ধর্ম ও জীবন

শান্তি প্রতিষ্ঠায় মহানবী (সা:)

আব্দুল কাদির জীবন প্রকাশিত হয়েছে: ১৭-০১-২০২০ ইং ০১:২৫:২১ | সংবাদটি ২০১ বার পঠিত

একটি সমাজ বা একটি রাষ্ট্র বা বিশে^র ভূ-মন্ডলে শান্তি প্রতিষ্ঠায় ইসলামের ভূমিকা অনস্বীকার্য। ইসলামে কোন বৈষম্য নেই। উঁচু-নিচু, ধনী-গরীব, সাদা, কালো- বিশেষ-অবিশেষের নামে কোন অসমতা ও শ্রেণীবিভেদও সমর্থন করে না ইসলামের মধ্যে। যেটা আমরা দেখতে পাই ইতিহাসের পাতায় যেমন সর্বশক্তিমান মহান আল্লাহ তায়ালার বার্তা প্রেরক, প্রিয় বান্দা, দুজাহানের সরদার, সকল নবীদের নবী, সকল রাসুলের রাসুল, যাকে পৃথিবীতে না পাঠালে পৃথিবী সৃষ্টি হতো না, যে নবীর উপর দীর্ঘ ২৩ বছরে নাযিল হয়েছিল বিশ^শান্তি প্রতিষ্ঠায় একমাত্র এবং নির্ভোল প্রগতিশীল কিতাব আল-কোরান, সেই নবী হযরত মুহাম্মদ মস্তফা (সা:) এর জীবনের মধ্যে। আর এ কারণেই ধর্ম হিসেবে একমাত্র ইসলাম মানবাধিকার, নাগরিক অধিকার, ন্যায়বিচার, আইনের শাসন, নারীর অধিকার, শান্তি সমাজ ব্যবস্থা, শিক্ষা ও চিকিৎসাসহ বাসস্থানের নিশ্চয়তা দিতে পেরেছে। সকল মানুষই শান্তি প্রত্যাশী। জীবনাকাশে অশান্তির কালো মেঘের ঘনঘটা কেউ দেখতে চায় না, কিন্তু চাইলেই কি আর শান্তি মিলে? বিশে^র বড় বড় নেতারা এবং বিশ^াসী শান্তিপূর্ণ সমাজব্যবস্থার খুজে আজ ব্যস্থ। শান্তি খুজলেই তো আর শান্তি মিলবে না। শান্তির জন্য ত্যাগ স্বীকার করতে হয়। সৃষ্টির শুরু থেকেই যুগে যুগে অনেকেই শান্তি প্রতিষ্ঠার জন্য নানা পদক্ষেপ নিয়েছিলেন ও কত শত শত কর্মসূচি দিয়েছিলেন, কিন্তু তাদের সেসব প্রচেষ্টা মানব জীবনে কোন প্রভাব পড়েনি। কিন্তু হযরত রাসূলুল্লাহ (সা:) এর শান্তির মিশন কর্মসূচি ছিল সফল কার্যকরি পদক্ষেপ সারা দুনিয়ায়। তিনি মানুষের সামগ্রিক জীবনের প্রতিটি ধাপে ধাপে কিভাবে দেশ, সমাজ ও মানুষের মনের মধ্যে শান্তি প্রতিষ্ঠা করা যায়, সে সব চিন্তা, পরিচালনা ও কর্ম পদ্ধতি প্রণয়ন বা প্রদান করে গেছেন। সমকালীন মানুষসহ কিয়ামত অবধি আগত মানুষকে তিনি দিয়ে গেছেন কাংক্সিক্ষত শান্তির পথ বা সন্ধান। মানুষের সামনের পথ উন্মোচিত করেছেন ইহলৌকিক ও পরলৌকিক শান্তির আলোকিত দিগন্ত। সেই পথ আজও মানবের জীবনে শান্তি প্রতিষ্ঠায় যুগান্তকারী ভূমিকা পালন করছে এবং করবে। আল্লাহ এবং তার রাসূলের পথই একমাত্র শান্তির পথ। বিশে^ প্রতিনিয়ত হাজার হাজার অন্যান্য ধর্মের লোকেরা ইসলামের ছায়ার নিচে আশ্রয় নিচ্ছে। আমরা প্রতিনিয়ত দেখছি যে, দেশ-বিদেশের জাতীয় ও আন্তর্জাতিক পত্রিকায় বিধর্মীরা যখন আল্লাহ, রাসূল (সা:) এবং কোরান হাদিস ভুল প্রমাণ করতে গিয়ে তারাও ইসলাম গ্রহণ করছে। কারণ বিশে^ একমাত্র আল-কোরানই প্রগতিশীল কোরান বা কিতাব হিসেবে বিবেচিত। রাসূল (সা:) মানবজীবনে যেসব পথে অশান্তি আসতে পারে সেগুলো বন্ধ করার জন্য চেষ্টা করেছেন।
রাসূল (সা:) বলেন, “অন্যায়-অবিচারের কিয়ামত দিবস (অত্যাচারীর জন্য) অন্ধকার হয়ে দাঁড়াবে। তিনি আরো বলেন, প্রকৃত মুসলমান সেই ব্যক্তি যার মুখ ও হাত থেকে অন্য মুসলমান নিরাপদ।” এ প্রসঙ্গে সর্বশক্তিমান মহান আল্লাহ তায়ালা পবিত্র কোরান মাজিদে বলেন, ‘‘আর তোমরা সকলে মিলে আল্লাহর রজ্জুকে শক্তভাবে আকড়ে ধর এবং পরস্পর বিচ্ছিন্ন হইও না। আর তোমরা তোমাদের উপর আল্লাহর নিয়ামত স্বরণ কর। যখন তোমরা পরস্পরে শক্ত ছিলে। তার পর আল্লাহ তায়ালা তোমাদের অন্তরে ভালোবাসার সঞ্চার করে দিলেন। অত:পর তার অনুগ্রহে তোমরা ভাই ভাই হয়ে গেলে। এভাবেই আল্লাহ তোমাদের জন্য তার আয়াতসমূহ বর্ণনা করেন, যাতে তোমরা হেদায়াত প্রাপ্ত হও। [আল কোরান এর আল-ইমরান-১০৩]।
এখানে মহান আল্লাহ তায়ালা রজ্জুকে বলতে কোরান সুন্নাহ তথা আল্লাহর দীন ইসলামকে বোঝানো হয়েছে। সেই ইসলামকে বাস্তব জীবনের সাথে কার্যকর করার মাধ্যমে সব ধরণের গোমরাহীর অনল থেকে নিজেকে রক্ষা করে দেশ, সমাজের মধ্যে শান্তিশৃঙ্খলা প্রতিষ্ঠা করার নামই হলো শান্তির ধর্ম ইসলাম।
এ জন্যই বলা হয়, বিশ^শান্তি প্রতিষ্ঠায় রাসূল (সা:) এর আদর্শ মানুষের জন্য রহমতে স্বরূপ বর্তমান যুগে এই বিশে^। বিশ^শান্তি প্রতিষ্ঠায় রাসূল (সা:) এর আদর্শের মধ্যে অন্যতম হলো সালাম বা শান্তি। ইসলাম হলো একটি সার্বজনীন ধর্ম বা জীবন বিধান। মানবজীবনের এমন কোন দিক নেই যার পূর্ণাঙ্গ বিবরণ ইসলামে দেয়া হয়নি। ব্যক্তিগত, পারিবারিক, সামাজিক ও আন্তর্জাতিক পরিমন্ডলসহ সর্বক্ষেত্রেই মেনে চলার জন্য ইসলাম দিয়েছে বিস্তারিত ও ভারসাম্যপূর্ণ বিধান। মানব সৃষ্টির সূচনা থেকেই মহান আল্লাহ তায়ালা একে অপরের সম্ভাষণ করার জন্য নবী রাসূলদের জানিয়ে দিয়েছেন সালাম। সর্ব প্রথম তিনি হযরত আদম (আ:) কে সালামের শিক্ষা দেন। তারপর আল্লাহ তায়ালা আদম (আ:) ফেরাস্তারাও সালাম দেয়ার নির্দেশ দেন। তিনি সালাম দিলে ফেরেস্তারাও সালামের উত্তর দেন। রাসূল (সা:) তার সাহাবীদের সালাম প্রচলনের নির্দেশ দেন। সালাম শান্তির প্রতিক, ভ্রাতৃত্বের বন্ধন, একে অপরের সাথে প্রাথমিক সম্পর্কের মাধ্যম হলো সালাম। একজন মুসলমান আরেকজন মুসলমান ভাইয়ের সঙ্গে সাক্ষাত হলে যে বাক্য দ্বারা পারস্পারিক ভালোবাসা-বন্ধুত্ব, শান্তি-নিরাপত্তা, কল্যাণ ও দোয়া কামনা করে তারই নাম সালাম। কোন মুসলমান ভাইয়ের সঙ্গে সাক্ষাত হলে কথা বলার আগে সালাম দেয়া প্রিয় নবী হযরত মুহাম্মদ (সা:) এর সুন্নাত আর সালামের জবাব দেয়া ওয়াজিব।
মুসলিম, আবু দাউদ ও তিরমিজি শরিফে বর্ণিত-হযরত আবু হুরায়রা (রা:) বর্ণনা করেন, নবী কারীম (সা:) সালামের গুরুত্ব ও ফজিলত বর্ণনা করতে গিয়ে বলেন,” তোমরা ইমান না আনা পর্যন্ত জান্নাতে প্রবেশ করতে পারবেনা। পরস্পর মহব্বত না করা পর্যন্ত ঈমানদার হতে পারবে না। আমি তোমাদের এমন কথা বলে দিবো কি? যা দিয়ে তোমরা পরস্পরের প্রতি মহব্বত সৃষ্টি হবে। তা হচ্ছে পরস্পরের সাক্ষাত হলে সালাম বিনিময় করা এবং সালামের ব্যাপক প্রচলন করা।
রাসূল (সা:) সর্বযুগের সর্বশ্রেষ্ঠ মহামানব। তিনি শুধু ইসলাম ধর্মের প্রতিষ্ঠাতা হিসেবেই শ্রেষ্ঠত্ব লাভ করেননি, মানবজাতির সব অন্যায়, অনাচার, অবিচার, শোষণ ও নির্যাতনের বিরুদ্ধে সফল আন্দোলনকারী এবং মানবজাতির মধ্যে শান্তি প্রতিষ্ঠাকারী হিসেবেও শ্রেষ্ঠত্ব লাভ করেছিলেন। তার জীবনের প্রতিটি কাজ মানবজাতির আদর্শ সমাজ গঠনের পথ প্রদর্শক ও আদর্শ শিক্ষক হিসেবে সর্বজন সমাদৃত। মহানবী (সা:) এ জীবনের তেমনি একটি গুরুত্বপূর্ণ কাজ হলো “হিলফুল ফুজুল” গঠন বা প্রতিষ্ঠা। যার অর্থ ‘শান্তিসংঘ’। তিনি আরবের সমাজের সব অন্যায়, অবিচার, শোষণ ও নির্যাতন বন্ধের লক্ষে তার সমবয়সী কিছু যুবককে নিয়ে ও শান্তিসংঘ নামে একটি সেবামূলক সংগঠন প্রতিষ্ঠা করে কাজ শুরু করেছিলেন।
রাসূল (সা:) এমন এক সময় আরবে জন্ম গ্রহণ করেছিলেন যখন আরব সমাজে চরম বিশৃঙ্খলা ও অরাজকতা বিদ্যমান ছিল। এ সমাজে কলহ, রক্তক্ষয়ীযুদ্ধ, সামাজিক শ্রেণীভেদ, নারী নির্যাতন, ব্যবিচার, সুদ, ঘুষ, মদ, জুয়া, প্রভৃতি সমাজকে মারত্মকভাবে কলুষিত করেছিল। ঐতিহাসিকভাবে আরবের সেই সমাজকে ‘আইয়ামে জাহেলিয়াত’ বা ‘অন্ধকারের যুগ’ বলে অভিহিত করা হতো। সেই সমাজকে রাসূল (সা:) ‘হিলফুল ফুজুল’ সংগঠনের মাধ্যমে শান্তি প্রতিষ্ঠা করেছিলেন। যার প্রভাব আজও আরবে বিদ্যমান।
মহানবী হযরত মুহাম্মদ (সা:) এর নবুয়ত প্রাপ্তির মানবজাতির মধ্যে শান্তি-শৃঙ্খলা ও মানবাধিকার প্রতিষ্ঠায় তার সর্বশ্রেষ্ঠ কর্ম হচ্ছে মদিনা সনদ বা সংবিধান প্রণয়ন। এ সংবিধান পৃথিবীর ইতিহাসে সর্বপ্রথম লিখিত একটি পূর্ণাঙ্গ রাষ্ট্রীয় সংবিধান। যেটি ৬১২ খ্রিস্টাব্দে প্রতিষ্ঠিত হয় আরবে। মহানবী হযরত মুহাম্মদ (সা:) ১০ম হিজরিতে অর্থাৎ ৬২২ খ্রিস্টাব্দে হজ্জ পালন কালে আরাফার ময়দানে বিদায় হজ্জের ভাষণ প্রদান করেন। মহানবী (সা:) বলেন, “আমি তোমাদের মাঝে দুটি গ্রন্থ রেখে যাচ্ছি, তা যদি তোমরা ভালোভাবে আকঁড়ে ধর তাহলে তোমরা পথভ্রষ্ট হবে না, আর এই দু’টি গ্রন্থ হলো (১) কোরান এবং অপরটি হলো আমার নবীর হাদিস। বিশ^শান্তি প্রতিষ্ঠায় প্রগতিশীল এই দুটি গ্রন্থ তোমাদেরকে সুন্দর ও শৃঙ্খলাপূর্ণ একটি জীবন দিবে। এই ঐতিহাসিক ভাষণ কেবল উপাসনামূলক অনুশাসন ছিলো না, বরং মানব সমাজের জন্য করণীয় সম্পর্কে সুস্পষ্ট ভাষায় গুরুত্বপূর্ণ উপদেশ ছিলো। আর তা হলো আল্লাহর প্রতি আনুগত্য। সার্বভৌমত্বের স্বীকৃতি, মানবজাতির ঐক্য, আধ্যাত্মিক ভ্রাতৃত্ব, সামাজিক স্বাধীনতা এবং গণতান্ত্রিক সাম্য ইত্যাদি সমাজ বিনির্মাণে অন্যতম সব বিষয় এই ভাষণের অন্তর্ভুক্ত ছিলো।
মহানবী (সা:) শুধু ইসলাম ধর্মে শান্তি প্রতিষ্ঠা করতে চান নি, তিনি সকল ধর্মের মধ্যে শান্তি প্রতিষ্ঠা করতে চেয়েছেন। তিনি সকল ধর্মের লোকের প্রতি ভালোবাসা দেখাতেন। মহানবীর উপর অনেক নির্যাতন, নিপীড়ন হয়েছিল কিন্তু তিনি সব কিছু ধৈর্যের সাথে মোকাবেলা করেছেন।
আমাদের নবী হযরত মোহাম্মাদ (সা:) যে পথে প্রতিদিন যাতায়ান করতেন সে পথে এক ইহুদি বিধর্মী বুড়ি মহিলা রাসূল (সা:) আসা-যাওয়ার পথে কাঁটা পুঁতে রাখতো। মহানবী (সা:) সেই কাঁটা সরিয়ে যেতেন। একদিন নবী করীম (সা:) দেখলেন পথে কাঁটা নেই। তখন তিনি আশপাশের লোকজনকে জিজ্ঞেস করলেন তার সম্পর্কে। তখন বুড়ির খোঁজ-খবর নিলেন এবং জানতে পারলেন মহিলা অসুস্থ। তিনি সাথে সাথে সেই বুড়িকে দেখতে যান এবং সেবাযতœ করে সুস্থ করে তুলেন। এর পর বুড়ি তার নিজের ভুল বুঝতে পেরে এবং মোহাম্মাদ (সা:) আদর্শ দেখে ইসলাম গ্রহণ করে। রাসূল (সা:) এর আদর্শ দেখে আরবের লোকেরা দলে দলে ইসলাম গ্রহণ করতো। এই হলেন আমাদের নবী (সা:) যার আদর্শ বর্ণনা করে শেষ করা যাবে না। বিশ^শান্তি প্রতিষ্ঠায় রাসূল (সা:) এর আদর্শ অনস্বীকার্য।

শেয়ার করুন

Developed by: Sparkle IT