঘুম আধা জাগরণ থেকে, বোবায় ধরা মানুষের মতোই, ধড়ফড়িয়ে জেগে উঠলো! গলাটা কেমন যেন শুকিয়ে গেছে। নিঃশ্বাস নিতেও কষ্ট হচ্ছে তার। বুকটাও কেমন যেন চিন চিন করছে। জল তেষ্টায় যেন ছাতি ফেটে চৌচির হবে! কিছুটা সম্বিৎ ফিরে পেয়ে অন্ধকারে জলের জন্য হেঁসেলের দিকে হাঁটা দিলো গৌরী। কিন্তু হাঁটতে পারছে না। যেন ভূচালের সময়। সমানে দুলছে সব কিছু! ভয় আর উৎকণ্ঠা আঁধারের মতোই তাকে ঘিরে ধরেছে। আহা, এ কী দুঃস্বপ্ন তাকে তাড়া করলো! নুয়ে পড়া ঘরের চালা, সহায় সম্বল সব ঠিকঠাক আছে তো?
সহায় সম্বল বলতে তো কয়খানা ঘটিবাটি, দুটা চাটাই, ছেঁড়া কাপড়ে সেলাই করা দুটো কাঁথা, তেল চিটচিটে দুখানা বালিশ, দুখানা থান কাপড়ের সাদা শাড়ি, আর শশির কয়খানা নিত্য ব্যবহারের কাপড়। গৌরীর দুখানা শাড়িতে চলতে হয়। একখানা পরনে তো আর একখানা বেড়াতে খোঁচা দেয়া রশিতে ঝুলে থাকে। পেটিকোট, ব্লুাউজ এসব তো শখ করেও গৌরীবালার পরা হয়ে ওঠেনি! তবে তার আরো কয়টি সম্পত্তি ও সম্পদ আছে বটে! বিশ্বশ্বরের রেখে যাওয়া দুটি স্থাবর সম্পত্তি- মাথা গোঁজার একচিলতে ভিটের ওপর দোচালা ঘরখানা আর খেয়াঘাটে বাঁধা সেই ছোট্ট ডিঙিখানি। মেরামতের অভাবে দুটোই এখন ভঙ্গুর দশা। সম্পদ বলতে একমাত্র ছেলে শশিবাঁশি জলদাস। শশি যখন তিন বছরের শিশু তখনই একদিন বিশ্বশ্বর কয়দিনের ওলাওঠা বিমারে ইহধাম ত্যাগ করলো। গেল কার্তিকে শশির বয়স পঁচিশে পড়লো! ছেলে আর মা-তে টানাটানির সংসার।
বিশ্বশ্বর গত হওয়ার পর ক্ষুধা, দারিদ্র্যের সাথে পাল্লা দিয়ে গৌরীর গৌরবর্ণ চামড়ার শরীরটা নিত্য তাকে তাড়িয়ে বেড়াতো। রাত বিরাতে ঘরের দরজা ধাক্কা তো ঘোঁৎঘোঁৎ করে শুয়োরের বাচ্চাগুলো। কখনো চোখ মুখ বুজে গুটিসুটি মেরে মরার মতো পড়ে থাকতো, ছেলেটাকে বুকে চেপে ধরে। কখনোবা দাওখান নিয়ে তেড়ে যেতো দরজা অবধি। চিৎকার করে বলতো, ‘হারামজাদা, কুত্তার বাচ্চা!!! আর আগ বাড়াইবি তো কচু হাডা গরি ফেইলাম!’ এক নাগাড়ে এই গালাগাল চলতো, মুখে কোনো লাগাম নেই! কিন্তু ভেতরে ভেতরে ভয়ে সিঁটিয়ে থাকতো! কখনো কখনো ছেলেটিও ঘুম থেকে জেগে মায়ের আঁচল ধরে দাঁড়িয়ে থাকতো। এভাবেই গৌরীবালার অনমনীয় মনোভাব, তার নিজেকে বাঁচানোর জন্য একটি দুর্লঙ্ঘনীয় দেয়াল তৈরি করতে সক্ষম হয়েছিল।
এখন শশিও বড় হয়েছে। তাই এসব উৎপাত বন্ধ হয়ে গেছে।
গৌরী ঢকঢক করে জগ উঁচিয়ে তৃপ্তি ভরে বেশ খানিকটা জল পান করলো। তারপর একটি দীর্ঘ নিঃশ্বাস নিলো। বুকের ব্যথাটা যেন চেপে বসেছে, ভেতরের ধুকপুকানি শব্দটা যেন এখনো ঘড়ির কাঁটার মতো আওয়াজ তুলছে। চারদিকে গভীর রাতের নিস্তব্ধতা, দূরে কোথাও একটি কি দুটি কুকুর যেন কোনো আগাম বিপর্যয়ের সংবাদ পেয়ে এক নাগাড়ে ডেকেই চলছে! এই অলুক্ষণে কুকুরের টানা আওয়াজ কানে বাজতেই গৌরীবালা আবারো সন্ত্রস্ত, বিহ্বল হয়ে উঠলো! তবে কী সত্যিই অঘটনটি ঘটতে চলছে! ঠিক তখনই একটি টিকটিকিও বেশ জোরে টিক টিক করে ডেকে উঠলো।
আর যায় কোথায়! গৌরীবালা এবার প্রায় নিশ্চিত, তার দুঃস্বপ্নের শেষ পরিণতির দিকেই বোধহয় সব কিছু সাক্ষ্য দিচ্ছে! যখন মানুষের আর অন্য সবকিছুতেই বিশ্বাস ও আস্থা হারিয়ে ফেলে তখন সে অন্ধ কুসংস্কারকে আঁকড়ে ধরে সান্ত্বনা খোঁজে। গৌরীবালাও তাই। সারা রাত তার আর ঘুম আসে না! ঘুমের ভেতরে যেমন সে তলিয়ে যাচ্ছিল, তেমনি জেগে থেকেও ঠিক একইভাবে তলিয়েই যাচ্ছে!.. ঝপাৎ ঝপাৎ ঝপাঝপ..!!
নদীর তীরেই জন্ম গৌরীদের, নদীর তীরেই সাতপুরুষের বসবাস! বয়স দশ কি বারো বছর হবে দক্ষিণপাড়া ডোমপল্লী থেকে উত্তরপাড়ার ডোমপল্লীতে উঠিয়ে আনা হলো গৌরীকে, বিশ্বশ্বর কুচকুচে কালো, সুঠামদেহ তাগড়া যুবক, জাল টেনে, বৈঠা বেয়ে পেটানো শরীর। শিক্ষাদীক্ষায় অক্ষরজ্ঞানশূন্য হলেও অমায়িক ও বিনয়ী ব্যবহারে তার তুলনা মেলা ভার। তবে জীবিকার অবলম্বন বলতে পালা করে ঘাটের পারাপার এবং শঙ্খনদীতে মাছ ধরা। তখন তো সাঙ্গুতে ছোট-বড় নানা মাছের কোনো অভাব ছিল না, একবেলা বের হলেই প্রচুর মাছ তুলতে পারতো বিশ্বশ্বর, কখনো তার খুড়তুতো ভাই পরিমল, কখনো বা খুড়া নিজেই তার সাথে এক নৌকায় বের হতো। মাঝে মাঝে আবার গ্রামের পুকুরের মাছ ধরার জন্য তাদের ডাকা হতো, তেভাগা বা দোভাগা নিয়ে সেখান থেকেও আয় হতো নিয়মিত। এভাবে যা পেতো দুপরিবারে ভাগাভাগি করে বেশ সচ্ছল না হলেও সুখে-দুঃখে চলে যেতো সময়। বিয়ের বছর দুয়ের মাথায় গৌরীবালার কোলজুড়ে এলো শশিবাঁশি, সংসার যেন কলকাকলিতে ভরে উঠলো! বিধি বড়ই বিচিত্র! গৌরীবালার অল্প সুখেই তার বুঝি ঈর্ষা হলো! গৌরী আর শশিকে অথৈ সাগরে ভাসিয়ে দিয়ে বিশ্বশ্বরকে উঠিয়ে নিলো। তারপর তো কত বেলা খেয়ে না খেয়ে, একমাত্র শিশু শশিকে নিয়ে তার বেঁচে থাকার সংগ্রাম। আজো চলছে।
গ্রামে গ্রামে মাথায় করে নানারকম শুঁটকি বিক্রয় করে, যৎসামান্য দয়া-দাক্ষিণ্য নিয়ে, গৌরীবালা নানা প্রলোভন ও লোলুপ দৃষ্টি এড়িয়ে; দুটো প্রাণের অন্ন বস্ত্র জুগিয়েছে।
যখন শশি বড় হতে লাগলো, খুড়তদুতো ভাইয়ের মতো তারও খুব ইচ্ছে ছিল, লেখাপড়া করবে। এক-দু ক্লাস পড়ে আর উপরে যাওয়া হলো না তার! ঘাটের খেয়া পারাপার প্রায় পুরোটা সময় তার ওপর এসে পড়লো। দিনে রাতে সময়-অসময় নেই, এপার কিংবা ওপার থেকে শশি ই বলে ডাক পাড়ে সবাই! একটু দেরি হলেই চিল্লাচিল্লি-চেঁচামেচি সমানে বাড়তেই থাকে! এসব শশির অসহ্য লাগে, ছেলেটি কেমন যেন তার বাপের বিপরীত গড়নের! গায়ের রংটা গৌরীর পেলেও স্বভাবে সে স্বাতন্ত্র্য নিয়েই বড় হয়ে উঠেছে, তার ছোটবেলা থেকে বিশেষ ভয় আর ক্ষুধা-পীড়িত নিপীড়ন তাকে এক ধরনের রুক্ষ প্রকৃতির দিকে ঠেলে দিয়েছে! সে চুপচাপ, কিন্তু বদমেজাজি।
অল্প কয়টা ঘাটের কড়ি, তাও অনেকে না দিয়ে চলে যেতে দ্বিধা করে না, তখন তার মেজাজ তিরিক্ষি হয়ে যায়! প্রায় প্রতিদিনই কারো না কারো সাথে ঝগড়া বাঁধে, তার এসব ভালো লাগে না! আগে কোনো ডাক ছিল না এই খেয়াঘাটের! এখন এতেও সরকারের নামে বার্ষিক টোল বসিয়েছে, এতেও শান্তি নেই, গ্রামের প্রভাবশালীরা ঘাটের ইজারা নিচ্ছে। শশি কেবল নামকাওয়াস্তে দৈনিক মাহিনা পায়! তাতে দৈনিক তার দুবেলা খাবারও ঠিকমতো জুটে না!
আর মাছ ধরার অবস্থা তো আরো কাহিল! সাঙ্গু এখন প্রায় পুরোপুরি মাছ শূন্য! একশ্রেণির মানুষ জলে বিষ ছিটিয়ে কিংবা কারেন্ট জাল ফেলে মাছের বংশ নির্মূল করে ফেলেছে! সারাদিন জাল ফেললেও এক কেজি মাছ জুটে না! জাল ধরার লোকজনও আর জোটে না, তার জেঠুমশায় বয়োবৃদ্ধ, পরিমল লেখাপড়া করে এখন শহরে চলে গেছে। অন্যরাও মাছ ধরার পেশা ত্যাগ করে যে যেভাবে পারে থিতু হতে চেষ্টা করছে! শশি পিছিয়ে পড়েছে তার বাপ অসময়ে চলে যাওয়ায়।
শশি বড় হতে হতে দেখেছে কত কী বদলে যাচ্ছে! বদলায়নি শুধু শশিদের জীবনযাপনের বোঝা যেন তিল তিল করে বাড়ছেই। গৌরী কয়দিন পর পর তাগাদা দেয়, বিয়ে করার জন্য, কিন্তু শশির সেই ভরসা হয় না! ছোট্ট এক পর্ণকুটিরে কোথায় রাখবে বৌকে, খাওয়াবে কি? পরাবেই বা কি? এসব প্রশ্নের কোনো আপাতত সমাধান তার কাছে নেই!
মা, মাঝে মাঝে রাগারাগি করে, কথা বন্ধ করে দেয়, আবার নিজ থেকে স্বাভাবিক হয়। গৌরীবালার রাতে দেখা দুঃস্বপ্নের মতোই এভাবে চলে যাচ্ছে তাদের দিনকাল।
দুই.
শশির নাম ধরে ওপাড় থেকে কে যেন চেঁচাচ্ছে। এটা নতুন কোনো কিছু নয়। ঘাটে যারা নিত্য পারাপার করে, সবাই শশিকে চিনে এবং ছোট-বড় প্রায় সবাই নাম ধরে ডাকতে থাকে। সময়-অসময় নেই, দিয়াকুল পুরানগড়ের এই ঘাটের খেয়া দুই পাড়ের বাসিন্দাদের যাতায়াতের বাহন। শশিবাঁশি জলদাস তারই একমাত্র ভরসা। শশি জেগে উঠেছে। ধলিরবাড়ির মসজিদে ফজরের আজান ভেসে আসছে! আগে মুয়াজ্জেন মুন্সীর খালি কিন্তু দরাজ গলায় আজান দিতো কী মধুর সুর, সেই আজানেই শশি জেগে উঠতো। এখন তো মাইকেই সব মসজিদে আজান, তবে কেমন যেন সব যান্ত্রিক যান্ত্রিক লাগে। মানুষ পারাপারে কোনো বিশেষ সময় মেনে চলে না, ফজরের আজান হতে না হতেই লোকজন ডাক পাড়ে! হয়তো কোনো জরুরি যাত্রা, না হলে ধল প্রহরে কী কেউ বের হয়?
মনে হচ্ছে সাগর স্যার ডাকছে ওপার থেকে।
ওপারের তিন তিন জন শিক্ষক প্রতিদিন এপারে হাইস্কুল ও প্রাইমারিতে শিক্ষকতা করেন এবং নিয়মিত এপার-ওপার যাতায়াত করেন। তারা সাংবাৎসরিক মজুরি এককালীন শোধ দেন। তবে তারা তো সাধারণত সকাল ৮টা থেকে সাড়ে ৮টার দিকে ঘাটে আসেন। আজ এত সকালে কেন স্যার পার হতে এসেছেন? মনে মনে ভাবছে শশি, তাড়াতাড়ি বের হয়ে নৌকায় উঠলো, তখনো ভালোভাবে গায়ের লোম দেখা যাচ্ছে না। পৌষ মাসের শেষ। কিছুটা ভারী কুয়াশায় ওপার দেখা যাচ্ছে না।
সাগর স্যার আবারো একটু চড়া গলায় ডাক পাড়ে, ‘ও শশি! আইয়ো না এক্কানা তাড়াতাড়ি।’
শশি জবাব দেয়, ‘আজ্ঞে আইয়িত্ত, দাদা।’
‘জলদি আয়, বেয়ারাইম্যা আছে; শঅরত যা ফরিবঅ!’ সাগর স্যার আবার তাড়া দেন।
শশি ততক্ষণে মাঝ নদীতে পৌঁছে গেছে! নদী তো নয় পৌষে যেন এক মরা গাঙ! কোথাও হাঁটু জল, কোথাওবা কোমর ডুবে আবার কোথায় ধু-ধু বালুচর! খেয়াঘাটেও চিতল মাছের পেটের মতো চর জেগেছে নদীর পশ্চিমাংশে, তাই নদীর কিছু অংশ হাঁটুজল মাড়িয়ে ওপার থেকে লোকজনকে নদীর মাঝ বরাবর চলে আসতে হয়! তার পর নৌকায় চড়তে হয়! ওপারে আবছা দেখা যাচ্ছে সাগর স্যারের সাথে আরো একজন দাঁড়িয়ে আছেন! তিনি বেশ বয়োবৃদ্ধ, আপাদমস্তক কাপড় মোড়ানো। চেহারা ঠিক বুঝা যাচ্ছে না। তবে মেয়ে মানুষ সেটা বুঝতে অসুবিধা হলো না শশির।
শশি আরো কাছে চলে এসেছে। পরস্পরকে ভালোমতো দেখতে পাচ্ছে!
‘ও দাদা! এত বেইন্যা ফজরত হডে যঅন্দে ? লগে মাসিরেও দেহিজ্জে!’
‘মারে লই শঅরত যঅন পরিবো! ডাক্তার দেহন পরিবো।’ সাগর স্যার শশির জবাবে বলতে থাকলেন,
‘রাইতভর জ্বর, কাশি আর বমিতে কাহিল অবস্থা! এহতাল্লাই বড় হাসপাতালত লই যাই!’
‘হ, লই যন তাড়াতাড়ি! গাঁও গেরামে তো ভালা ডাক্তর নাই!’ শশি নাওখানা চরে ঠেস দিতে দিতে বলল।
সাগর স্যার তার মাকে শক্ত করে ধরে নৌকায় তুলে বসিয়ে দিলো। নিজেও তার পাশে বসার পর শশি উল্টো করে বৈঠা চালালো। মিনিট পাঁচেক পর অপর ঘাটে পৌঁছে গেল তারা।
ঢালু বেয়ে উঠতে উঠতে সাগর স্যার শশিকে জিজ্ঞেস করে, ‘তুই তো ঘাডর বৈঠা ধরে জীবন পার গরি দিলি! আই তো থাকিত ন পারির, আজিইয়া ভোরবাজার প্রতিবাদ মিছিলত যাবি নি, তোর ঘর তো আগামী বর্ষায় শঙ্খ গিলি হাইবো!’
‘হ, দাদা, আই নিশ্চয় যাইয়ুম! আঁর মা ঘাট সামলাইবো হইয়ে!’ শশি জবাব দিল।
‘হ, বেয়াগুনেরে ডাকি হুজি লই যাবি। বেয়াগুন ন যাইলে, বাধা ন দিলে, বালুদস্যুরা পিছু হইট্টো নয়!’ বলতে বলতে সাগর স্যার মাকে নিয়ে সদর রাস্তায় উঠে এলো। একটু হেঁটে গেলেই রিকশা চালক জহুরের বাড়ি, কিন্তু মাকে আর হাঁটানো যাচ্ছে না, তিনি রাস্তার পাশেই বসে পড়েছেন! শশিও স্যারের পিছনে পিছনে উপরে উঠে এলো।
‘স্যার, রিক্সা ছাড়া ক্যানে যাইবান! অঁনে এক্কুনা হাড়ন, আঁই জওর বদ্দারে ডাহি আনি।’
জবাবের অপেক্ষা না করেই শশি জহুরের বাড়ির দিকে হাঁটা দিলো। ফজরের নামাজ পড়তে উঠেছিল জহুর। শশির ডাক শুনে এবং সাগর স্যারের মায়ের অসুখের কথা শুনে রিকশা নিয়ে বের হয়ে এলো জহুর মিয়া। মিনিট সাতেক পর জহুরকে নিয়ে শশি হাজির হলো। দুজনের আচরণে ও অমায়িক ব্যবহারে সাগর স্যার খুব খুশি হলেন। তারপর মাকে নিয়ে বাস স্টেশনের উদ্দেশ্যে রওনা দিলেন। বান্দরবান থেকে ছেড়ে আসা প্রথম গাড়িতেই টিকেট কাটতে পারলে ডাক্তারের সিরিয়াল নিতে সহজ হবে, তাই সাগর স্যারকে এত ভোরে বের হতে হয়েছে।
শশির মা তো আগেই জেগে উঠেছিল। সে যথারীতি হাতমুখ ধুয়ে নিল। প্রতিদিনের মতো তুলসি তলায় একটু জল দিলো। তারপর কয়টা জবাফুল তুলে আনলো। দেবীর বেদিতে এগুলো নিবেদন করে, ভক্তি ও প্রণাম সেরে সবে উঠে দাঁড়িয়েছে। শশিকে দেখে জিজ্ঞাসা করে,
-কি রে শশি, এতো ভেইন্না হনে পার অইল?
-সাগর দাদা।
-হডে যাদ্দে।
-মাসির অসুখ, তারে লই শঅরত যায়বদে।
-আইচ্ছা। তুই আজিয়া ভোরবাজার মিটিংঅত ন যাবি?
-হ, ন যাইয়ুম কী! আঁরা ন যাইলে, যাইবো হন!
-ইন গরি কী অইবো! এহন ভগবানত্তুন ইতারা বড়!
-না, মানুষ বেয়াগুন এক অইলে ওঁন ইঁয়ালর নান ফলাইবো!
-আবার মারামারি লাগি যাইবো না হনো?
-লাগিলে লাগোক! জনগণরলাই ন পারিবো! আঁরার লগে চেয়ারম্যান, মেম্বারঅ থাইবো হইয়ে, মুরুব্বি, ছাত্র, শিক্ষক বেয়াগুন থাইবো, থানাতও হবর দিবো নাকি, ইতারা সাধারণ জনগণের ওঁয়ারে ন থাকি কী শঙ্খর বালি খোদন্যা ডাহাইতর লগে থাহিবো!
একটানা কথাগুলো বলে শশি থামল। তার কথা শুনে গৌরী কিছুটা আশ্বস্ত হয়।
তিন.
সাঙ্গুর দুই পাড়ের লক্ষ মানুষের বসতভিটা এবং চলাচলের সদর রাস্তা, কালভার্ট ব্রিজসহ মাইলের পর মাইল ফসলি জমি ভাঙনের কবলে, হুমকির মুখে। দীর্ঘদিনের দাবির পর, সাঙ্গু পাড়ে শত কোটি টাকা খরচ করে সরকার নির্মাণ করেছে সিসি ব্লুক। পুরানগড়, বাজালিয়া, ভোরের বাজার, বিশ্বহাট, আলমগীরসহ বিস্তীর্ণ জনপদ ইতোমধ্যে নদীগর্ভে বিলীন হয়ে গেছে, বোমাং রাজার ঐতিহ্যের বসতি ও কেয়াংঘর প্রায় নিশ্চিহ্নের পথে। নানা বাদ-প্রতিবাদেও তারা ড্রেজিং মেশিন তুলে নিচ্ছে না, প্রতিবাদী জনগণকে নানা বাহানা ও হুমকি-ধমকি দিয়ে বালি উত্তোলন অব্যাহত রাখছে। তারই প্রতিবাদে স্থানীয় প্রতিনিধিরা সর্বস্তরের জনগণকে নিয়ে আজ ভোরবাজারে মিলিত হবে; একযোগে এই অবৈধ ও অন্যায় কাজের প্রতিবাদ জানাবে।
বিকেলে ঘাটের মাঝি শশিবাঁশি জলদাস, রিকশাচালক জহুর মিয়া, দিনমজুর বদন আলি তাদের আরো জনা বিশেক বন্ধু স্বজন নিয়ে প্রতিবাদ সভায় হাজির হলো। ততক্ষণে হাজার মানুষ জড়ো হয়েছে ভোরের বাজার বাঁধের ওপর! শঙ্খ নদীতে তারা দেখতে পেলো একটি বিশাল ড্রেজিং নৌযান! বড় বড় পাইপ লাইনে করে নদী থেকে টন টন বালি তুলে স্তূপ করে রেখেছে। ব্লুক ঘেঁষে নদীর তলদেশ থেকে এসব বালি তুলে আনছে। এভাবে বালি তুললে, অতি সহজেই ব্লুক ভেঙে নদীর গর্ভে চলে যেতে সময় নিবে না। সভা শেষে প্রতিবাদ করতে করতে মানুষ এগিয়ে যায় ড্রেজারের দিকে। এগিয়ে যেতে থাকে সামনের দিকে। জনগণ যখনই জেগে উঠে কুচক্রীরা তখন পাততাড়ি গুটায়! শশি, জহুরও দাঁড়িয়ে থাকে না! তারাও এগিয়ে যায় তীব্র ক্ষোভ নিয়ে। বাঁধের উপর দিয়ে, সব বাধা উপেক্ষা করে, ড্রেজিং নৌযানের কাছে পৌঁছে যায়। জনতা চোখের পলকে খুলে নেয় একে একে সবক’টি পাইপ। ক্ষিপ্ত জনতা ড্রেজিং সরঞ্জামাদি জ্বালিয়ে দিতে উদ্যত হলো। পুলিশ এসে তাদের নিবৃত্ত করলো। এই যাত্রায় প্রশমিত হলো আগুনের লেলিহান শিখা! বদরুল আর এখলাছের লেজ আপাতত চোঙার ভেতর ঢুকিয়ে দেয়া গেছে হয়তো! শশিও সন্ধ্যার পর আনন্দ মিছিল করতে করতে হাসি মুখে বাড়ি ফিরে এলো।

 

শেয়ার করুন

Developed by: Sparkle IT