শিশু মেলা

নিরাপদ হোক নারীর পথচলা

সুমনা মৃধা প্রকাশিত হয়েছে: ১৬-০১-২০২০ ইং ০১:৩৪:৩৯ | সংবাদটি ৯৮ বার পঠিত

মানুষের দ্বারা সংঘটিত জঘন্যতম অপরাধগুলোর মধ্যে একটি হলো ধর্ষণ। ধর্ষণের একটি বীভৎস খবরের রেশ কাটতে না কাটতেই পত্রিকায় বড়ো অক্ষরে ছাপা হচ্ছে আরো একটি ধর্ষণের ইতিহাস। এই গর্হিত অপরাধটি সামাজিক ব্যাধির মতো ছড়িয়ে পড়ছে সমাজের সর্বত্র। দিনের পর দিন নারীর প্রতি সহিংসতা বৃদ্ধি পেয়েই চলেছে। সেই সঙ্গে বৃদ্ধি পাচ্ছে ধর্ষণের সংখ্যাও। আট বছরের শিশু থেকে আশি বছরের বৃদ্ধা-কারো মুক্তি মিলছে না মনুষ্যদেহদারি পশুদের হাত থেকে। পৈশাচিক আনন্দ মেটাতে মনুষ্যত্বকে ধূলিসাৎ করে একজন পুরুষ ধর্ষকের কাতারে নিজেকে দাঁড় করাচ্ছে। ঘর থেকে কর্মস্থল- কোথাও নেই নারীর দৈহিক নিরাপত্তা। চরিত্রহীন এসব পুরুষের কামার্ত চোখে নারী কেবলই একটি ভোগ্য মাংসপি-, যার শরীরের প্রত্যেক ভাঁজে ভাঁজে কেবল খেলা করে যাচ্ছে কাম। তাই তো একজন নারীকে প্রতি পদে পদে হেনস্থার শিকার হতে হচ্ছে।
সম্প্রতি কুর্মিটোলা বিমানবন্দর সড়ক এলাকায় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ছাত্রীকে সড়ক থেকে তুলে নিয়ে ধর্ষণের ঘটনায় উত্তাল সমগ্র দেশ। সামাজিক সাংস্কৃতিক সংগঠনগুলোও বিচারের দাবিতে মানববন্ধন ও মিছিল সমাবেশ করছে ঘটনার পর দিন থেকে। ছাত্রছাত্রীদের হাতে ‘ডঊ ডঅঘঞ ঔটঝঞওঈঊ’- লেখা প্ল্যাকার্ডসহ মস্তিষ্কে জ্বালা ধরানো নানা স্লোগানই চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দেয় কতটা অনিরাপত্তার মধ্য দিয়ে নারীরা পথ অতিক্রম করছে! আমাদের দেশে নারীর পথচলা কতটা ভয়াবহ ঝুঁকির মুখে তা পরিসংখ্যানের দিকে চোখ বুলালে খুব সহজেই অনুমান করা যায়। মানবাধিকার সংস্থা আইন ও সালিশ কেন্দ্র (আসক) এর হিসাব অনুযায়ী, ২০১৯ সালে ১ হাজার ৪১৩ জন নারী ধর্ষণের শিকার হয়েছেন। ২০১৮ সালে এই সংখ্যা ছিল ৭৩২ জন। অর্থাৎ, বছর ঘুরতেই ধর্ষণের ঘটনা বেড়েছে দ্বিগুণ যা ভয়াবহ বলে উল্লেখ করেছে সংস্থাটি।
ধর্ষণের শিকার হওয়া একজন নির্যাতিতার ব্যথায় আমরাও ব্যথিত হই। তার কষ্ট উপলব্ধি করতে পেরে আমরা অশ্রুসিক্ত হই। তবে একজন নির্যাতিতার কষ্ট আমরা আসলেই কি পুরোপুরি অনুভব করতে পারি? অবশ্যই পারি না। কেবল একজন নির্যাতিতাই জানে, তার ভেতরটা চূর্ণবিচূর্ণ করে কতটা গুঁড়িয়ে দেওয়া হয়েছে! যাকে ধর্ষণ করা হয় তাকে মূলত সামাজিকভাবে হত্যা করা হয়। তার জীবন্ত অবয়বের ভেতরে একটা মৃত সত্তাকে নিয়ে সে নামেমাত্র বেঁচে থাকে। অনেকে বেঁচে থাকার সাহস হারিয়ে আত্মহত্যার পথ বেছে নেয়। সেটা অবশ্যই আমাদের কাম্য নয়। আর যারা সমাজের কটূক্তি হজম করেও বেঁচে থাকে, তারা সেই ট্রমা থেকে কখনো বের হতে পারে বলে আমার মনে হয় না। আর লোকলজ্জাকে উপেক্ষা করে যেসব সাহসী নারীরা ধর্ষকের বিচারের দাবিতে আদালতের শরণাপন্ন হন, আদালতের অযৌক্তিক জেরা দ্বারা তাদের দ্বিতীয়বারের মতো ধর্ষণ করা হয়।
নারীদের সামাজিকভাবে সুরক্ষা দেওয়ার রাষ্ট্রের যে দায়িত্ব রয়েছে রাষ্ট্র তা পালন করতে ব্যর্থ হচ্ছে বলেই নারীর জীবন হয়ে উঠেছে দুর্বিষহ। বিচারহীনতা ও ভয়ের অপসংস্কৃতির কারণেই নারীর প্রতি সহিংসতার লাগাম টানা সম্ভব হচ্ছে না। ঘটে যাওয়া অসংখ্য ধর্ষণের খবর জাতীয় পত্রিকাগুলোতে ছাপানো হলেও এবং ক্ষেত্রবিশেষে ধর্ষকের গ্রেফতারের খবর পেলেও, নজির মিলছে না সুবিচারের। আমাদের দেশে নারী ও শিশু নির্যাতন দমন বিশেষ আইন ২০০৩ সেকশন ৯ অনুসারে ধর্ষণের শাস্তি হলো ধর্ষণের কারণে বা ধর্ষণের পর ভিক্টিমের কোনো ক্ষতি হলে বা ভিক্টিম ধর্ষণের পর মারা গেলে ধর্ষণকারীকে মৃত্যুদ- দিতে হবে এবং ১ লাখ টাকা জরিমানাও করা হবে। কিন্তু আফসোস! কঠোর আইন তো আছে আমাদের, প্রয়োগের দেখা মিলবে কবে? ধর্ষণ রোধে আইনের যথাযথ প্রয়োগ নিশ্চিত করা এখন সময়ের দাবি। অপরাধ তদন্তে ও অপরাধীদের বিচারাধীন করায় পুলিশকে নিরপেক্ষভাবে দায়িত্ব পালন করতে হবে। বন্ধ করতে হবে ‘তদন্ত কমিটি গঠন’ নামক মুলা ঝুলানো টালবাহানা। অপরাধ দমনে আইন যেমন গুরুত্বপূর্ণ, তেমনই গুরুত্বপূর্ণ হলোÍ পারিবারিক শিক্ষা ও সামাজিক সচেতনতা। ধর্ষকরাও কোনো না কোনো পরিবারের সন্তান। একটি শিশুর প্রাথমিক শিক্ষাকেন্দ্র হলো তার পরিবার। পরিবার থেকে একজন শিশুকে নারীর প্রতি যথাযথ সম্মান প্রদর্শনের এবং নৈতিক মূল্যবোধের শিক্ষায় বড়ো করে তুলতে হবে। জোরদার করতে হবে সামাজিক নিরাপত্তা। নারীর প্রতি সহিংসতা রোধে প্রতিটি স্তরের জনগণকে এগিয়ে আসতে হবে। নিশ্চিত করতে হবে নারীর নিরাপত্তা? নির্যাতিতার পাশে দাঁড়াতে হবে স্বয়ং রাষ্ট্রকে। পুরুষের হাত দুটো নারীর দিকে প্রসারিত হোক; তবে সে হাত নারীর সম্ভ্রম লুণ্ঠনকর না হয়, হোক নারীর নিরাপত্তার রক্ষাকবচ।
লেখক : শিক্ষার্থী।

শেয়ার করুন

Developed by: Sparkle IT