মহিলা সমাজ

কর্মজীবী মা

সৈয়দা মানছুরা হাছান (মিরা) প্রকাশিত হয়েছে: ১৪-০১-২০২০ ইং ০০:১০:১৬ | সংবাদটি ৮৭ বার পঠিত

শিশুর জন্মের পর থেকেই যিনি সার্বিক তত্ত্বাবধান করেন, তিনিই হলেন মা। মা এমন এক আপন মানুষের নাম যার সাথে জড়িয়ে আছে সন্তানের যাবতীয় চাওয়া পাওয়া। সন্তানকে জন্ম দানের পর শিশু বয়সে আগলে রাখেন, তারপর সে যখন ধীরে ধীরে বড় হতে থাকে তখন তার পড়ালেখার দেখ ভালও করেন মা। শৈশবে একটি শিশু ন্যায়-অন্যায়, ভাল-মন্দ, আপন-পর এসব বুঝতে পারে না। মা তাকে সবকিছুর ধারণা দিয়ে থাকেন একটু একটু করে। একটি শিশু সবসময় মায়ের আশেপাশে থাকে, এতে সে ভরসা পায়। একটু ভয় পেলেই মায়ের কাছে দৌড়ে আসে। মা তাকে পরম মমতায় কোলে তুলে নেন। এই যে মায়ের সাথে শিশুর মমতার বন্ধন, এটা অবিচ্ছেদ্য। এই বন্ধন শিশুর জন্মের সাথে সাথেই স্থাপিত হয়। মায়ের কাছে শিশুর বায়নার শেষ নেই। এক কথায় মা-কে সে সার্বক্ষণিক কাছে পায়। এতে করে স্বাভাবিকভাবেই একটা ভরসার ব্যাপার চলে আসে।
এখন আসি কর্মজীবী মাদের কথায়। খুব ভোরে মোবাইলের অ্যালার্মের ডাকে ঘুম ভাঙে মায়ের। ঘুম থেকে উঠেই শুরু হয়ে যায় ব্যস্ততা। অফিসে যাওয়ার জন্য নিজের প্রস্তুতি তো রয়েছেই, সঙ্গে রয়েছে সন্তানের সারাদিনের প্রয়োজনীয় জিনিসপত্র গুছানো। নিজের ক্যারিয়ার, অফিসের ব্যস্ততা থাকলেও সন্তানের যত্নআত্তির ব্যাপারে এতটুকুও ছাড় দিতে রাজি নয় মা। কিন্তু এখনও বাংলাদেশের অনেক অফিসে কর্মজীবী মায়ের সন্তানের জন্য ডে কেয়ার সেন্টার নেই। অনেক অফিস এখনও সবেতনে মাতৃত্বকালীন ছুটি ও অন্যান্য সুযোগ সুবিধা দিতে গড়িমসি করে। মা হওয়া এখন হুমকির মুখে, মা এবং সন্তান উভয়ের জন্য। সরকারের রাজস্ব বাজেটের আওতায় ঢাকা শহরে ৭টি এবং ঢাকার বাইরে বিভাগীয় শহর রাজশাহী, চট্টগ্রাম, সিলেট, বরিশাল, খুলনাসহ মোট ১২টি ডে-কেয়ার সেন্টার নিম্নবিত্ত শ্রেণির কর্মজীবী শ্রমজীবী মহিলাদের শিশুদের জন্য পরিচালিত হচ্ছে। এর বাইরে মধ্যবিত্ত শ্রেণির কর্মজীবী নারীদের জন্য ঢাকায় ৬টি ডে-কেয়ার সেন্টার মহিলা বিষয়ক অধিদপ্তরের আওতায় পরিচালিত হচ্ছে। কিন্তু এসব ডে কেয়ার সেন্টার সর্বস্তরের কর্মজীবী নারীদের চাহিদা পূরণ করতে সক্ষম হচ্ছে না। এ কারণে শিশু সন্তান ও কর্মস্থল নিয়ে অনেককেই উভয় সংকটের মুখোমুখি হতে হচ্ছে। সন্তান জন্মের পর প্রথম ৬ মাস শিশুর সুষ্ঠুভাবে বেড়ে ওঠার জন্য শিশুকে মায়ের বুকের দুধ খাওয়ানোর কথা। কিন্তু অনেক কর্মজীবী মায়েরা এ সুযোগ পাচ্ছেন না। ‘কর্মজীবী নারীর’ উপর পরিচালিত এক জরিপে দেখা যায়, ৫১ দশমিক ৩৫ ভাগ অফিস বা কারখানায় ডে-কেয়ার সেন্টারের অস্তিত্ব নেই।
গত বছর প্রকাশিত বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিবিএস) সর্বশেষ শ্রমশক্তি জরিপ ২০১৬-১৭ প্রতিবেদন বলছে দেশের শ্রমশক্তিতে থাকা সম্ভাবনাময় সাড়ে ৩৪ লক্ষ নারীকে কাজে লাগানো যাচ্ছে না (সূত্র: প্রথম আলো, সুযোগ সংকটে হারাচ্ছে সম্ভাবনা, ২৯শে এপ্রিল ২০১৯ইং)। এই নারীদের অনেকে সংসারের ঝক্কিঝামেলায় চাকরি করতে পারছেন না। সংসার, সন্তান, চাকরি সবকিছুর সঙ্গে ভারসাম্য রক্ষা করতে তাই মায়েদের জন্য দরকার অনুকূল পরিবেশ। সন্তানকে ভালো মানুষ হিসেবে গড়ে তোলার হাজারও দায়িত্ব কেবল মায়ের কাঁধে তুলে দিলে হবে না। পরিবার, সমাজ ও রাষ্ট্র এক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করতে পারে।
অতিরিক্ত কাজের চাপ, দ্বন্দ্ব, হতাশা যেকোনো মানুষের মানসিক স্বাস্থ্যের জন্যই ক্ষতিকর। এর প্রভাবে সাধারণত মনোযোগের অভাব, খিটখিটে মেজাজ, অন্যের সাথে খারাপ ব্যবহার ইত্যাদি নেতিবাচক আচরণ দেখা যায়। আর এগুলো মানুষের স্বাভাবিক কার্যক্রমকে ব্যাহত করে। অনেক সময় ভুল বুঝাবুঝির সৃষ্টি হয়, সম্পর্কে ফাটল ধরে।
একটা সময় ছিলো যখন বাড়ির পুরুষরা শুধুই বাইরের কাজ করতেন, আর নারীরা শুধুই বাড়ির কাজ করতেন। কিন্তু বর্তমান চিত্রটা অনেকটাই বদলেছে। জীবনমান উন্নয়নের তাগিদে পুরুষের পাশাপাশি নারীরাও অংশীদার হচ্ছেন সংসারের ব্যয় নির্বাহে। বর্তমানে নারী পুরুষ উভয়েই সমানভাবে ঘরে বাইরের কাজে অবদান রাখছেন। এতে করে নারীরা যেমন স্বাবলম্বী হচ্ছেন, তেমনি পরিবারের স্বচ্ছলতায়ও হচ্ছেন অংশীদার। মুদ্রার উল্টো পিঠেই আছে সমস্যা, প্রধানত সন্তান লালন পালনে। শিল্পায়ন ও নগরায়নের ফলে যৌথ পরিবারগুলো অনেক আগে থেকেই একক পরিবারে রূপান্তরিত হতে শুরু করে। এক্ষেত্রে শিশুদের লালন-পালনে নানান অসুবিধায় পড়তে হয় কর্মজীবী মায়েদের। শিশুদের নিরাপত্তা নিয়ে চাকরিজীবী মা-বাবা খুবই দুশ্চিন্তায় থাকেন। শিশুর খাওয়া থেকে শুরু করে সার্বিক নিরাপত্তা নিয়ে মা বাবাকে সর্বক্ষণ উদ্বিগ্ন থাকতে হয়। কেননা বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই শিশুটিকে গৃহপরিচারিকার কাছে রেখে যেতে হয়। তবে পরিবারের সদস্য ভিন্ন অন্য কারো কাছে বাচ্চা থাকলে তাকে অন্ধভাবে বিশ্বাস করবে না। সে আপনার বাচ্চার সঠিক যত্ন নিচ্ছে কি-না তা যাচাই করুন। মাঝে মাঝে সময়ের আগে বাড়ি ফিরতে পারেন। তবে তার সাথে কখনও খারাপ ব্যবহার করবেন না। তাকে আপনার সন্তানের বন্ধু হতে সাহায্য করুন।
নারীরা স্বভাবতই অফিসের কাজের পাশাপাশি ঘরের কাজও করেন। ফলে একজন কর্মজীবী নারীর ওপর চাপ পড়ে যায় বেশি। এক্ষেত্রে নারীকে কিছু কৌশলী ভূমিকা পালন করতে হবে। তবে অনেক পরিবারে স্বামী স্ত্রীর প্রতি সাহায্যের হাত বাড়িয়ে দেন। প্রতিটি ক্ষেত্রে স্ত্রীকে সহযোগিতা করেন। এভাবে স্বামী-স্ত্রী দুজনে মিলে পরিকল্পনা করে চললে কর্মজীবী নারীর কষ্টটা অনেকাংশে কমে যাবে।
অর্থ উপার্জন নারীকে অর্থনৈতিক স্বচ্ছলতা, স্বাধীনতা ও স্বাবলম্বীতা দিয়েছে। কর্মজীবী মায়েরা তাদের সন্তান এবং পরিবারের জন্য প্রয়োজনীয় সুযোগ-সুবিধার ব্যবস্থা সহজেই করতে পারেন। যুক্তরাষ্ট্রের মিশিগান স্টেট ইউনিভার্সিটির একটি গবেষণায় দেখা গেছে, কর্মজীবী মায়ের মেয়েরা তুলনামূলক বেশি বুদ্ধিমতি, উচ্চশিক্ষিত এবং ক্যারিয়ারের প্রতি বেশি সচেতন হয়। ইদানীং কর্মজীবী মায়ের ছেলেমেয়েদের মধ্যে প্রচলিত লিঙ্গভিত্তিক আচরণ কমে যাচ্ছে, ছেলেরাও গৃহস্থালী কাজে মেয়েদের সাহায্য করছে।
সময়ের প্রয়োজনে, যুগের দাবিতে নিজেদের তৈরি করার তাগিদে নারীর ঘর থেকে বাইরে পা রাখা জোরালোভাবে এগিয়ে যাচ্ছে। এক সময়কার সুগৃহিণী নারীরা আজ শিক্ষায়, আধুনিকতায় নিজেদের সফল প্রমাণ করে কর্মক্ষেত্রেও তাদের অভিগামিতাকে স্পষ্ট করতে পিছপা হচ্ছে না।
উল্লেখ্য, যার সুন্দর ভবিষ্যতের আশায় আপনি আমি কাজ করছি বাইরে, সেই সন্তানের বর্তমানটাই তো হুমকির মুখে পড়তে পারে। তাই আমি বলব, সন্তানের নিরাপত্তার বিষয়টিকে আমাদের অগ্রাধিকার দেওয়া উচিত। সমস্যা তো আছেই,এগুলোকে সমাধান করতে পারা, তাল মিলিয়ে চলতে পারাই তো জীবন।
কর্মজীবী মাকে নিজের যত্ন নিতে হবে, কিছুটা সময় নিজেকে দিতে হবে। সর্বোপরি মানসিক চাপমুক্ত থাকার চেষ্টা করুন। স্বামী-স্ত্রী দুজনে মিলে পরিকল্পনা করে সামনে এগিয়ে যান। যেসব প্রতিষ্ঠান কর্মজীবী নারীদের সন্তান ও কর্মস্থলের ব্যাপারে সকল সুযোগ-সুবিধা দিচ্ছেন, তাদের আমি সাধুবাদ জানাই।
পরিশেষে বলব, এই পৃথিবীতে সন্তানের সবচাইতে আপনজন হচ্ছেন বাবা-মা। তাই মা কর্মজীবী না গৃহিণী সেটা বড় কথা নয়। তবে বর্তমানে অনেক মা-ই বাইরে কাজ করছেন, তাই কর্মজীবী মায়ের ব্যাপারটা এসে যায়। কাজের অনুকূল পরিবেশ সৃষ্টি করে দিতে কর্মজীবী মাদের আমরা সচেষ্ট থাকব, একজন নারী হিসেবে সবার কাছে এটাই আমার প্রত্যাশা।

শেয়ার করুন

Developed by: Sparkle IT