স্বাস্থ্য কুশল

শিশুর খাবার

এম. লোকমান হেকিম প্রকাশিত হয়েছে: ১৩-০১-২০২০ ইং ০০:৪৩:১৬ | সংবাদটি ৫৯ বার পঠিত

শিশু জন্মগ্রহণ করার পর তার প্রথম খাবার হলো মায়ের বুকের দুধ। পুষ্টির দিক থেকে মায়ের দুধ সবচেয়ে পুষ্টিকর। শিশুর পুষ্টি, দৈহিক ও মানসিক বিকাশ নির্ভর করে সঠিক পরিমাণ ও পুষ্টিগুণসম্পন্ন খাবার গ্রহণের ওপর। জন্মের পর থেকে প্রথম দুই বছর শিশুর বেড়ে ওঠা, বিশেষ করে মেধা ও শারীরিক বৃদ্ধিতে খাদ্য গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। সঠিক মাত্রায় প্রয়োজনীয় খাদ্য উপকরণ সমৃদ্ধ খাবার নির্বাচন মা এবং পরিচর্যাকারীর কাছে অত্যন্ত জটিল বিষয়। সাধারণভাবে খিচুড়ি, চালের সুজি, কমলা, বেদানা এবং বাজারে প্রচলিত শিশুখাদ্য খাবার হিসেবে ব্যবহৃত হয়। কিন্তু প্রকৃতপক্ষে শিশুকে কী খাবার দিতে হবে, কতটুকু পরিমাণে দিতে হবে অথবা কোনো খাদ্য শিশুর মানসিক ও দৈহিক গঠনে সাহায্য করে সে সংক্রান্ত ধারণা আমাদের সমাজে খুব বেশি প্রচলিত নয়।
আমরা শিশুর খাবারের ব্যাপারে শারীরিক বৃদ্ধি ও ওজন বৃদ্ধিকেই প্রাধান্য দিয়ে থাকি যা শিশুর সুস্বাস্থ্যের জন্য কাম্য নয়। এমনকি জন্মের আগে মাতৃগর্ভে থাকাকালীন শিশুর সঠিক বৃদ্ধির জন্য মায়ের উপযুক্ত খাদ্যতালিকাও অনেক ক্ষেত্রে উপেক্ষিত হয়। মাতৃগর্ভে শিশুর মগজ তৈরি শুরু হয়, যা পরবর্তী তিন বছর পর্যন্ত আকারে ও কর্মদক্ষতায় পূর্ণতা লাভ করে। এই মগজই পরবর্তীকালে শিশুর বিকাশ ও মেধার পরিচয় বহন করে। সুতরাং শিশুর খাদ্যগ্রহণ শুরু হয় মাতৃগর্ভে থাকালীন মায়ের সঠিক পরিমাণ খাবারের ওপর। এ কারণে গর্ভাবস্থায় মাকে পুষ্টিকর এবং চাহিদার অতিরিক্ত খাবার দিতে হবে। বিশেষ করে ক্যালসিয়াম, আয়রন এবং প্রোটিনযুক্ত খাবার মাকে গ্রহণ করতে হবে, যা মায়ের শরীরের চাহিদা পূরণ করে গর্ভের সন্তানেরও চাহিদা পূরণে সহায়তা করতে পারে। জন্মের পর প্রথম ছয় মাস শিশুর আদর্শ খাবার মায়ের দুধ, অনেক কর্মজীবী মা বাইরে থাকার কারণে মাতৃদুগ্ধ কম হয় বলে অভিযোগ করেন। কিন্তু মাতৃদুগ্ধই শিশুর জন্য আদর্শ এবং উপযুক্ত খাবার। মাতুদুগ্ধে যেমন শিশুর বেড়ে ওঠার জন্য কার্বোহাইড্রেট, প্রোটিন, ফ্যাট রয়েছে তেমনি শিশুর রোগ প্রতিরোধের জন্য প্রয়োজনীয় উপাদান রয়েছে যা শিশুর ঠান্ডাজনিত রোগ নিউমোনিয়া, ডায়রিয়া ইত্যাদি প্রতিরোধ করে এবং শিশুকে সুস্থ রাখতে সহায়তা করে। এক্ষেত্রে কর্মজীবী মায়েরা দুধ পান করানোর সময় অপর স্তন হতে দুধ গেলে রাখতে পারেন। এ দুধ ৬ ঘন্টা সময় পর্যন্ত ঘরের তাপমাত্রায় এবং ফ্রিজে রাখলে ২৪ ঘন্টা ব্যবহার করতে পারবেন। তবে খেয়াল রাখতে হবে এই গেলে রাখা দুধ কখনোই চুলায় ফুটানো যাবে না। শুধু পাত্রে নিয়ে পাত্রটি গরম পানিতে ডুবিয়ে গরম করা যাবে এবং চামচ বাটিতে খাওয়াতে হবে।
মায়ের দুধ বাড়ানোর পদ্ধতি- *স্তন খালি করে দুধ খাওয়াতে হবে। *প্রথমবার যে স্তন হতে দুধ খাওয়াবেন, পরের বার অপর স্তন হতে খাওয়াবেন। *অন্য কোনো খাবার এমনকি বাড়তি দুধ ও পানি পর্যন্ত দেয়া যাবে না। *প্রতিবার খাওয়ানোর আগে মাকে অবশ্যই কিছু খাবার খেয়ে নিতে হবে। এতে দুধের পরিমাণ বৃদ্ধি পাবে। *মা সব রকম খাবার খেতে পারবেন। কালোজিরা, লাউ, মাছ ইত্যাদি খাবার তালিকায় থাকা ভালো। *মাকে প্রতিবেলায় খাবারের সাথে এক মুঠ খাবার বেশি খেতে হবে।
কিভাবে বুঝবেন শিশু যথেষ্ট পরিমাণ দুধ পাচ্ছে- *শিশু দিনরাত ২৪ ঘন্টায় (সকাল ৮টা থেকে পরদিন সকাল ৮টা পর্যন্ত) কমপক্ষে ছয়বার প্রস্রাব করে।* শিশু সঠিক মাত্রায় ঘুমায় ও খেলাধুলা করে। *সঠিক মাত্রায় শিশুর ওজন বাড়তে থাকে। শিশুর জন্মের পর প্রথম ৭-১০ দিন স্বাভাবিক নিয়মেই ওজন কমবে এবং এরপর হতে ওজন ধীরে ধীরে বাড়তে থাকবে। শিশুর অতিরিক্ত কান্নাকাটি সব সময় ক্ষুধার কারণে নাও হতে পারে। কান্নার সঠিক কারণ বের করা জরুরি। শিশুকে কমপক্ষে ২-৩ ঘন্টা পর পর মায়ের দুধ দেয়া ভালো। এতে শিশুর খাবার চাহিদা সঠিক মাত্রায় পূরণ হয়। ৬ মাস পর থেকে শিশুকে মাতৃদুগ্ধের পাশাপাশি বাড়তি খাবার দিতে হবে। তবে বাড়তি খাবারের পরিমাণ ধীরে ধীরে বাড়াতে হবে এবং একের পর এক খাবার সাত দিন অন্তর অন্তর খাদ্য তালিকায় যোগ করতে হবে। এতে শিশুর কোন খাবারে সমস্যা হয় তা বোঝা যায়। সেই খাবার সাময়িকভাবে খাবার তালিকা থেকে বাদ দেয়া যায়।
৬ থেকে ৮ মাস বয়সী শিশুর খাবার-* ঘরে রান্না করা চটকানো ভাত, ডাল, আলুসিদ্ধ। *মাছ, ডিম, মুরগির গোশত, শাক, যে কোনো প্রকার সবজি যেমন- পেপে, পটোল, গাজর ইত্যাদি। *যেকোনো ফল, যেমন- কলা, পেপে, ইত্যাদি দিনে একবার। *শক্ত খাবার এক পোয়া বাটির অর্ধেক করে দিনে দু’বার এবং হালুয়া বা ফলজাতীয় খাবার দিনে একবার দেয়া যাবে।
৯ মাস থেকে ১১ মাস বয়সী শিশুর খাবার- *এ সময় শিশুর খাবার পে¬ট অথবা বাটিসহ সবার সাথে খেতে দিতে হবে। *ডাল-ভাত, খিচুড়ি, ডিম, তেলে ভাজা খাবার ইত্যাদি দিনে ৩ বার এবং ফল দিনে ১ বার দিতে হবে।
১২ মাস থেকে ২ বছর বয়সী শিশুর খাবার- *শিশুকে নিজের হাতে খেতে দিতে হবে। বাকি খাবার ফাঁকে ফাঁকে শিশুর মুখে দিয়ে দিতে হবে। তবে কখনোই জোর করে শিশুকে খাওয়ানো যাবে না। *এ বয়সে শিশুকে তিনবার শক্ত খাবার, যা পরিবারের সকলে খেতে পারে এমন খাবার দিনে তিন-চারবার এবং নাশতা দু’বার (সকল ১০-১১টা এবং বিকেল ৪-৫ টা) দিতে হবে। নাশতা ফল বা হালুয়াজাতীয় খাবার অথবা শিশুর পছন্দ অনুযায়ী যেকোনো খাবার হতে পারে। কিন্তু কখনোই বাজারের জুস, পানীয়, চকলেট, চিপস জাতীয় খাবার দেয়া যাবে না। বিভিন্ন ধরনের খাবার ভিন্ন ভিন্ন উপস্থাপনায় শিশুকে খাবার দিতে হবে। রঙিন ও সাজানো পরিবেশনায় শিশু আকৃষ্ট হয়। একঘোয়েমি খাবার শিশুর মনে খবারের প্রতি বিরক্তির উদ্রেক করে। জোর করে খাওয়ালে শিশুর মনে ভয়ের জন্ম নেয় যা খাবারে অনীহা সৃষ্টি করে এবং খাবার দেখলেই পালিয়ে যাওয়ার প্রবণতা তৈরি করে। শিশুকে উৎসাহ দিয়ে এবং ধৈর্য ধরে খাওয়াতে হবে। তার পছন্দ অনুযায়ী খাবার দিতে হবে। অবশ্যই মনে রাখতে হবে সুস্থ শরীরের জন্য চাই সঠিক যতœ এবং খাবার যে খাওয়াবেন, খাবার প্রস্তুত করবেন ও শিশুর হাত অবশ্যই সাবান দিয়ে পরিষ্কার করবেন। ’সঠিক পুষ্টি সুস্থ শিশু’।

শেয়ার করুন
স্বাস্থ্য কুশল এর আরো সংবাদ
  • ঠান্ডায় নাক বন্ধ হলে করণীয়
  • শশার গুণাগুণ
  • রোগ প্রতিরোধে কমলা
  • শিশুর খাবার
  • ডা. এ হাসনাত শাহীন অসুস্থ শিশুর যত্ন নিচ্ছেন মা
  • শীতে যেসব রোগের প্রকোপ বাড়ে
  • শীতকালে নাক, কান ও গলার সমস্যা
  • অ্যান্টিবায়োটিক এক অদৃশ্য ‘মহামারি’র নাম
  • তাফসিরুল কোরআন
  • ইসলামের চতুর্থ খলিফা হজরত আলী (রা.)
  • আল্লামা তাহির আলী তহিপুরী (র.)
  • মানবাধিকার প্রতিষ্ঠায় মহানবী (সা.) -এর ভূমিকা
  • টেস্টিং সল্ট: মানবদেহের নীরব ঘাতক
  • ফুলকপির যত গুণ
  • স্বাস্থ্যকর ঘুমের নিয়মকানুন
  • নাক কান গলার ক্যান্সার
  • শীতের শুরুতে...
  • আপনার শিশুর বেড়ে ওঠা
  • সাধারণ রোগেই আমরা ভীত হয়ে যাচ্ছি কেন?
  • গর্ভকালীন কিছু কমন সমস্যা ও করণীয়
  • Developed by: Sparkle IT