উপ সম্পাদকীয়

দেশের আদালতে মামলার পাহাড়

ইসহাক খান প্রকাশিত হয়েছে: ১৩-০১-২০২০ ইং ০০:৩৯:৫৫ | সংবাদটি ১২১ বার পঠিত

দেশের আদালতে মামলার পাহাড়। প্রায় ৩৭ লাখ মামলা নিয়ে হিমশিম খাচ্ছে বিচার বিভাগ। মামলাজট কমাতে নেওয়া হয়েছে নানা উদ্যোগ। কিন্তু কোনো উদ্যোগেই মামলার জট কমছে না। দিন দিন আরো বৃদ্ধি পাচ্ছে। বেশির ভাগ বিচারাধীন মামলায় সাক্ষী হাজির হয় না। রাষ্ট্রপক্ষ আদালতে সাক্ষী হাজির করতে ব্যর্থ হচ্ছে। এই কারণে ন্যায়বিচার লঙ্ঘিত হচ্ছে। খালাস পেয়ে যাচ্ছে সন্ত্রাসীরা। সাক্ষী হাজির না হওয়ার অন্যতম কারণ তাঁদের নিরাপত্তাহীনতা। সংক্ষুব্ধ পক্ষের হামলায় সাক্ষী নিহত হওয়ার ঘটনা অনেক। তাঁদের নিরাপত্তায় আইন করার অনেক সুপারিশ আলোচনায় এসে ফাইলবন্দি হয়ে পড়ে আছে।
আদালতের বিভিন্ন মামলার হিসাব অনুযায়ী বেশির ভাগ আসামি মামলায় খালাস পেয়ে যায়। আর এই খালাস হওয়ার বড় কারণ সাক্ষীদের আদালতে হাজির না হওয়া।
এর কারণ অনুসন্ধানে জানা গেছে, সাক্ষীদের নিরাপত্তা নেই। সাক্ষীদের কোনো যাতায়াত ভাতাও দেওয়া হয় না। কিছু সাক্ষী হাজির হন বাদীর ঘনিষ্ঠতার কারণে। কিন্তু তাঁদের সাক্ষ্য আদালতে গ্রহণযোগ্য হয় না বাদীর সঙ্গে সংশ্লিষ্টতার কারণে। মামলার তারিখ পড়তে পড়তে প্রকৃত সাক্ষীরাও ক্লান্ত হয়ে পড়েন। একসময় তাঁরাও সাক্ষ্য দিতে আগ্রহ হারিয়ে ফেলেন। আর নিরপেক্ষ সাক্ষীরা আদালতে হাজির হলে তাঁদের কোনো বেনিফিট থাকে না। এক দিনের শ্রম নষ্ট। যাতায়াত বাবদ খরচ, দুপুরের খাওয়ার খরচ এবং ভোগান্তির বিষয়টি মাথায় রেখে সাক্ষীরা আদালতে যেতে চান না। অন্যদিকে আসল ঘটনা হলো, সাক্ষীদের হাজির করতে বাদী এবং আসামি উভয়কেই নিজের গাঁটের পয়সা খরচ করতে হয়। এভাবে বছরের পর বছর বিচার চলায় একসময় মামলার ঘানি টানতে টানতে বিচারপ্রার্থীরা নিঃস্ব হয়ে যান।
আমি ছোটবেলায় দেখেছি, আমাদের পরিবারে একটি মামলা ছিল। চার বিঘার একটি আমবাগান নিয়ে মামলা। ১৯৬৫ সালে ভারত-পাকিস্তান যুদ্ধের পর নিরাপত্তার অভাবে এ দেশ থেকে দলে দলে হিন্দুরা ভারতে চলে যায়। আমাদের গ্রাম থেকে অনেক হিন্দু সম্প্রদায়ের লোক গ্রাম ছেড়ে চলে যায়। উমেশচন্দ্র ম-ল নামের একজন নমঃশূদ্র তাঁর আমবাগানের ভিটা দুজনের কাছে বিক্রি করে দেশ ছেড়ে চলে যান। কে জমির প্রকৃত মালিক, কে আগে কিনেছেন, তা নিয়ে আদালতে মামলা শুরু হয়। ১৯৬৫ সালে সেই মামলা শুরু। আমি তখন প্রাইমারি স্কুলের ছাত্র। আমি যখন হাই স্কুলের ছাত্র তখনো সেই মামলা চলছে। কলেজে উঠার পরও মামলা চলছিল। আমি সেই সময় মামলার গতি-প্রকৃতি বোঝার জন্য বড় ভাইয়ের সঙ্গে আদালতে যেতাম। বড় ভাই ছিলেন ওই মামলার আসামি। তাঁর নামেই ভিটা কেনা হয়েছিল। আমি প্রায়ই অবাক হতাম সব কিছু ঠিকঠাক থাকার পরও সাধারণ কারণে মামলার নতুন তারিখ দিয়ে দিতেন বিচারক। ভাবখানা এমন, যেন তিনি মামলা পরিচালনা করতে করতে বিরক্ত।
এক দিন সব কিছু ঠিকঠাক, সেদিন মামলার শুনানি হবে। আমি প্রচ- কৌতূহল নিয়ে বিচারকক্ষের বেঞ্চে বসে আছি। আমাদের পক্ষের দুজন সাক্ষী তাঁরাও প্রস্তুত। আমাদের পক্ষের উকিল দাঁড়িয়ে সবে কথা বলা শুরু করেছেন, সেই সময় বাদীপক্ষের উকিল তারিখ চেয়ে আবেদন করলেন। বিচারক সঙ্গে সঙ্গে নতুন তারিখ দিয়ে মামলার ফাইল সরিয়ে রাখলেন। আমি ভাইয়ের মুখের দিকে তাকিয়ে চমকে উঠলাম। ভাইয়ের চেহারায় হতাশার নিকষ অন্ধকার। পারলে আদালতের ভেতরেই তিনি কেঁদে ফেলেন।
সেই থেকে তিনি চুপ। সাক্ষীদের হোটেলে নিয়ে খাওয়াতে বসলেন। সাক্ষী এবং আমরা খাচ্ছি, বড় ভাই কিছুই খাচ্ছেন না। কারো সঙ্গে কথাও বলছেন না। স্তব্ধ হয়ে গেছেন যেন।
সেই মামলাটি দীর্ঘ ১৫ বছর চলার পর আমরা জয়লাভ করি। পরে বাদীপক্ষ জজকোর্টে আপিল করে। আপিলে তিনি জিতে যান। সমাপ্তি হয় দীর্ঘ ১৫ বছরের লড়াই।
অনেক পরে আমি বাবাকে জিজ্ঞেস করেছিলাম, বাবা, উমেশের ভিটার মামলায় আমাদের কত খরচ হয়েছিল?
বাবা জবাবে বললেন, ‘খরচ তো হিসাব করে রাখিনি।’
আমি বলি, ধারণা করে বলেন।
বাবা দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলেন, ‘মামলায় যে টাকা খরচ হয়েছে, সেই টাকা দিয়ে ওরকম ১০টা ভিটে কিনতে পারতাম।’
বাবার মুখে এই কথা শুনে আমি চমকে উঠি। বলে কী! সামান্য চার বিঘা জমির জন্য দীর্ঘ ১৫ বছর মামলা করার খরচ নাকি ওরকম ১০টি ভিটা কেনা যেত।
তাহলে অযথা মামলা করতে গেলেন কেন? আমার প্রশ্নে বাবা অনেকক্ষণ মৌন থেকে তারপর বললেন, ‘জেদের পরিণাম। ওই জমি নিয়ে আমার নিজের একজন লোক আমার সঙ্গে বেইমানি করেছিল। সেই রাগ আমার সহ্য হয়নি।’
বাবার মনের অবস্থা বুঝে আমি আর তাঁকে বিব্রত করিনি। কিন্তু তাঁর জেদের কারণে কতটা মূল্য দিতে হয়েছে, সেটা ভাবলে নিঃশ্বাস বন্ধ হয়ে আসে।
এই যদি বিচারপ্রার্থীর বিচার পাওয়ার নমুনা হয়, তাহলে বিচারপ্রার্থীর নিঃস্ব হতে সময় লাগার কথা নয়। বোম্বের একটি হিন্দি সিনেমা দেখেছিলাম, ‘দামিনী’। দামিনীকে নিয়ে মামলা। সেই মামলায় শেষ শুনানির দিন বিরোধীপক্ষের উকিল অসুস্থতার অভিনয় করে তারিখের প্রার্থনা করলে বিচারক প্রার্থনা মঞ্জুর করেন। তখন দামিনীর উকিল কিছু সংলাপ বলেন, যা ছিল ওই সিনেমার উল্লেখযোগ্য অংশ। দামিনীর উকিল বলেন, ‘মহামান্য আদালত, বিচারপ্রার্থীরা ন্যায়বিচারের আশায় আদালতের শরণাপন্ন হন। কিন্তু তাঁরা দিনের পর দিন ঘুরে ঘুরে আদালতের কাছে কী পান, তারিখ পান। তাঁরা জায়গাজমি বিক্রি করে আদালতে আসেন ন্যায়বিচারের আশায়; কিন্তু তাঁরা কী পান, তারিখ পান, ¯্রফে তারিখ।’
গ্রামে একটি অভিশাপ প্রচলিত আছে। লোকজন অভিশাপ দিয়ে বলে, ‘তোর ঘরে যেন মামলা ঢোকে।’ কারণ তারাও জানে মামলা ঢুকলে সেই মামলা সহজে সমাপ্ত হবে না। মামলার কারণে তারা ফকির হয়ে যাবে। কাউকে অভিশাপ হিসেবে মামলা ঢোকার কথা বলা হয়। অথচ মামলা হলো ন্যায়বিচার প্রর্থনা করা। কিন্তু বাস্তবে ঘটে উল্টো। মামলার তারিখ ফেলতে আইনজীবীদেরও হাত থাকে বলে অনেকেই রসিকতা করে বলে থাকে। মামলার তারিখ পড়লে কার্যত উকিলদেরই বেশি লাভ। মক্কেলকে আবার তাঁর কাছে আসতে হবে, ফি দিতে হবে। বাড়তি লাভ। তাঁরাও চান মামলা দীর্ঘ হতে থাক।
আরেক খবরে জানা গেছে, তিন হাজার ৫০০ দুর্নীতির মামলা ঝুলে আছে। ঢেলে সাজানো হয়েছে দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক)। দুর্নীতির মামলা পরিচালনার জন্য আলাদা স্থায়ী প্রসিকিউশন টিম গঠন করার সিদ্ধান্ত হয়েছে। কিন্তু এখনো নিজস্ব প্রসিকিউটর নিযুক্ত হয়নি। সুনির্দিষ্ট অভিযোগের ভিত্তিতে অনুসন্ধান ও তদন্ত করা হলেও দুদকের মামলায় শতভাগ শাস্তি আওতায় আনা যায়নি। তদন্ত, অনুসন্ধান ও বিচারে এখানেও দীর্ঘসূত্রতা বিরাজমান।
এই যদি হয় বিচারব্যবস্থা, তাহলে সমাজ থেকে দুর্নীতি দূর হবে কিভাবে?
বিচারের দীর্ঘসূত্রতার কারণে মানুষ আইন হাতে তুলে নেয়। নিকট অতীতেও এমন অজ¯্র প্রমাণ রয়েছে।
আরেকটি ভয়াবহ খবর হলো, আদালত সংকটে হাইকোর্টে জমছে ফাঁসির মামলা। মৃত্যুদ- পাওয়া আসামিদের জন্য পাঠানো ‘ডেথ রেফারেন্স’-এর জট বেড়েই চলেছে। বর্তমানে সাত শতাধিক ‘ডেথ রেফারেন্স’ মামলা হাইকোর্টে বিচারাধীন।
ভাবুন অবস্থা। যদি এর মধ্যে মিথ্যা মামলায় যার ফাঁসির দ- হয়েছে তার পরিণতির কথা একবার ভাবুন। আমার একজন নিকট আত্মীয়র ফৌজদারি কোর্টে খুনের মামলায় মৃত্যুদ- হয়। তারপর শুরু হয় অবর্ণনীয় কষ্ট। একে তো সারাক্ষণ মৃত্যুভাবনা, তার ওপর রয়েছে নিঃসঙ্গতার যন্ত্রণা। একটা খুপরি সেলে তাঁকে একা বাস করতে হয়। কারো সঙ্গে দেখা করার সুযোগ মেলে না। সেলেই থাকা, সেলেই গোসল, সেলেই খাওয়া, সেলেই ঘুমানো। ২০০৩ সালের আগস্ট মাসে তাঁর ফৌজদারি কোর্টে মৃত্যুদ- হয় আর তিনি ২০০৭ সালে খালাস পান। তাঁর জীবন থেকে যে পাঁচটি মূল্যবান বছর কেড়ে নেওয়া হলো, এর জবাব কে দেবে? সেই সঙ্গে তাঁর মৃত্যুযন্ত্রণা। সেই নিদারুণ কষ্টের দায় কার?
লেখক : মুক্তিযোদ্ধা।

শেয়ার করুন

ফেসবুকে সিলেটের ডাক

উপ সম্পাদকীয় এর আরো সংবাদ
  • ক্যাস্পিয়ান সাগরের ভূ-কৌশলগত গুরুত্ব
  • নিজগৃহে আমাদের এই উদ্বাস্তু জীবন
  • বেকারত্ব ও যুবসমাজ
  • আমার হাতেই আমার সুরক্ষা
  • কুড়িগ্রামের সুলতানা সরেবোর
  • স্মার্টফোনের আনস্মার্ট ব্যবহার
  • কোয়ারেন্টাইন না বলে ঘরবন্দি, একঘরে, ছোঁয়াচে বলুন
  • বিশ্বের স্বাধীনতাকামী মানুষের বন্ধু
  • করোনা ভাইরাস ও করুণ পরিস্থিতি
  • পানির অপচয় রোধ করতেই হবে
  • বিশ্বনবী (সা) এর মিরাজ
  • বিদ্যুৎসাশ্রয় এবং আমাদের করণীয়
  • বেঁচে থাকি প্রাণশক্তির জোরে
  • রক্ত দিন জীবন বাঁচান
  • নদীকে না দেখলে নদীও আমাদের দেখবে না
  • করোনা ভাইরাসে থমকে গেল পৃথিবী
  • করোনা ভাইরাসে আমাদের করণীয়
  • বঙ্গবন্ধুর মানবিক বাংলাদেশের স্বপ্ন
  • বঙ্গবন্ধু ও আমাদের শিশুরা
  • করোনা ভাইরাস ও দেশের অর্থনীতি
  • Developed by: Sparkle IT