উপ সম্পাদকীয়

মধ্যপ্রাচ্যের রাজনীতিতে ইউ.এ.ই’র ভূমিকা

অ্যাডভোকেট আনসার খান প্রকাশিত হয়েছে: ১৬-০১-২০২০ ইং ০১:০৭:২৮ | সংবাদটি ২২৬ বার পঠিত

ষাটের দশকেও যে দেশটা ছিলো হতদরিদ্র; মৎস্য সম্পদ ও মণিমুক্তা আহরণ-বিপণন এবং তা থেকে আয়কৃত অর্থই ছিলো যার অর্থনীতির মূল ভিত্তি এবং এই অর্থনৈতিক দূরবস্থার কারণে মানুষের জীবন ব্যবস্থা ছিলো মারাত্মকভাবে বিপর্যস্ত; ছিলো না সুচিকিৎসার ব্যবস্থা; ছিলো না পশ্চিমা উন্নত বিশ্বের ব্যবহৃত চিকিৎসা সামগ্রী ও ঔষধপত্র। এ কারণে উপযুক্ত চিকিৎসার অভাবে অর্ধেকেরও বেশি শিশু ও প্রায় তৃতীয়াংশ মহিলা সন্তান প্রসবকালেই মৃত্যুবরণ করতেন। অন্যদিকে, জনসংখ্যার বিরাট অংশই ছিলো অশিক্ষিত, এমনটা দরিদ্র দেশ কয়েক দশকের ব্যবধানে একটা শিল্পোন্নত দেশে রূপান্তরিত হয়েছে। তার জনগণ আজ সর্বক্ষেত্রে স্বাবলম্বী। এ দেশটা হলো সংযুক্ত আরব আমিরাত বা ইউ.এ.ই।
বিশেষজ্ঞদের মতে, ১৯৬২ সালের দিকে তেল-গ্যাসের অনুসন্ধান পাওয়ায় এবং সেটা দক্ষতার সাথে উত্তোলন করে উন্নত দেশগুলোতে বিক্রি-রপ্তানী করে প্রাপ্ত আয়ের অর্থ দিয়ে দেশটার অর্থনীতি শক্তিশালীকরণের কাজে এবং শিল্প বিনির্মাণে দক্ষতার সাথে বিনিয়োগ করার ফলে এক সময়ের দরিদ্র দেশটা এখন উন্নত রাষ্ট্রে রূপান্তরিত হয়েছে। সংক্ষিপ্ত সময়ের মধ্যে দেশের মানুষের জীবনযাত্রায় ব্যাপক পরিবর্তন এসেছে; মানুষ উন্নত জীবন ব্যবস্থা ভোগ করছে। জিডিপি পার ক্যাপিটিয়ার দিক থেকে সংযুক্ত আরব আমিরাত এখন উন্নত বিশ্বের উন্নত রাষ্ট্রগুলোর সমকক্ষ। উল্লেখ্য যে, দেশের অর্থনীতি এখন মধ্যপ্রাচ্যে দ্বিতীয় অবস্থানে রয়েছে; সৌদি আরবের পরেই এর অবস্থান। মোট নমিনাল জিডিপি হলো ৪১৪.১৭৯ বিলিয়ন আমেরিকান ডলার এবং জিডিপি এট পিপিপি হলো-৭২২.০১৫ বিলিয়ন আমেরিকান ডলার। জিডিপি পার ক্যাপিটিয়া হলো-৩৯.৭০৯ আমেরিকান ডলার। তেল রিজার্ভের দিক থেকে ইউ.এ.ই-এর অবস্থান বিশ্বে সপ্তম।
বলা হয়ে থাকে, সংযুক্ত আরব আমিরাত রাষ্ট্রকে আধুনিক ও বহুত্ববাদী রাষ্ট্রে উন্নীতকরণ ও রূপান্তরের মূল কারিগর হলেন বর্তমান শাসক মোহাম্মদ বিন জাহেদ-যিনি-‘এমবিজেড’ নামে সমধিক পরিচিত। একটা নতুন বহুত্ববাদী আধুনিক রাষ্ট্র বিনির্মাণে তিনি দেশের শিক্ষা-সংস্কৃতি, ফিনান্স, সামরিক ও প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা ঢেলে সাজানোর পরিকল্পনা নিয়ে এগিয়ে আসেন। তিনি তেলের ওপর নির্ভরশীলতা হ্রাস করে নতুন অর্থনীতি ও শিল্প কারখানা স্থাপনের দিকে জোর দেন। নতুন নতুন শিল্প-কারখানা স্থাপিত হওয়ায় দেশি-বিদেশী লোকদের জন্য কর্মসংস্থানের দ্বার খুলে যায়। দেশটাতে এখন মোট জনসংখ্যা হলো-নয় মিলিয়ন; এর মধ্যে হাফ মিলিয়নের কিছু বেশি হলো আমিরাতি এবং বাকী সব হলো বিদেশী শ্রমিক। অর্থাৎ আট মিলিয়ন বিদেশী শ্রমিকের কর্মসংস্থান হয়েছে আরব আমিরাতে।
এমবিজেড-এর পরিকল্পিত সভরেন ওয়েলথ ফান্ড যা মুবাদালা নামে পরিচিত-এর মাধ্যমে অর্জিত আয় থেকে স্থাপিত শিল্প থেকে দেশীয় লোকদের ব্যাপক কর্মসংস্থানের ব্যবস্থা হয়েছে; এমনকি, মহিলাদেরও কর্মসংস্থানের ব্যবস্থা হয়েছে। মুবাদালার আয় দিয়ে আল-আইন এলাকায় এরোস্পেস ও এভিয়েশন হাব স্থাপন করা হয়েছে যেখানে ৮৬% শতাংশ মহিলাদের কর্মসংস্থানের ব্যবস্থা করা হয়েছে। এছাড়াও মহিলাদের শিক্ষার ওপর জোর দেওয়া হয়েছে। ফলে এখন ব্যাপক সংখ্যায় মহিলারা আধুনিক শিক্ষায় শিক্ষিত হয়ে রাষ্ট্র ও সমাজে ভূমিকা রাখছে।
এক সময়ের দরিদ্র রাষ্ট্র আরব আমিরাত সাতটা সিটি স্টেট নিয়ে গঠিত একটা ফেডারেশন রাষ্ট্র। এর অবস্থান মধ্যপ্রাচ্যের আরব সাগরের উত্তরে। এগুলো এক সময় ট্রুসিয়াল স্টেটস নামে পরিচিত ছিলো। ১৯৭১ সালে বৃটিশদের নিকট থেকে স্বাধীনতা প্রাপ্ত এ ফেডারেশন রাষ্ট্র বিশ্বের অন্যতম ধনী রাষ্ট্র এবং বিশ্বের সর্বোচ্চ ভবন-‘বুর্জ খলিফা’, ‘দ্য দুবাই মল’, ‘ফেরারী ওয়ার্ল্ড আবুধাবি’ ইত্যাদি প্রচুর আকাশ ছোঁয়া ভবন ও সুপারমলগুলোর অবস্থান এখন সংযুক্ত আরব আমিরাতে।
শুধু যে অর্থনীতিতেই আমিরাত উন্নতি অর্জন করেছে তা নয়-একই সাথে সামরিক ও প্রতিরক্ষা খাতেও দেশটা শক্তি অর্জন করেছে এবং মধ্যপ্রাচ্যসহ বিশ্বের বিভিন্ন দেশে আরব আমিরাতের সশস্ত্র বাহিনী শান্তিরক্ষায় কাজ করছে; এমনকি যুদ্ধে অংশ নিচ্ছে। এভাবে একটা উদীয়মান অর্থনৈতিক ও সামরিক শক্তি হিসেবে আমিরাত রাজনীতি ও জিওপলিটিক্সে অবদান রাখছে।
দেশের ইতিহাস পর্যালোচনায় দেখা যায় স্বাধীনতা পরবর্তী বড় একটা সময় আমিরাত মূলত: নিজেদের অভ্যন্তরীণ উন্নয়ন নিয়েই ব্যস্ত ছিলো, তাই বহির্বিশ্বের রাজনীতি নিয়ে মাথা ঘামায়নি। অর্থাৎ এর ভূমিকা ছিলো নিরপেক্ষতার নীতি। বিশেষ করে-আমিরাতের জনপ্রিয় শাসক শেখ জায়েদ বিন সুলতান আল-নাহিয়ানের শাসন কালে আমিরাত বিশ্ব রাজনীতি এবং মধ্যপ্রাচ্যের রাজনীতিতে কোনো ভূমিকা পালন করেনি; বহির্বিশ্বের রাজনীতিতে সম্পূর্ণ নিরপেক্ষ থেকে সুলতান আল নাহিয়ান শাসন কার্য পরিচালনা করেছিলেন। বলা যায়-কারো সাথে শত্রুতা নয়-মিত্রতাই ছিলো তার পররাষ্ট্র নীতির ভিত্তি। আমিরাতের এই নিরপেক্ষ পররাষ্ট্রনীতির কারণেই এক সময় আমিরাত রাষ্ট্রকে ‘মধ্যপ্রাচ্যের সুইজারল্যান্ড’ হিসেবে অভিহিত করা হতো।
২০০৪ সালে আমিরাতের শাসক শেখ জায়েদ বিন সুলতান আল নাহিয়ানের মৃত্যু পরবর্তীতে আমিরাতের পররাষ্ট্র নীতিতে বড় ধরনের পরিবর্তন ঘটে। নতুন শাসক মোহাম্মদ বিন জায়েদ তথা এম.বি.জেড পুরানো ধারা থেকে বেরিয়ে আসেন; তিনি পূর্ববর্তী শাসক আল-নাহিয়ানের অনুসৃত পররাষ্ট্রনীতি সম্পূর্ণ পরিত্যাগ করেন। অর্থাৎ নিরপেক্ষ পররাষ্ট্রনীতির স্থলে নতুন শাসক মধ্যপ্রাচ্য, আঞ্চলিক ও আন্তর্জাতিক রাজনীতিতে অংশ গ্রহণের ধারায় নতুন পররাষ্ট্রনীতি গ্রহণ করেন। নতুন পররাষ্ট্রনীতিতে আমিরাতকে-আমেরিকান লবির ইসরাইল-সৌদি আরব সংশ্লিষ্ট অক্ষ শক্তির সাথে সংযুক্ত করেন। বিশ্বব্যবস্থায় সামরিক ক্ষেত্রে ভূমিকা পালনের সিদ্ধান্ত নেয় আমিরাত।
আমিরাতের নতুন পররাষ্ট্রনীতির সফলতার লক্ষ্যে দেশটা তার প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা ও সামরিক শক্তি সম্প্রসারণ, ক্ষমতায়ন ও বৃদ্ধির লক্ষ্যে শক্তিশালী সামরিক বাহিনী গঠন ও বাহিনীকে আধুনিক অস্ত্রাদি ও সরঞ্জাম দিয়ে সুসজ্জিত করার লক্ষ্যে আমেরিকাসহ বিশ্বের বন্ধু রাষ্ট্রগুলো থেকে আধুনিক সমরাস্ত্র ক্রয় করার উদ্যোগ নেয়। প্রতিরক্ষা বাজেটে প্রতিবছর বিপুল ব্যয় বৃদ্ধি করতে থাকে এবং সর্বশেষ ২০১৯ সালের বাজেটে প্রতিরক্ষা ব্যয় বাড়িয়েছে ৪১% শতাংশ। অর্থাৎ ২০১৯ সালের প্রতিরক্ষা ব্যয় পূর্ববর্তী বছরের চেয়ে বৃদ্ধি করে ২.৩ বিলিয়ন আমেরিকান ডলার বরাদ্দ করা হয়েছে যা ২০১৮ সালে ছিলো ১.৬৬ বিলিয়ন আমেরিকান ডলার।
আরব আমিরাত যার জনসংখ্যা ১০ মিলিয়নের কম, সেটা তার সশস্ত্র বাহিনীর শক্তি বৃদ্ধি করে চলেছে এবং মধ্যপ্রাচ্য ও আফ্রিকান দেশগুলোর যুদ্ধ-গৃহযুদ্ধে দেশটার সশস্ত্র বাহিনী গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে চলেছে। মধ্যপ্রাচ্য ও আফ্রিকায় আমিরাতের সেনা উপস্থিতি অব্যাহতভাবে বৃদ্ধি পাওয়ার প্রেক্ষিতে আমিরাতের প্রশংসা করে এটাকে-‘লিটল স্পার্টা’ বলে অভিহিত করেছিলেন আমেরিকার সাবেক প্রতিরক্ষা মন্ত্রী জীম মেট্টিস। আমেরিকার সরবরাহকৃত আধুনিক অস্ত্রে সজ্জিত আমিরাতের বিশেষ বাহিনী বর্তমানে ইয়েমেন, লিবিয়া, সোমালিয়া, আফগানিস্তান, মিসরের নর্থ সিনাই এলাকায় নিয়োজিত আছে। সৌদি কোয়ালিশনের সাথে ইয়েমেনে সন্ত্রাসী সংগঠন হুতি বাহিনীর বিরুদ্ধে লড়াই করছে আমিরাতের সশস্ত্র বাহিনী।
বিশ্বের নানা দেশে আমিরাতের সশস্ত্র বাহিনীর উপস্থিতি এবং এ বাহিনীর শক্তি বৃদ্ধির জন্য আধুনিক অস্ত্র ও সরঞ্জাম ক্রয় করতে হয় বলে আমিরাতের সামরিক ও প্রতিরক্ষা ব্যয় বাজেটে ঘোষিত ব্যয়ের চেয়ে অনেক বেশি বলে অভিমত বিশেষজ্ঞদের। এক পরিসংখ্যান থেকে দেখা যায়, আমিরাত সরকার আমেরিকার নিকট থেকে মিলিয়ন মিলিয়ন ডলার ব্যয়ে এফ-১৬ যুদ্ধ বিমান, এপাচি হেলিকপ্টার, রাডার যন্ত্রপাতি, মোবাইল রকেট সিস্টেম ইত্যাদি সামরিক সরঞ্জাম ক্রয় করেছে। ফলে আমিরাতের সামরিক ব্যয় বৃদ্ধি পেয়েছিলো ২০১৮ সালে ১৩.৯ বিলিয়ন ডলার এবং ২০১৯ সালে এ ব্যয় বৃদ্ধি পেয়ে দাঁড়ায় ১৬.৪ বিলিয়ন আমেরিকান ডলারে। আর সর্বশেষ প্রাপ্ত তথ্য থেকে দেখা যায়, দেশটার সামরিক ব্যয় বৃদ্ধি পেয়ে দাঁড়িয়েছে ২২.৮ বিলিয়ন ডলারে-যা দেশটার জিডিপির ৫.৬% শতাংশ। উল্লেখ্য যে, প্রতিরক্ষা ব্যয়ের দিকে মধ্যপ্রাচ্যে আমিরাতের অবস্থান দ্বিতীয়’ অর্থাৎ সৌদি আরবের পরেই আমিরাতের অবস্থান। আর বিশ্বে আমিরাতের স্থান ১৪তম।
বিশেষজ্ঞদের মতে, দু’টি কারণে মূলত: আমিরাতের সামরিক ব্যয় বৃদ্ধি পাচ্ছে। যেমন : আমিরাত সশস্ত্র বাহিনী এখন বিশ্বব্যবস্থায় সামরিক উপস্থিতি বৃদ্ধি করেছে। সাম্প্রতিক সময়কালে প্রচুর অস্ত্র আমদানী করছে। অন্যদিকে, এ সময়কালে ইয়েমেনে আমিরাতের সশস্ত্র বাহিনী প্রত্যক্ষ যুদ্ধে জড়িয়ে আছে। তাছাড়া, লিবিয়াতেও দেশটার বাহিনীর প্রত্যক্ষ অংশ গ্রহণ আছে। এ সকল যুদ্ধক্ষেত্রের বাহিনীগুলোর জন্য প্রচুর ব্যয় করতে হচ্ছে; অস্ত্র আমদানী করতে হচ্ছে। অর্থাৎ দ্বিতীয় কারণ, অস্ত্র আমদানীর জন্যই সবচেয়ে বেশি ব্যয় করতে হচ্ছে আমিরাত সরকারকে। দেশটা বিশ্বের পঞ্চম অস্ত্র আমদানীকারক রাষ্ট্র হিসেবে বিশ্বে স্থান করে নিয়েছে।
আমিরাতে অস্ত্র-গোলাবারুদ ইত্যাদি আধুনিক যুদ্ধাস্ত্র সরবরাহ ও রপ্তানীকারক দেশগুলোর মধ্যে সর্বশীর্ষে রয়েছে আমেরিকা। আমেরিকার লক্ষ্য হচ্ছে সংযুক্ত আরব আমিরাতকে অত্যাধুনিক এডভান্সড সার্ভেইলেন্স টেকনোলজি, কমান্ডোস ও ওয়েপনারী দিয়ে সুসজ্জিত করা, শক্তিশালী করা। আমেরিকার এ উদ্যোগের সমালোচনা করে আমেরিকান স্টেট ডিপার্টমেন্টের সাবেক কর্মকর্তা ও ব্রুকিংস ইন্সটিটিউশনের ফেলো তামারা কফম্যান উইটিস মন্তব্য করেছেন, ‘আমরা লিটল ফ্যাংকেনস্টেইন সৃষ্টি করছি।’
আমিরাত যেমন আমেরিকান সামরিক সহায়তা পাচ্ছে, তেমনি বিনিময়ে আমেরিকা ও আমিরাতের নিকট সামরিক সহায়তা পেয়ে আসছে। যেমন ১৯৯১ সালের গালফ যুদ্ধের সময় থেকে আমেরিকা আমিরাতের অভ্যন্তরের সামরিক বেইছ ব্যবহারের সুযোগ পেয়েছিলো এবং তখন থেকে আমিরাতের কমান্ডোজ এবং বিমানবাহিনী আমেরিকার সহায়তায় কসভো, সোমালিয়া, আফগানিস্তান, লিবিয়া এবং এমনকি, ইসলামিক স্টেট এর বিরুদ্ধে মোতায়েন করেছিলো। উভয় দেশের মধ্যে এমন ধরনের পারস্পরিক সহযোগিতা এখনো অব্যাহত আছে। যেমন-আমেরিকা-আমিরাতের প্রতিরক্ষা শিল্প উন্নয়নে ব্যাপক সহযোগিতা দিয়ে চলেছে। আমেরিকানদের অভিমত, আমিরাত লেবাননে ইরানী প্রভাব কমাতে সহায়তা করতে পারবে এবং এজন্য আমেরিকার দরকার আমিরাত। অন্যদিকে মধ্যপ্রাচ্য ও আন্তর্জাতিক রাজনীতিতে ভূমিকা রাখার জন্য আমেরিকার সহযোগিতা আমিরাতের জন্য অপরিহার্য। এ কারণেই উভয় দেশের মধ্যে গভীর বন্ধুত্ব গড়ে ওঠেছে। আমিরাতে সাবেক আমেরিকান রাষ্ট্রদূতের কথা থেকেই স্পষ্ট হয়ে যায় আমেরিকার জন্য আমিরাত কত দরকারী। সাবেক রাষ্ট্রদূত রিচার্ড জি.ওলসন বলেন, ‘এটা সবার জানা যে, মধ্যপ্রাচ্যে কোনো কিছু করতে হলে; কেবল আমিরাতই সেটা করতে পারবে।’
আমেরিকার সক্রিয় সহযোগিতায় এবং আমিরাতের নেতৃত্বের দক্ষতা ও দূরদর্শীতায় দরিদ্র দেশ আমিরাত এখন অর্থনৈতিক, সামরিক ক্ষেত্রে একটা উন্নত ও প্রভাবশালী দেশে রূপান্তরিত হয়েছে এবং এখন দেশটা মধ্যপ্রাচ্যসহ আঞ্চলিক ও আন্তর্জাতিক পরিমন্ডলে অর্থনৈতিক, সামরিক ও রাজনৈতিক ব্যবস্থায় ভূমিকা পালন করতে আগ্রহী হয়ে ওঠেছে-যদিও বিগত চার দশকে দেশটা তেমন কোনো ভূমিকা পালন করতে সক্ষম হয়নি কেবলমাত্র দারিদ্র্যতার কারণে।
তবে সাম্প্রতিক বছরগুলোতে অর্থনৈতিক, রাজনৈতিক ও সামরিক ক্ষেত্রে দ্রুত উন্নতি ও শক্তি অর্জন করায় আমিরাত মধ্য পূর্বাঞ্চলের রাজনীতি ও জিওপলিটিক্সে এক অপরিহার্য খেলোয়াড় হিসেবে আত্মপ্রকাশ করেছে এবং মধ্যপ্রাচ্যের আঞ্চলিক রাজনীতিতে রিজিওনাল পাওয়ার কেন্দ্রিক প্রতিযোগিতায় সৌদি আরবের প্রতিদ্বন্দ্বি হয়ে ওঠার চেষ্টা করছে। উল্লেখ্য যে, মধ্যপ্রাচ্যে দু’টি শক্তি সৌদি আরব ও ইরান-আঞ্চলিক শক্তি হিসেবে স্থান করে নেবার জন্য যুগ যুগ ধরে প্রতিযোগিতা করে আসছে এবং এ প্রতিযোগিতায় শামিল হয়েছে সাম্প্রতিককালে সংযুক্ত আরব আমিরাত, দেশটা এখন অত্রাঞ্চলে একক আঞ্চলিক পরাশক্তি হওয়ার প্রত্যাশা পোষণ করছে।
আমিরাত তার লক্ষ্যার্জনে আঞ্চলিক বিভিন্ন কর্মকান্ডে অংশ নিচ্ছে। যেমন : দেশটা গালফ কো-অপারেশন কাউন্সিলর তথা জিসিসি-এর সদস্য রাষ্ট্র। সৌদি আরবের নেতৃত্বে নয়টা রাষ্ট্রের সমন্বয়ে গঠিত কোয়ালিশনের সদস্য হিসেবে ইয়েমেন যুদ্ধে অংশ নিয়েছে-যুদ্ধটা এখনো চলমান। আমিরাত এই অঞ্চলে সন্ত্রাসী বিরোধী যুদ্ধে আমেরিকার সাথে অংশ নিয়েছে। লেবাননের মুসলিম ব্রাদারহুড আন্দোলনকে সন্ত্রাসী-সংগঠন হিসেবে ঘোষণা করে এর বিরুদ্ধে লড়াই করে চলেছে।
আমিরাত বিশ্বাস করে এক্সট্রিমিজম এবং টেররিজম-একই মুদ্রার এপিট-ওপিঠ। তাই এ দু’টি শত্রুর বিরুদ্ধে অবস্থান নিয়েছে এবং লড়াই করে চলেছে আমিরাত। আমিরাতের বর্তমান শাসক মোহাম্মদ বিন জায়েদ (এম.বি.জেড) মনে করেন-মধ্যপ্রাচ্যে শক্তির ভারসাম্য প্রতিষ্ঠার ক্ষেত্রে প্রচলিত আর্মি ও সমরাস্ত্র দ্বারা সেটা অর্জন করা সম্ভব নয়-এর জন্য দরকার একটা অত্যাধুনিক সামরিক বাহিনী এবং নতুন প্রজন্মের সমরাস্ত্র। আমিরাত তার স্বার্থের অনুকূলে মধ্যপ্রাচ্যের ক্ষমতার ভারসাম্য প্রতিষ্ঠার জন্য গড়ে তুলছে অত্যাধুনিক সশস্ত্র বাহিনী এবং মজুদ করছে আধুনিক প্রযুক্তির সমরাস্ত্র। একই সাথে দেশটা তার আঞ্চলিক ও আন্তর্জাতিক নীতিতেও সুদূর প্রসারী পরিবর্তন সাধন করেছে-যার লক্ষ্য হলো মধ্যপ্রাচ্যসহ বিশ্বব্যবস্থায় আমিরাতের বৃহত্তর ভূমিকা পালনের সুযোগ সৃষ্টি এবং মধ্যপ্রাচ্যে দেশটাকে একক আঞ্চলিক শক্তি হিসেবে প্রতিষ্ঠা করা। আমিরাত সে শক্তি হয়ে ওঠার পথেই রয়েছে।
লেখক : আন্তর্জাতিক রাজনীতি বিশ্লেষক।

 

শেয়ার করুন

ফেসবুকে সিলেটের ডাক

উপ সম্পাদকীয় এর আরো সংবাদ
  • ক্যাস্পিয়ান সাগরের ভূ-কৌশলগত গুরুত্ব
  • নিজগৃহে আমাদের এই উদ্বাস্তু জীবন
  • বেকারত্ব ও যুবসমাজ
  • আমার হাতেই আমার সুরক্ষা
  • কুড়িগ্রামের সুলতানা সরেবোর
  • স্মার্টফোনের আনস্মার্ট ব্যবহার
  • কোয়ারেন্টাইন না বলে ঘরবন্দি, একঘরে, ছোঁয়াচে বলুন
  • বিশ্বের স্বাধীনতাকামী মানুষের বন্ধু
  • করোনা ভাইরাস ও করুণ পরিস্থিতি
  • পানির অপচয় রোধ করতেই হবে
  • বিশ্বনবী (সা) এর মিরাজ
  • বিদ্যুৎসাশ্রয় এবং আমাদের করণীয়
  • বেঁচে থাকি প্রাণশক্তির জোরে
  • রক্ত দিন জীবন বাঁচান
  • নদীকে না দেখলে নদীও আমাদের দেখবে না
  • করোনা ভাইরাসে থমকে গেল পৃথিবী
  • করোনা ভাইরাসে আমাদের করণীয়
  • বঙ্গবন্ধুর মানবিক বাংলাদেশের স্বপ্ন
  • বঙ্গবন্ধু ও আমাদের শিশুরা
  • করোনা ভাইরাস ও দেশের অর্থনীতি
  • Developed by: Sparkle IT