মহিলা সমাজ

ধর্ষকের বিচার প্রসঙ্গ

জুঁই ইসলাম প্রকাশিত হয়েছে: ১৪-০১-২০২০ ইং ০০:১০:৪৮ | সংবাদটি ১২১ বার পঠিত

সাম্প্রতিক সময়ে দেশের বিভিন্ন স্থানে লোমহর্ষক ঘটনা সাধারণ মানুষকে ভাবিয়ে তুলেছে। জনগণ এখন নিজের ছেলে মেয়েদের নিরাপত্তা নিয়ে শংকিত। গত ৫ জানুয়ারি রাজধানীর কুর্মিটোলা এলাকার রাস্তা থেকে তুলে নিয়ে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের এক ছাত্রীকে ধর্ষণের ঘটনায় জড়িতদের গ্রেফতারে ৪৮ ঘণ্টার আলটিমেটাম দিয়েছেন ডাকসু ভিপি নুরুল হক নুর। অনলাইনে যখন এই ভিডিওটি দেখছিলাম তখন মনে হল একটা মেয়ে ধর্ষিত হয়েছে আর গোটা কয়েক ছাত্র নিয়ে ভিপি নুর গলা ফাটাচ্ছেন আমরা অন্য সবাই হাত পা গুটিয়ে বসে আছি। একজন ধর্ষিতার বিচার চাওয়া দেশের আপামর জনতার, সেখানে শুধু আমাদের নুর ভাই কেন দায়িত্ব পালন করবেন? আজ যারা হাত পা গুটিয়ে বসে আছেন, কাল যে আপনার কিংবা আপনার মেয়ে কিংবা বোনের উপর হামলা হবে না তার নিশ্চয়তা কী? প্রতিদিনই কেউ না কেউ এভাবে ধর্ষণের স্বীকার হচ্ছে আমাদের সমাজে কিন্তু আমরা শুধু নীরব। যেমন সয়ে গেছে কিংবা মেনে নিয়েছি বিষয়টিকে-এভাবেই চলবে আমাদের সমাজ কিন্তু কেন কোন সমাধানের চিন্তা কি নেই? ধর্ষিতার বিচার দেশের সকলেই চাইবে, প্রতিবাদ করবে গোটা কয়েকজনে করলে কি হয়?
আমাদের সমাজ একবিংশ শতকে অনেক এগিয়ে গিয়েছে। এগিয়ে যাওয়া সমাজে নারীর নিরাপত্তা একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। আমরা সবাই জানি নারী জাতি অনেক ঘাত-প্রতিঘাতের মধ্যে দিয়ে নিজের স্থান নির্মাণ করতে পেরেছে। অষ্টাদশ শতক হতে উনবিংশ শতক, যখন নারী শিক্ষা কল্পনাতীত, পুরুষশাসিত সমাজে নারীরা ছিল গৃহবন্দী। নারী ছিল শুধু গৃহ নির্মাণের কারিগর মাত্র। আর সে সময় থেকে অনেক ঘাত-প্রতিঘাতের মধ্য দিয়ে নারী জাতি নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করতে পেরেছে। আজকের সমাজে নারীর স্থান অনস্বীকার্য। নারী জাতি প্রতিটি ক্ষেত্রেই নিজেকে প্রতিপন্ন করতে পেরেছে, রাজনীতি থেকে সমাজনীতি প্রত্যেক কাজের পরিসরেই নিজের অস্তিত্বকে। কিন্তু এই একবিংশ শতকে প্রতিটি কর্মক্ষেত্রে যেখানে নারীর ভূমিকা অনবদ্য সেখানে দাঁড়িয়ে প্রশ্ন থেকেই যায়-আজকের সমাজে নারী কতটুকু নিরাপদ কিংবা কন্যা শিশুরা।
ইন্টারনেট থেকে সংগ্রহীত একটা জরিপে দেখলাম- নারীদের একটি স্বেচ্ছাসেবী সংগঠন বলছে বাংলাদেশে ২০১৬ সালে এক হাজারেরও বেশি নারী ও শিশু কন্যা ধর্ষণের শিকার হয়েছে। বাংলাদেশে ১৪টি দৈনিক পত্রিকার খবর বিশ্লেষণ করে সংগঠনটি বলছে ২০১৬ সালে ১০৫০ জন ধর্ষণের শিকার হয়েছে। তারা বলছে, আগের বছরের তুলনায় এই সংখ্যা কিছুটা কম হলেও ধর্ষণ, নির্যাতনের ধরণ ছিলো নির্মম ও নিষ্ঠুর। এ ঘটনাগুলোকে ‘ধর্ষণ, গণধর্ষণ, ও ধর্ষণের পর হত্যা’ এই তিনভাগে ভাগ করা হয়েছে। বাংলাদেশে নারী নির্যাতন ও ধর্ষণের ঘটনা নতুন নয়, তবে সাম্প্রতিক সময়ে এর বিরুদ্ধে সোচ্চার হতে দেখা গেছে সামাজিক যোগাযোগের মাধ্যমগুলোও।
বেশ ঘাটাঘাটি করে এ তথ্যগুলো যোগাড় করলাম-২০১৭ সালে আমাদের দেশে ধর্ষণের শিকার হয়েছেন ৮১৮ জন নারী। এদিকে ২০১৯ সালে ধর্ষণের পর হত্যা করা হয়েছে ৭৬ জনকে আর আত্মহত্যা করতে বাধ্য হয়েছেন ১০ জন নারী। মোট ৮৬ জন নারী ধর্ষণের শিকার হয়ে সুন্দর পৃথিবী থেকে বিদায় নিয়েছেন।
নারীর প্রতি সহিংসতার অন্য চিত্রগুলো ভয়াবহ। ২০১৯ সালে যৌন হয়রানীর শিকার হয়েছেন ২৫৮ নারী। ২০১৮ সালে এই সংখ্যা ছিলো ১৭০ জন।
অন্য আরেকটি জরিপ বলছে-২০১৯ সালে শুধুমাত্র যৌন হয়রানীর শিকার হয়ে মোট ১৮ জন নারী আত্মহত্যা করেছেন। প্রতিবাদ করতে গিয়ে চারজন নারীসহ ১৭ জন হত্যার শিকার হয়েছেন। আমি অবাক হই ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রী যেখানে ধর্ষণের শিকার হয়ে গুরুতর আহত হয়ে হাসপাতালে ভর্তি হতে হয় সেখানে সাধারণ ছাত্রীরা কতটুকু নিরাপদ এ দেশে? এভাবে চললে তো অনেক সাধারণ ছাত্রী ভয়ে স্কুল কলেজ যাওয়া ছেড়ে দিবে। মা-বাবারা সন্তানকে স্কুল কলেজে দিতে ভয় পাবেন। আমি লিখছি আর ভাবছি আমার মতই তো সে একটা মেয়ে, ঐ মেয়ে ধর্ষণের শিকার হওয়ার সময় হয়তো কত চিৎকার, কান্না কাটি করছে নিজেকে রক্ষার চেষ্টায় যুদ্ধে অবতীর্ণ হয়েছে কিন্তু ঐ পাষন্ডের মন গলে নি। ভাবতেই শিউরে উঠি কি ভয়ানক সময় ঐ মেয়েটার উপর গেছে। যে ধর্ষিত হয় সে জানে কেবল তার উপর কি হচ্ছে ?
আবার দেখা যায়-ধর্ষণ ও খুনের অভিযোগে কেউ গ্রেফতার হলেও কিছুদিন পর জামিনে বেরিয়ে আসে তবে এসবের অবধারিত ফল হচ্ছে ঘটনার পুনরাবৃত্তি হওয়া যে কারণে দিনে দিনে আমাদের সমাজে ধর্ষণ বেড়েই চলছে। ধর্ষণের সংবাদ মিডিয়ায় এলেও তেমন প্রতিক্রিয়া দেখা যায় না। দু’একদিন বিষয়টি নিয়ে মাতামাতি কিংবা ঘাটাঘাটি করা হলেও পরে আমরা সব ভুলে যাই বা নতুন কোন বিষয় নিয়ে ব্যস্ত হয়ে পড়ি। এ ধরনের ঘটনা রোধ করতে সর্বোচ্চ ব্যবস্থা নেওয়া হবে বলেও সরকারের পক্ষ থেকে বারবার আশ্বাস প্রদান করলেও কাজের কাজ কিছুই হচ্ছে না। এ ব্যাপারে কঠোর আইন প্রণয়ন এবং প্রয়োগের কথা শতবার উচ্চারিত হলেও প্রায় প্রতিদিনই ধর্ষণের ঘটনা ঘটছে। অপরাধীর সাজা না হলে অপরাধ বাড়বে, এটি সহজ কথা। ধর্ষণ শুধু নারীর বিরুদ্ধে নয়, মানবতার বিরুদ্ধে চরম অপরাধ। এশিয়ার মধ্যে বাংলাদেশে ও ভারতে ধর্ষণের অপরাধ বেশি হয়ে থাকে। বিশ্বের যেসব দেশে ধর্ষণ বাড়ছে, দেখা যাচ্ছে ধর্ষণকারীর সাজা না-হওয়া তার অন্যতম প্রধান কারণ।
আমি মনে করি ধর্ষকের শাস্তি প্রকাশ্য দিবালোকে জনসম্মুখে হলে অপরাধীরা ভয় পেতো। আরেকটি বিষয়, ধর্মীয় শিক্ষার মাধ্যমে সচেতনতা বৃদ্ধি ছাড়া এ রোগ থেকে মুক্তি পাওয়া কঠিন। কাজেই ধর্মীয় মূল্যবোধকে যথেষ্ট গুরুত্ব দিয়ে পাশাপাশি আইন প্রয়োগকারী সংস্থাকে কঠোর মনোভাব নিয়ে এগিয়ে আসতে হবে।

শেয়ার করুন

Developed by: Sparkle IT