শান্তিনিকেতনে ১৩১৫ থেকে ১৩২২ এর মধ্যে ‘শান্তিনিকেতন’ ভাষণ দান করেন ১৩ খণ্ডে যা গ্রন্থাকারে প্রকাশিত হয়েছে। রামকৃষ্ণ জন্মশতবার্ষিকীতে সভাপতির ভাষণ দিয়েছিলেন ইংরেজিতে ১৯৩৭ সালে। ভারতীয় দর্শন কংগ্রেসে ১৯২৫ সনে ‘The Philosophy of our people’ নামে সভাপতির ভাষণ দান করেন।
হাভার্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রদত্ত ভাষণ Sadhana (১৯১৪) নামে প্রকাশিত হয়েছে। আমেরিকায় যেসব বক্তৃতা দিয়েছেন সেগুলি Personality (১৯১৭) নামে প্রকাশিত হয়েছে। জাপানে প্রদত্ত ভাষণ Nationalism (1917) নামে প্রকাশিত হয়েছে। Creative Unity নামে ১৯২২ সালে আরেকটি ভাষণ গ্রন্থ প্রকাশিত হয়েছে।
রবীন্দ্রনাথের এই বক্তৃতা বিষয়ের সুমেধা ঐতিহ্যকে সামনে রেখেই শ্রীহট্ট ভাষণকে অনুভবের সত্যে প্রকাশ করবো। শ্রীহট্টে প্রদত্ত দুটি ভাষণ নিয়েই বিবেচনাকে উপস্থাপন করবো।
বাঙ্গালীর সাধনা
৬ নভেম্বর, ১৯১৯, ২০ কার্তিক, বৃহস্পতিবার ১৩২৬ লোকনাথ রতনমণি টাউন হলে সিলেটের সর্বস্তরের জনগণের পক্ষে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরকে এক গণসংবর্ধনা দেয়া হয়। সভায় সভাপতিত্ব করেন খান বাহাদুর সৈয়দ আবদুল মজিদ (কাপ্তান মিয়া) সাহেব। সকাল দশটায় সভা আরম্ভ হয়। প্রায় পাঁচ হাজার মানুষের সমাবেশ হয়। সভার প্রারম্ভে সভাপতি আবদুল মজিদ উর্দু ভাষায় মহাকবিকে উদ্দেশ্য করে বলেন- ‘ডক্টর সাহেব রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর, আপযো সিলেট মে তশরীপ লে আয়ে, ইসলিয়ে সিলহেট কা হামারে সব বহুত খুশ হওয়া ... ইত্যাদি।’
উর্দু বক্তৃতা শুনে রবীন্দ্রনাথ জিজ্ঞাসা করেন তিনি বাংলায় না ইংরেজিতে ভাষণ দেবেন। উর্দুতে তো কিছুই বলতে পারবো না।
১৩২৬ বাংলার পৌষ সংখ্যা প্রবাসী পত্রিকায় এই ভাষণ প্রকাশিত হয়। ভাষণটি অনুলিখন করেন মনোরঞ্জন চৌধুরী ও উপেন্দ্র নারায়ণ সিংহ। ১৯৪১ সালে প্রকাশিত কবি প্রণামের পরিশিষ্টে ভাষণটি মুদ্রিত হয়। প্রায় এক ঘণ্টাব্যাপী রবীন্দ্রনাথ ভাষণ দান করেন। প্রথমে আস্তে আস্তে ও পরে উচ্চকণ্ঠে কবি ‘বাঙ্গালীর সাধনা বিষয়ে ভাষণ দান করেন।
বাঙ্গালীর সাধনা, সন্ধান ও সিদ্ধি
শেষ জীবনে রবীন্দ্রনাথ এক দর্শন প্রস্থানে উপনীত হয়েছিলেন। যাকে নাম দিয়েছিলেন ‘মানব ধর্ম’ । তার জীবন দেবতা তত্ত্বেরই এক পরিচিত রূপ যেন এই দর্শন। শ্রীহটে প্রদত্ত ভাষণ বাঙ্গালীর সাধনা ও সেই অনুভবেরই সমীপবর্তী। তাঁর দার্শনিক প্রত্যয় এখানেও মানবসত্যে সুনিকেত তুল্য।
ভাষণের প্রারম্ভে রবীন্দ্রনাথ বলেন, ‘আজ আপনাদের কাছ থেকে এই যে অভ্যর্থনা লাভ করলেম সে জন্যে কৃতজ্ঞতা জানাচ্ছি। কিন্তু সেই সঙ্গে একটি কথা না বলে থাকতে পারিনে যে, উচ্চমঞ্চে স্বতন্ত্র হয়ে বসে জনসংঘের কাছে নিজের যশোগান স্থির হয়ে শোনা বড় কঠিন পরীক্ষা। এই পরীক্ষার হাত থেকে নিষ্কৃতি লাভের চেষ্টা অনেকবার অনেক স্থলে করেছি, সে চেষ্টা অনেকবারই নিস্ফল হয়েছে।’
এই সৌজন্য শোভন সম্ভাষণের পর মহাকবি তাঁর মূল বক্তব্যে বলেন- ‘আজ এই সভাতে আপনাদের সঙ্গে আমার এই যে যোগ হল সে কেবলমাত্র সাহিত্যের যশ নিয়ে নয়। এর ভিতরে একটি গূঢ় কথা আছে যা খ্যাতির চেয়ে অনেক বড়। সে কথাটা এই যে বাংলাদেশের লোক আপনার মধ্যে একটি শক্তির জাগরণ- অনুভব করছে।’
এই জাগরণই তাকে মানবিকী প্রত্যয়ে শক্তিমান করেছে। তাঁর মানব ধর্মে আছেন মানবদেবতা, ঈশ্বর নেই। সে কারণেই তিনি মুক্ত কণ্ঠে উচ্চারণ করেছেন এক ধ্রুববাণী। এক গোধূলি পর্যায়ের চিরায়ত বিশ্বাসের কথা। সে কথা তার সমগ্র জীবনের পূর্ণতাকে প্রকাশ করে।
রবীন্দ্রনাথের মানতত্ত্বকে মধ্যযুগের সপ্ত সাধক ও বাউলেরা মানুষরতন বোধকেই বিস্তারিত করেছে। রবীন্দ্রনাথ লোককবিদের দ্বারা আকৃষ্ট হয়েছিলেন কারণ তারা গানে ও বাণীতে ভেদহীন মানুষের কথাই বলেছেন। The Religion of Man ভাষণে তাই তিনি বলেছেন,

God-man (Nara Narayana) is they definition, it is not a delusion.

.
এই দেহখানা বহন করে আসছে দীর্ঘকাল
বহু বহু মুহূর্তের রাগ দ্বেষ ভয় ভাবনা,
কামনার আবর্জনারাশি।
এর আবিল আবরণে বারেবারে ঢাকা পড়ে
আত্মার মুক্ত রূপ।
এ সত্যের মুখোশ পরে সত্যকে আড়ালে রাখে;
মৃত্যুর কাদামাটিতেই গড়ে আপনার পুতুল,
তবু তার মধ্যে মৃত্যুর আভাস পেলেই
নালিশ করে আর্তকণ্ঠে।
খেলা করে নিজেকে ভোলাতে,
কেবলই ভুলতে চায় যে সেটা খেলা।
‘আমি এটা অনুভব করি যে, ভারতে বাঙ্গালীর একটি বিশেষ সাধনা আছে।' এই অনুভবকে বিশ্লেষণ করতে গিয়ে তিনি বলেছেন সকল ভেদের মূলে গিয়ে অভেদকে দেখা। যারা দেখেছেন তারা ভক্ত সাধক। তারা বড় সেনাপতি বা বড় রাষ্ট্রনীতিক নন। তারা মাটির কাছাকাছি মানুষ। তিনি ব্যাখ্যা করে বলেছেন জাপান বা ইংলণ্ডের মত জাতিগত সহজ ঐক্য আমাদের নেই।
ধর্মে ও আচারে বিরোধ আছে।
আমাদের সম্মিলনের সহজ-সূত্র ও তিনি দেখিয়েছেন- ‘আমাদের দেশকে আমরা যদি মাতৃভূমি বলেই মানি তা হলে সর্বত্র মাতাকে উপলব্ধি করা চাই।
বাঙালির সাধনার স্বরূপ সম্পর্কে তিনি তাত্ত্বিক ভাষণ দান করেন। বাংলাদেশের মানুষ ও প্রকৃতিকে তিনি এক নিজস্ব প্রস্থানে বিচার করেছেন। রবীন্দ্রনাথের দার্শনিক কুললক্ষণ বিচার করে তাই রবীন্দ্রভাবুক ড. ভবতোষ দত্ত লিখেছেন‘রবীন্দ্রনাথ তাঁর জীবনের শেষ দশকে একটি সুস্পষ্ট দার্শনিক প্রত্যয়ে উপনীত হয়েছিলেন, তার নাম তিনি দিয়েছিলেন- মানুষের ধর্ম।’
সিলেট জেলার সমাজ সংহতির কথা বলতে গিয়ে রবীন্দ্রনাথ লিখেছেন- ‘এই যে এ জিলায় হিন্দু মুসলমান পাশাপাশি বাস করে এরা বাঙালী জাতি রচনার বিচ্ছিন্ন উপকরণভাবে পরস্পরের বিরুদ্ধ।’ এসব কথা বলার আগে তিনি বলেছেন-বাঙালীর শক্তি যদি সৃষ্টি শক্তি, যদি আত্মোর্জ্জনের শক্তিই হয়, তা হলেই নানা বিভিন্ন সম্প্রদায়ের বিভিন্ন জাতির উগ্র বিরোধের সমাধান করে এক বিরাট সভাকে সে গড়ে তুলতে পারবে।’
বাঙালির সাধনাকে তিনি ঐতিহাসিক নানাস্তরের ভাব ও বিরোধের মধ্যে স্থাপন করেছেন। তার মৌল দৃষ্টি সহায়ে দেখাবার চেষ্টা করেছেন বাঙালি জাতির সত্তার মধ্যেই নিহিত আছে এক সমন্বয় ধর্ম। যা স্থানিক নানা রূপসহ পূর্ণতার সাধনাই করেছে। যাকে মানবধর্ম বলা হয়েছে। প্রাচীন ভারতের উপনিষদের দর্শনে, পুরাণকাহিনীতে তা প্রবাহিত হয়েছিল। পরে ব্যক্তি প্রভায় বিস্তারিত হয়েছে, বুদ্ধের নিরীশ্বরবাদী নৈতিকতায়, প্রভু যীশুর প্রেমে, ইসলামের সাম্যে আর লোকায়ত বাউল ফকিরের মানবিক বোধে। এই মানবিকী বিদ্যাকে রাধাকৃষ্ণন বলেছেন-True humanism tells us that there is something more in man than is apparent in his ordinary consciousness, something which frames ideals and thoughts a finer spiritual presence, which makes him dissatisfied with more earthly pursuits.
মুরারিচাঁদ কলেজ বার্ষিকীতে কবির ভাষণ সম্পর্কে মন্তব্য করা হয় এভাবে-

Let us hope Rabi Babis speech will when the outlook of our students and in spire them to think noble thought. speak noble words and perform noble acts (Murarichand College Magazine 1919 voll-III, No. 2)


আকাক্সক্ষা
মুরারিচাঁদ কলেজের ছাত্রাবাসে মহাকবি ‘আকাক্সক্ষা’ বক্তৃতাটি দান করেন ২১ কার্তিক ১৩২৬। কবিপ্রণামে বলা হয়েছে ১৮ কার্তিক। সেটা সঠিক নয়। প্রায় চার হাজার শ্রোতার সামনে রবীন্দ্রনাথ ভাষণ উপস্থাপন করেন। ছাত্ররা শোভাযাত্রা সহকারে কবিকে হোস্টেলে নিয়ে যায়। তখন এম.সি. কলেজের অধ্যক্ষ ছিলেন জ্যোতির্বিজ্ঞানী ও গণিতবিদ অপূর্ব চন্দ্র দত্ত। ‘আকাক্সক্ষা’ নামের ভাষণটি ২১ কার্তিক ১৩২৬, ৭ নভেম্বর ১৯১৯ দুপুরে প্রদত্ত হয়। মহাকবি নিজেই বক্তৃতাটির ইংরেজি অনুবাদ করেন ‘Towards the future’ নামে। ১৯২০ সনের জুন মাসের ‘মডার্ণ রিভিয়্যু’ পত্রিকায় লেখাটি প্রকাশিত হয়। ‘শান্তিনিকেতন’ পত্রিকার পৌষ সংখ্যা ১৩২৬ বাংলায় আকাক্সক্ষা মুদ্রিত হয়।
রবীন্দ্রনাথ ‘আকাক্সক্ষা’ বক্তৃতাটি দেন মুরারিচাঁদ কলেজ ছাত্রাবাসে। তবে এখন মুরারিচাঁদ ছাত্রাবাস যেখানে আছে, তখন সেটি তৈরি হয়নি। ১৯১৯ সালে সিলেট শহরের চৌহাট্টা ও তেলিহাওরে দুটি পৃথক ছাত্রাবাস ছিল। ৮৬ জন হিন্দু ছাত্রের আবাসিক ব্যবস্থা ছিল চৌহাট্টার দুটি ব্লকে। ২১ জন মুসলিম ছাত্রের আবাসিক সুবিধা ছিল তেলিহাওর ব্লকে। ছাত্রাবাসের কাছেই ছিল হোস্টেল সুপারের বাসা। হিন্দু হোস্টেলের সুপার ছিলেন প্রফেসর সুরেশচন্দ্র সেনগুপ্ত (এস. সি. সেনগুপ্ত)। যিনি রবীন্দ্রনাথকে সিলেট আসার জন্যে টেলিগ্রাম করেছিলেন। তাঁর টেলিগ্রামের ভাষাটি ছিল খুব সুন্দর ও কাব্যগুণ-মণ্ডিত, নান্দনিক।

Sylhet desires India's greatest son to honour her by his visit.


এই তারবার্তাটি সম্পর্কে আমার কিছু ব্যক্তিগত সুখস্মৃতি আছে। সেটা নিবেদন করতে চাই, অনেকটা অপ্রাসঙ্গিক মনে হতে পারে কারো কাছে। তবু আমাকে বলতেই হবে। কারণ, সারস্বতচর্চায় যাঁরা মফস্বলবাসী, তাঁদেরকে কেউ সহায়তা করে না। যারা উচ্চ ডিগ্রিধারিণী ক্ষমতাধর, তারা অন্ত্যজ মনে করেন তাদেরকে। আজিজ স্যার যে ব্যতিক্রমিক চারিত্রের লোক সেটা জানানোই আমার উদ্দেশ্য। প্রফেসর মো. আবদুল আজিজ লিখিত মুরারিচাঁদ কলেজের ইতিকথা প্রথম সংস্করণ বের হয় সেপ্টেম্বর ১৯৯২ সালে। তিনি তখন কুমিল্লা শিক্ষাবোর্ডের চেয়ারম্যান। আমি তখন এই বোর্ডের একজন পরীক্ষক। স্যারকে অনুরোধ করেছিলাম এক কপি বই দিতে। এক সপ্তাহের মধ্যেই আমার শ্রীমঙ্গলের বাসায় রেজিঃ ডাকে চলে আসে বই। খুলে দেখি, ফেব্রুয়ারি ১৯৯২, সাহিত্য প্রকাশ, ঢাকা প্রকাশিত ‘শ্রীভূমি সিলেটে রবীন্দ্রনাথ’ বইটির উল্লেখ আছে। আমি যখন বইটি লিখি, তখন আজিজ স্যার মুরারিচাঁদ কলেজের অধ্যক্ষ। তথ্য সংগ্রহে কলেজে গেলে তিনি আমাকে আন্তরিকভাবে গ্রহণ করেন ও ১৯১৯ সালের মুরারিচাঁদ কলেজ ম্যাগাজিন দেখতে দেন। সেখানেই প্রথম আবিষ্কার করি সুরেশচন্দ্র সেনগুপ্তের টেলিগ্রামটি। আমার ‘শ্রীভূমি সিলেটে রবীন্দ্রনাথ’ (১৯৯২) বইটির সূচনাতেই স্থাপন করি এই সুখ্যাতি তারবার্তাকে।
প্রফেসর মজদ উদ্দিন আহমদ ছিলেন মুসলিম ছাত্রাবাস চৌহাট্টার সুপার । অধ্যক্ষ অপূর্ব চন্দ্র দত্ত চৌহাট্টায় থাকতেন। তিনি ছিলেন জ্যোতির্বিজ্ঞানী ‘আকাশে কথা নামে তার একটি গ্রন্থ প্রকাশিত হয়েছিল। এই চৌহাট্টা ছাত্রবাসেই ৭ নভেম্বর রবীন্দ্রনাথ আকাক্সক্ষা নামের খ্যাতকীর্তি ভাষণ দান করেছিলেন। মোহাম্মদ আবদুল্লাহ বিএল সাহেব তার ৬ নভেম্বরের ডায়রিতে লিখেছেন- ‘সভা শেষে জানানো হয় যে, কবি পরদিন (৭ নভেম্বর ১৯১৯) মুরারিচাঁদ কলেজ ছাত্রাবাসে (চৌহাট্টায়) ভাষণ দেবেন। তাই সরঞ্জামাদি সেখানে নেওয়ার ব্যবস্থা করি) (নবম খণ্ড)
বাঙালির সাধনা বক্তৃতাটি রবীন্দ্রনাথ মৌখিকভাবে দিয়েছিলেন। এবং উপেন্দ্র নারায়ণ সিংহ ও মনোরঞ্জন চৌধুরী অনুলেখন করেছিলেন এরকম তথ্যই প্রায় সুপ্রতিষ্ঠিত। সম্প্রতিকালে নতুনভাবে বিষয়টি ভাববার প্রেক্ষিত সৃষ্টি হয়েছে। কুলাউড়া থেকে প্রকাশিত রবীন্দ্রস্মারক ‘রবিরাগে’ ড. আবুল ফতেহ ফাত্তাহ একটি প্রবন্ধ লিখেছেন- মোহাম্মদ আব্দুল্লাহ বিএল-এর রোজনামচায় সিলেটে রবীন্দ্র সংবর্ধন' শিরোনামে ' তিনি দেখিয়েছেন মোহাম্মদ আব্দুল্লাগ বিএল ৬ নভেম্বরের তার ডায়রিতে বাঙালির সাধনা শীর্ষক ভাষণটি রবীন্দ্রনাথ লিখিতভাবে দিয়েছেন। ৬ নভেম্বরের আব্দুল্লাহ লিখিত রোজনামচায় ড. ফাত্তাহর বাংলা অনুবাদ নিম্নরূপ :
৬ নভেম্বর ১৯১৯, বৃহস্পতিবার
সকালে টাউন হল প্রাঙ্গণে যাই এবং প্যান্ডেলসহ বসার জায়গা ঠিকঠাক করি। রবিবাবু আসলেন। এবং একটি সঙ্গীত পরিবেশনের পর কবি একটি লিখিত বাংলা ভাষণ (বাঙালির সাধনা) উপস্থাপন করেন। মাননীয় সৈয়দ আবদুল মজিদ সাহেব উর্দুতে স্বাগত ভাষণ দেন। রবিবাবু এর জবাবে খুব উৎসাহ উদ্দীপনাপূর্ণ ভাষণ দেন। সকাল নয়টা নাগাদ সংবর্ধনা অনুষ্ঠান শেষ হয়।’
মূল ডায়েরিতে পরিষ্কার লেখা আছে-
‘.... an address was read in Bengali.’
শিলচর থেকে প্রকাশিত নগেন্দ্রচন্দ্র শ্যাম বি.এল, সম্পাদিত ‘ভবিষ্যৎ’ পত্রিকার ১ম বর্ষ, শেষ সংখ্যা, আশ্বিন, ১৩৩৪ বঙ্গাব্দ ‘আকাক্সক্ষা’ ভাষণটির একটি ভিন্ন পাঠ- ‘ছাত্রদের প্রতি রবীন্দ্রনাথের উপদেশ’ নামে প্রকাশিত হয় ভাষণটি প্রদানের সাত বছর পর। সেখানে বক্তৃতার তারিখ ভুল ছিল। ১৯১৯-১১ নভেম্বর সকাল ৮ টা। সৈয়দ মুর্তাজা আলী তার জীবন কথা- ‘আমাদের কালের কথা’ গ্রন্থে লিখেছেন তকালীন ছাত্র আবদুল্লাহ চৌধুরী, সৈয়দ মোস্তফা আলী, সৈয়দ মুর্তাজা। আলী ও সৈয়দ মুজতবা আলী ভাষণটি অনুলিখন করে ছিলেন। ‘কবি প্রণামে’ লেখা হয়েছে পাদটীকায় অনুলেখক হচ্ছেন উপেন্দ্রনারায়ণ চৌধুরী ও মনোরঞ্জন চৌধুরী। সব লেখন মিলিয়েই শুদ্ধ পাঠ তৈরি করা হয়।
নোটবুকের পত্রপুট মেলে ধরে মুষ্টিভিক্ষা করাকে রবীন্দ্রনাথ ধিক্কার দিয়েছেন। অর্থনীতিবিদ বিনায়ক সেন তাঁর ‘আকাক্সক্ষার দারিদ্র ও উন্নয়ন শতবর্ষ পূর্বে সিলেটে রবীন্দ্রনাথের ভাষণ-
প্রবন্ধে বলেছেন- ‘আকাক্সক্ষা প্রবন্ধে (ভাষণ) ইউরোপের উচ্চাকাক্ষা ও বৃহত্তর জ্ঞানান্বেষণের পেছনে ক্ষমতা লিপ্ততার অন্তর্লীন যোগাযোগ রবীন্দ্রনাথের চোখে বড় হয়ে দেখা দেয়নি।’ ‘কালান্তরে’ এসে ১৯৩৭ সালে তাঁর মনোভঙ্গির পরিবর্তন হয় বলে তিনি মন্তব্যকার হয়েছেন। লার্নিং ক্রাইসিস বা জানার সংকট বিষয়ে তিনি অর্থনীতিবিদ ল্যাল্ট প্রিচেটের ভাবনারও বিবরণ দিয়েছে।
আমরা মনে করি আকাক্সক্ষার দারিদ্রই মানুষের চরম দারিদ্র। রবীন্দ্রনাথ সেই দুঃখ হরণেরই গান গেয়েছেন।
‘আকাক্ষা’ বক্তৃতা শুনেই সৈয়দ মুজতবা আলী রবীন্দ্রনাথকে একটি চিঠি লেখেন এই প্রশ্ন করে- ‘কীভাবে আকাক্সক্ষাকে বড়ো করা যায়?’ উত্তরে রবীন্দ্রনাথ লিখেছিলেন, এত দূর থেকে বিষয়টি ব্যাখ্যা করা কঠিন। তবে এটুকু বলা যায় স্বার্থশূন্য হয়ে কাজ করে আকাক্সক্ষাকে বড়ো করা যায়। ১২ এই একটি বক্তৃতাই মুজতবা আলীর জীবনকে পাল্টে দেয়। তিনি বহুভাষাবিদ পণ্ডিত ও রবীন্দ্র পরিকররূপে খ্যাতকীর্তি ব্যক্তি হয়ে উঠেছিলেন আকাক্সক্ষাকে বড়ো করে। এই ভাষণ এক কালজয়ী প্রভাব ফেলে ছিল সিলেটের ব্যক্তি ও সমাজ জীবনে।
সূচনায় রবীন্দ্রনাথ বলেন, ‘এই যে ছাত্ররা এখানে আমাকে আহ্বান করেছে এটা আমার আনন্দের কথা। ছাত্রদের মধ্যে আমার আসন আমি সহজেই গ্রহণ করতে পারি। সে কিন্তু গুরুরূপে নয়, তাদের কাছে এসে, তাদের মধ্যে বসে’।
এই বক্তৃতার প্রারম্ভিক পর্বে তিনি বৃদ্ধদের সম্পর্কে বলেছেন- ‘বুড়োদের ওপর বাধা হুকুম রয়েছে জায়গা ছেড়ে দেবার মধ্যে।' ‘অসীমের তো জরা নেই তাই সৃষ্টিকে পেছনে বাঁধা পড়তে দিতে চান না রবীন্দ্রনাথ। বৃদ্ধ সেজে তিনি উপদেশ দিতে চান না কেবল নবীনদের কাছে আকাক্সক্ষার কথা বলতে এসেছেন। তিনি আমাদের দারিদ্রকে বলেছেন ‘আত্মারই দারিদ্র’। বিদ্যালয়ে ছাত্ররা ভর্তি হয়েছে ‘শিখব না আমরা পাশ করব। এ কথা বলেই আকাক্সক্ষাকে বড়ো করার কথা বলেছেন।
‘সারা পৃথিবীতে য়ূরোপ শিক্ষকতার ভার পেয়েছে গায়ের জোরে নয়। গায়ের জোরে শুরু হওয়া যায় না। ইউরোপের মানুষ বিপুল আকাক্সক্ষাকে নিয়তই নানা ক্ষেত্রে প্রকাশ করছে এবং জয়ী হয়েছে। রবীন্দ্রনাথ এ জন্যেই আকাক্সক্ষাকে বড় করার কথা বলেছেন।’
‘আকাক্সক্ষা’ ভাষণটিতে রবীন্দ্রনাথ উপনিষদ থেকে চারটি বাণী উঙ্কলন করেছেন। এ বিষয়ে বিস্তৃত তথ্য পাওয়া যাবে সিলেটেরই সুসন্তান সুখময় সপ্ততীর্থ রচিত সংস্কৃত অনুশীলনে রবীন্দ্রনাথ' গ্রন্থে। কল্যাণী শঙ্কর ঘটকের ‘রবীন্দ্রনাথ ও সংস্কৃত সাহিত্য’ গ্রন্থে তথ্যনিষ্ট আলোচনা আছে শম্পা মজুমদারের ‘রবীন্দ্র সংস্কৃতির ভারতী রূপও উৎস’ (১৯৭২) গ্রন্থে।
‘আত্মানং বিদ্ধি’ মানে আত্মাকে জানো। ছাত্রদের সামনে তার এই চরম উপদ'/> SylheterDak.com.bd

সাহিত্য

রবীন্দ্রনাথের শ্রীহট্ট ভাষণ

নৃপেন্দ্রলাল দাশ প্রকাশিত হয়েছে: ১২-০১-২০২০ ইং ০০:২৩:২৩ | সংবাদটি ২১৪ বার পঠিত
Image

১.
রবীন্দ্রনাথ যেমন কবি সার্বভৌম, তেমনি তিনি ভাষণভাস্কর। বাগীশ্বর তিনি বক্তৃতা শৈলীতেও। পরিব্রাজন ও ভাষণ জীবনব্যাপী তাঁর জীবনপাত্রকে পূর্ণতা দান করেছে। পৃথিবীর যেখানেই গিয়েছেন, সেখানেই অবধারিতভাবে ভাষণ দান করেছেন। ১৯৩১ সনে অক্সফোর্ডে হিবার্ট বক্তৃতা দিয়েছেন ‘Religion on Man’ নামে আবার একই বিষয়ে বাংলায় ভাষণ দিয়েছেন কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ে ‘কমলা বক্তৃতা’ ১৯৩৩ সালে মানুষের ধর্ম' নামে। ওয়ালটেয়ারে বিশ্ববিদ্যালয়ে ‘Man’ নামে ভাষণ দেন ১৯৩৩ সনে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ভাষণ দেন Meaning of Arts নামে।
শান্তিনিকেতনে ১৩১৫ থেকে ১৩২২ এর মধ্যে ‘শান্তিনিকেতন’ ভাষণ দান করেন ১৩ খণ্ডে যা গ্রন্থাকারে প্রকাশিত হয়েছে। রামকৃষ্ণ জন্মশতবার্ষিকীতে সভাপতির ভাষণ দিয়েছিলেন ইংরেজিতে ১৯৩৭ সালে। ভারতীয় দর্শন কংগ্রেসে ১৯২৫ সনে ‘The Philosophy of our people’ নামে সভাপতির ভাষণ দান করেন।
হাভার্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রদত্ত ভাষণ Sadhana (১৯১৪) নামে প্রকাশিত হয়েছে। আমেরিকায় যেসব বক্তৃতা দিয়েছেন সেগুলি Personality (১৯১৭) নামে প্রকাশিত হয়েছে। জাপানে প্রদত্ত ভাষণ Nationalism (1917) নামে প্রকাশিত হয়েছে। Creative Unity নামে ১৯২২ সালে আরেকটি ভাষণ গ্রন্থ প্রকাশিত হয়েছে।
রবীন্দ্রনাথের এই বক্তৃতা বিষয়ের সুমেধা ঐতিহ্যকে সামনে রেখেই শ্রীহট্ট ভাষণকে অনুভবের সত্যে প্রকাশ করবো। শ্রীহট্টে প্রদত্ত দুটি ভাষণ নিয়েই বিবেচনাকে উপস্থাপন করবো।
বাঙ্গালীর সাধনা
৬ নভেম্বর, ১৯১৯, ২০ কার্তিক, বৃহস্পতিবার ১৩২৬ লোকনাথ রতনমণি টাউন হলে সিলেটের সর্বস্তরের জনগণের পক্ষে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরকে এক গণসংবর্ধনা দেয়া হয়। সভায় সভাপতিত্ব করেন খান বাহাদুর সৈয়দ আবদুল মজিদ (কাপ্তান মিয়া) সাহেব। সকাল দশটায় সভা আরম্ভ হয়। প্রায় পাঁচ হাজার মানুষের সমাবেশ হয়। সভার প্রারম্ভে সভাপতি আবদুল মজিদ উর্দু ভাষায় মহাকবিকে উদ্দেশ্য করে বলেন- ‘ডক্টর সাহেব রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর, আপযো সিলেট মে তশরীপ লে আয়ে, ইসলিয়ে সিলহেট কা হামারে সব বহুত খুশ হওয়া ... ইত্যাদি।’
উর্দু বক্তৃতা শুনে রবীন্দ্রনাথ জিজ্ঞাসা করেন তিনি বাংলায় না ইংরেজিতে ভাষণ দেবেন। উর্দুতে তো কিছুই বলতে পারবো না।
১৩২৬ বাংলার পৌষ সংখ্যা প্রবাসী পত্রিকায় এই ভাষণ প্রকাশিত হয়। ভাষণটি অনুলিখন করেন মনোরঞ্জন চৌধুরী ও উপেন্দ্র নারায়ণ সিংহ। ১৯৪১ সালে প্রকাশিত কবি প্রণামের পরিশিষ্টে ভাষণটি মুদ্রিত হয়। প্রায় এক ঘণ্টাব্যাপী রবীন্দ্রনাথ ভাষণ দান করেন। প্রথমে আস্তে আস্তে ও পরে উচ্চকণ্ঠে কবি ‘বাঙ্গালীর সাধনা বিষয়ে ভাষণ দান করেন।
বাঙ্গালীর সাধনা, সন্ধান ও সিদ্ধি
শেষ জীবনে রবীন্দ্রনাথ এক দর্শন প্রস্থানে উপনীত হয়েছিলেন। যাকে নাম দিয়েছিলেন ‘মানব ধর্ম’ । তার জীবন দেবতা তত্ত্বেরই এক পরিচিত রূপ যেন এই দর্শন। শ্রীহটে প্রদত্ত ভাষণ বাঙ্গালীর সাধনা ও সেই অনুভবেরই সমীপবর্তী। তাঁর দার্শনিক প্রত্যয় এখানেও মানবসত্যে সুনিকেত তুল্য।
ভাষণের প্রারম্ভে রবীন্দ্রনাথ বলেন, ‘আজ আপনাদের কাছ থেকে এই যে অভ্যর্থনা লাভ করলেম সে জন্যে কৃতজ্ঞতা জানাচ্ছি। কিন্তু সেই সঙ্গে একটি কথা না বলে থাকতে পারিনে যে, উচ্চমঞ্চে স্বতন্ত্র হয়ে বসে জনসংঘের কাছে নিজের যশোগান স্থির হয়ে শোনা বড় কঠিন পরীক্ষা। এই পরীক্ষার হাত থেকে নিষ্কৃতি লাভের চেষ্টা অনেকবার অনেক স্থলে করেছি, সে চেষ্টা অনেকবারই নিস্ফল হয়েছে।’
এই সৌজন্য শোভন সম্ভাষণের পর মহাকবি তাঁর মূল বক্তব্যে বলেন- ‘আজ এই সভাতে আপনাদের সঙ্গে আমার এই যে যোগ হল সে কেবলমাত্র সাহিত্যের যশ নিয়ে নয়। এর ভিতরে একটি গূঢ় কথা আছে যা খ্যাতির চেয়ে অনেক বড়। সে কথাটা এই যে বাংলাদেশের লোক আপনার মধ্যে একটি শক্তির জাগরণ- অনুভব করছে।’
এই জাগরণই তাকে মানবিকী প্রত্যয়ে শক্তিমান করেছে। তাঁর মানব ধর্মে আছেন মানবদেবতা, ঈশ্বর নেই। সে কারণেই তিনি মুক্ত কণ্ঠে উচ্চারণ করেছেন এক ধ্রুববাণী। এক গোধূলি পর্যায়ের চিরায়ত বিশ্বাসের কথা। সে কথা তার সমগ্র জীবনের পূর্ণতাকে প্রকাশ করে।
রবীন্দ্রনাথের মানতত্ত্বকে মধ্যযুগের সপ্ত সাধক ও বাউলেরা মানুষরতন বোধকেই বিস্তারিত করেছে। রবীন্দ্রনাথ লোককবিদের দ্বারা আকৃষ্ট হয়েছিলেন কারণ তারা গানে ও বাণীতে ভেদহীন মানুষের কথাই বলেছেন। The Religion of Man ভাষণে তাই তিনি বলেছেন,

God-man (Nara Narayana) is they definition, it is not a delusion.

.
এই দেহখানা বহন করে আসছে দীর্ঘকাল
বহু বহু মুহূর্তের রাগ দ্বেষ ভয় ভাবনা,
কামনার আবর্জনারাশি।
এর আবিল আবরণে বারেবারে ঢাকা পড়ে
আত্মার মুক্ত রূপ।
এ সত্যের মুখোশ পরে সত্যকে আড়ালে রাখে;
মৃত্যুর কাদামাটিতেই গড়ে আপনার পুতুল,
তবু তার মধ্যে মৃত্যুর আভাস পেলেই
নালিশ করে আর্তকণ্ঠে।
খেলা করে নিজেকে ভোলাতে,
কেবলই ভুলতে চায় যে সেটা খেলা।
‘আমি এটা অনুভব করি যে, ভারতে বাঙ্গালীর একটি বিশেষ সাধনা আছে।' এই অনুভবকে বিশ্লেষণ করতে গিয়ে তিনি বলেছেন সকল ভেদের মূলে গিয়ে অভেদকে দেখা। যারা দেখেছেন তারা ভক্ত সাধক। তারা বড় সেনাপতি বা বড় রাষ্ট্রনীতিক নন। তারা মাটির কাছাকাছি মানুষ। তিনি ব্যাখ্যা করে বলেছেন জাপান বা ইংলণ্ডের মত জাতিগত সহজ ঐক্য আমাদের নেই।
ধর্মে ও আচারে বিরোধ আছে।
আমাদের সম্মিলনের সহজ-সূত্র ও তিনি দেখিয়েছেন- ‘আমাদের দেশকে আমরা যদি মাতৃভূমি বলেই মানি তা হলে সর্বত্র মাতাকে উপলব্ধি করা চাই।
বাঙালির সাধনার স্বরূপ সম্পর্কে তিনি তাত্ত্বিক ভাষণ দান করেন। বাংলাদেশের মানুষ ও প্রকৃতিকে তিনি এক নিজস্ব প্রস্থানে বিচার করেছেন। রবীন্দ্রনাথের দার্শনিক কুললক্ষণ বিচার করে তাই রবীন্দ্রভাবুক ড. ভবতোষ দত্ত লিখেছেন‘রবীন্দ্রনাথ তাঁর জীবনের শেষ দশকে একটি সুস্পষ্ট দার্শনিক প্রত্যয়ে উপনীত হয়েছিলেন, তার নাম তিনি দিয়েছিলেন- মানুষের ধর্ম।’
সিলেট জেলার সমাজ সংহতির কথা বলতে গিয়ে রবীন্দ্রনাথ লিখেছেন- ‘এই যে এ জিলায় হিন্দু মুসলমান পাশাপাশি বাস করে এরা বাঙালী জাতি রচনার বিচ্ছিন্ন উপকরণভাবে পরস্পরের বিরুদ্ধ।’ এসব কথা বলার আগে তিনি বলেছেন-বাঙালীর শক্তি যদি সৃষ্টি শক্তি, যদি আত্মোর্জ্জনের শক্তিই হয়, তা হলেই নানা বিভিন্ন সম্প্রদায়ের বিভিন্ন জাতির উগ্র বিরোধের সমাধান করে এক বিরাট সভাকে সে গড়ে তুলতে পারবে।’
বাঙালির সাধনাকে তিনি ঐতিহাসিক নানাস্তরের ভাব ও বিরোধের মধ্যে স্থাপন করেছেন। তার মৌল দৃষ্টি সহায়ে দেখাবার চেষ্টা করেছেন বাঙালি জাতির সত্তার মধ্যেই নিহিত আছে এক সমন্বয় ধর্ম। যা স্থানিক নানা রূপসহ পূর্ণতার সাধনাই করেছে। যাকে মানবধর্ম বলা হয়েছে। প্রাচীন ভারতের উপনিষদের দর্শনে, পুরাণকাহিনীতে তা প্রবাহিত হয়েছিল। পরে ব্যক্তি প্রভায় বিস্তারিত হয়েছে, বুদ্ধের নিরীশ্বরবাদী নৈতিকতায়, প্রভু যীশুর প্রেমে, ইসলামের সাম্যে আর লোকায়ত বাউল ফকিরের মানবিক বোধে। এই মানবিকী বিদ্যাকে রাধাকৃষ্ণন বলেছেন-True humanism tells us that there is something more in man than is apparent in his ordinary consciousness, something which frames ideals and thoughts a finer spiritual presence, which makes him dissatisfied with more earthly pursuits.
মুরারিচাঁদ কলেজ বার্ষিকীতে কবির ভাষণ সম্পর্কে মন্তব্য করা হয় এভাবে-

Let us hope Rabi Babis speech will when the outlook of our students and in spire them to think noble thought. speak noble words and perform noble acts (Murarichand College Magazine 1919 voll-III, No. 2)


আকাক্সক্ষা
মুরারিচাঁদ কলেজের ছাত্রাবাসে মহাকবি ‘আকাক্সক্ষা’ বক্তৃতাটি দান করেন ২১ কার্তিক ১৩২৬। কবিপ্রণামে বলা হয়েছে ১৮ কার্তিক। সেটা সঠিক নয়। প্রায় চার হাজার শ্রোতার সামনে রবীন্দ্রনাথ ভাষণ উপস্থাপন করেন। ছাত্ররা শোভাযাত্রা সহকারে কবিকে হোস্টেলে নিয়ে যায়। তখন এম.সি. কলেজের অধ্যক্ষ ছিলেন জ্যোতির্বিজ্ঞানী ও গণিতবিদ অপূর্ব চন্দ্র দত্ত। ‘আকাক্সক্ষা’ নামের ভাষণটি ২১ কার্তিক ১৩২৬, ৭ নভেম্বর ১৯১৯ দুপুরে প্রদত্ত হয়। মহাকবি নিজেই বক্তৃতাটির ইংরেজি অনুবাদ করেন ‘Towards the future’ নামে। ১৯২০ সনের জুন মাসের ‘মডার্ণ রিভিয়্যু’ পত্রিকায় লেখাটি প্রকাশিত হয়। ‘শান্তিনিকেতন’ পত্রিকার পৌষ সংখ্যা ১৩২৬ বাংলায় আকাক্সক্ষা মুদ্রিত হয়।
রবীন্দ্রনাথ ‘আকাক্সক্ষা’ বক্তৃতাটি দেন মুরারিচাঁদ কলেজ ছাত্রাবাসে। তবে এখন মুরারিচাঁদ ছাত্রাবাস যেখানে আছে, তখন সেটি তৈরি হয়নি। ১৯১৯ সালে সিলেট শহরের চৌহাট্টা ও তেলিহাওরে দুটি পৃথক ছাত্রাবাস ছিল। ৮৬ জন হিন্দু ছাত্রের আবাসিক ব্যবস্থা ছিল চৌহাট্টার দুটি ব্লকে। ২১ জন মুসলিম ছাত্রের আবাসিক সুবিধা ছিল তেলিহাওর ব্লকে। ছাত্রাবাসের কাছেই ছিল হোস্টেল সুপারের বাসা। হিন্দু হোস্টেলের সুপার ছিলেন প্রফেসর সুরেশচন্দ্র সেনগুপ্ত (এস. সি. সেনগুপ্ত)। যিনি রবীন্দ্রনাথকে সিলেট আসার জন্যে টেলিগ্রাম করেছিলেন। তাঁর টেলিগ্রামের ভাষাটি ছিল খুব সুন্দর ও কাব্যগুণ-মণ্ডিত, নান্দনিক।

Sylhet desires India's greatest son to honour her by his visit.


এই তারবার্তাটি সম্পর্কে আমার কিছু ব্যক্তিগত সুখস্মৃতি আছে। সেটা নিবেদন করতে চাই, অনেকটা অপ্রাসঙ্গিক মনে হতে পারে কারো কাছে। তবু আমাকে বলতেই হবে। কারণ, সারস্বতচর্চায় যাঁরা মফস্বলবাসী, তাঁদেরকে কেউ সহায়তা করে না। যারা উচ্চ ডিগ্রিধারিণী ক্ষমতাধর, তারা অন্ত্যজ মনে করেন তাদেরকে। আজিজ স্যার যে ব্যতিক্রমিক চারিত্রের লোক সেটা জানানোই আমার উদ্দেশ্য। প্রফেসর মো. আবদুল আজিজ লিখিত মুরারিচাঁদ কলেজের ইতিকথা প্রথম সংস্করণ বের হয় সেপ্টেম্বর ১৯৯২ সালে। তিনি তখন কুমিল্লা শিক্ষাবোর্ডের চেয়ারম্যান। আমি তখন এই বোর্ডের একজন পরীক্ষক। স্যারকে অনুরোধ করেছিলাম এক কপি বই দিতে। এক সপ্তাহের মধ্যেই আমার শ্রীমঙ্গলের বাসায় রেজিঃ ডাকে চলে আসে বই। খুলে দেখি, ফেব্রুয়ারি ১৯৯২, সাহিত্য প্রকাশ, ঢাকা প্রকাশিত ‘শ্রীভূমি সিলেটে রবীন্দ্রনাথ’ বইটির উল্লেখ আছে। আমি যখন বইটি লিখি, তখন আজিজ স্যার মুরারিচাঁদ কলেজের অধ্যক্ষ। তথ্য সংগ্রহে কলেজে গেলে তিনি আমাকে আন্তরিকভাবে গ্রহণ করেন ও ১৯১৯ সালের মুরারিচাঁদ কলেজ ম্যাগাজিন দেখতে দেন। সেখানেই প্রথম আবিষ্কার করি সুরেশচন্দ্র সেনগুপ্তের টেলিগ্রামটি। আমার ‘শ্রীভূমি সিলেটে রবীন্দ্রনাথ’ (১৯৯২) বইটির সূচনাতেই স্থাপন করি এই সুখ্যাতি তারবার্তাকে।
প্রফেসর মজদ উদ্দিন আহমদ ছিলেন মুসলিম ছাত্রাবাস চৌহাট্টার সুপার । অধ্যক্ষ অপূর্ব চন্দ্র দত্ত চৌহাট্টায় থাকতেন। তিনি ছিলেন জ্যোতির্বিজ্ঞানী ‘আকাশে কথা নামে তার একটি গ্রন্থ প্রকাশিত হয়েছিল। এই চৌহাট্টা ছাত্রবাসেই ৭ নভেম্বর রবীন্দ্রনাথ আকাক্সক্ষা নামের খ্যাতকীর্তি ভাষণ দান করেছিলেন। মোহাম্মদ আবদুল্লাহ বিএল সাহেব তার ৬ নভেম্বরের ডায়রিতে লিখেছেন- ‘সভা শেষে জানানো হয় যে, কবি পরদিন (৭ নভেম্বর ১৯১৯) মুরারিচাঁদ কলেজ ছাত্রাবাসে (চৌহাট্টায়) ভাষণ দেবেন। তাই সরঞ্জামাদি সেখানে নেওয়ার ব্যবস্থা করি) (নবম খণ্ড)
বাঙালির সাধনা বক্তৃতাটি রবীন্দ্রনাথ মৌখিকভাবে দিয়েছিলেন। এবং উপেন্দ্র নারায়ণ সিংহ ও মনোরঞ্জন চৌধুরী অনুলেখন করেছিলেন এরকম তথ্যই প্রায় সুপ্রতিষ্ঠিত। সম্প্রতিকালে নতুনভাবে বিষয়টি ভাববার প্রেক্ষিত সৃষ্টি হয়েছে। কুলাউড়া থেকে প্রকাশিত রবীন্দ্রস্মারক ‘রবিরাগে’ ড. আবুল ফতেহ ফাত্তাহ একটি প্রবন্ধ লিখেছেন- মোহাম্মদ আব্দুল্লাহ বিএল-এর রোজনামচায় সিলেটে রবীন্দ্র সংবর্ধন' শিরোনামে ' তিনি দেখিয়েছেন মোহাম্মদ আব্দুল্লাগ বিএল ৬ নভেম্বরের তার ডায়রিতে বাঙালির সাধনা শীর্ষক ভাষণটি রবীন্দ্রনাথ লিখিতভাবে দিয়েছেন। ৬ নভেম্বরের আব্দুল্লাহ লিখিত রোজনামচায় ড. ফাত্তাহর বাংলা অনুবাদ নিম্নরূপ :
৬ নভেম্বর ১৯১৯, বৃহস্পতিবার
সকালে টাউন হল প্রাঙ্গণে যাই এবং প্যান্ডেলসহ বসার জায়গা ঠিকঠাক করি। রবিবাবু আসলেন। এবং একটি সঙ্গীত পরিবেশনের পর কবি একটি লিখিত বাংলা ভাষণ (বাঙালির সাধনা) উপস্থাপন করেন। মাননীয় সৈয়দ আবদুল মজিদ সাহেব উর্দুতে স্বাগত ভাষণ দেন। রবিবাবু এর জবাবে খুব উৎসাহ উদ্দীপনাপূর্ণ ভাষণ দেন। সকাল নয়টা নাগাদ সংবর্ধনা অনুষ্ঠান শেষ হয়।’
মূল ডায়েরিতে পরিষ্কার লেখা আছে-
‘.... an address was read in Bengali.’
শিলচর থেকে প্রকাশিত নগেন্দ্রচন্দ্র শ্যাম বি.এল, সম্পাদিত ‘ভবিষ্যৎ’ পত্রিকার ১ম বর্ষ, শেষ সংখ্যা, আশ্বিন, ১৩৩৪ বঙ্গাব্দ ‘আকাক্সক্ষা’ ভাষণটির একটি ভিন্ন পাঠ- ‘ছাত্রদের প্রতি রবীন্দ্রনাথের উপদেশ’ নামে প্রকাশিত হয় ভাষণটি প্রদানের সাত বছর পর। সেখানে বক্তৃতার তারিখ ভুল ছিল। ১৯১৯-১১ নভেম্বর সকাল ৮ টা। সৈয়দ মুর্তাজা আলী তার জীবন কথা- ‘আমাদের কালের কথা’ গ্রন্থে লিখেছেন তকালীন ছাত্র আবদুল্লাহ চৌধুরী, সৈয়দ মোস্তফা আলী, সৈয়দ মুর্তাজা। আলী ও সৈয়দ মুজতবা আলী ভাষণটি অনুলিখন করে ছিলেন। ‘কবি প্রণামে’ লেখা হয়েছে পাদটীকায় অনুলেখক হচ্ছেন উপেন্দ্রনারায়ণ চৌধুরী ও মনোরঞ্জন চৌধুরী। সব লেখন মিলিয়েই শুদ্ধ পাঠ তৈরি করা হয়।
নোটবুকের পত্রপুট মেলে ধরে মুষ্টিভিক্ষা করাকে রবীন্দ্রনাথ ধিক্কার দিয়েছেন। অর্থনীতিবিদ বিনায়ক সেন তাঁর ‘আকাক্সক্ষার দারিদ্র ও উন্নয়ন শতবর্ষ পূর্বে সিলেটে রবীন্দ্রনাথের ভাষণ-
প্রবন্ধে বলেছেন- ‘আকাক্সক্ষা প্রবন্ধে (ভাষণ) ইউরোপের উচ্চাকাক্ষা ও বৃহত্তর জ্ঞানান্বেষণের পেছনে ক্ষমতা লিপ্ততার অন্তর্লীন যোগাযোগ রবীন্দ্রনাথের চোখে বড় হয়ে দেখা দেয়নি।’ ‘কালান্তরে’ এসে ১৯৩৭ সালে তাঁর মনোভঙ্গির পরিবর্তন হয় বলে তিনি মন্তব্যকার হয়েছেন। লার্নিং ক্রাইসিস বা জানার সংকট বিষয়ে তিনি অর্থনীতিবিদ ল্যাল্ট প্রিচেটের ভাবনারও বিবরণ দিয়েছে।
আমরা মনে করি আকাক্সক্ষার দারিদ্রই মানুষের চরম দারিদ্র। রবীন্দ্রনাথ সেই দুঃখ হরণেরই গান গেয়েছেন।
‘আকাক্ষা’ বক্তৃতা শুনেই সৈয়দ মুজতবা আলী রবীন্দ্রনাথকে একটি চিঠি লেখেন এই প্রশ্ন করে- ‘কীভাবে আকাক্সক্ষাকে বড়ো করা যায়?’ উত্তরে রবীন্দ্রনাথ লিখেছিলেন, এত দূর থেকে বিষয়টি ব্যাখ্যা করা কঠিন। তবে এটুকু বলা যায় স্বার্থশূন্য হয়ে কাজ করে আকাক্সক্ষাকে বড়ো করা যায়। ১২ এই একটি বক্তৃতাই মুজতবা আলীর জীবনকে পাল্টে দেয়। তিনি বহুভাষাবিদ পণ্ডিত ও রবীন্দ্র পরিকররূপে খ্যাতকীর্তি ব্যক্তি হয়ে উঠেছিলেন আকাক্সক্ষাকে বড়ো করে। এই ভাষণ এক কালজয়ী প্রভাব ফেলে ছিল সিলেটের ব্যক্তি ও সমাজ জীবনে।
সূচনায় রবীন্দ্রনাথ বলেন, ‘এই যে ছাত্ররা এখানে আমাকে আহ্বান করেছে এটা আমার আনন্দের কথা। ছাত্রদের মধ্যে আমার আসন আমি সহজেই গ্রহণ করতে পারি। সে কিন্তু গুরুরূপে নয়, তাদের কাছে এসে, তাদের মধ্যে বসে’।
এই বক্তৃতার প্রারম্ভিক পর্বে তিনি বৃদ্ধদের সম্পর্কে বলেছেন- ‘বুড়োদের ওপর বাধা হুকুম রয়েছে জায়গা ছেড়ে দেবার মধ্যে।' ‘অসীমের তো জরা নেই তাই সৃষ্টিকে পেছনে বাঁধা পড়তে দিতে চান না রবীন্দ্রনাথ। বৃদ্ধ সেজে তিনি উপদেশ দিতে চান না কেবল নবীনদের কাছে আকাক্সক্ষার কথা বলতে এসেছেন। তিনি আমাদের দারিদ্রকে বলেছেন ‘আত্মারই দারিদ্র’। বিদ্যালয়ে ছাত্ররা ভর্তি হয়েছে ‘শিখব না আমরা পাশ করব। এ কথা বলেই আকাক্সক্ষাকে বড়ো করার কথা বলেছেন।
‘সারা পৃথিবীতে য়ূরোপ শিক্ষকতার ভার পেয়েছে গায়ের জোরে নয়। গায়ের জোরে শুরু হওয়া যায় না। ইউরোপের মানুষ বিপুল আকাক্সক্ষাকে নিয়তই নানা ক্ষেত্রে প্রকাশ করছে এবং জয়ী হয়েছে। রবীন্দ্রনাথ এ জন্যেই আকাক্সক্ষাকে বড় করার কথা বলেছেন।’
‘আকাক্সক্ষা’ ভাষণটিতে রবীন্দ্রনাথ উপনিষদ থেকে চারটি বাণী উঙ্কলন করেছেন। এ বিষয়ে বিস্তৃত তথ্য পাওয়া যাবে সিলেটেরই সুসন্তান সুখময় সপ্ততীর্থ রচিত সংস্কৃত অনুশীলনে রবীন্দ্রনাথ' গ্রন্থে। কল্যাণী শঙ্কর ঘটকের ‘রবীন্দ্রনাথ ও সংস্কৃত সাহিত্য’ গ্রন্থে তথ্যনিষ্ট আলোচনা আছে শম্পা মজুমদারের ‘রবীন্দ্র সংস্কৃতির ভারতী রূপও উৎস’ (১৯৭২) গ্রন্থে।
‘আত্মানং বিদ্ধি’ মানে আত্মাকে জানো। ছাত্রদের সামনে তার এই চরম উপদ

শেয়ার করুন

Developed by:Sparkle IT