উপ সম্পাদকীয়

বাগ্মীতায় অমর আল্লামা ফুলতলী

মাওলানা আব্দুল হান্নান তুরুকখলী প্রকাশিত হয়েছে: ১৬-০১-২০২০ ইং ০১:০৫:০০ | সংবাদটি ৯৯ বার পঠিত

রাসূলে পাক (সাঃ) এর ওফাতের পর দ্বীন ইসলাম প্রচারে যারা সুচারু দায়িত্ব পালন করবেন তাঁরা হচ্ছেন আলেম। কারণ ওলামায়ে কেরাম হচ্ছেন নবীগণের ওয়ারিস। তবে যে কেউ আলেম হতে পারবেন না, যে কারো দাওয়াতে মানুষ হেদায়ত প্রাপ্ত হবে না। যাদের মধ্যে ইলমে শরীয়ত ও ইলমে তাসাউফ-এই উভয় প্রকার ইলিম আছে তারাই হচ্ছেন আলেম। আর এরাই হচ্ছেন রাসূলে পাক (সাঃ) এর প্রকৃত ওয়ারিস। জৈনপুরী সিলসিলার প্রখ্যাত বুজুর্গ শামসুল উলামা আল্লামা আব্দুল লতিফ চৌধুরী ফুলতলী (১৯১৩-২০০৮) ছিলেন রাসূল (সাঃ)-এর প্রকৃত ওয়ারিসদের একজন। রাসূল (সাঃ)-এর ওয়ারিস হিসেবে তিনি সারাজীবনই ইসলামের সুমহান আদর্শ, আক্বীদা-বিশ্বাস ও দ্বীনি ইলমের প্রচার-প্রসারে ছিলেন নিবেদিত। একই উদ্দেশ্যে তিনি দেশের প্রত্যন্ত অঞ্চল যেমন সফর করেছিলেন, তেমনি তিনি দেশের সীমানা পেরিয়ে যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য ও ভারতসহ পৃথিবীর বিভিন্ন দেশে দাওয়াতী কার্যক্রম পরিচালনা করেছেন। বিভিন্ন সভা-সমাবেশে, মাহফিলে মাহফিলে সারগর্ভ বয়ান পেশ করার মাধ্যমে তিনি ইসলামের প্রকৃত সৌন্দর্যকে অত্যন্ত তাৎপর্যবহ করে তুলে ধরেছেন। আল্লাহর খলিফা হিসাবে আল্লামা ফুলতলী (রঃ) মানুষকে তাদের দায়িত্ব কর্তব্য সম্পর্কে সচেতন করেছেন, মানুষের মধ্যে মানবতাবোধ জাগ্রত করেছেন তিনি। মাহফিলে মাহফিলে তাঁর সে সকল বয়ান সে সময় মানুষকে যেমন আকৃষ্ট ও অনুপ্রাণিত করেছিল, তেমনি এখনও সে সকল বয়ান আমাদের প্রেরণা দিয়ে থাকে। তাঁর বয়ান ও বক্তব্যগুলো আমাদের প্রেরণার উৎস।
আল্লামা ফুলতলী (রঃ) ছিলেন একজন বাগ্মী মহাপুরুষ। বাগ্মীতায় দেশ-বিদেশে তাঁর অত্যন্ত সুখ্যাতি ছিল। তিনি ছিলেন একজন সুবক্তা। তাঁর বক্তব্য ছিল অত্যন্ত আকর্ষণীয়। তাঁর বক্তব্য অতি দ্রুত প্রভাব ফেলতো মানুষের অন্তরে। মানুষ তাঁর বক্তব্য অবাক হয়ে শ্রবণ করতেন। তাঁর বক্তব্য শুনে মানুষের মধ্যে ঈমানী জযবা বৃদ্ধি পেয়ে যেত। শ্রোতারা বারবার ‘তাকবীর’ দিয়ে তাঁকে ধন্যবাদ জ্ঞাপন করতেন। হাজার হাজার আলেমের বয়ান থেকে শ্রোতারা যা জানতে ও বুঝতে পারতেন তা আল্লামা ফুলতলীর বয়ান থেকেই শ্রোতারা জানতে ও বুঝতে পারতেন। তিনি ছিলেন একজন ‘বাহরুল উলুম’। তিনি তাঁর বক্তব্যে এমন সব আশ্চর্যজনক ও বিস্ময়কর তথ্য উপাত্ত উপস্থাপন করতেন যা আর কারো পক্ষে এরূপ তথ্য উপস্থাপন করা সম্ভব হতো না। আল্লামা ফুলতলী (রঃ) তাঁর সুদীর্ঘ জীবনে কত মাহফিল, সভা-সমাবেশ, সেমিনার সিম্পোজিয়ামে যে বক্তব্য দিয়েছেন তার হিসাব কারো কাছে নেই, এর হিসাব কেউ দিতেও পারবে না। তিনি তাঁর জীবদ্দশায় যতটি মাহফিল, সভা-সমাবেশ, সেমিনারে উপস্থিত হয়েছেন সবক’টিতেই তিনি ছিলেন সভার মধ্যমণি। প্রধান অতিথির আসনটি থাকতো তাঁর জন্যই নির্ধারিত। এ অঞ্চলের প্রতিটি ওয়াজ মাহফিলের তারিখ নির্ধারিত হতো তাঁর দেয়া তারিখ অনুসারেই। ওয়াজ মাহফিলের প্রতিটি মানুষ অধীর আগ্রহে অপেক্ষমান থাকতেন তাঁর বক্তব্য শোনার জন্য। তাঁর বক্তব্য শুনলেই সকলে ওয়াজ মাহফিলে আসাকে সার্থক মনে করতেন।
আল্লামা ফুলতলী (রঃ) শুধু আমাদের কাছে কিংবা কোন নির্দিষ্ট জাতি বা গোষ্ঠীর কাছে বিশেষ সম্মানিত নন; বরং তিনি জাতি-ধর্ম-বর্ণ-গোত্র নির্বিশেষে সকল মানুষের কাছে শ্রদ্ধাভাজন ও অনুসরণীয় ব্যক্তিত্ব ছিলেন। তাঁর ওয়াজ-নসীহত বক্তৃতা বিবৃতি তাই সকলের কাছেই পথ নির্দেশনা রূপে গৃহীত। বাতিলের বিরুদ্ধে তিনি ছিলেন সর্বদা সোচ্চার। তিনি বাতিলের বিরুদ্ধে বক্তব্য দিতে কখনও কুন্ঠাবোধ করতেন না। পীর ও বীর আল্লামা ফুলতলীর অনলবর্ষী বক্তব্যে বাতিলের ভিত কেঁপে যেত। ১৯৯৯ সালে তৎকালীন সরকার শত শত মাদ্রাসার স্বীকৃতি বাতিল করলে বাংলাদেশ সরকারের এই ঘৃণ্য ষড়যন্ত্রের তীব্র নিন্দা জানিয়ে আল্লামা ফুলতলী (রঃ) এক সেমিনারে বক্তৃতা দানকালে বলেন ‘ফেরাউন ৫০ বছর চেষ্টা করে ইসলামী শিক্ষা বন্ধ করে খোদায়ী দাবী করেও রেহাই পায়নি। আমাদের দেশেও কি কেউ খোদায়ী দাবী করার চেষ্টা করছে? এ জমিনে একজন ঈমানদার বেঁচে থাকতে ইসলামী শিক্ষা কেউ বন্ধ করতে পারবে না’ (সিলেট রেজিস্টারী মাঠের বক্তব্য ৭ মার্চ ১৯৯৯ দৈনিক সিলেটের ডাক, ৮ মার্চ ১৯৯৯)। একই ইস্যুতে একটি সেমিনারে বক্তব্য দানকালে তিনি বলেছেন ‘অবিলম্বে প্রত্যাহারকৃত মাদ্রাসার স্বীকৃতি পুনরায় না দিলে তীব্র আন্দোলন গড়ে তোলা হবে। প্রয়োজনে আমার বিদেশ সফর সংক্ষিপ্ত করে দেশে প্রত্যাবর্তন করব। সরকার আমাদের সৌম্যদীপ্ত চেহারা দেখেছে, এর রুদ্র রূপ দেখেনি। ঈমানী চেতনায় উজ্জীবিতদের রুদ্রতার তাপদাহে যে কোন জালেম সরকার জ্বলে ছারখার হয়ে যেতে পারে।’ (মাসিক পরওয়ানা ঃ জুলাই-আগস্ট ১৯৯৯)।
আল্লামা ফুলতলী (রঃ) ছিলেন বিংশ শতাব্দীর শ্রেষ্ঠ মুবাল্লিগ। আর মুবাল্লিগের অনন্য বৈশিষ্ট্য হচ্ছে ‘হিকমত’ অবলম্বন করে তাবলীগ করা, ইসলামের দাওয়াত দেয়া। ‘হিকমত’ অবলম্বন করে জনতার সামনে বক্তব্য উপস্থাপন করা। আর যাবতীয় বিষয়বস্তুকে সঠিক জ্ঞান দ্বারা জানাকে ‘হিকমত’ বলে। পবিত্র কুরআনে ইরশাদ হচ্ছে-‘তুমি মানুষকে তোমার প্রতিপালকের পথে আহবান কর হিকমত ও সদুপদেশ দ্বারা এবং তাদের সাথে আলোচনা কর সদ্ভাবে’ (সূরা নাহল ঃ আয়াত-১২৫)। আল্লামা ফুলতলী (রঃ) সেই ‘হিকমত’ অবলম্বন করেই সভা-সমাবেশে বক্তব্য দান করতেন, মানুষকে ইসলামের প্রতি আহবান করতেন এবং হিকমতের মাধ্যমেই কুরআন, হাদীস ও ইলমে ফিকাহর আলোকে মানুষকে ইসলামের বিধি বিধান বিশদভাবে বুঝিয়ে দিতেন। এ জন্যই তাঁর বক্তব্যের প্রতি সকলেই ছিলেন অত্যন্ত আকৃষ্ট।
বাগ্মীতায় অমর হয়ে রয়েছেন আল্লামা ফুলতলী (রঃ)। মাহফিল, সভা-সমাবেশে ও সেমিনার-সিম্পোজিয়ামে তাঁর দেয়া তাৎপর্যপূর্ণ বক্তব্যগুলো তাঁকে অনন্তকাল অমর করে রাখবে। ইহ-পরকালীন কল্যাণে তাঁর এসব তাৎপর্যপূর্ণ বক্তব্যগুলো সংরক্ষণ করে রাখা আমাদের সকলের উচিত।
লেখক : প্রাবন্ধিক ও কলামিস্ট।

শেয়ার করুন
উপ সম্পাদকীয় এর আরো সংবাদ
  • শান্তিময় সমাজ গঠনে যা প্রয়োজন
  • অনির্বাণ ওসমানী
  • ট্রাম্পের মধ্যপ্রাচ্য শান্তি পরিকল্পনার ভবিষ্যৎ
  • একুশের অম্লান স্মৃতি
  • ভোটের প্রতি জনগণের অনীহা কেন?
  • ওসমানী : সৎসাহসী বঙ্গবীর
  • উৎপাদনের সঙ্গে দরকার সম্পদের যথাযথ ব্যবহার
  • নিঃসঙ্গতাই আজকের শিশুদের সমস্যা
  • সুন্দরবনকে ভালোবাসুন
  • প্রসঙ্গ : কানাইঘাট উপজেলা
  • খাদ্য অধিকার এবং মানবাধিকার
  • দিবসের আবরণে অপসংস্কৃতি
  • শীতরে আনন্দ এবং বদেনা
  • বেকারত্ব ও কর্মসংস্থান
  • ঢাকা সিটি নির্বাচন ও অন্যান্য প্রসঙ্গ
  • ভারতে সি.এ.এ, এন.আর.সি ও এন.পি.আর
  • বই পড়ি : সত্যকেই সত্য জানি
  • বাঙালি সংস্কৃতি
  • পলিথিন ও প্লাস্টিকের ব্যবহার
  • আসুন নিজেকে চিনি, বিশ্বাসী হই
  • Developed by: Sparkle IT