ধর্ম ও জীবন

শাইখুল হিন্দের চিন্তার সমুদ্রে

সাইফ আশরাফ প্রকাশিত হয়েছে: ১৭-০১-২০২০ ইং ০১:২৬:২০ | সংবাদটি ২১৬ বার পঠিত

শাইখুল হিন্দ মাহমুদ হাসান দেওবন্দি (রাহিঃ)। চেতনায় দীপিত একটি নাম। যে নাম শুনে নিয়ত কাঁদে হাজারো ভক্তের প্রাণ। যে নাম সূর্যের আলোয় প্রদীপ্ত যে আলোর কোনো লয় নেই। যে নামে সাত সকালের পাখিরা তান ধরে যে সুরের কোনো উপমা নেই। যে নাম জপে কলকল রবে বয়ে যায় নদীর মোহনা যে ধ্বনির কোনো বিনাশ নেই।
আজ মুসলিম বিশ্বে শাইখুল হিন্দের নাম শুনেনি এমন মানুষ খুঁজে পাওয়া অতি দুষ্কর। ইসলামী তা’লীম-তাদরীস, তাক্বওয়া, তাওয়াক্কুল, তাওয়াদ্বুঅ ইখলাস ও যুহদের মতো মহাগুণে গুণান্বিত এই মহা মনীষীকে শ্রেষ্ঠত্ব এনে দিয়েছিলো তার আরো একটি আদর্শিক গুণ সেটি হলো ব্রিটিশ বিরোধী আন্দোলনে সামনে থেকে নেতৃত্ব প্রদান। উপমহাদেশের এই মহান ব্যক্তি ১৮৫১ সালে ভারতের বেবেলী শহরে মাওলানা যুলফিকার আলী (রাহিঃ) এর ঘরে জন্মগ্রহণ করেন। বসবাস করতেন সাহারানপুর জেলার অন্তর্গত ছোট্ট একটি গ্রামে। যার নাম ছিলো দেওবন্দ। এ জন্য আমরা তাকে মাহমুদ হাসান দেওবন্দি (রাহিঃ) বলে অভিহিত করি। তৎকালীন ভারতে এই দেওবন্দ নামক গ্রামের কোনো মূল্য ছিলো না। কিন্তু আজকের ভারতে তথা সারা বিশ্বে দেওবন্দের মর্যাদা অনস্বীকার্য। কারণ এই দেওবন্দ যুগে যুগে জন্ম দিয়েছে সংস্কার-সাধকদেরকে। আর তাদের সকলের মধ্যমণি হলেন আমাদের শাইখুল হিন্দ (রাহিঃ)। তার আবির্ভাব উপমহাদেশের ঘোরতর দুঃসময়ে একজন ত্রাতার আগমনী সু-বার্তা বয়ে এনেছিলো। কারণ তখন ইংরেজদের অত্যাচারে কেঁপে উঠেছিলো গোটা ভারত উপমহাদেশ। ভারত উপমহাদেশের চারদিকে ছড়িয়ে পড়েছিলো ইংরেজ অত্যাচারের লোহালক্কর। ক্ষমতালিপ্সু ইংরেজরা হিং¯্র হায়েনার চেয়েও হিং¯্র হয়ে উঠেছিলো উপমহাদেশের নিরীহ মুসলিমদের উপর। শান্তিপ্রিয় নিরীহ মাজলুমরা হয়রান হয়ে দিগি¦দিক ছুটেছিলো একজন ত্রাতার খোঁজে। ইতিহাসের এমনি এক ভয়ঙ্কর সময়ে যিনি জাতির হাল ধরেছিলেন তিনি হলেন আমাদের শাইখুল হিন্দ (রাহিঃ)। যখন সবাই ছিলো উদাসীনতার ঘুমে ঘুমন্ত তিনি ছিলেন অঙ্গারের ন্যায় জ্বলন্ত। দাসত্বের জিঞ্জিরে নিবদ্ধ। ইংরেজ শক্তির প্রকটতা তখন দুরন্ত তার চেতনার বাজপাখি ছিলো উড়ন্ত।
ইংরেজরা ক্রমশঃ মুসলিমদের উপর অত্যাচারের মাত্রা বাড়াতে থাকে। তিনিও বসে থাকেন নি। তার একচোখ থাকত দরস-তাদরীসে। আর চোখে দেখতেন ইংরেজ-শাসনমুক্ত উপমহাদেশ। তিনি তার বিশিষ্ট সাগরেদ ও একান্ত আস্থাভাজনদের নিকট তার স্বপ্নের কথা খুলে বললেন। এমনিতেই তার ছাত্ররা একেকজন ছিলেন আকাশের তারকাসদৃশ। তারাও মুসলিমদের উপর ইংরেজদের অত্যাচার মেনে নিতে পারেননি। তাই তারাও মনে মনে ব্রিটিশ বিরোধী আন্দোলন ও ভারতমুক্তির স্বপ্ন দেখছিলেন। তার উপর আবার তাদের আত্মার খোরাক উস্তাদের ডাক। দুইয়ে মিলিয়ে তাদের আত্মবিশ্বাস ও মনোবল আরও সুদৃঢ় ও মজবুত হলো। শাইখুল হিন্দের ডাকে সাড়া পড়ে গেল গোটা ভারতে। তার সেই ডাকে সাড়া দেন তার স্বহস্তে গড়া কারিগর শাইখুল ইসলাম হুসাইন আহমদ মাদানী, স্বাধীনচেতা উবায়দুল্লাহ সিন্ধী, মাওলানা উযাইর গুল পেশোয়ারী, খলিল আহমদ সাহারানপুরী, হাকিম নুসরাত হুসাইন, মাওলানা ওয়াহিদ আহমদ, মরতুজা হাসান চাঁদপুরী, মাওলানা হাদি হাসান, সাহুল ভাগলপুরী (রাহিঃ) প্রমুখ মহান ব্যক্তিবৃন্দ। তাদেরকে সাথে নিয়ে এবং নিজ শাইখ হুজ্জাতুল ইসলাম ক্বাসিম নানুতুবী (রাহিঃ) এর অভীষ্ট লক্ষ্য ও উদ্দেশ্যকে সামনে রেখে গঠন করলেন ‘সামারাতুত তারবিয়্যাহ’ এবং ‘জমিয়তুল আনসার’ নামক দু’টি বিপ্লবী সংগঠন। যা পরবর্তীতে তার আন্দোলনকে করেছিলো বেগবান। স্বাধীনচেতা উবায়দুল্লাহ সিন্ধী এবং শাইখুল ইসলাম হুসাইন আহমদ মাদানী (রাহিঃ) এই দু’জন ছিলেন তার চেতনার ঝান্ডা নিয়ে দুই পায়ে খাড়া। তারা জানতেন বিপদ তাদের মাথার উপর সর্বদা ঘূর্ণন করছে তবুও যে দিলে একবার জ্বলে উঠে জিহাদী জাযবা তাকে ঠেকাবার দুঃসাধ্য কার। শাইখুল হিন্দের পর তারাই ছিলেন ব্রিটিশ বিরোধী আন্দোলনের মূল নায়ক। যাদের স্বপ্ন, লক্ষ্য ও উদ্দেশ্য একীভূত ছিলো তাদের প্রিয় উস্তাদের স্বপ্ন, লক্ষ্য ও উদ্দেশ্যের সাথে। তাই মাওলানা উবায়দুল্লাহ সিন্ধী (রাহিঃ) কে বানালেন জমিয়তুল আনসারের সেক্রেটারি।
ক্রমে তার আন্দোলন বেগবান হয়ে উঠল। মুসলমানরা সানন্দে-সাগ্রহে গ্রহণ করল তাকে, তার আন্দোলন ও সাথীবর্গদেরকে। ইহার মধ্যেই তারা তাদের মুক্তির পথ দেখছিলো। তারা সর্বোতভাবে শাইখুল হিন্দকে সাহায্য করলো। ভারত ছাড়াও বলখ, কাবুল, বেলুচিস্তান, পেশোয়ার ইত্যাদি বিভিন্ন জায়গায় ছড়িয়ে ছিটিয়ে থাকা তার শিষ্যদেরকে শাইখুল হিন্দ (রাহিঃ) অনুপ্রাণীত করলেন তার আন্দোলনে। তারা সবাই তার আহবানকে সাদরে গ্রহণ করলো এবং তৈরী হয়ে গেল তাদের প্রিয় শাইখের ইশারায় জীবন বিলিয়ে দিতে।
তিনি তার আন্দোলনকে আরও ব্যাপক প্রচার করলেন। ফলে ইংরেজ সরকার বিচলিত হয়ে পড়লো। দারুল উলুম দেওবন্দ থেকেও তাকে সতর্ক করা হলো, তবুও তিনি থামলেন না। চলতে লাগলেন তবে সতর্কতার সাথে। তিনি উলামাদের উদ্দেশ্য করে বলেন, ‘ইসলাম কেবলমাত্র ইবাদত-বন্দেগীর নাম নয়। বরং ধর্ম, রাজনীতি, আখলাক এবং সংস্কৃতির যাবতীয় প্রয়োজনীয় উপাদান সংবলিত এক ব্যবস্থাপনার নাম। সময়ের চাহিদায় সাড়া না দিয়ে যারা একপাশ কাটাতে চায়, যারা হুজরায় বসে থাকাকে ইসলাম প্রদত্ত কর্তব্য সম্পাদনে যথেষ্ট মনে করে তারা ইসলামের পুতঃপবিত্র আঁচলে কালিমা লেপন করে।’
পথ যত লম্বা হোক, সেদিকে নজর দেননি শাইখুল হিন্দ (রাহিঃ)। যার আরম্ভ আছে তার শেষও আছে। তিনি জানতেন যত বড় জিনিসই হোক বিন্দু থেকে সবকিছুর সূচনা। যেখানে পুরাতনের অন্তিমতা সেখানে নতুনত্বের সূচনাগার। পুরাতনের জন্য অহেতুক আফসোস করে সময় নষ্ট করা বোকামি। তাই তিনি উম্মাহর কল্যাণে নতুনভাবে নতুন পরিকল্পনা নিয়ে এগিয়ে যান বদ্ধপরিকর হয়ে। তিনি তার অভিযান সফল হওয়ার লক্ষ্যে হিজাজে হজ্ব করার জন্য অবস্থান করার সময় হিজাজে তুর্কি প্রেরিত প্রতিনিধি গালিব পাশার সাথে একটি চুক্তি করেন এবং সেনাপ্রধান আনওয়ার পাশার সাথেও সাক্ষাৎ করেন এবং তার নিকট থেকে একটি চিঠিও লাভ করেন যাতে তাকে আনোয়ার পাশা সহযোগীতার আশ্বাসও দিয়েছিলেন। এমনকি তিনি তার চরিত্রের মাধ্যমে বিদ্রোহী, পাষন্ড শরীফ হোসাইনেরও মন জয় করে নিয়েছিলেন। অপরদিকে ইংরেজরা তাকে হন্য হয়ে খুঁজছিলো। শেষ পর্যন্ত ইংরেজরা তার অবস্থান সম্পর্কে জেনে ফেলে এবং তাকে গ্রেফতার করে। প্রথমে জেদ্দা তারপর মিসরের জিযা আর তারপর ইতিহাস বিখ্যাত সেই মাল্টা দ্বীপ যা তার ও তার সাথীদের গ্রেফতার হওয়ার পূর্বে পৃথিবীবাসীর নিকট অবিদিত ছিলো এখানেও শেষ নয় তারপর রয়ে গিয়েছিলো ইস্কান্দারিয়া, কায়রো, সান্দিবাশার, আদন, বোম্বাইয়ের জেলখানাগুলো। যেখানে তাকে ও তার সাথীবর্গদেরকে বন্দী করে রাখা হয়েছিলো। কিন্তু বন্দী অবস্থায়ও এই সংগ্রামী পুরুষের সংগ্রাম থামেনি। যে আগুন জ্বলে উঠেছিলো তার বুকে তা ছিলো অনির্বাণ। কারাগারে থেকেও তিনি শুনতে পাচ্ছিলেন নিরীহ ভারতবাসীদের আর্তচিৎকার। পাঁচ বছর পর যখন কারাগার থেকে মুক্তি পেয়ে দেওবন্দে ফিরে আসেন তখন তিনি প্রদান করেন ঐতিহাসিক ইংরেজ বিরোধী ফতোয়া। আর ভারতবাসীরা তাকে উপাধি দেয় ‘শাইখুল হিন্দ’। স্বাধীনতা আন্দোলনের এই অজেয় বীর উপমহাদেশের মুকুটহীন বাদশাহ যখন ১৯২০ সালে পৃথিবী পৃষ্ঠে নিজ-কাজ সমাধা করে এবং অন্যের কাজ সমজিয়ে দিয়ে ধরণির সাথে সম্পর্কচ্যুত করেন তখন শোকের ছায়ায় আবর্তিত হয়েছিলো গোটা ভারত উপমহাদেশ। মানুষ বুঝে ফেলেছিলো তারা আজ তাদের ত্রাতাকে হারিয়ে ফেলেছে। যার প্রয়াণে ভেঙ্গে পড়েছিলো ইসলামের একটি বাহু। তার একটি প্রমাণ তার জানাযা পাঁচবার অনুষ্ঠিত হওয়া। আজ আমরা প্রাণভরে মুক্ত নিঃশ্বাস গ্রহণ করি, কিন্তু আমরা জানি না কারা আমাদেরকে এই নিঃশ্বাস গ্রহণ করতে দিতে গিয়ে স্বেচ্ছায় উৎসর্গ করেছিলেন নিজ জীবন। ইহা আরেকটি ইতিহাস। ইতিহাসের সূচনা মানবজীবনের সূচনারও পূর্বে। আজ আমাদের এমন একটা সময় অতিক্রান্ত হচ্ছে যখন ইতিহাস পাঠ কের মনীষীদের জীবনী থেকে শিক্ষা গ্রহণ করা আমাদের উপর আবশ্যক। কিন্তু আমরা তার সাথে করছি বিদ্রুপ ও গাদ্দারি। যার ফলে প্রতিনিয়ত বেড়েই চলেছে আমাদের দুর্দশা। ইতিহাসের একটি অবিচ্ছেদ্য অংশ শাইখুল হিন্দ (রাহিঃ), তার জীবন ও কর্ম। ভূপৃষ্ঠে দাঁড়িয়ে মহাকাশের সীমা নির্ধারণ যেমন অসম্ভব, বোকামি যেমন তটে দাঁড়িয়ে মহাসমুদ্রের সীমা কিংবা পানি নির্ধারণ তেমনি যারা বড় তাদের কীর্তির সীমা নির্ধারণ অসম্ভব ও বোকামি। আমাদেরকে মুক্ত নিঃশ্বাস গ্রহণ করার পিছনে যারা নিজেদের জীবনকে সহাস্যে বিলিয়ে দিয়েছেন আমাদের কি উচিত নয় তাদের প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করা। জীবনের প্রতিটি অধ্যায়ে আমরা যেন তাদের নামের সাথে উচ্চারণ করি রাহিমাহুমুল্লাহু তাআলা।

শেয়ার করুন

Developed by: Sparkle IT