উপ সম্পাদকীয়

নিত্যপ্রয়োজনীয় দ্রব্যমূল্য নিয়ন্ত্রণ করুন

মনজু আরা বেগম প্রকাশিত হয়েছে: ১৫-০১-২০২০ ইং ০০:২৫:২৫ | সংবাদটি ৩৮১ বার পঠিত
Image

দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতিতে নিম্নআয়ের মানুষের জীবন ওষ্ঠাগত। বাজারে চাল, ডাল, তেল, নুন, পেঁয়াজ, শাকসবজি থেকে শুরু করে এমন কোনো নিত্যপ্রয়োজনীয় দ্রব্য নেই, যার দাম লাফিয়ে লাফিয়ে বাড়ছে না। অস্বীকার করার উপায় নেই, আমাদের জীবনযাত্রার মানোন্নয়ন হয়েছে। বেতন বৃদ্ধি পেয়েছে, মজুরি বৃদ্ধি পেয়েছে।
ফলে আয়ও বৃদ্ধি পেয়েছে। বাংলাদেশ এগিয়ে যাচ্ছে। তবে এখানে উল্লেখ না করলেই নয়, সম্প্রতি ২০০০ থেকে ২০১৫ সালের মধ্যে অতি দারিদ্র্যের হার সবচেয়ে বেশি কমেছে এমন ১৫টি দেশের যে তালিকা প্রকাশ করেছে বিশ্বব্যাংক, সে তালিকায় বাংলাদেশের নাম নেই। তালিকায় দক্ষিণ এশিয়ার মধ্যে ভারত ও পাকিস্তানের নাম থাকলেও বাংলাদেশের নাম নেই। ওই ১৫টি দেশে যে গতিতে দারিদ্র্য কমেছে, বাংলাদেশে কমেছে এর চেয়ে কম গতিতে।
এর কারণ হিসেবে বলা যায়, দ্রব্যমূল্যের লাগামহীন ঊর্ধ্বগতি। নিম্নআয়ের মানুষ যা আয় করছে, তার পুরোটাই জীবনধারণের জন্য ন্যূনতম খাদ্যদ্রব্য ক্রয় করতেই শেষ হয়ে যাচ্ছে। স্বাস্থ্য, চিকিৎসা, শিক্ষা ইত্যাদির জন্য ব্যয় করার মতো অর্থ তাদের হাতে থাকছে না।
আয় যে হারে বেড়েছে, তার চেয়ে কয়েকগুণ বেশি বৃদ্ধি পেয়েছে নিত্যপ্রয়োজনীয় দ্রব্যের মূল্য। কারণ একটাই, তা হচ্ছে বাজারের ওপর সরকারের কোনো নিয়ন্ত্রণ নেই। নিয়ন্ত্রণ যে নেই তাতো আরও সুস্পষ্টভাবে বোঝা গেল পেঁয়াজ নিয়ে তুঘলকি কাণ্ড দেখে।
অর্থনীতির সংজ্ঞা অনুযায়ী, বাজারে চাহিদা ও জোগানের ওপর দব্যমূল্য র্নিভ্র করে; কিন্তু এ সংজ্ঞা এখানে ফেল করেছে। জানা যায়, দেশে পেঁয়াজের চাহিদা বছরে ২৪ লাখ টন। দেশে উৎপাদন হয় ১৫ থেকে ১৬ লাখ টন। বাকি চাহিদা আমদানির মাধ্যমে পূরণ করা হয়।
বাজারে প্রচুর সরবরাহ থাকা সত্ত্বেও হঠাৎ করে ২৫-৩০ টাকার পেঁয়াজ ২৫০ থেকে ৩০০ টাকায় গিয়ে ঠেকল। দেশের ইতিহাসে সবচেয়ে বেশি দামে বিক্রয় হচ্ছে নিত্যপ্রয়োজনীয় এ পণ্যটি। সরকারি উদ্যোগ, পত্রিকায় লেখালেখি, আলোচনা, সমালোচনা বহু কিছু হলেও ব্যবসায়ীরা পেঁয়াজের দাম কমায়নি, বরং অনেক ব্যবসায়ী সিন্ডিকেটের মাধ্যমে পেঁয়াজ গুদামজাত করে কৃত্রিম সংকট সৃষ্টি করে মানুষের দুর্ভোগ বাড়িয়ে দিয়েছে।
এমনকি বাজারে নতুন পেঁয়াজ উঠলেও দাম কমছে না। পেঁয়াজের মতো পচনশীল দ্রব্য গুদামজাত করায় টনকে টন পেঁয়াজ পচিয়ে নদীতে ফেলে দেয়ার মতো দৃশ্যও আমাদের দেখতে হয়েছে। মানুষ কতটা অমানবিক, অর্থলোভী, পিশাচ হলে এ ধরনের জঘন্য কাজ করতে পারে।
শুধু পেঁয়াজ নয়, বাজারে প্রতিটি নিত্যপ্রয়োজনীয় দ্রব্যমূল্য আকাশছোঁয়া। চাল, ডাল, তেল, নুন, শাকসবজি, ওষুধপত্র থেকে শুরু করে এমন কোনো দ্রব্য নেই, যার দাম নিয়ন্ত্রণের মধ্যে আছে। শুধু কি তাই, এত উচ্চমূল্য দিয়ে যেসব দ্রব্য কিনছি তা-ও ভেজালে ভরা।
জীবন রক্ষাকারী ওষুধও ভেজাল মেশানো ও মেয়াদোত্তীর্ণ বিক্রয় করা হচ্ছে। তার ওপর প্রায় প্রতিটি ওষুধের দামও অনেক বেড়ে গেছে। নামিদামি কিছু প্রতিষ্ঠানও ভেজাল ওষুধ বিক্রয় করছে। আমরা নিরীহ ক্রেতারা জীবনরক্ষার জন্য চড়া মূল্যে বিষ ক্রয় করছি বলা যায়।
দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতিতে সব থেকে বেশি কষ্টকর পরিস্থিতিতে পড়েছেন নিম্নবিত্ত, অবসরপ্রাপ্ত সৎ সরকারি কর্মচারী, প্রবীণ জনগোষ্ঠী ও নিম্নআয়ের মানুষ। সবচেয়ে বেশি কষ্টকর পরিস্থিতিতে রয়েছেন অধিকাংশ প্রবীণ। তারা না ঘরের মরা, না ঘাটের মরা।
যেসব চাকরিজীবী সৎভাবে চাকরিজীবন কাটিয়েছেন, তাদের অবস্থা আরও শোচনীয়। কারণ চাকরি জীবনের তাদের একমাত্র সঞ্চয় পেনশন বা গ্র্যাচুইটির টাকা। জীবনের শেষ সম্বল এ সঞ্চয়ের টাকা দিয়ে তারা সঞ্চয়পত্র কিনেছেন। এ সঞ্চয়পত্রের মুনাফার টাকা দিয়ে তাদের সংসার-জীবনযাত্রা সম্পূর্ণভাবে নির্বাহ করতে হয়।
প্রবীণ বয়সে খাদ্যদ্রব্যের চেয়েও বেশি জরুরি ওষুধপত্র ও চিকিৎসাসেবা। আমার বাস্তব অভিজ্ঞতায় দেখছি, প্রবীণ বয়সে স্বাস্থ্য সুরক্ষা ও সুস্থ থাকার জন্য মাসে ১০ থেকে ১৫ হাজার টাকা খরচ করতে হয়।
বয়োবৃদ্ধির সঙ্গে সঙ্গে প্রেসার, ডায়াবেটিস, কিডনি, হৃদরোগসহ বিভিন্ন ধরনের রোগে আক্রান্ত হতে হয়, হাসপাতাল খরচ বা অন্যান্য খরচের কথা বাদ দিয়েই। আমরা জানি, বর্তমান সরকার প্রবীণবান্ধব সরকার।
কিন্তু প্রবীণদের এ দিকটি চিন্তাভাবনা না করেই হঠাৎ করে সঞ্চয়পত্রের মুনাফা কমিয়ে দিয়ে দেশের প্রবীণ জনগোষ্ঠীর একটি বিরাট অংশকে বিপর্যয়ের মুখে ফেলে দিয়েছে। দেশে এখন প্রবীণ জনগোষ্ঠীর সংখ্যা ১ কোটি ৪০ লাখ প্রায়। প্রবীণ জনগোষ্ঠীসহ নিম্নবিত্ত ও সাধারণ খেটে খাওয়া মানুষের অধিকাংশই মানবেতর জীবনযাপন করছেন। দ্রব্যমূল্যের বাজার ক্রমেই ঊর্ধ্বমুখী হওয়ায় ভোক্তারা দিশেহারা হয়ে পড়েছেন।
বাজারের ওপর সরকারের কোনো নিয়ন্ত্রণ নেই। ব্যবসায়ীরা সিন্ডিকেট করে বিভিন্ন অজুহাতে নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের দাম বাড়িয়ে সাধারণ মানুষকে বিপাকে ফেলছে। একবার যে পণ্যের দাম বাড়ে, তা আর কমে না।
সরকারি বিভিন্ন সংস্থা এ ব্যাপারে কাজ করলেও তা তেমন কার্যকর ভূমিকা না রাখায় দ্রব্যমূল্য নিয়ন্ত্রণে আসছে না। কনজুমারস অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশ (ক্যাব) নামে একটি সংস্থা রয়েছে; কিন্তু তাদের কার্যক্রমও তেমন লক্ষণীয় নয়।
ভোক্তাদের অধিকার সংরক্ষণের জন্য এটি প্রতিষ্ঠিত হলেও বাস্তবে তারা ভোক্তাদের অধিকার সংরক্ষণ কতটুকু করছেন তা সর্বসাধারণের বিচার্য। এ ছাড়া লক্ষ করা যাচ্ছে, অনেক রফতানিকারক শাকসবজিসহ বিভিন্ন ধরনের পণ্য অতিরিক্ত লাভের আশায় দেশের চাহিদা না মিটিয়ে বিদেশে রফতানি করছেন।
ইলিশ মাছ বাঙালিদের একটি প্রিয় খাদ্য। কিন্তু বহু রফতানিকারক দেশের চাহিদা না মিটিয়ে ভারতসহ বিভিন্ন দেশে ইলিশ রফতানি করে। ফলে সাধারণ ক্রেতারা পছন্দের এ পণ্যটি ক্রয় করতে পারে না, সাধ থাকলেও সাধ্যে কুলায় না। এ ক্ষেত্রে সরকারের প্রতিটি পণ্যের রফতানির একটা নির্দিষ্ট সীমা নির্ধারণ করে দেয়া উচিত।
বাজারে শীতকালীন সবজির সরবরাহ যথেষ্ট পরিমাণে থাকলেও প্রতিটি সবজির দাম চড়া। পেঁয়াজপাতা এখনও ৮০ টাকা কেজি দরে বিক্রয় হচ্ছে।
প্রতিটি নিত্যপ্রয়োজনীয় দ্রব্যমূল্য বৃদ্ধি পাওয়ার কারণে রাজধানী শহরে নিম্ন ও মধ্যম আয় এবং প্রবীণ জনগোষ্ঠীর বেঁচে থাকা দায় হয়ে পড়েছে। গ্রামের অবস্থা তুলনামূলক ভালো। তবে প্রবীণদের জন্য ভালো নয়, কারণ প্রবীণদের জন্য সার্বক্ষণিকভাবে প্রয়োজন ডাক্তার, নার্স, হাসপাতাল, প্রয়োজনীয় ওষুধপত্র, যা গ্রামে পাওয়া প্রায় কষ্টসাধ্য।
তাই প্রবীণ ও নিম্নআয়ের মানুষের কষ্ট এবং দুর্ভোগের বিষয়টি বিবেচনা করে প্রবীণবান্ধব বর্তমান সরকারের কাছে আবেদন প্রতিটি দ্রব্যের বাজারমূল্য নির্ধারণ করে বাজার নিয়ন্ত্রণের পাশাপাশি ভেজাল খাদ্যদ্রব্যের হাত থেকে রক্ষার জন্য সরকারি-বেসরকারি বিভিন্ন সংস্থার সহযোগিতা ও সমন্বয়ে আরও বেশি বেশি মোবাইল কোর্ট চালু করে ভেজালকারীদের গুরুদণ্ড প্রদান, ক্যাবকে আরও কার্যকরী ভূমিকা রাখার প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ এবং সেইসঙ্গে সঞ্চয়পত্রের মুনাফার বিষয়টি আবারও বিবেচনার জন্য সুবিধাবঞ্চিত প্রবীণ জনগোষ্ঠীর পক্ষ থেকে বিশেষভাবে অনুরোধ জানাচ্ছি।
লেখক : গবেষক; সাবেক মহাব্যবস্থাপক, বিসিক

 

শেয়ার করুন

ফেসবুকে সিলেটের ডাক

উপ সম্পাদকীয় এর আরো সংবাদ
  • বৈচিত্র্যের সৌন্দর্য
  • আল্লামা আহমদ শফী চলে গেলেন
  • কর্তৃত্ববাদী রাজনীতির নব্য রূপকার
  • স্মরণ:ডা. দেওয়ান নূরুল হোসেন চঞ্চল
  • কোভিড-১৯ এর সম্মুখ সমরে লড়ছে জিন প্রকৌশলীরা
  • মধ্যপ্রাচ্যের রাজনীতিতে তুরস্কের প্রভাব
  • বৃদ্বাশ্রম
  • পুষ্টি-অপুষ্টি প্রসঙ্গ
  • পুষ্টি-অপুষ্টি প্রসঙ্গ
  • সত্য যখন উক্তি হয়ে ফিরে আসে
  • প্রসঙ্গ : মহামারিতে ধৈর্য ধারণ
  • মা-বাবার সাথে থাকি
  • নব্যউদারনীতিবাদ নিয়ে কিছু কথা
  • মাওলানা আবুল কালাম আজাদ
  • বাউল সম্রাট ও গ্রামীণ সংস্কৃতি
  • সমাজসেবা ও দেশপ্রেম
  • ক্ষণজন্মা সৈয়দ মহসীন আলী
  • শিক্ষার সাথে চরিত্র গঠনও প্রয়োজন
  • জাতীয় প্রবীণ নীতিমালার লক্ষ্য ও উদ্দেশ্য
  • ম. আ. মুক্তাদির : বিপ্লবীর স্বপ্নের দেশ
  • Image

    Developed by:Sparkle IT