ইতিহাস ও ঐতিহ্য

হারিয়ে যাচ্ছে ডাকপিয়ন ও ডাকবাক্স

আফতাব চৌধুরী প্রকাশিত হয়েছে: ১৫-০১-২০২০ ইং ০০:২২:৩১ | সংবাদটি ২৪১ বার পঠিত

‘রাত নির্জন পথে কতো ভয় তবুও রানার ছুটে/ দস্যুর ভয় তারও চেয়েও ভয় কখন সূর্য উঠে/রানার চলেছে রানার’ শ্রীকান্তের এই গানটি আজো শোনা গেলেও রানারদের ঘুংঘুরের শব্দ শোনা বন্ধ হয়ে গেছে অনেক আগেই। এখন আর তেমন দেখা যায় না হাট বাজারগুলোতে লাল রঙের ডাকবাক্স। তথ্য ও যোগাযোগের ক্ষেত্রে আধুনিকতার ছোঁয়ায় প্রতিনিয়ত এগিয়ে যাচ্ছে দেশ আর তারই ধারাবাহিকতায় হারিয়ে যাচ্ছে ডাকপিয়ন আর ডাকবাক্স। এক সময়ে চিঠির বোঝা কাঁধে বয়ে জীবনের ঝুঁকি নিয়ে রাতভর দৌড়ে মাঠ প্রান্তর পাড়ি দিয়ে তা গন্তব্যে পৌঁছে দিত রানার পদধারী ডাকঘর কর্মীরা। দেশ বিভক্তের কিছু পূর্বে বিংশ শতাব্দীর শেষের দিকে যখন সড়ক যোগাযোগের উন্নতি হয়েছে ঠিক তখন থেকেই বন্ধ হয়ে গেছে রানারদের পাঁয়ে হেঁটে চিঠির বোঝা পৌঁছে দেয়ার কার্যক্রম। ডাকবিভাগগুলোতে সেই রানার পদটি বহাল আছে আজও। তবে তারা পায়ে হেঁটে নয়, আধুনিক যানবাহনে করে পৌঁছে দেয় মানুষের মালামাল। চিঠির ব্যবহার কমতে কমতে বর্তমানে শতকরা ১০ ভাগে চলে এসেছে। তার বেশির ভাগই সরকারি ও বেসরকারি বিভিন্ন অফিসের ডকুমেন্ট। এখন বিজ্ঞান আমাদেরকে এমনভাবে আগলে ধরেছে তাতে করে ডাকঘর, ডাকপিয়ন আমাদের চোখের আড়াল হয়ে গেছে। দিন দিন বন্ধ হয়ে যাচ্ছে চিঠির ব্যবহার আর সেই সাথে বিলুপ্তপ্রায় পাড়া মহল্লার লাল রঙের ডাকবাক্স। বেশ ক’ বছর আগেও কোন মহল্লায় ডাকবাক্স স্থাপনের জন্য কর্তৃপক্ষ বরাবরে আবেদন নিবেদনসহ খবরের কাগজে লেখালেখি করতে হত। অনেক বিবেচনার পর মহল্লা ভিত্তিক ডাকবাক্স স্থাপন করা হত। এখন ভেঙে নষ্ট হয়ে গেলেও কেউ তার দিকে ফিরে তাকায় না।
জিপিও পোস্ট অফিস সূত্রে জানা যায়, নগরীর বেশীরভাগ ডাকবাক্সই অনেক দিন ধরেই ব্যবহারের অনুপযোগী হয়ে আছে। যে ডাকবাক্সগুলো কোন মতে টিকে আছে সেগুলো নিয়মিত খুললেও দেখা যায় চিঠির পরিমাণ একেবারেই অপ্রতুল। তার কারণ, দ্রুত চিঠি পত্র আদান প্রদানে এখন কুরিয়ার সার্ভিসকেই অনেকে যথেষ্ট মনে করে থাকেন। তাই তাদের সাথে পেরে উঠছেনা সনাতন পদ্ধতিতে থাকা ডাক বিভাগ। তাই আধুনিকতার ছোঁয়ায় গ্রামগঞ্জ থেকে শুরু করে শহর বন্দরেও কমে গেছে ডাকঘর আর ডাক বাক্সের ব্যবহার। এখন ডাকঘর আর ডাকবাক্স থেকে মুখ ফিরিয়ে নিয়েছেন অনেকেই। হাতের নাগালের মধ্যে রয়েছে এখন কুরিয়ার সার্ভিস আর মোবাইল ফোন। বাজারে এসেছে বিভিন্ন ফোন কোম্পানীর নানা অফার। সকাল নয় সন্ধ্যা নয় অফারগুলোই সারাদিন কর্মব্যস্ত করে রেখেছে অনেক প্রিয়জনকেও। দ্রুত চিঠিপত্র আদান প্রদানে কুরিয়ার সার্ভিসকে অনেকেই যথেষ্ট মনে করে থাকেন। তাই এদের সাথে পাল্লা দিয়ে পেরে উঠছে না ডাক বিভাগ। এখন কোথায় কোথায় ডাকবাক্স লাগানো রয়েছে , সে খোঁজ খবর আর রাখে না কেউ। কারণ চিঠি আর পড়ে না ওই ডাক বাক্সে। অবহেলায় অযত্নে সেগুলো পড়ে থেকে নষ্ট হয়ে যাচ্ছে।
এ বিষয়ে একটি এনজিও সংস্থার উন্নয়ন কর্মী সালমা সুলতানা হেলেন বলেন, ডাক বিভাগের অফিসগুলোতে চলছে বিভিন্ন অনিয়ম। চলছে চরম স্বেচ্ছাচারিতা আর অবহেলা। ঠিকমত চিঠিপত্রও না পাওয়ার অভিযোগ তিনিসহ একাধিক গ্রাহকের। অভিযোগ করেছেন পত্রিকা সম্পাদক, প্রকাশকসহ অনেকেই। ইএমও সেবা থেকেও কাক্সিক্ষত সেবা পাচ্ছেনা গ্রাহকরা। এজন্য অবশ্য জনবল স্বল্পতাকেই দায়ী করছেন ডাক বিভাগ কর্তৃপক্ষ। নগরীর উপশহর এলাকার কলেজ ছাত্র আব্দুল আজিজ জানান, তার বড় ভাই ঢাকা থেকে টাকা পাঠায় তার লেখাপড়ার খরচের জন্য। এ টাকা পোস্ট অফিস থেকে তুলে নিয়ে নির্দিষ্ট সময়ে কলেজে জমা দেয়ার কথা থাকলেও ৫/৭ দিন পরে টাকা তার কাছে পৌছে। এমন আরো অনেক হয়রানি ও ক্ষতির হাত থেকে বাঁচানোর জন্য প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণের অনুরোধ জানান এ শিক্ষার্থী। জানা যায়, ডাক ব্যবস্থা সৃষ্টিকালে ডাক বিভাগের মূল কাজ ছিল ব্যক্তিগত চিঠিপত্র, সরকারি চিঠিপত্র গ্রহণ, পরিবহন ও বিলি করা। পরবর্তীতে ডাক বিভাগের কার্যক্রমের সঙ্গে যুক্ত হয় মানি অর্ডারসহ বিভিন্ন ধরনের কার্যক্রম। দেশব্যাপী সরকারি এ প্রতিষ্ঠানটির আছে বিস্তৃত নেটওয়ার্ক। বাংলাদেশের স্বাধীনতার পর পরই ২০ ডিসেম্বর বর্তমান ‘ডাক ভবনে’ বাংলাদেশের ডাক বিভাগের কার্যক্রম শুরু হয়। আর এ প্রতিষ্ঠানটির বয়স বাড়ার সাথে সাথে পাল্লা দিয়ে বাড়ছে অনিয়ম, দুর্নীতি ও স্বেচ্ছাচারিতা। একুশ শতকের সূচনালগ্নে সারা বিশ্বের ডাকব্যবস্থা বিস্ময়কর সাফল্যের পর ই-মেইলসহ বিভিন্ন প্রযুক্তি মানুষের সামনে খুলে দিয়েছে দ্রুত যোগাযোগের নতুন দিগন্ত। কিন্তু দেশের ডাক ও গ্রামীণ ডাক-ব্যবস্থার তেমন উন্নতি হয়নি, হয়েছে অবনতি। পরিবহন ব্যবস্থার উন্নতি হলেও গ্রামাঞ্চলের বিভাগীয় ডাকঘর, ডাককর্মী এবং ডাক সার্ভিসের অবস্থা শ্রীহীন। দৈনন্দিন কর্মচঞ্চল জীবনের সঙ্গে পাল্লা দিতে ব্যর্থ, পরাজিত এই বিভাগটির আর উন্নয়ন হবেনা বলে ধারণা সাধারণ মানুষের।
একাধিক পোস্ট অফিস ঘুরে দেখা গেছে, পোস্টমাস্টার, পিয়ন ও রানার এই তিন অপরিহার্য কর্মীর পেশাগত জীবনেও লাগেনি আধুনিক শিক্ষা, প্রশিক্ষণ ও প্রযুক্তির স্পর্শ। সময়ের প্রতি নেই কোনও মনিটরিংয়ের ব্যবস্থা। যে যার মত চলে সে ছোট কর্মচারী থেকে বড়কর্তা পর্যন্ত একই অবস্থা। পেশা যোগ্যতাহীনতার কারণে চাকরির অনিশ্চয়তা, ন্যূনতম বেতন, তাদের ঠেসে রেখেছে এক হতাশার মাঝে। স্বয়ংক্রিয় চিঠি বাছাই যন্ত্র ক্রয়েও কোন পদক্ষেপ নেই বলেই জানালেন নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক ডাককর্মী। পোস্টমাস্টারদের সাথে কথা বলে জানা যায়, চিঠি নিয়ে ভাবনা-দুর্ভাবনায় থাকতে হয় কখন চিঠি হারিয়ে যায়। সত্যিকার অর্থে চিঠি সবাইকে আমন্ত্রণ দান করে। এর মূল্য অপরিসীম। চিঠিতে অনেক সময় পাওয়া যায় অনেক গুরুত্বপূর্ণ তথ্য। ঐতিহাসিকরা খুঁজে পান ইতিহাসের অমূল্য উপাদান। অথচ সরকারি ডাকসেবা সময়োপযোগী করার লক্ষ্য নিয়ে ২০০০ সালে ই-পোস্ট সার্ভিস চালু করা হয়েছিল। সম্ভাবনাময় এই সার্ভিসটি এতটা বছর পরেও খুঁড়িয়ে খুঁড়িয়ে চলছে-প্রশিক্ষিত দক্ষ জনবল সঙ্কটের কারণে। সারা দেশে ডাকঘর বা পোস্ট অফিস আছে ৯ হাজার ৮৮৯টি, এর মধ্যে জেনারেল পোস্ট অফিস চারটি। জেলা শহরগুলো মিলিয়ে ৬৬টি। এরপর উপজেলা, গ্রামে রয়েছে ৮২০০টি এক্সট্রা ডিপার্টমেন্টাল ডাকঘর। বর্তমানে অ্যাসিষ্ট্যান্ট পোস্টমাস্টার, পরিদর্শক, অপারেটর, মেইল অপারেটর ও রানারসহ সারাদেশে ডাক বিভাগে কর্মরত লোকবল রয়েছে ১২ হাজারে । পূর্ণাঙ্গ বেতন স্কেলভুক্ত ও বেতন স্কেল ছাড়া ৩০ হাজার কর্মকর্তা ও কর্মচারী এ প্রতিষ্ঠানে কাজ করে থাকেন। তবে এতো বড় ও সম্ভাবনাময় এ প্রতিষ্ঠানটিকে প্রযুক্তি নির্ভর কর্মকান্ডে পরিচালিত করতে পারলে সাধারণ মানুষ স্বল্প খরচে অনেক বেশি সেবা গ্রহণের সুযোগ পেত বলে মনে করছেন দেশের বিশিষ্টজনরা।

শেয়ার করুন

ফেসবুকে সিলেটের ডাক

ইতিহাস ও ঐতিহ্য এর আরো সংবাদ
  • বালাগঞ্জের বাতিঘর বাংলাবাজার উচ্চ বিদ্যালয়
  • বঙ্গবন্ধু ও গান্ধীজী
  • সিলেটের দ্বিতীয় সংবাদপত্রের সম্পাদক ছিলেন ‘মেশিনম্যান’
  • একটি যুদ্ধ : একটি শতাব্দী
  • বালাগঞ্জের প্রাচীন জনপদ শিওরখাল গ্রাম
  • ভাটিপাড়া
  • সময়ের সোচ্চার স্বর সোমেন চন্দ
  • বঙ্গবন্ধুর সিলেট সফর ও কিছু কথা
  • বায়ান্নতেই লিখেছিলেন ‘ঢাকাই কারবালা’
  • জীবনের শেষক্ষণে অর্থ-স্বর্ণ সবই জড়পদার্থ
  • কমরেড বরুণ রায়
  • বঙ্গবন্ধু ও রাষ্ট্রভাষা আন্দোলন
  • নারী ভাষাসৈনিকদের কথা
  • মুক্তিযুদ্ধ ও বঙ্গবীর ওসমানী
  • ভাটির বাতিঘর সুনামগঞ্জ সরকারি কলেজ
  • মাওয়ের লংমার্চের ৪ বছর পর সিলেটিদের লং মার্চ
  • শহীদ মিনারের ইতিকথা
  • সিলেটের লোকসংগীত : ধামাইল
  • পর্যটক ইবনে বতুতার কথা
  • বই এল কোথা থেকে?
  • Developed by: Sparkle IT